রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আমার কিছু কথা - অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়

 


রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আমার কিছু কথা

 

     গত ২৪ শেষ ফেব্রুয়ারী ২০২২ থেকে শুরু হওয়া রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ আজ নিয়ে (২৬/০৫/২০২৬) ৪ বছর এক মাস ২৩ তম দিনে পড়লো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবং ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ইরাক ও ইরানের মধ্যে এক বছর ধরে চলা যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে স্মরণ কালের মধ্যে এতো দীর্ঘ দিন ধরে চলা যুদ্ধ আমরা দেখিনি। প্রাথমিক ভাবে হয়তো সামরিক শক্তিতে এবং অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত সুপার পাওয়ার রাশিয়ার ধারণা ছিল যে এক সময়ের পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের অঙ্গ দুর্বল ইউক্রেনকে যুদ্ধে গুড়িয়ে দিতে এক পক্ষ কালের বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু যতো দিন গেছে রাশিয়াও বুঝতে পেরেছে যে ভয়ঙ্কর মরিয়া ও স্বাধীনতাকামী তথা দেশপ্রেমী ইউক্রেনকে সম্পূর্ণ রূপে পর্যুদস্ত করা মোটেও কোন সহজ কর্ম নয়।

           অত্যাধুনিক ফাইটার প্লেন, হেলিকপ্টার, ট্যাঙ্ক, যুদ্ধ জাহাজ, কামান, গোলা বারুদ, বোমা ও মিসাইলে সুসজ্জিত এবং প্রায় লাখ দুয়েক সৈন্যের বিশাল সমাবেশ ঘটিয়ে এই লম্বা যুদ্ধে সুসমৃদ্ধ ইউক্রেন দেশটির  অনেক আধুনিক ও জনবহুল শহরকে উপর্যুপরি বোমা মেরে ও মিসাইল ছুঁড়ে প্রায় ধ্বংসাবশেষে পরিণত করলেও অকুতোভয় ইউক্রেনের যুবক প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কির নেতৃত্বে সমগ্র ইউক্রেন বাসী দুর্দান্ত মনোবল ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে এখনও লড়ে যাচ্ছে। বাস্তবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ইউক্রেনের কাছেও শক্তিশালী রাশিয়াকে তাদের অজস্র ফাইটার প্লেন, হেলিকপ্টার, ট্যাঙ্ক ও বেশ কয়েক হাজার সৈন্যকেও হারাতে হয়েছে। খবরে প্রকাশ যে অনেক রাশিয়ান সৈন্য যুদ্ধে অনীহা প্রকাশ করে সটান যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যেতে চেয়েছে। কিন্তু রাশিয়ার একছত্র ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন গোপন কমান্ডো পাঠিয়ে নিজের দেশের পলায়নপর রুশ সৈন্যদের খতম করে দেবার ফরমান জারি করেছে।

         আসলে কোন দেশের সৈন্যই অকারণে যুদ্ধে প্রাণ দিতে চায় না, বরং ফিরে যেতে চায় নিজেদের পরিবারের কাছে। অথচ ক্ষমতা লোভী রাষ্ট্র নেতারা তাদের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়।

এর আগে গত নব্বইয়ের দশকে সুপার পাওয়ার আমেরিকা ক্ষমতা প্রয়োগ করে ইরাক ও কুয়েতের মধ্যে চলা উপসাগরীয় যুদ্ধে নাক গলিয়ে তৈল সমৃদ্ধ কুয়েতের হয়ে সরাসরি লড়াইয়ে নেমে কার্পেট বম্বিং করে সমৃদ্ধ ও প্রাচীন সভ্যতায় গৌরবান্বিত ইরাক দেশটিকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল। অথচ যে বাহানায় আমেরিকা স্বাধীন দেশ ইরাকের উপর ভয়ঙ্কর যুদ্ধ চাপিয়ে  দিয়েছিল তা আদৌ ধোপে টেকে নি।

              সেই সত্তরের দশকে ভিয়েতনামের সঙ্গে যুদ্ধে আমেরিকা সারা ভিয়েতনাম জুড়ে ভয়াবহ আগুন ছড়ানো নাপাম বোমা ফেলে একটা সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা সবুজ দেশকে প্রায় শ্মশান বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু খোদ আমেরিকারও সেই যুদ্ধে প্রচুর সৈন্য মারা পড়ায় এবং এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে দেশে বিদেশে শক্তিশালী জনমত তৈরী হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আমেরিকাকেও অনেক ক্ষতি স্বীকার করে পশ্চাদপসরণ করতে হয়েছিল। গত ৯/১১-য় সন্ত্রাসী হানায় আমেরিকার টুইন টাওয়ার ধ্বংসের বদলা নিতে আল কায়দা তথা সন্ত্রাসী নেতা লাদেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে আমেরিকা সৈন্য ও যুদ্ধাস্ত্র পাঠিয়ে আফগানিস্তানকে প্রায় গুড়িয়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত সেই তালিবানদের হাতেই শাসন ক্ষমতা তুলে দিয়ে আমেরিকা সে দেশ থেকে পালিয়ে বাঁচে।

                এই যে ন্যাটোর সদস্য হতে চাওয়ায় ইউক্রেনকে উচিত শিক্ষা দিতে রাশিয়ার ঝাঁপিয়ে পড়া-- এর পিছনে রাশিয়ার দিক দিয়ে নানা রকম আত্মসমর্থনকারী যুক্তি আছে। কারণ কোন শক্তিশালী দেশই চায় না যে তার নাকের ডগায় কোন শত্রু দেশ বাস করুক। আসলে এক সময়ের সুপার পাওয়ার শক্তিশালী সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার পিছনে তো তার চির প্রতিদ্বন্দ্বী আমেরিকা ও ন্যাটোর হাত রয়েছে। আজ আমেরিকা তথা ন্যাটোর উস্কানিতে যদি রাশিয়ার প্রতিবেশী ও সম মনোভাবাপন্ন দেশ গুলি ন্যাটোর ছত্রছায়ায় চলে যায় তাহলে কি রাশিয়া হাত গুটিয়ে বসে থাকবে?  রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার পূর্বসূরি বলিস ইয়েলিৎসিনের মতো দুর্বল চিত্তের নয় বরং উগ্র, দুঃসাহসী ও আগ্রাসী মনোভাবাপন্ন। সামরিক এক নায়কের মতো সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার এক দৃঢ়চেতা শাসক। অন্য দিকে আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার পূর্বের শাসকদের তুলনায় অনেকটাই দুর্বল চিত্তের। তবে যথেষ্ট বাস্তববাদী ও হিসেবী। তাছাড়া আমেরিকা আগের অনেক গুলো মিস এডভেঞ্চারের মতো যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন আর দেশের অর্থনীতির সর্বনাশ করে অকারণে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায় না।

সুতরাং রাশিয়ার পক্ষেও এ এক সুবর্ণ সুযোগ নিজেকে বিশ্ব শক্তি হিসেবে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার। তাই রাশিয়ার পক্ষেও আমেরিকা ও ইউরোপের শক্তি শালী দেশগুলোর নানা আর্থিক ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এতো দিন ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। তাছাড়া রাশিয়া আগেই ইউক্রেনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে পারমাণবিক বোমা প্রয়োগের হুমকি দিয়ে বাকি সব বিশ্ব শক্তিকে চুপ করিয়ে দিতে বা হাত গুটিয়ে থাকতে বাধ্য করেছে।

      এই প্রসঙ্গে বলি যে এই যুদ্ধের শুরুতে আমার এক সাংবাদিক বন্ধু ফেসবুকের পোস্টে বলেছিলেন যে শীঘ্র ই এটি তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধে পরিণত হবে কারণ আমেরিকা ঝাঁপিয়ে পড়লো বলে। সেদিন আমি জবাব দিয়েছিলাম যে এই আমেরিকার সেরকম মুরোদ নেই। সুতরাং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবার চান্স নেই। এই মুহূর্তে বরং এডভান্টেজ রাশিয়া। যতো দিন গেছে আমার সেই কথা গুলো দারুন ভাবে মিলে গেছে।

                 কিন্তু এই ভয়ঙ্কর এবং প্রাণঘাতী যুদ্ধ চালিয়ে কি প্রকৃত পক্ষে কোন পক্ষেরই লাভ হবে? মনে হয় না। আসলে যুদ্ধের শুরুর দিকে ইউক্রেন হয়তো ভেবেছিল যে আগ্রাসী ও সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ন্যাটো তথা ইউরোপের অনেক শক্তি ধর দেশ তাদের পাশে এসে দাঁড়াবে এবং এই যুদ্ধে সক্রিয় ভাবে জড়িয়ে পড়বে। এবং তাহলে রাশিয়া তেমন কিছু করার সাহস দেখাবে না। কিন্তু যতো দিন গেছে ইউক্রেন তার ভুল এবং কঠিন বাস্তব পরিস্থিতিটা বুঝতে পেরেছে। কারণ আমেরিকা ও ন্যাটো যতোই না আশ্বাস দিক, বিশাল শক্তিধর দেশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে আজকেও ইউক্রেনকে একা একাই লড়াই চালাতে হচ্ছে। বস্তুতঃ আমার বরং মনে হয়েছে যে যতোই দেশ প্রেম বা দুঃসাহস দেখাক না কেন-- ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনিস্কির উচিত ছিল না ন্যাটোর সদস্য হতে চেয়ে তার নিকটতম এবং অতি শক্তিশালী প্রতিবেশী রাশিয়ার বিরাগভাজন হওয়া। ইউক্রেন যদি বাস্তবতার খাতিরে দূরের বন্ধুদের ছেড়ে তার কাছের বন্ধুদের অর্থাৎ নিকটতম প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারতো এবং যুদ্ধের শুরুতেই বা কিছুদিনের মধ্যেই শক্তিশালী রাশিয়ার কাছে সারেন্ডার করে নিতো তাহলে হয়তো এই দেশটার এতো ধ্বংস, এতো বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি স্বীকার করতে হতো না, এবং সেটাই হতো প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ। শুধু নিছক ভাবাবেগ আর দেশপ্রেম দিয়েই আধুনিক যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় না। তাছাড়া দুর্বল ইউক্রেনের পক্ষে তো সুপার পাওয়ার রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জেতা এক কথায় অসম্ভব। তাই স্রেফ জেদের বশে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটা জেলেনিস্কির ফালতু গোয়ার্তুমি বই কিছু নয়। বরং সময়ে হার স্বীকার করে নিলেই বাঁচতো একটা ছবির মতো সুন্দর দেশ, বাঁচতো সে দেশের উন্নত কৃষি ব্যবস্থা ও শিল্প সমৃদ্ধ কারখানা, বাঁচতে পারতো ইউক্রেনের শিক্ষিত, সুসভ্য নাগরিকগণ। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে রাশিয়া নিজেকে পুনরায় সুপার পাওয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে এবং বিশ্বে মার্কিন ও ইউরো ডলারের আধিপত্য খর্ব করে রুবেল পেট্রো বাণিজ্যের সূচনা করতে পেরেছে।

            কিন্তু শেষ অবধি সারা বিশ্বে তথা রাষ্ট্রসঙ্ঘের কাছে একঘরে হয়ে গেছে রাশিয়া। হয়তো এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ বা পারমাণবিক যুদ্ধে পর্যবসিত হবে না। কিন্তু যদি হয় তাহলে তার দায় একান্তই রাশিয়ার উপর বর্তাবে। এই যুদ্ধের বিপুল খরচ ও ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে না পারলে রাশিয়ার গ্লাসনস্ত, পেরেস্ত্রোয়িকা উত্তর ঘুরে দাঁড়ানোর অর্থনীতি পুনরায় ভেঙে পড়বে। রাশিয়া নূতন করে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং পরিণতিতে চীন ও আমেরিকার কাছে ঋণী হয়ে পড়তে পারে।

         তাছাড়া অবিরত গোলা বারুদ ও মিসাইলের আঘাতে প্রত্যক্ষ ভাবে হয়তো একটা নির্দিষ্ট দেশই ধ্বংস হচ্ছে কিন্তু তার অভিঘাত হচ্ছে সুদূর প্রসারী। আসলে ক্ষতি হচ্ছে সারা বিশ্বের। কারণ, প্রথমতঃ প্রায় করোনা মূক্ত পৃথিবীর অনেক দেশ যখন অর্থনৈতিক ভাবে ক্রমশঃ এগিয়ে চলতে শুরু করেছে তখন বিশ্ব বাজারে পেট্রল, ডিজেলের এবং গম ও ভোজ্য তেলের ক্রমাগত মূল্য বৃদ্ধিতে কোন মতে ঘুরে দাঁড়ানো অর্থনীতি ফের ধসে পড়তে চলেছে। দ্বিতীয়তঃ যুদ্ধে ব্যবহৃত গোলা বারুদের বিষাক্ত রাসায়নিক ও ধোঁয়া, ধুলা সারা বিশ্বের উষ্ণায়ণ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং ভূমন্ডলের মাটি,জল ও বাতাসকে দূষিত করে প্রকৃতিকে সমূহ বিনাশের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করছে। আর সত্যি কথা বলতে কি, এই পৃথিবীটা কোন এক বৃহৎ শক্তির একার নয়। এই সুন্দর পৃথিবীতে  সবারই সুখে শান্তিতে স্বাধীন ভাবে বাঁচার অধিকার আছে ‌। এই সুন্দর পৃথিবীর জল, বায়ু, আকাশ ও মাটির তথা সমগ্র ভূ পরিমন্ডলের উপর সমস্ত পৃথিবী বাসীর সমান অধিকার।

           একটা সর্বগ্রাসী এবং দীর্ঘ দিন ধরে চলা যুদ্ধের কি ভয়ঙ্কর পরিণাম হয় তার নিদর্শন আমরা পৌরাণিক কালে মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দেখেছি। দীর্ঘ ১৮ দিন ধরে চলা সেই ভয়ানক যুদ্ধে তৎকালীন ভারতবর্ষের প্রায় সব রাজা মহারাজারা কৌরব ও পান্ডবদের পক্ষে এসে ভীড়েছিলো। কৌরব পক্ষে ছিল ১১ অক্ষৌহিনী সেনা এবং পান্ডব পক্ষে এসে যোগ দিয়েছিলো ৭ অক্ষৌহিনী সেনা, অর্থাৎ সর্বমোট ১৮ অক্ষৌহিনী সেনা, আজকের হিসেবে যে সংখ্যাটা প্রায় ৪০ লক্ষের কাছাকাছি। সে এক বিপুল সৈন্য সমাবেশ-- রথ, হাতি ও ঘোড়া সহ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষে পৃথিবী ক্ষত্রিয় শূন্য হয়ে গেছলো । যুদ্ধের শেষে কৌরব ও পান্ডবদের ঘরে ঘরে পড়েছিলো স্বামী হারা বা সন্তান হারা রমণী বা বৃদ্ধ পিতা মাতার দল। কৌরব ও পান্ডবপক্ষে বেঁচে ছিলো শুধু ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী, বিদুর, অশথ্থামা, কৃপাচার্য এবং কুন্তী, দ্রৌপদী ও পঞ্চপান্ডব, এবং অভিমন্যুর স্ত্রী উত্তরা ও পরীক্ষিত। এই নরসংহারী যুদ্ধের শেষে শান্তি হয়তো এসেছিলো কিন্তু সে ছিল শ্মশানের করুণ শান্তি।

         আসলে কোন যুদ্ধেই শেষ বিচারে কেউ জেতে না। জেতে শুধু অশুভ শক্তি যা মানবতা ও শান্তি, সমৃদ্ধিকে গ্রাস করে।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যের এই যুদ্ধ রাশিয়ার পূর্ণ সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে গত ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হলেও প্রকৃতপক্ষে এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল গত ২০১৪ সালে যখন রাশিয়া জোর করে ইউক্রেনের সমৃদ্ধ বন্দর শহর ক্রিমিয়া দখলের মধ্য দিয়ে।

এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ হানির ঐ বাস্তুহারা হবার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 যুদ্ধের কারণ ও পটভূমি -- পূর্বতন দুই মেরু বিশ্বের এক সুপার পাওয়ার দেশ হিসেবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেন। মূলতঃ ইউক্রেনের ন্যাটো ভূক্তির বিরোধীতা এবং রাশিয়ার নিজের প্রভাব বলয় ধরে রাখার স্বার্থেই এই ভয়ঙ্কর আধুনিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধ যাকে বলে রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার পরিণাম‌। যদিও আসল কারণ হলো গত ২০১৪ সালে ইউক্রেনের এক রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের পর সেখানে রাশিয়া সমর্থিত ইউক্রেনের সরকারের পতন হলে রাশিয়া প্রথমে সামরিক বল প্রয়োগ করে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ ক্রিমিয়া দ্বীপটি দখল করে নেয়।

বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রভাব -- রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রায় চার বছর ধরে চলা যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও মূলতঃ আমেরিকার বা অন্য দুয়েকটি দেশের ( যেমন নরওয়ে) যুদ্ধের প্রাবল্য অনেক কমেছে ইউক্রেনে। রাশিয়ার আগ্রাসী হানায় ডনবাস, কিয়েভ এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলিতে এমনকি চেরনোবিল এর পরমাণু শক্তি কেন্দ্রটিও ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনে যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সেদেশে বসবাসকারী অন্যান্য দেশের অভিবাসীরা অনেক সঙ্কটের মধ্যেও নিজেদের দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বিশেষতঃ ইউক্রেনে ডাক্তারী পড়তে যাওয়া হাজার হাজার ভারতীয় ছাত্র ছাত্রীদের ভারতে ফিরে আসতে বাধ্য হতে হয়েছে।

           এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই যুদ্ধের পরিণতিতে ইউরোপে মারাত্মক শরণার্থী সঙ্কটের সৃষ্টি করেছে। রুশ ইউক্রেনের যুদ্ধে বিবাদমান দুটি পক্ষেরই প্রভুত পরিমাণে ধন সম্পদ ও জীবন ও জীবিকার ক্ষতি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দুটি বিবাদমান দেশের কয়েক লাখ সৈন্যিক তথা দেশবাসীর প্রাণ গেছে। প্রচুর সেনা ক্ষয়ের জন্য রাশিয়াকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যেমন ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, কোরিয়া বা আরো অন্যান্য অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল দেশ থেকে ভাড়াটে সৈন্য কাজে লাগাতে হয়েছে। 

           রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সঙ্কট ও সরবরাহ শৃংখলায় মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে। এই যুদ্ধে ইউক্রেনের সমৃদ্ধ কৃষি, জ্বালানি ও নাগরিক পরিকাঠামোর ভীষণ ক্ষতি হয়েছে। প্রচুর সৈনিক ও নাগরিকদের মৃত্যু হয়েছে এবং দেশের জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। এই যুদ্ধের ফলে ইউক্রেনের ও রাশিয়ার গম, ভুট্টা ও ভোজ্য তেলের রপ্তানি বাধা পেয়েছে। এর ফলে উন্নয়নশীল ও বিদেশ থেকে আমদানি নির্ভর দেশ গুলোতে খাদ্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম ও তীব্র খাদ্য সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে।

আঞ্চলিক ও ভূ রাজনৈতিক পরিবর্তন -- এই যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর জোটের বন্ধন আরও গভীর হয়েছে এবং আমেরিকা সমেত পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার উপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তবে এর বিপরীতে আবার রাশিয়ার সঙ্গে চীন ও উত্তর কোরিয়ার একটি শক্তিশালী অক্ষজোট তৈরি হয়েছে। এছাড়া মধ্য প্রাচ্যের ইরান, লেবানন ও তুরস্কের সঙ্গেও রাশিয়ার মিত্রতার সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

সূত্র: খবর কাগজের বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদন এবং উইকিপিডিয়া 

 

Post a Comment

Previous Post Next Post