চৌর্যবৃত্তি
বিদ্যাশিস
বন্দ্যোপাধ্যায়
নিবারণ পাকড়াশি থাকেন একটি ছোট শহরে, কিন্তু কলকাতা
থেকে বেশি দূরে নয়। তিনি খুব সুন্দর একটি দোতলা বাড়ি তৈরি করিয়েছেন। লোকেরা বলে,
থাক লোকেরা কি বলে সে কথায় পরে আসছি।
নিবারণ বাবুর বাড়ির দরজার ওপর একটি সাইনবোর্ড লাগানো, 'নিভাননী কেরিয়ার কাউন্সেলিং
সেন্টার'। তলায় ছোট করে লেখা - বিভিন্ন পেশার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নিভাননী
তাঁর মায়ের নাম। প্রয়াত হয়েছেন বহুদিন আগে। নিবারণ বাবুর বয়সও তো একষট্টি!
লোকজনেরা বলে, বংশানুক্রমে নিবারণ বাবুদের
পেশা হচ্ছে চুরি। চুরির পয়সায় বানিয়েছেন বাড়ি। তাঁর বাবা মা থাকতেন ছোট একটা টালির
চালের ঘরে। তুলনায় নিবারণ বাবুর উপার্জন অনেক বেশি।
নিবারণ বাবুর মনে আছে, মা যখন বেঁচে ছিলেন, তখন রাতে কাজে বের হওয়ার সময় বলতেন,'ও
বাবুল, সিঁধকাঠি, ছুরি কাঁচি, চাবির গোছা, সব গুছিয়ে নিয়েছিস তো? তোর বাবাকে তো আমিই
সব হাতের কাছে গুছিয়ে দিতুম। আজকালকার বৌ গুলোও হয়েছে অন্যরকম। এসব সরঞ্জাম একটু
এগিয়ে দিতে পারে না?'
নিবারণ খেঁকিয়ে উঠতো, 'আজকের দিনে ঐসব
সিঁধকাঠি ফাঠি অচল। এখন সব নতুন টেকনিক। আর আমার জিনিস আমি নিজেই গুছিয়ে নিতে পারি।
চললাম।'
'সাবধানে যাস বাবা, দুগ্গা দুগ্গা '
----------------------
নিবারণ বাবু দোতলায় সপরিবারে থাকেন।
একতলায় তিনখানা বড় ঘর নিয়ে তাঁর স্কুল। সামনের ঘরে অফিস এবং টিচার্স কমন রুম। দুই
পাশে দুইখানা ক্লাশরুম।
নিবারণ বাবু প্রাচীনপন্থী মানুষ। তিনি
মনে করেন শিক্ষা একটি সাধনা, কো-এডুকেশন ক্লাশ সাধনায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই ছাত্র
ও ছাত্রীদের জন্য আলাদা ক্লাশরুম। ছেলেদের ক্লাশে তিনজন মাস্টারমশাই, মেয়েদের ক্লাশে
শিউলিদি একাই পড়ান, আর নিবারণ বাবু নিজেও মাঝে মাঝে দুটো ঘরেই পড়াতে আসেন।
একজন শিক্ষক সই জাল করা শেখান। বিভিন্ন
সার্টিফিকেট, পরীক্ষার মার্কশিট দেখে এমন সুনিপুণ হাতে সই নকল করা শেখান, যে খালি চোখে
বোঝাই যাবে না, কোনটি আসল, কোনটি নকল।
একজন শিক্ষক সাবেকি পদ্ধতিতে চুরি ছিনতাই
এসব শেখান। আরেকজন মাস্টারমশাই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে আলমারি, সিন্দুক
খোলার কারদা শেখান।
শিউলিদি বহুবছর শেয়ালদা বনগাঁ লোকাল ট্রেনে কাজ করেছেন
এবং প্রচুর রোজগার করেছেন। সঙ্গে একটি অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েও থাকতো। এখন বয়স হয়েছে,
তাই ট্রেনের ধকল ছেড়ে দিয়ে নিবারণ বাবুর স্কুলে যোগদান করেছেন। তাঁর শেখানোর বিষয়বস্তু
মূলতঃ লোকাল ট্রেনে ছিনতাই পকেটমারি। ছাত্রীদের জন্য তাঁর উপদেশ, লোকাল ট্রেনে মেয়েদের
কামরায় যা উপার্জন, তার থেকে বেশি হয় জেনারেল কম্পার্টমেন্টে।
বহু শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা চাকরি না পেয়ে
নিবারণ বাবুর স্কুলে ভর্তি হচ্ছে, দিন দিন সংখ্যায় বাড়ছে। উনি পাড়ার দুটি ক্লাবকে
নানা পুজোর জন্য প্রচুর টাকা চাঁদা দিয়ে থাকেন। লোকাল থানার অফিসারদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক।
ক্লাশ ছুটি হয়ে যাওয়ার পর মাঝে মাঝে অমিতাভ বচ্চনের স্টাইলে হেঁকে ওঠেন, 'পাকড়াশিকো
পাকড়না সির্ফ মুস্কিল নেহি, নামুমকিন হ্যাঁয়!'
----------------------
একদিন দুপুরে ক্লাশ চলাকালীন হঠাৎ ঢুকলো
এক লম্বা চওড়া চেহারার লোক, পরনে পুলিশের ইউনিফর্ম, দুই হাতে দুটো বড় বড় মিষ্টির
হাঁড়ি। নিবারণ বাবু চিনতে পেরে বললেন,
'আরে, তুমি তিমির না ? তুমি তো সাত মাস
আগে আমার স্কুল থেকে পাশ করে বেরিয়েছিলে। তা, তুমি পুলিশের চাকরি পেলে কি করে?'
'স্যার, এটা আপনাদের ট্রেনিংয়ের জন্যই
সম্ভব হয়েছে। সব কথা এখানে খুলে বলা যাবে না। আমার সামান্য গুরুদক্ষিণা গ্ৰহণ করুন,
সব টিচার ও স্টুডেন্টদের জন্য মিষ্টি নিয়ে এলাম। আশীর্বাদ করবেন স্যার।'
