রূপকথার বাজেট ২০২৬ ও গণপরিবহন => নাগরিক

পশ্চিমবঙ্গের বাজেট ২০২৬ ও গণপরিবহণ 


আমি ৩৪ বছরের রাজত্বকালীন রাজনীতি বা অর্থনীতি কোনোটা নিয়েই মাথা ঘামাতাম না। কিন্তু গত ১৫ বছর ধরে বাজেটে দেখেছি থাকত প্রচুর 'অনুপ্রেরণা', কিন্তু 'কেন্দ্রের বঞ্চনা' ও আর্থিক দেউলিয়াপনার প্রতিচ্ছবি। এবারের বাজেটে দৃশ্য পুরো উল্টে গেছে। অর্থমন্ত্রী শ্রী স্বপন দাশগুপ্তের কাছে বাস্তবিকই ঋণভারে জর্জরিত, শিল্পরোহিত, রুগ্ন একটি রাজ্যের জন্য বাজেট পেশ করা ছিল মস্ত চ্যালেঞ্জ। 

সেই চ্যালেঞ্জ তিনি উতরেছেন বলা যায় "ডাবল ইঞ্জিন"-এর জোরে। বাজেটে তাই নতুন কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলি লাগু করা ও অসম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় কাজগুলোকে দ্রুত পরিণতি দানের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এক কথায় দিল্লীর সহায়তায় পশ্চিমবঙ্গকে ঢেলে সাজানোর মতো ব্যাপার, যেখানে উত্তরবঙ্গে উন্নয়ন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, আবার দক্ষিণবঙ্গও বঞ্চিত হয়নি। 

রাজ্য সরকারের কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ মেটানোর জন্য এক ধাক্কায় 20% ডিএ প্রদান সম্ভবত বেনজির ব্যাপার। মাইনে বেড়েছে প্রায় সব সরকারি কর্মীদের, এমনকি সিভিক ভলান্টিয়ার, প্যারা টীচার ও আশা কর্মীদেরও। মানে কাউকেই কেন্দ্রীয় বঞ্চনার কাঁদুনি গেয়ে বঞ্চিত করা হয়নি, আবার প্রধানমন্ত্রী কি মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় হচ্ছে বলেও কিছু বিজ্ঞাপিত হয়নি। একজন আমাকে ব্যক্তিগত মেসেজে জানান, পৌরসভার সাফাইকর্মীদের মাইনে নাকি বাড়েনি। এটা ঠিক জানি না। যদি সত্যিই সেটা মিস হয়ে গিয়ে থাকে, আশা করব নতুন যুগ্ম ইঞ্জিন সরকার সেই অভিযোগের জায়গাও রাখবে না। 

এক কথায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে এত ভারসাম্য রক্ষাকারী ব্যালান্সড বাজেট, তাও আবার এমন হতদরিদ্র অবস্থায় আমি অন্তত ভাবিনি। এটাও হতে পারে, বিরোধী আসনে বসে যাদের হাল্লাচিল্লা করার কথা ছিল, তারা এখন ভালো তৃণমূল হয়ে গেছে বলে বিরোধিতাশূন্য বাজেট একবারে রূপকথার মতো মনে হচ্ছে। 

এর মধ্যে আসানসোল মহকুমার মানুষ হিসাবে দুর্গাপুর-আসানসোল মেট্রো চালুর প্রস্তাব আমার দারুণ লেগেছে। সেটা উপভোগ করার উপায় থাকলে আরও দারুণ হত। তবে সাধারণ মানুষ হিসাবে আমার সেই অঞ্চলে গণপরিবহনে যাতায়াতের বাস্তব কিছু অভিজ্ঞতা জানাচ্ছি পরামর্শ তথা আবেদন হিসাবে।


1) দুর্গাপুর ও আসানসোলের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বাস সার্ভিস যথেষ্ট সংখ্যায় আছে। বর্ধমান-আসানসোল ডিএমইউ ট্রেনও আছে; আছে কোলফিল্ড, ব্ল্যাক ডায়মন্ডের মতো কিছু স্বল্প দূরত্বের ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ট্রেনও। কিন্তু সমস্যা হয় আসানসোলে নামার পর। লোকাল বাস থাকলেও কিছু স্থান যেমন ডিশেরগড়-বরাকর এই 6-7 কিলোমিটার রুট বাস পরিষেবা থেকে বঞ্চিত অনেক দিন হল। অধিকাংশ বাস হয় বরাকর, নয় ডিশেরগড় গেলেও অনেক আগে কয়েটা মিনিবাস ডিশেরগড়-বরাকর রুট হয়েও আসানসোল যেত। বছর সাতেক আগে গিয়ে দেখি ডিশেরগড়-বরাকর রুটে সেইসব বিরল বাসগুলিও বন্ধ। যোগাযোগের জন্য ভরসা একমাত্র টেম্পো (অটো) যার সংখ্যা বেশি নয়। অ্যাপের মাধ্যমে ক্যাব সার্ভিসও ছিল না। এখন আছে কিনা জানি না। থাকলেও সেটা নিত্যযাত্রীদের ও ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে চাপের। সাঁকতোড়িয়া থেকে বরাকরের মাঝে থাকা মানুষগুলোর ব্যক্তিগত বাহন না থাকলে আসানসোল পৌঁছোনোর জন্য বিস্তর হাঙ্গামা করতে হয়। ভোরে ট্রেন ধরার থাকলে তো কথাই নেই। 

আমি এখন ঐ অঞ্চলে থাকি না। আমাদের পোড়োবাড়ির ভগ্নাংশে যাওয়াই হয় না। দুর্ঘটনার পর শরীরের যা অবস্থা হয়েছে, আর যাওয়া হবে কিনা, ঘোর সন্দেহ। কিন্তু যারা ঐ দিকে থাকে তাদের কথা ভেবে লিখলাম।


2) একই অবস্থা টিটাগড় পাতুলিয়ার মানুষগুলোরও। তবে আমি ছাড়া সম্ভবত আর কারও মাঝেমাঝেই কলকাতার কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলে যাওয়ার দরকার পড়ে না, কিংবা আমি ছাড়া আর সকলেই নিজস্ব দুই চাকা চালাতে অভ্যস্ত, ভিড় ট্রেনে চাপতে পারদর্শী, অথবা আমার চেয়ে বেশি ধনী, আর সর্বোপরি ধরেই নিয়েছে যা নেই তা কোনোদিন হবেও না। তাই এই নিয়ে দেখেছি শুধু আমার একারই বেশি মাথাব্যথা, যদিও পাতুলিয়া ও আশপাশের বহু মানুষ সুবিধা পাওয়ার জন্য আমার করা আবেদনপত্রে সানন্দে সই করেছে।

আমার একটা প্রস্তাব ছিল, 78/1 তার মূল রুট পারমিট অনুযায়ী পাতুলিয়া পর্যন্ত যদি আরও এক দেড় কিমি বাড়ানো যেত, পূর্ণাঙ্গ টার্মিনাল না হলেও অন্তত কিছু বাসকে যদি পাতুলিয়ার পঞ্চায়েত মোড় কি চৌধুরী মোড় পর্যন্ত ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া যেত, তাহলে সমস্যার সহজতম সমাধান হয়ে। শুধু রহড়াবাসীকে আশ্বস্ত হতে হবে, কিছু বাস পাতুলিয়া থেকে ছাড়লে রহড়ার বাসের টাইমিং বসার জায়গা কোনোকিছুই ব্যাহত হবে না। কারণ রহড়ার নিজস্ব টার্মিনাস থেকেই অধিকাংশ বাস টাইম অ্যাডজাস্ট করে যেমন ছাড়ার ছাড়বে। পার্থপুরে 78/1এর একটা রুট যায় বলে তো সমস্যা বাড়েনি, বরং সোদপুর পর্যন্ত মানুষের বাড়তি সুবিধাই হয়েছে। এর বাইরে নতুন রুট চালু হতেই পারে। হলে তো অতি উত্তম।

সবটাই বিশদে জানিয়ে প্রায় 120-130 জনের সম্মতিসূচক হস্তাক্ষর সহ পাতুলিয়া পঞ্চায়েত, টিটাগড় পুরসভা, ব্যারাকপুরের এসডিপিও অফিস, বারাসাতের RTA অফিসের 3টি বিভাগ সহ মোট 5টি দপ্তরে আবেদনপত্র দিয়ে রিসিভড কপি তৈরি করেই রেখেছিলাম। এছাড়া একটা আলাদা পত্র মানে ৬ষ্ঠ চিঠিটি 78/1 বাসস্ট্যান্ডের রহড়ার অফিসের ড্রপবক্সে ফেলে এসেছিলাম, যার ইতিবাচক প্রত্যুত্তর পাই ঠিক পরের দিনই। তৎকালীন বাস পরিচালক মণ্ডলীর বক্তব্য ছিল, স্থানীয় পঞ্চায়েত ও বিধায়কের অনুমতি এবং কিছু বেসিক ব্যবস্থাপনা দেওয়া হলে তাদের পরিষবা চালু করতে আপত্তি নেই।

পুরো কাজটা আমার বরকে জ্বালিয়ে, গাঁটের কড়ি খসিয়ে পাতার পর পাতা প্রিন্ট, জেরক্স ইত্যাদি করে, একজন স্থানীয় বাসিন্দাকে সঙ্গে নিয়ে করেছিলাম বিগত শাসকের আমলে। শুধু বিধায়কের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আবেদনপত্র ও প্রত্যয়িত কপিগুলো জমা দেওয়া হয়নি। কয়েকবার চেষ্টা যে করিনি তা নয়, কিন্তু দক্ষিণ কলকাতার মানুষ উত্তর চব্বিশ পরগনার বিধায়ক হলে যা হয়, তাই হয়েছে। আর পলিটিক্যাল চ্যানেলে কিছু করার থাকলে ব্যাপারটা অন্যদের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি নিজে প্রাক্তন বিধায়কের সঙ্গে দেখা করতে সচেষ্ট হইনি।


আশার কথা, বর্তমান বিধায়ক শ্রী কল্যাণ চক্রবর্তী খড়দারই মানুষ এবং রাজ্য বিধানসভার একজন পূর্ণ মন্ত্রী। তাই মাননীয় বিধায়কের উদ্দেশে লেখা একটি পৃথক আবেদনপত্র অন্যান্য দপ্তরে জমা পড়া চিঠিগুলির received কপিগুলি সংযুক্ত করে আমার বরের সাহায্য গিয়ে দিয়ে এসেছি নিজের যন্ত্রণাবিদ্ধ কোমরে বেলট পরেই। এটা ছিল হিসিবমতো ৭ম আবেদনপত্র।

মন্ত্রীমশাই খুবই ব্যস্ত ও বহুজন পরিবৃত ছিলেন। সেই অবস্থাতেই কিছুটা শুনলেন। আমার বাসরুট 1-1.5 km সম্প্রসারণের প্রস্তাবটির বদলে নতুন বাসরুটের কথা বললেন, যে প্রস্তাব আমার চিঠিতেও আছে। তাঁর বিধানসভায় একটি বাস টার্মিনাল করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। আমাকে টার্মিনাল করার জায়গাও দেখে দিতে বললেন। বললেন, "এতকিছু যখন করেছেন, এটাও আপনি পারবেন।"

এই ব্যাপারে আমার মতে সবচেয়ে উপযুক্ত স্থানটি চিহ্নিত করা আছে। তবে যাদের সাহায্য চাইছি তারা একেকজন একেক রকম কথা বলছে। এখন জখম শরীর নিয়ে আমার পক্ষে আর এগোনো সম্ভব কিনা বুঝতে পারছি না। কারণ আমি এখনও বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারছি না। এই অঞ্চলের বাকিদের তৎপর হতে হবে যার মধ্যে আমাদের আবাসনের সহ-আবাসিকদের ভূমিকা অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। এই আবেদনপত্র জমা দেওয়ার কথা অনেক ইতস্তত করে সবে আজ এমনি মেসেজ করে জানালেন আমার বর। 

এখন ব্যারাকপুর পর্যন্ত মেট্রো সম্প্রসারণ, যেটা ভারতীয় রেলের কাজ, সেটা এই ডাবল ইঞ্জিন সরকারের আমলে শুরু হলে তো সোনায় সোহাগা। তাহলেও কিন্তু পাতুলিয়া থেকে বিটি রোড হয়ে শ্যামবাজার হয়ে কলেজ স্ট্রিট (রামমোহন সরণী) হয়ে ধর্মতলা কি বাবুঘাট যাওয়ার বাসরুটের উপযোগিতা থেকেই যায়। বর্তমানে আমাদের পাতুলিয়া থেকে সোদপুর যেতে আসতে রিকশা ও বাস ভাড়া মিলিয়ে পড়ে ৮০-১০০ টাকা, যার ফলে প্রয়োজনের মূল্যমান অন্তত ১000 টাকা না হলে হেঁটে গিয়ে রিকশা ধরা, তারপর অতীব দুর্গন্ধযুক্ত বাস টার্মিনাস থেকে বাসে চড়ে সোদপুর ঘুরে আসাটা গায়ে লাগে। রহড়া থেকে এদিকে সবসময় রিকশাও মেলে না। আর রিকশা চেপে স্টেশনে গিয়ে লাইন পেরিয়ে ট্রেনের জন্য হাপিত্যেশ করা আরও ঝকমারি। সরাসরি বাস পেয়ে গেলে ব্যাপারটা খুব জোর ১৫ টাকার।

আমার মতো অনেকেই ট্রেনের ভিড় ও স্টেশনে অপেক্ষা করাতে স্বচ্ছন্দ নয়। আমি তো বরানগর থেকে মেট্রো ধরতে প্রথমে রিকশা, তারপরে বিপজ্জনক ভাবে লাইন পেরিয়ে অস্বাস্থ্যকর দুর্গন্ধের মধ্যে অনেকটা হাঁটা, তারপর অটো-- এতকিছু করে যাই। তাতেও খরচ পড়ে। বর বাইকে বসিয়ে পৌঁছে দিলে মনে হয় ফোকটে লিফট পেলাম, পেট্রোল খরচটা আমার গণনায় থাকে না।

যাইহোক, আশা প্রকাশ করছি খড়দা বিধানসভার বিধায়ক ও মন্ত্রীমশাই এই ব্যাপারে আমাদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে কিছু করবেন। 

এখানেও 1 নং পয়েন্টের মতো একই কথা প্রযোজ্য। এখন আমার কী লাভ? কিছুদিন আগে পর্যন্ত অবশ্যই ছিল। কিন্তু এখন তো গাড়ির সামনের আসনে বসা ছাড়া যাতায়াত করাই নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। তবু এতদিন ধরে এতখানি কষ্টের কিছু একটা ফল বেরিয়ে এলে ভালো লাগবে।


শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

Post a Comment

Previous Post Next Post