সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

 ভারত বিশ্বমানবতা ও সোনার বাংলা


খামখেয়ালে শুরু করা ত্রৈমাসিক স্বয়ংসিদ্ধা ওয়েবজিন দেখতে দেখতে যখন চার বছর পূর্ণ হওয়ার মুখে, তখন খেয়ালের বশেই আমার পরলোকগত বাবার স্মৃতির উদ্দেশে একটি প্রতিযোগিতা ঘোষণা করে ফেললাম। সম্বৎসর প্রকাশিত গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ও ভ্রমণকাহিনীগুলি উল্লেখ-সাপেক্ষে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে, যার মধ্যে থেকে প্রতিটি বিভাগে সেরা লেখাগুলিকে “
স্বর্গত অশোক কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি সম্মান” প্রদান করা হবে।

ঘটনাচক্রে বাবার জন্মদিন ২১শে ফেব্রুয়ারি পরবর্তীতে বিশ্বের তাবৎ বাঙালীর কাছে বিশেষ শ্রদ্ধা ও আদরের। আর ঘটনাচক্রে এই ঘোষণা ও তদনুরূপ কাজ শুরু করার কিছু মাসের মধ্যেই আমার মাতৃবিয়োগ হল। ভগ্নহৃদয়ে কয়েকটি সমাজসেবী সংগঠনের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিশ্রতিও দিয়ে ফেলেছি, সম্পাদকীয়তে যেগুলোর উল্লেখ করার প্রয়োজন দেখছি না। তবে যেটা উল্লেখযোগ্য, সেটা হল একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ করে তোলা রাষ্ট্রটির বিগত কয়েক বছর ধরে আলোচ্য হয়ে ওঠার বিষয়টি। দিনটিকে কীভাবে বিপণন করে আন্তর্জাতিক স্তরের মর্যাদা ছিনিয়ে এনেছে বাংলাদেশ, সেই ইতিহাস বা বাংলা ভাষা আন্দোলনে তার তাৎপর্য নিয়ে ওঠা বিতর্কে যাব না। কিন্তু স্বদেশ ও মাতৃভাষার জন্য অর্জিত সেই আন্তর্জাতিক মর্যাদার মান স্বয়ং জনিতৃ দেশটিই আর বজায় রাখছে কিনা, সেই দিকে তো চোখ পড়বেই।

২০২৪-এ ছাত্র আন্দোলনের ছদ্মবেশে বাংলাদেশে ঠিক কী নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে ও হয়েই চলেছে, এবং তার মূল কুশীলব কারা কারা, সেই ব্যাপারটা একমাত্র চোখ বুজে থাকা কতিপয় ভারতীয় বাঙালী ছাড়া সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে মোটামুটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার। সোভিয়েত পরবর্তী পূর্ব ইউরোপ তথা পশ্চিম এশিয়ায় বর্ণচোরা Colour Revolution-এর মতো বাংলাদেশের ‘কোটাবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর নেপথ্যেও মার্কিন ডীপ স্টেটের কলকাঠিতে মৌলবাদী অভ্যুত্থানের স্বরূপটা মোটামুটি উদ্ঘাটিত। বিষয়টা আমার “বাঙালীর খণ্ডিত জাতীয়তা: দেশভাগ ও প্রাদেশিক প্রেক্ষাপট” নামের পৃথুল গবেষণা-গ্রন্থের একটি হৃষ্টপুষ্ট অধ্যায় অধিকার করে আছে, এই নিয়ে স্বয়ংসিদ্ধার পাতাতেও আমি ইতিপূর্বে লিখেছি। তাই তথ্যগত বিশদে আর যাচ্ছি না। শুধু একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘মাতৃভাষা দিবস’ মনে করা, বাংলা ও বাঙালী নিয়ে আবেগাপ্লুত হওয়া তথা হিন্দী সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে সচেতন ভারতীয় বাঙালীর কাছে একটি প্রশ্ন রাখাই যায়— বাঙালী হিসাবে নীরব থেকে আমরা কি ঠিক করছি?

ঠিক-ভুল বা ন্যায়-নীতির প্রশ্ন থাক; কিন্তু এই প্রসঙ্গে নীরবতা বা নিস্পৃহতা কি আদৌ বিচক্ষণতারও পরিচয়? এই বিচক্ষণতার কারণেই কিন্তু বাঙালী জাতিসত্তার আড়ালে একটা হিংস্র সাম্প্রদায়িকতা কাঁটাতার কেটে পশ্চিমবঙ্গেরও অর্ধেকের বেশি খেয়ে ফেলেছে, যেখানে সনাতন বাঙালীর দুর্গাপুজোর নির্ঘণ্ট, লক্ষ্মী-সরস্বতীর মূর্তি, কালীর বিসর্জন, মকর সংক্রান্তি, পালা-পার্বণ— সবই বিজাতীয় বহিরাগত রুচির অনুমোদনসাপেক্ষ। সেই অনুমোদন বাংলাদেশে তো দূর অস্ত, পশ্চিমবঙ্গেও যে প্রায়শ মিলছে না, তার প্রমাণ সংবাদমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমে নিত্য ভাসমান। যাঁরা সেইসব সংবাদকে অস্বীকার করছেন বা তাৎপর্যহীন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভাবছেন, তাঁরাও নিশ্চিত জানি ঘটনাগুলিকে চাক্ষুষ বা প্রত্যক্ষ করতে মোটেই ইচ্ছুক নন।

বাংলাদেশে যে সম্প্রদায়টি সংখ্যালঘু হওয়ার অপরাধে শরব্য, পশ্চিমবঙ্গে সেই সম্প্রায়ের মানুষই সংখ্যাগুরু তকমার সৌজন্যে আক্রান্ত হয়েও সহিষ্ণুতার পরাকাষ্ঠা হয়ে থাকতে বাধ্য। এগুলো যদি ধর্মনিরপেক্ষতার নমুনা হয়, তাহলে বাংলা অভিধান থেকে ভণ্ডামি তথা দ্বিচারিতা শব্দ দু’টির অবলুপ্তিই শ্রেয়। কারণ বর্তমান বাংলাদেশে যা হচ্ছে, তার নিন্দা না জানালে বাঙালী অস্মিতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অমর একুশের আবেগ, ‘সোনার বাংলা’কে ভালোবাসা, এমনকি মাতৃভাষা হিসাবে বাংলাভাষা চর্চার অধিকারও বিসর্জন দিতে হয়।  

 

থাক। আপাতত বিপন্ন বাঙালীর ভারতীয় খণ্ডিতাংশকে এর বেশি প্রশ্ন দ্বারা বিব্রত না করে কিছু প্রশ্ন রাষ্ট্রকেও করি। দিল্লীতে গৈরিক সরকার ক্ষমতায় আসা ইস্তক বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অপধর্মীয় আক্রোশ আছড়ে পড়েছে, যার নগ্ন পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল ২০২১-এ রক্তাক্ত দুর্গাপূজার সময়ই। কিন্তু তখন হিন্দুত্বের ঠিকা নেওয়া রাজনৈতিক দল শাসিত ভারত সরকার তিরস্কার করার পরিবর্তে অনতিবিলম্বে বাংলাদেশকে ২৫টি অ্যাম্বুলেন্সসহ সুপ্রচুর উপহার-উপঢৌকনে কেন ভরিয়ে দিয়েছিল? ২০২৪-এ যখন ধূম উদ্গিরক আগ্নেয়গিরি আগুন ও লাভা উদ্গিরণ শুরু করল, তখনও কেন ভর্ৎসনার তো দূর, বিরক্তি প্রকাশেরও চিহ্নমাত্র নেই? কেন শুধুমাত্র ওদেশে সবকটি রাজনৈতিক দলকে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের ওপরেই জোর দিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও সাহায্য পাঠানোর জন্য ব্যাপক সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধের শর্তটুকুও রাখা হল না? কেন অমুসলিম শরণার্থীদের বিনাশর্তে আশ্রয় ও অভিবাসন দেওয়ার মৌখিক প্রতিশ্রতি দিয়েও উৎপীড়িত শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত একেবারে রুদ্ধ করে দেওয়া হল?

ভারত রাষ্ট্রের স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে বেশি আত্মবলিদান দেওয়া বাঙালী জাতিটিকে অনেক ভারতবাসীরই সহ্য হয় না, জানা কথা। সেটা শুধু বাঙালীর মেধা-মনন বা অতীত সমৃদ্ধির প্রতি ঈর্ষার কারণে নয়, বাঙালী হিন্দু রামমোহন, বিদ্যাসাগরদের বংশধর বলেও, যাঁরা হিন্দুসমাজের অশুভ উপাদানগুলো ফেলে শুভটুকু চয়ন করে সমাজ সংস্কার করেছিলেন। সেই কারণেই কি মাতৃ-উপাসক প্রগতিশীল হিন্দু বাঙালী জাতির নির্মূলীকরণ দেখছেন নীরব দর্শকের ভূমিকায় বসে?

বাংলাদেশের উলঙ্গ ভারতবিদ্বেষ ও হিংস্র সাম্প্রদায়িক রূপ দেখেও আপনাদের নীরবতা নিষ্ক্রিয়তার সাফাই গাইতে বেশ কিছুদিন আরাকান সেনার যুগপৎ মায়ানমার ও বাংলাদেশকে প্যাঁচে ফেলার গল্প, কিংবা ‘মুরগীকণ্ঠ’কে সিংহগ্রীবা বানানোর আশাবাদ শুনিয়েছিলেন বেশ কিছু ভক্ত মারফত। ফলাফল স্বরূপ দেখলাম— অসংখ্য নারী, দীপু দাস বা খোকন দাসদের ঝলসানো দেহ। ফলত আপনাদের ওপর ভরসা করা বাঙালীদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পররাষ্ট্রনীতি, কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি তত্ত্বগুলো আর হজম হচ্ছে না।

তাই প্রশ্নের পরিবর্তে একটা একটা নিবেদনই রাখছি। ভারত যদি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু ও বৌদ্ধদের বাঁচানোর দায়িত্ব না নিতে চায়, তাহলে বরং বোমাবর্ষণ করে তাদের মেরেই ফেলুক। প্রতিক্ষণ তিলেতিলে মরা, তিলেতিলে নিঃস্ব কাঙাল ও শরণার্থী হয়ে লাথিঝাঁটা খাওয়ার ধারাবাহিক অনুষ্ঠানে এবার যবনিকা পড়ুক। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীদের জন্য বোমা খরচেরও প্রয়োজন নেই; এই রাজ্য আপনিই মরূভূমিতে রূপান্তরিত অথবা হিন্দী সাম্রাজ্যের উপনিবেশে পরিণত হবে।

শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়


Post a Comment

Previous Post Next Post