বৈষ্ণব পদাবলীর রস সিঞ্চন: প্রেক্ষিত- ‘কবিরাজ’ - অরিজিৎ ঘোষ

বৈষ্ণব পদাবলীর রস সিঞ্চন: প্রেক্ষিত- ‘কবিরাজ’

অরিজিৎ ঘোষ

 

নিশি অবশেষ জাগী সব সখীগ

 বৃন্দাবন দেবী মুখ চাই

রতিরসে অবশ শুতিরহু দুহুজন

তুরিতুহি শ্যাম জাগাই ( গোবিন্দদাস)

সারসংক্ষেপ: বৈষ্ণব পদাবলীর ব্যাপ্তিতে থাকা পদকর্তাদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ, চৈতন্য পরবর্তী যুগের পদকর্তা গোবিন্দদাস বা গোবিন্দদাস কবিরাজ প্রাচীন বাংলার কবিদের নামের সাদৃশ্য বারংবার পাঠক সাধারণকে বিব্রত করেছে। গোবিন্দদাসের ক্ষেত্রেও এই একই সমস্যা দেখা যায়, ঠিক যেমন দেখা গিয়েছিল চন্ডীদাসের ক্ষেত্রে। আমরা চারজন গোবিন্দদাসের নাম কবি সমাজে পেয়ে থাকি, তবে তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ধরা হয় গোবিন্দদাস কবিরাজকে। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বৈষ্ণব গীতিকাব্য বা বৈষ্ণব পদাবলী যা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মধুর, গভীর এবং আধ্যাত্মিক সাহিত্য তাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি তাঁর প্রতিটি পদ বসন্ত বাতাসে স্নাত, কোকিলের কুহুধ্বনিতে মুখরিত (রূপে ভরল দিঠি সোঙ্গারি পরশ বিঠি) তিনি প্রধানত ব্রজবুলি তে তাঁর পদ রচনা করেছিলেন (তিল আধ, মাধব, বঁধুয়া চলু, নহিলে অবহুঁ কি হোইত কুল- কলঙ্কিনি, কিয়ে ধনি, ধরইতে, কুলে কুল, হোইত)গোবিন্দদাসের পদ গুলিতে মৈথিল কোকিল (রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের দেওয়া উপাধি) কবি বিদ্যাপতির অনেক মিল আছে বলে তাঁকে কবি বল্লভদাস দ্বিতীয় বিদ্যাপতি উপাধি দিয়েছিলেন। তাঁর পদের বৈচিত্র্য, পদাবলী সাহিত্যে অবদান, ‘গুরুর সাথে সাদৃশ্য- বৈসাদৃশ্য প্রভৃতি এই বিশ্লেষণ মূলক প্রবন্ধে রাখার চেষ্টা করা হল আলোচনায় ছুঁয়ে যাওয়া হবে বৈষ্ণব গীতিকাব্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, বৈশিষ্ট প্রভৃতি

                                  পাক চকোর চন্দ বলি ধাবই,

                                                               মধুর- কমলিনী ভানে

                                  আঁচরে ঝাঁপি বদন তেঞ্চি পুছঙ,

            তোহে পর- পুরুখক ঠানে।।

                                          মাধব মধু মনে এ বড়ি সন্দেহ

                                  কী ফল জগ-মন            মনরথ বিন্ধয়ে

                                                 কাঁহা পুন তাকর গেহ।।

                                       মূল শব্দ : বৈষ্ণব গীতিকাব্য, গোবিন্দদাস কবিরাজ, বিদ্যাপতি         

গৌরচন্দ্রিকা: বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্য মূলত শ্রীকৃষ্ণভক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকের মতে বৈষ্ণব পদাবলীর শিকড় হয়ত গাঁথা আছে তামিল সঙ্গম সাহিত্যের (খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ খ্রিস্টাব্দ ৩০০) আগম কাব্যে বৈষ্ণব পদাবলীর আদি কবি হলেন কবি জয়দেব, তিনি পদাবলী শব্দের প্রথম ব্যবহার করেন তাঁর রচিত গীতগোবিন্দম্ কাব্যে তাঁর মধুরকোমলকান্তপদাবলী(পততি পতত্রে বিচলিত পত্রে শঙ্কিত ভবদুপযানম/রচয়তি শয়নং সচকিতনয়নং পশ্যতি তব পন্থানম) অথবা চল সখি কুঞ্জং সতিমির পুঞ্জং শীলয় নীল নিচোলম্ হয়ে উঠেছে যুগ নির্নায়কমধুরকোমলকান্তপদাবলীতে সাহিত্যের মাধুর্য যেমন আছে তেমনি এতে আছে আদিরসের মিশ্রণ- দার্শনিক তত্ত্ব, ভক্তিবাদ খুঁজে পাওয়া যায় না গীতগোবিন্দে শব্দের ব্যবহার, ছন্দ শুধু মাত্র পরবর্তী বাংলা সাহিত্যকে নয় ভারতীয় একাধিক ভাষা সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছিল এ কারণের জন্যই জয়দেব অমর হয়ে আছেন

‘‘উন্মদমদন মনোরথ পথিক বধূজনজনিতবিলাপে।
অলিকুলসঙ্কুল কুসুমসমূহ নিরাকুলবকুলকলাপে।।
মৃগমদসৌরভরভসবশংবদ নবদলমালতমালে।
যুবজনহৃদয় বিদারণমনসিজ নখরুচিকিংশুকজালে।।

অনান্য পদকর্তা হিসেবে ষোড়শ শতকে যাদের নাম পাওয়া যায় তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- মুরারি গুপ্ত, বাসুদেব ঘোষ, নরহরি দাস, লোচনদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, বলরাম দাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস; পরের শতকে এলেন ছোট বিদ্যাপতি বা কবিরঞ্জন, কবিশেখর, রাধাবল্লভ দাস, রামগোপাল দাস, ঘনশ্যাম দাস অষ্টাদশ শতকে যেসব পদাবলীকার জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে নাম করা যায় বৈষ্ণব দাস, চন্দ্রশেখর, নরহরি চক্রবর্তী, রাধামোহন ঠাকুর, যদুনন্দন ইত্যাদি ব্যক্তিত্ব নানা সময়ে আরো অনেকেই যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিলেন   

বৈষ্ণব গীতিকাব্যের অন্তরকথা’: বৈষ্ণব গীতিকাব্য শুধু ধর্মীয় সাহিত্য নয়, বাঙালির হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর প্রেম, বিরহ, লজ্জা, অভিমান, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মসমর্পণের কথাও বলেযা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বেজে চলেছে যা মূলত রাধা- কৃষ্ণের প্রণয়লীলা, বাহ্যিক প্রেমের আড়ালে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনের প্রতীক, যা ছিল গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের প্রভাব। এখানে জীবাত্মার প্রতীক হলেন রাধা এবং পরমাত্মার প্রতীক কৃষ্ণ এখানে শ্রীকৃষ্ণ সৎ, চিৎ ও আনন্দ এর রূপ, যেখানে সৎ এর শক্তি সন্ধিনী’, চিৎ এর শক্ত সম্বিত ও আনন্দের হলাদিনী রাধা কৃষ্ণের প্রণয় বর্ণনা করতে গিয়ে বৈষ্ণব কবিরা মর্ত্যের নরনারীর আবেগ অনুভূতিকেও ছুঁয়ে গেছেন তাঁদের ভাব ও ভাষার কুশলতায় বৈষ্ণব কবিতার এক অর্থ অপ্রাকৃতলোকে আধ্যাত্মিকতার দিকে গেছে, অন্যদিকে তা গেছে মর্ত্যের মানব মানবীর দৈনন্দিন সুখ দুঃখে ভরা চিরন্তন প্রেমের পথে একাধিক সমালোচক ও গবেষক মনে করেন বৈষ্ণব পদাবলীর বেশ কিছু পদ ভাব, রস এবং অতি অবশ্যই শিল্পগুণে বিশ্ব সাহিত্যের পৃথিবীতে সহজেই স্থান করে নিতে পারতো  

বৈষ্ণব পদাবলী গোড়া থেকেই গান, তবে সাধারণ গানের মতো নয়- বরং নাতিসংক্ষিপ্ত ও নিটোল, অনেকটাই সংস্কৃত প্রকীর্ণ কবিতার মতো ড. সুকুমার সেনের লেখা থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায় পদাবলীতে পঞ্চভাব বা পঞ্চরস রয়েছে সেগুলি হল শান্ত (নিষ্ঠাময়), দাস্য (সেবা ও নিষ্ঠাময়), সখ্য (বিশ্বাস, নিষ্ঠা ও সেবাময়), বাৎসল্য (মমতা, নিষ্ঠা, সেবা ও বিশ্বাসময়তা) ও মধুর বা মাধুর্য (আত্মসমর্পণ, মমতা, নিষ্ঠা, সেবা ও বিশ্বাসময়তা) বাংলায় বৈষ্ণব পদাবলীর ভাষা মূলত দু রকম, একটা বাংলা অন্যটা ব্রজবুলি- যার ঠাট মিথিলার প্রাচীন কবিদের মতো ব্রজবুলি বাংলা ও মৈথিলি, হিন্দী কিছু ক্ষেত্রে সংস্কৃত ভাষার সংমিশ্রণে গড়া এক কৃত্রিম বা মিশ্র ভাষা কোনো কোনো পদে বাংলা ও ব্রজবুলির মিশ্রণ দেখা যায় (ধ্বজব্রজাঙ্কুশপঙ্কজকলিতম্- গোবিন্দদাস) পরবর্তী যুগের বাংলা সাহিত্য, সংগীত, এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। রবীন্দ্রনাথের ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী ( কো তুঁহু বোলবি মোয়! / কো তুঁহু কো তুঁহু সব জন পুছয়ি,/ অনুদিন সঘন নয়নজল মুছয়ি,/ যাচে ভানু, সব সংশয় ঘুচয়ি), নজরুলের অনেক গান (বঁধু আমি ছিনু বুঝি বৃন্দাবনের রাধিকার আঁখি- জলে) এমনকি আধুনিক বাউল কীর্তন শ্যামাসঙ্গীতের মূলে এই বৈষ্ণব গীতিকাব্যের প্রভাব স্পষ্ট। কিছু চলচিত্রেও এর প্রভাব আছে, যেমন ঋতুপর্ণ ঘোষের রেইন কোটএ (পিয়া তোরা ক্যায়সা অভিমান) বা মেমোরিজ ইন মার্চ (বহু মনোরথে সাজু অভিসারে)

          পর্যায় হিসেবে বৈষ্ণব পদাবলীকে গৌরচন্দ্রিকা, পূর্বরাগ, অভিসার, প্রেমবৈচিত্র অপেক্ষানুরাগ, মাথুর, নিবেদন, ভাবসম্নিলন, মিলন, বিরহ, নিবেদন, প্রার্থনা প্রভৃতি পর্যায়ে ভাগ করা যায় কিছু গবেষকদের মতে বৈষ্ণব পদগুলি প্রধান চারটে ভাগে বিভক্ত সেগুলি হল গৌরলীলা, ভজন, রাধাকৃষ্ণলীলা এবন রাগাত্মিকা গৌরলীলাতে মূলত চৈতন্য লীলার কথা আছে, ‘ভজনএর পদে গুরু/ মহাজনদের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রার্থনা করা হয়েছে অন্যদিকে রাধাকৃষ্ণলীলাতে ব্রজধামে রাধা কৃষ্ণের প্রেমময় সম্পর্কের কথা উল্লেখ আছে, এই ধারার পদ রচনা করে কবিরা সবথেকে বেশি সফলতা অর্জন করেছিলেন পদাবলী তে এই ধরণের পদএর সংখ্যাই সবথেকে বেশি শেষতম ভাগ রাগাত্মিকা পদ গুলি বেশ জটিল যা গুহ্য সাধনার কথা বলে তাই এই ধরণের পদগুলি অন্য ধরণের পদ এর তুলনায় দুর্বোধ্য ছিলো অন্য মত হল বাংলার বৈষ্ণব পদাবলীর ভাগ তিনটে কৃষ্ণলীলা, প্রার্থনা ও চৈতন্যলীলা ড. সেনের মতে পদ মানে একটি সম্পুর্ণ বৈষ্ণব- কবিতা বা গান এবং পদাবলী মানে বৈষ্ণব- কবিতা বা গান সমূহ 

 

ব্রজের মধুর লীলা

যা শুনি দরবে শিলা

গাইলেন কবি বিদ্যাপতি

তাহা হৈতে নহে ন্যূন

গোবিন্দের কবিত্বগুণ

গোবিন্দ দ্বিতীয় বিদ্যাপতি।  বল্লভদাস

কবি গোবিন্দদাসের সংক্ষিপ্ত জীবন চর্চা:  এবার মূল অংশে আসা যাক বেশ কিছু স্বতন্ত্রতার জন্যই এ আলোচনাতে কবি গোবিন্দদাসকে বেছে নেওয়া হয়েছে, তার অর্থ এটা নয় বাকি পদাবলী রচয়িতারা কোনও অংশে ওনার তুলনায় কম গুণের ছিলেন আসলে সমগুণ সম্পন্নদের মধ্যে তিনি একজন বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের মূল, কাণ্ড থেকে শাখা- প্রশাখায় বিচরণ করেছেন কবি গোবিন্দদাস, ফুটিয়েছেন চির ভাস্বর ফুল গোবিন্দদাসের জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায় না, কিছু তথ্য কিংবদন্তি নির্ভর ভক্তমাল গ্রন্থ, নরহরি চক্রবর্তীর ভক্তিরত্নাকর  নরোত্তমবিলাস, নিজের লেখাঅধুনালুপ্ত সঙ্গীতমাধব নাটকের অংশ বিশেষ, রামগোপাল দাসের রসকল্পবল্লীপ্রভৃতি থেকে গোবিন্দদাস সম্পর্কে কিছু কিছু পাওয়া যায়। জন্ম আনুমানিক ১৫৩৫ খ্রিষ্টাব্দে (কিছু মত হল ১৫৩৪- ৩৭ এর মধ্যে) তাঁর মামার বাড়ি তৎকালীন নদীয়া বর্ধমান অঞ্চল, বর্তমান পূর্ব বর্ধমান জেলার কটোয়ার শ্রীখণ্ড গ্রামে, বৈদ্যবংশে বাবা চিরঞ্জীব সেন ছিলেন শ্রীচৈতন্যের পার্ষদ, তিনি ভক্তকবি দামোদর সেনের (যিনি রচনা করেছিলেন সঙ্গীত দামোদর’) কন্যা সুনন্দাকে বিয়ে করে নিজের গ্রাম কুমারনগর ছেড়ে বৈষ্ণবতীর্থ শ্রীখণ্ডে চলে আসেনপ্রথম জীবনে গোবিন্দদাস ছিলেন শাক্তযৌবনের শেষভাগে গ্রহণী রোগে (পাচন তন্ত্রের সমস্যা IBS বা ইরিটেবল বাওয়েল সিস্টেম) আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেই সময় তাঁর মনে কৃষ্ণভক্তির উদয় হয়। তখন তাঁর দাদা নৈয়ায়িক রামচন্দ্রের ব্যবস্থাপনায় শ্রীনিবাস আচার্য জাজিগ্রাম থেকে বুধরি গিয়ে গোবিন্দদাসকে বৈষ্ণবমন্ত্রে দীক্ষিত করেন। গোবিন্দদাসের বয়স তখন চল্লিশ এরপর রূপ গোস্বামীর  উজ্জ্বলনীলমণি পড়ে বৈষ্ণব রসশাস্ত্র অনুসারে লিখতে থাকেন রাধাকৃষ্ণলীলাচৈতন্যলীলার পদাবলী। গোবিন্দদাস সেই সময় কিছুদিন তেলিয়াবুধরীতে ছিলেন, তখন শ্রীনিবাস আচার্যও তাঁর কাছে থাকতেন এবং পদাবলী শুনতেন তাঁরই অনুরোধে গোবিন্দদাস গীতামৃত  রচনা করেন। সুবৃহৎ বৈষ্ণব সংকলনগ্রন্থ পদকল্পতরুতে তাঁর অজস্রপদ সংকলিত হয়েছে এরপর তিনি বৃন্দাবনে তীর্থে গিয়ে জীব গোস্বামী, গোপাল ভট্ট প্রমুখদের সামনে নিজের পদাবলী শোনান এই সময় নরোত্তম ঠাকুরের পিতৃব্যপুত্র রাজা সন্তোষ দেবের অনুরোধে তিনি ভক্তিমূলক নাটক সঙ্গীতমাধব রচনা করেন (মাধব কি কহব দৈব বিপাক) এছাড়াও শ্রীজীব গোস্বামীর ভক্তিরসামৃতসিন্ধুউজ্জ্বলনীলমণিবইগুলোর অলঙ্কারশাস্ত্রকে তিনি কাব্যরূপ দিয়েছিলেন পদ রচনার জন্য তিনি তাঁর গুরু বিদ্যাপতির বাসস্থান বিফসি গ্রামেও গিয়েছিলেন, যা বর্তমান বিহারের মধুবনীতে অবস্থিত

          শ্রীনিবাস আচার্য তাঁকে কবিরাজ’, জীব গোস্বামী কবীন্দ্র উপাধি দিয়েছিলেন। খেতরীর মহোৎসবে নিত্যানন্দ প্রভুর পুত্র বীরভদ্রও তাঁকে সম্মানিত করেছিলেন গোবিন্দদাসের মৃত্যু ৭৬ বছর বয়সে, আনুমানিক ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দ আশ্বিন মাসের শুক্লা প্রতিপদ তিথিতে, তেলিয়াবুধরীর পশ্চিমপাড়াতে নরোত্তমবিলাস থেকে জানা যায় গোবিন্দদাসের ছেলে দিব্যসিংহও ছিলেন ভক্ত সাধক 

কবীন্দ্রএর পদ বৈচিত্র:  চৈতন্যদেবের পরবর্তী সময়ে বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বকে সুসংহত করেন বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীগণ, বিশেষত রূপ গোস্বামীজীব গোস্বামীতাঁদের লেখা ভক্তিরসতত্ত্ব ও প্রেমতত্ত্ব গোবিন্দদাসের কাব্যভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ছিলেন গোবিন্দদাসের জীবন দেবতা, তাঁকে স্বচক্ষে না দেখেও তাঁর পদে তিনি এঁকেছেন দিব্যভাবচঞ্চল মহাপ্রভুর অন্তর্জীবনের ছবি। “নীরদ নয়নে নীর ঘন সিঞ্চনে পুলক মুকুল অবলম্ব স্বেদমকরন্দ বিন্দু বিন্দু চূয়ত বিকশিত ভাবকদম্ব”।। অথবা “ঢল ঢল কাঁচা- অঙ্গের লাবণি অবনি বহিয়া যায়” গোবিন্দদাস নন্দ নন্দন চন্দ চন্দনপদে বা শ্যাম সুধাকর ভুবন মনোহর পদে কৃষ্ণের অপূর্ব রূপ মাধুর্যের ও রমণীমোহন রূপের বর্ণনা দিয়েছেন। বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যে গোবিন্দদাসের অবদান হল তিনি বৈষ্ণব পদাবলীকে কাব্যিক উৎকর্ষে নিয়ে যান ব্রজবুলি ভাষার পরিশীলিত ব্যবহার, বিরহরসের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, কীর্তনসাহিত্যের সংগীতধর্মী বিকাশ, রাধাকৃষ্ণপ্রেমকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা শিল্পরূপে পরিণত হয়েছে তাঁর পদাবলী কীর্তন আজও রসিক বৈষ্ণবদের হৃদয়ে অম্লান পরবর্তী বৈষ্ণব কবিরা তাঁর কাব্যরীতি অনুসরণ করেছিলেন, গীতিকবিতা ও ভক্তিসঙ্গীতে তাঁর প্রভাব লক্ষণীয়। কবি শশিশেখরের নায়িকা রত্নমালায়’, নরহরি (বা ঘনশ্যাম) চক্রবর্তীর ভক্তিরত্নাকর প্রভৃতির ওপর গোবিন্দদাসের রচনার প্রভাব ছিল এমনকি তাঁর পদ রবীন্দ্রসংগীতে প্রভাব ফেলেছিল বলে গবেষকরা মত দেন। তাঁর লেখা সুন্দরী রাধে আওয়ে বনিপরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক সুরারোপিত হয়েছিল

কন্টক গাড়ি     কমল- সম পদতল
মঞ্জীর চীরহি ঝাঁপি।
গাগরি- বারি ঢারি করি পিছল
চলতহি অঙ্গুলি চাপি।
মাধব, তুয়া অভিসারক লাগি।

এ চিরন্তন প্রেম যা কখনো প্রাচীন হবে না এখানে রাধা কণ্টকাকীর্ণ পথে চলার অভ্যাসের জন্য ঘরে জল ঢেলে পিছল করে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে হাঁটার যে সাধনা করছেন তা কাব্য নয়, বাস্তব অধ্যাপক শঙ্করীপ্রসাদ বসুর মতে- অভিসারের পদে গোবিন্দদাস রাজাধিরাজ। কবির অভিসারের পদগুলো যেন মানবাত্মার অভিসার। এখানে অভিসারের অর্থ “নিছক সঙ্কেতস্থানে মিলনার্থে প্রণয়ী প্রণয়িণীর গুপ্তযাত্রা নয়, অভিসারের অর্থ কাম্যবস্তু লাভে কঠোর কৃচ্ছসাধন” ঘনঘোর যামিনী, মন যায় বৃন্দাবনে, কবির প্রকাশভঙ্গি অনবদ্য, তাই এগুলো রসোত্তীর্ণ। রূপে ভরল দিঠিপদে রাধার কৃষ্ণানুরাগ প্রকাশ পেয়েছে, অন্যদিকে কৃষ্ণের পূর্বরাগের ছবি দেখা যায় কবির যাঁহা যাঁ যাঁহা যাঁ নিকশয়ে তনু তনুজ্যোতি পদে।

আজু সখি হেরি যাইল যমুনা তীরে

কানু কোথা বাজায় বাঁশরী।

মেঘ গর্জ্জন করে ঘন ঘন

বিজুরি চমকে আঁধার রাত্রি॥

কন্টকে বিঁধে পদ যায় না থামি

প্রেমে পাগলিনী রাধা চলে।

গোবিন্দদাস কয় শুন সখি

এমন প্রেম কোথা মিলে॥

গৌরচন্দ্রিকা, পূর্বরাগ, মাথুর ও অভিসারের পদে করিরাজের কৃতিত্ব লক্ষ্যণীয়। রূপক ও উপমা প্রয়োগের বৈচিত্র্য দেখে বিস্মিত হতে হয়। কুল মরিয়াদ/  কবাট উদঘাটলুঁ / লুঁ তাহে কি কাঠকি বাধা। গোবিন্দদাস রূপতন্ময় কবি। প্রসাধন- কলায় শ্রেষ্ঠ কবির প্রেমবৈচিত্তোর, কলহান্তরিতার, মাথুরের প্রভৃতি বিষয়ক পদগুলো অপূর্ব। শৃঙ্গার রস ও ভক্তির সমন্বয়। অলংকার ও নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ। গোবিন্দদাসের বর্ষার বর্ণনা প্রাণ উজাড় করে, হৃদয়ের জানালা খুলে দিয়ে প্রকৃতিকে চিনিয়ে দেয়। “তহি অতি দূরতর বাদর দোল।/ বারি কি বারই নীল নিচোল” গোবিন্দদাসের প্রায় প্রতিটি পদ বসন্ত-বাতাসে স্নাত কোকিলের কুহুধ্বনিতে মুখরিত। তিনি উপমা, রূপক অনুপ্রাস ব্যবহারে অন্য একাধিক পদকর্তাদের থেকে এগিয়ে

গোবিন্দদাসের স্বাতন্ত্র্যতা: বিরহের আধ্যাত্মিকীকরণপ্রেমকে ভক্তির স্তরে উন্নীত করেছেন রাধার হৃদয়ের ব্যাকুলতা, অস্থিরতা কৃষ্ণবিরহের যন্ত্রণা তিনি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহীভাবে প্রকাশ করেছেন যেমন শ্যাম নয়ন কমল লোচন, / কাঁদে রাধা দিনরজনী এই ধরনের পদে বিরহের ব্যথা শুধু মানবিক প্রেম নয়, ভক্তির আধ্যাত্মিক রূপ ধারণ করেছে

সংগীতের সঙ্গে কাব্যের মেলবন্ধন কীর্তনধর্মী ছন্দে পদ রচনা তাই ছন্দ, মাত্রা সুরের প্রতি তাঁর বিশেষ যত্ন ছিল তাঁর পদ গাওয়া হলে তার সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পায়

রাধাকেন্দ্রিকতারাধাকে ভক্তির প্রতীক করেছেন তাঁর রাধা কখনও অভিমানিনী, কখনও বিরহিণী, কখনও প্রেমময়ী এই বহুমাত্রিক রাধা চরিত্র তাঁর কাব্যের বিশেষ সম্পদ সখি, কাহে কহবি মোরে, শ্যাম নাহি আসে ঘরে এখানে রাধার মানসিক যন্ত্রণা অপেক্ষার ছবি ফুটে উঠেছে

সহজ কিন্তু শিল্পিত ভাষাব্রজবুলিকে সহজ মাধুর্যময় করেছেন

শরদ চন্দ পবন মন্দ বিপিনে ভরল কুসুমগন্ধ।

ফুল্ল মল্লিকা মালতী যূথী মত্ত মধুকর ভোরণী।।

হেরত রাতি ওছন ভাতি শ্যামমোহন মদনে মাতি।

মুরলী গান পঞ্চম তান কুলবতীচিতচোরণী।।

বৈষ্ণব পদাবলীর ধারায় বিদ্যাপতি ও গোবিন্দদাস: গোবিন্দদাসের রচনায় বিদ্যাপতির ( মৈথিলি কোকিল, ব্রজবুলিতে লেখা, “এ ভরা বাদর মাহ ভাদর/ না দেখিয়া প্রিয়তম কেমনে রহিব ঘর”)প্রভাব সুস্পষ্ট (ভাষা ব্রজবুলি, একই ধরণের কারুকার্যময় ছন্দ- অলঙ্কার সমৃদ্ধ “হরি রহ মানস- সুরধনী পায়/ তাহারি তীরে রাধা অভিসারে যায়”); সেই কারণে তাঁকে বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য বলা হয় রূপ সাগরে ডুব দিয়ে গোবিন্দদাস রাধাকৃষ্ণের পদগুলোকে মানিক রতনের মতো ছন্দ অলংকার দিয়ে সাজিয়েছেন তাঁর রাধা কৃষ্ণের প্রেমে খাঁচায় বন্দী হয়ে আর্ত চিত্‍কার করেনা সে সুললিত সুরে গান করে

বিদ্যাপতির অনেক গুণ গোবিন্দদাসের লেখায় প্রভাব ফেলেছে, তবে তা কখনোই অনুকরণ বা অন্ধ অনুসরণ নয় গোবিন্দদাসের একান্তই নিজস্ব তাঁর বর্ষার বর্ণনা এসেছে প্রাণ উজাড় করে, মনের জানলা দিয়ে- প্রকৃতিকে সাথে নিয়ে

তহি অতি দূরতর বাদর দোল।

বারি কি বারই নীল নিচোল।

দুজনেই রাধাকে চতুরিকা, কলাবতী নায়িকা হিসেবে দেখিয়েছেন, যা বিদ্যাপতির প্রভাবে গোবিন্দদাসের পদে পদকল্পতরূ গীতামৃত গ্রন্থে দেখা যায়। যদিও বিদ্যাপতির রচনার সঙ্গে তাঁর রচনার সাদৃশ্যের পাশাপাশি বৈপরীত্যও চোখে পড়ে। দুজনেই বৈষ্ণব কাব্যধারার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ; তাঁদের সাদৃশ্য প্রেমে, পার্থক্য দর্শন ও ভাষায়। বিদ্যাপতির পদের ভাষা ছিল মৈথিলী অবহট্ট প্রভাবিত বিশুদ্ধতর ব্রজবুলি, অন্যদিকে গোবিন্দদাসের ভাষা বাংলা প্রভাবিত, সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত ব্রজবুলি বিদ্যাপতি বৈষ্ণব পদাবলীতে মানবপ্রেমের শৃঙ্গারকে শিল্পসৌন্দর্যে উন্নীত করেছেন (কি কহব সখি, কাহে লাগি দেহ জ্বরে)তাঁর কাব্যে দেহাত্মক আবেগ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা প্রধান। অপরদিকে গোবিন্দদাস সেই প্রেমকেই ভক্তির উচ্চতায় উন্নীত করে আধ্যাত্মিক মাধুর্যে পরিণত করেছেন। বলা হয় বিদ্যাপতির পদ- এ রাজকীয় চটুলতা দেহজ প্রেম প্রাধান্য পেয়েছে অন্যদিকে গোবিন্দদাস ছিলেন গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের আদর্শে দীক্ষিত ভক্ত কবি বিদ্যাপতির পদ ছিল বুদ্ধিনির্ভর, আর গোবিন্দদাসের পদ- এ বুদ্ধির সাথে যুক্ত হয়েছিল ভক্তি শাস্ত্রীয় পাণ্ডিত্য

 গোবিন্দদাসের রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদেও পূর্বরাগ, অনুরাগ, অভিসার, মিলন, বিরহ, মাথুর প্রভৃতি পর্যায় আছে। তাঁর রাধার মধ্যেও বাসকসজ্জা, খণ্ডিতা, মানঅভিমান, কলহান্তরিতা দশা দেখা যায়বিদগ্ধ কবি অন্তর সংঘাতে বিধ্বস্ত রাধার আত্মগ্লানি, দীনতা, মিনতি তুলে ধরেছেন উৎকৃষ্ট ভাব ও ভাষায়। গোবিন্দদাসের পদগুলো ভাষা, অলংকার ও ছন্দের সৌন্দর্যে এবং ভাবের গভীরতায় পূর্ণ ছিলো (শরদ চন্দ পবন মন্দ বিপিনে ভরল কুসুমগন্ধ। ফুল্ল  মল্লিকা মালতী যূথী মত্ত মধুকর ভোরণী।। হেরত রাতি ওছন ভাতি শ্যামমোহন মদনে মাতি। মুরলী গান পঞ্চম তান কুলবতী- চিত- চোরণী ।।) বিদ্যাপতির পদাবলীতে যে সঙ্গীতময়তার অভাব ছিল, গোবিন্দদাস সঙ্গীতময়তা এনে তার পূর্ণতা দিয়েছেন। এমনকি তাঁর খাঁটি বাংলা পদও দুর্লভ নয়, “ঢল ঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণী অবনী বহিয়া যায়। ঈষৎ হাসির তরঙ্গহিল্লোলে মদন মুরছা পায়” বিদ্যাপতির পদে ভক্তের আকুতি নেই তিনি  জীবনরসিক কবি। খেয়াল রাখতে হবে বিদ্যাপতি ছিলেন শৈব, গোবিন্দদাস বৈষ্ণব বিদ্যাপতি সভাকবি, গোবিন্দদাস ভক্তকবি। স্বভাবতই, বিদ্যাপতির পদে আছে বুদ্ধির দীপ্তি, রাজকীয় আভিজাত্য। রাধাকৃষ্ণ প্রেমলীলার অন্তর্নিহিত সত্যটি যে সেই জীবাত্মা পরমাত্মার অপার্থিব সম্পর্ক সেই বৈষ্ণব তত্ত্বের অনুভূতিরই অন্যতম প্রকাশস্থল গোবিন্দদাসের পদাবলী বিদ্যাপতির পদে আছে চটুলতা, রাধাকে দেখেছেন রাজকন্যার রূপে কিন্তু গোবিন্দদাসের পদে আছে ভক্তির একনিষ্ঠতা, রাধাকে এঁকেছেন মহাভাবের মূর্তিমতী বিগ্রহ হিসেবে শ্যাম নয়ন কমল লোচন, কাঁদে রাধা দিনরজনী

ভজ হু রে মন শ্রীনন্দনন্দন/ অভয় চরণারবিন্দ।/ গোবিন্দদাস কয় শুন রে সখি/ প্রেমের এই অমৃত বিন্দু॥

তুলনামূলক আলোচনা: গোবিন্দদাস বাংলা ভাষায় পদ রচনা করলেও তাতে জয়দেবের মতো অলংকারপ্রবণতা থাকলেও, আধ্যাত্মিক রূপানুরাগের (ভক্তি) গভীরতা বেশি বলা যেতে পারে জয়দেব ছিলেন সংস্কৃত কবি গোবিন্দদাস জয়দেবের সংস্কৃত অলঙ্কার ছন্দকে বাংলা অথবা ব্রজবুলিতে আত্মস্থ করেছিলেন তবে জয়দেবের আদি রসে যে শরীরী প্রেম ছিল বা বা শৃঙ্গারকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন, গোবিন্দদাসের পদে তা অনেক বেশি আধ্যাত্মিক তাত্ত্বিক গাম্ভীর্য লাভ করেছে

চণ্ডীদাস সহজ সরল পদাবলীর কবি, যা সহজিয়া প্রেমের প্রতীক গোবিন্দদাস সেখানে অলংকার ভাষার কারুকার্যে অনেক বেশি জটিল শিল্পরূপদক্ষ (কিয়ে নিশি নিঝুম, ঝমরু ঝম) ব্যবহার করেছেন গোবিন্দদাসের পদগুলো দৃশ্যকল্প তৈরিতে এবং নাটকীয় পরিবেশ সৃষ্টিতে অনন্য অন্যদিকে বিদ্যাপতির ভোগ এবং চণ্ডীদাসের ত্যাগ-এর মাঝখানে গোবিন্দদাস ভক্তি রূপের সমন্বয় ঘটিয়েছেন চণ্ডীদাসের রাধা মানবীসুলভ গোবিন্দদাসের রাধা তুলনায় বেশি আধ্যাত্মিক ভাবপ্রবণ

          কবি গোবিন্দদাসের সাথে অনান্য কবিদের মধ্যে সব থেকে বেশি তুলনা করা হয় কবি জ্ঞানদাসের কোনো এক প্রবন্ধকারের মতে একজন যদি কাঁঠালিচাঁপা হন, অপরজনের কাব্যে হাস্নুহেনার সুবাস। জ্ঞানদাস গোবিন্দদাস সমসাময়িক ছিলেন তাঁদের কাব্যলক্ষ্মী শত আভরণে সুশোভিতা। উভয়ের কবি- কল্পনা আকাশছোঁয়া, তাঁদের ধ্যানে, জ্ঞানে, চিন্তায়, মননে রাধা- কৃষ্ণ প্রাধান্য পেয়েছে। তাঁদের ধ্যান- ধারার মান, ভঙ্গি, আভা, প্রভা, প্রকাশ, বিকাশ একই সুরে বাঁধা নয়। গোবিন্দদাস যেমন ছিলেন বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য, অন্যদিকে জ্ঞানদাস চন্ডীদাসের ভাবশিষ্য। তিনি চণ্ডীদাসের মত নিরাভরণ ও নিরলঙ্কার ভাষায় তপস্বিনী রাধার প্রেম- বিভোর মূর্তি এঁকেছেন। নায়িকার রূপ বর্ণনা, অতৃপ্ত প্রণয়াঙ্ক্ষার তীব্র জ্বালা, মিলনের জন্য ব্যাকুলতা, মিলনের গভীর উল্লাস এবং বিরহের মর্মস্পর্শী আর্তি প্রতিটি ক্ষেত্রেই জ্ঞানদাস চন্ডীদাসের মত ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। জ্ঞানদাসের কিছু পদ প্রেমের বাণী হিসেবে দেশকাল জয় করেছে। যেমন-

রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে।
পরাণ পিরীতি লাগি  থির নাহি বান্ধে।

জ্ঞানদাসের রাধা কৃষ্ণপ্রেমে যোগিনী সেজেছেন। সব সময় বিষাদ- ক্লিষ্ট, তার কথায়, আচরণে সব সময় বিষাদের সুর বেজে ওঠে। জ্ঞানদাসের রাধা বেদনার সাগরে হাবুডুবু খেলেও সে স্বভাবে হাসিখুশি, মিলনের জন্য ব্যাকুলা, সুরসিকা নায়িকা। নায়কের রূপ বর্ণনায় জ্ঞানদাসের মৌলিক প্রতিভার পরিচয় মেলেকৃষ্ণরূপ দেখে রাধা বিমোহিতা। মুগ্ধা রাধার দৃষ্টিতে জ্ঞানদাস শ্রীকৃষ্ণের রূপকে ভাষার বন্ধনে আবদ্ধ করতে চেয়েছেন।

কি রূপ হেরেনু কালিন্দীকূলে।
অপরূপ মেঘ কদম্বমূলে।
অচলা চপলা সহিত তায়
মৃগাঙ্ক-বিহীন শশাঙ্ক ভায়।

কৃষ্ণের সৌন্দর্যে মুগ্ধা রাধার মনে যে গভীর স্পন্দন ও কম্পনের সৃষ্টি করে, তা জ্ঞানদাস ভাষায় ব্যক্ত করতে পারেন না-

দেখিতে যে সুখ উঠে কি বলিব তা।
দরশ পরশ লাগি আউলাইছে গা।

আক্ষেপানুরাগের পদেও কবির কৃতিত্ব রয়েছে। তার বিখ্যাত পদ-

সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু
অনলে পুড়িয়া গেল।

কবির ভাষা সরল- সহজ অলঙ্কার বর্জিত, কিন্তু প্রবল আবেগে পরিপূর্ণ। তবে আবেগের সঙ্গে দার্শনিক তত্ত্ব এবং কবির মননশীলতা যুক্ত হয়েছে। জ্ঞানদাসের এক হাতে দুঃখের সানাই, আরেক হাতে সুখের শঙ্খধ্বনি। জ্ঞানদাস গীতিকবি, একজন গীতিকবির গীতিকবিতায় যে- সব ভাব ও কল্পনা এবং ছন্দ থাকার কথা, তার সব কিছু না থাকলেও তাদের অনেক কিছুর স্পর্শ তাঁর পদকে গীতিধর্মীতার মহিমা দান করেছে নীরব নিথর ছায়াবীথিতলে বসে মাটির মাধুরী অঙ্গে মেখেছেন। বাস্তবতাকে সামনে রেখে তিনি তাঁর কাব্যকে ছন্দ- অলঙ্কার- উপমা- রূপক দিয়ে মায়াবী প্রলেপ দিয়েছেন। জ্ঞানদাসের পদাবলিতে ভাব এবং ভাষার মধুমিলন ঘটেছে। আবেগ কবির ভাব প্রকাশে গতি এনে দিয়েছে। তাঁর সহজ- সরল প্রকাশ তাঁর কাব্যে রূপ- রসের সুন্দর সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে।

          পূর্বরাগ ও আক্ষেপানুরাগ পদে জ্ঞানদাসের শ্রেষ্ঠত্ব অনস্বীকার্য। এ ধরনের পদে জ্ঞানদাস যে ধরনের গীতিপ্রাণতার স্বাক্ষর রেখেছেন, তা গোবিন্দদাসে অনুপস্থিত। যেমন-

রূপলাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর ॥

অভিসার বিষয়ক পদ রচনায় গোবিন্দদাস যেখানে রাজাধিরাজ, জ্ঞান দাসের প্রচেষ্টা সেখানে অনেকটা ম্লান। যেমন-

মন্দির বাহির কঠিন কপাট।
চলইতে শঙ্কিল পঙ্কিল বাট ॥
তঁহি অতি দূরতর বাদর দোল।
বারি কি বারই নীল নিচোল ॥

জ্ঞানদাসের পদাবলির সর্বত্র মাধুর্যের প্রকাশ, অতিশয় আনন্দ বা বেদনার মুহূর্তেও গভীরতা নেই; গভীর বেদনার মুহূর্তেও যেন জ্ঞানদাস অনেকটা প্রশান্ত, অন্যদিকে গোবিন্দদাসের প্রধান সুর উল্লাসের। রূপ বর্ণনার ক্ষেত্রে গোবিন্দদাস অপূর্ব প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। ভাব, ভাষা ও ছন্দের সাহায্যে তিনি রাধাকৃষ্ণের যে রূপ গঠন করেছেন, তাতে আমিত্বনেই। কিন্তু জ্ঞানদাস অমিত্ব- বঞ্চিত রূপগঠনের দিকেই যাননি, তাঁর রূপদর্শন মানেই স্বরূপ দর্শন।

গোবিন্দদাস ব্রজবুলি পদ রচনায় যতটা স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেছেন, জ্ঞানদাস এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যর্থ। নাটকীয়তা গোবিন্দদাসের পদের অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নাটকীয়তা, এ রকম নাটকীয়তা জ্ঞানদাসের পদে নেই। গোবিন্দদাস অভিসার বিষয়ক পদে যে তাৎপর্যময় পরিচয় দিয়েছেন তার মধ্যেও নাটকীয়তা রয়েছে। চিত্রধর্মিতা ও নাটকীয়তা বিষয়ে বহু সমালোচক দেখিয়েছেন- গৌরচন্দ্রিকায় উভয়ের মিলন, রূপানুরাগে চিত্ররসের প্রাধান্য, অভিসারে নাটকীয়তা, মহারাসেও তাই। জ্ঞানদাস প্রাণতন্ময় কবি, আর গোবিন্দদাস রূপতন্ময় কবি। গোবিন্দদাসের শ্রেষ্ঠত্ব প্রসাধনকলায়, উন্নততর, অনুভূতির গভীরতায় জ্ঞানদাসের শ্রেষ্ঠ। জ্ঞানদাসের মতো গোবিন্দদাসের গভীরতা নেই-

আলো মুঞি জানো না-
জানিলে যাইতাম না কদম্বের তলে।
যৌবনের বনে মন হারাইয়া গেল।
ঘরে যাইতে পথ মোর হৈল অফুরান।

গোবিন্দদাস রূপচিত্র অঙ্কন করেছেন অলঙ্কারের চিত্র যুক্ত করে সেইসাথে যুক্ত হয়েছে সাঙ্গীতিক উপাদান। গোবিন্দদাস গৌরচন্দ্রিকা বিষয়ক পদে তাঁর প্রতিভার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করেছেন। এ ধরনের পদ রচনায় তিনি যে অনুপম শৈলীর বিদর্শন করেছেন যা বাংলা কাব্যে তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই-

নীরদ নয়নে  নীর ঘর সিঞ্চনে
পুলক- মুকুল- অবলম্ব।
স্বেদ মকরন্দ   বিন্দু বিন্দু চুয়ত
বিকশিত ভাব-কদম্ব

তাঁরা দুজনেই একই সুরের পথিক হলেও তাঁদের সুরে রয়েছে বৈচিত্র্য। পরিশেষে একথা স্বীকার করতেই হয়, জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস এ দুই কবির মেধা চিন্তা ও মানসের সার্বিক আলোচনা এ ক্ষুদ্র পরিসরে পরিপূর্ণ করে লেখার চেষ্টা করা, ঝিনুক দিয়ে সাগরের জল তোলার প্রয়াসমাত্র। জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস দুজনেই স্ব স্ব মহিমায় উজ্জ্বল। তাঁদের শিল্পসুষমাময় পদাবলি বাংলা বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। স্ব স্ব ক্ষেত্রে জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস রাজাধিরাজ। চৈতন্য- পূর্ববর্তী কবি হিসেবে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের যে মর্যাদা,  চৈতন্য- উত্তর যুগের বৈষ্ণব পদকর্তা হিসেবে জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাসের একই মর্যাদা।

উত্তরকালে গোবিন্দদাসের প্রভাব: গোবিন্দদাসের প্রভাব বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে সপ্তদশ অষ্টাদশ শতাব্দীর পরবর্তী প্রায় সকল পদকর্তাই গোবিন্দদাসের অলঙ্কারপূর্ণ ব্রজবুলি ভাষাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন উনিশ শতকে বাংলা নবজাগরণের সময়ও তাঁর পদ সংগীতজ্ঞদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল কবি রায়শেখর, শশিশেখর এবং ঘনশ্যাম চক্রবর্তীর ওপর গোবিন্দদাসের স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায় উনিশ শতকে তরুণ রবীন্দ্রনাথ যখন ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী রচনা করেন, তখন তাঁর প্রধান অনুপ্রেরণা ছিলেন বিদ্যাপতি গোবিন্দদাস গোবিন্দদাসের শব্দচয়ন ছন্দের দোলা রবীন্দ্রনাথকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল

 

পরাণ- পিয়া সখি হামারি প্রিয়া

 অবহু না আওল কুলিশ- হিয়া।।

নখর খোয়ায়ুলুঁ দিবস লেখি লেখি .....

হেন জন নাহি কহয়ে পিয়া- পাশ।।

বিদ্যাপতি কহ ঐছন প্রীত

            গোবিন্দদাস কহ ঐছন রীত।।  প্রতীক্ষমাণা

সমাপ্তির আলোকে:  গোবিন্দদাস আরাধনা, প্রেম, শিল্প, শাব্দিক কবি। তাঁর রূপোল্লাসের প্রদীপে বিরহের অন্ধকার চাপা পড়ে গেছে শ্রীচৈতন্যদেবের প্রেমধর্ম দর্শনের ওপর ভিত্তি করে যে গীতিধর্মী সাহিত্য গড়ে উঠেছিল, তার সার্থক রূপকারদের মধ্যে গোবিন্দদাস অন্যতম . সুকুমার সেনের ভাষায়, গোবিন্দদাস যদি না জন্মাতেন, তবে বৈষ্ণব পদাবলী তার রাজকীয় ঐশ্বর্য হারাত” আজও বাংলায় যে পালাকীর্তন পরিবেশিত হয়, তাতে গোবিন্দদাসের পদ ব্যতিরেকে অভিসার বা গৌরচন্দ্রিকা অসম্পূর্ণ থেকে যায় জয়দেব, চণ্ডীদাস বা জ্ঞানদাসের নিজস্ব বলয় থাকলেও, গোবিন্দদাস তাঁর ধ্রুপদী শিল্পকলা ব্রজবুলির জাদুকরী ছন্দে সকলের থেকে স্বতন্ত্র ও দেদীপ্যমান গোবিন্দদাস তাঁর ধ্রুপদী শিল্পকলা ব্রজবুলির জাদুকরী ছন্দে সকলের থেকে স্বতন্ত্র চির ভাস্বর তাঁর প্রেমময়তা ছড়িয়ে পড়ুক সারা বিশ্বজুড়ে

যমুনা তীরে কদম্ব তলে / শ্যাম সাজে রাধা সঙ্গে।/ মুরলী বাজায় মধুর সুরে / প্রেমে মাতোয়ারা দুজনে॥/ গোবিন্দদাস ভণে শুন রে সখি/ এই লীলা অমর হয়ে রয়।

 

অলমিতি বিস্তারেণ

গ্রন্থসূত্র ও তথ্যসূত্র:

১ সাহিত্য সংগ্রহ – পুরাতন কবিকুলের কাব্য সংগ্রহ,   ১২৭৮ বঙ্গাব্দ 

২ বৈষ্ণব পদাবলী সুকুমার সেন সম্পাদিত  সাহিত্য অকাদেমি

৩ গোবিন্দদাস পদাবলী, বসুমতী সাহিত্য মন্দির, কলকাতা, ২য় সংস্করণ, ১৯৯৬
৪ বাংলা সাহিত্য পরিচয়, . পার্থ চট্টোপাধ্যায়, তুলসী প্রকাশনী, কলকাতা, ৪র্থ সংস্করণ, ২০০৮

৫ বাংলা সাহিত্যের ইতিকথা  ১ম পর্যায়   শ্রী ভূদেব চৌধুরী

৬ বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত  ড.অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

৭ বাঙালা সাহিত্যের ইতিহাস সুকুমার সেন

৮ বৈষ্ণব পদাবলী ড.সত্য গিরি

৯ আদি-মধ্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস          তপন কুমার চট্টোপাধ্যায়

১০ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের তথ্য ও কালক্রম   সুখময় মুখোপাধ্যায়

১১ গোবিন্দদাসের পদাবলি  বসুমতী

১২ সাহিত্য টীকা

১৩ বৈষ্ণব পদাবলী নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত সম্পাদিত

১৪ মিলনসাগর ওয়েবসাইট

১৫ History of Bengali Literature

১৬ বিমানবিহারী মজুমদার গোবিন্দদাসের পদাবলী তাঁহার যুগ

 

Post a Comment

Previous Post Next Post