সাতাশ নম্বর পাতা
দিব্যেন্দু ঘোষ
কলকাতার
ব্যস্ত রাজপথ তখন নিয়নের আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে। রাসবিহারী মোড়ে দাঁড়িয়ে অর্পা বেশ
বুঝতে পারছে তার হাতের তালু ঘামছে। কালীঘাট ট্রাম ডিপোর উল্টোদিকে ডার্ক চকলেটের
বাক্সটা হাতে নিয়ে সে যখন নিজের মেসের দিকে হাঁটতে শুরু করল, তখন তার মনে হচ্ছিল সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।
যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের সেই নতুন লেকচারার, অরিন ঘোষ। গায়ের রং ধবধবে ফর্সা, চোখে রিমলেস চশমা আর কথা বলার ধরনে এক অদ্ভুত আভিজাত্য মানুষটাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিচ্ছিল। সবার মধ্যে তার দিকে চোখ চলে যেতে বাধ্য। অর্পা যখন প্রথম তাকে সিঁড়িতে দেখেছিল, তখনই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। অদ্ভুত এক অনুভূতি, কেমন যেন হচ্ছে, বারবার তাকাতে ইচ্ছে করছে, এগিয়ে গিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে, খুব কাছাকাছি দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে। এত ইচ্ছে একসঙ্গে মনের ভেতর জড়ো হলে তো মুশকিল, যদি তিনি তার মনের কথা পড়ে ফেলেন, যদি ধরে ফেলেন, অর্পা কী ভাবছে, লজ্জা পেল সে। কত কীই না ভেবেছিল অর্পা, অথচ আজ সেই মানুষটিই নিজে ডেকে তাকে চকোলেট দিয়ে বললেন, "ভীতু।"
মেসে
ফিরে নিজের ছোট ঘরটায় ঢুকে অর্পা প্রথমেই ডার্ক চকোলেটের প্যাকেটটা খুলল। চকচকে
সোনালি কাগজে মোড়া। খুলে ছোট্ট কামড় বসাল,
তেতো-মিষ্টি
স্বাদে মুখটা ভরে গেল। কিন্তু চকোলেটের ঠিক মাঝখানে কিছু একটা শক্ত ঠেকল দাঁতে। অর্পা মুখ থেকে বের
করে দেখল, প্লাস্টিকের ছোট একটা
টুকরো। ভাল করে ধোয়ার পর দেখল ওটা আসলে একটা মেমোরি কার্ড। হৃৎস্পন্দন এক
মুহূর্তের জন্য থেমে গেল অর্পার। অরিন স্যার কি ভুল করে এটা চকলেটের ভেতর ফেলে
দিয়েছেন? নাকি এটা কোনও সংকেত?
ল্যাপটপটা অন করে কার্ডটা রিডার দিয়ে ঢোকাল অর্পা। ভেতরে একটাই ফোল্ডার, নাম নেই। ফোল্ডারটা খুলতেই কয়েকটা ভিডিয়ো ফাইল ওপেন হল। প্রথম ভিডিয়োটা প্লে করতেই অর্পার মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। অর্পার নিজের রুমেরই ভিডিয়ো। সে যখন রাতে ঘুমোচ্ছিল, তখন তার জানলার বাইরে থেকে রেকর্ড করা, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছ। তিন দিন ধরে ভিডিয়ো করা হয়েছে, অর্পা দেখল কোণায় তারিখ আর সময় উঠছে। দ্বিতীয় ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে অরিন ঘোষকে। তিনি একটি অন্ধকার ঘরে বসে আছেন। সামনে একটা টেবিল, তাতে অনেকগুলো সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট সাজানো। তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলছেন, "২৩ ইনটেক, আইডি ২৮, সেকশন ১। অর্পা, তুমি আমার ক্লাসে খুব মন দিয়ে আমার লেকচার শোনো। কিন্তু তুমি জানো না, মানুষের শরীরের অ্যানাটমি ইংরেজি সাহিত্যের চেয়েও অনেক বেশি রোমাঞ্চকর।"
অর্পা
ল্যাপটপ বন্ধ করে দিতে চাইল, কিন্তু হাত সরল না।
সে দেখছে, অরিন স্যারের সেই মায়াবী
চোখের আড়ালে যেন এক বীভৎস পিশাচ লুকিয়ে আছে। পরের ভিডিয়ো আরও ভয়ঙ্কর। সেখানে একটা
মেয়েকে দেখা যাচ্ছে, হাত-পা বাঁধা। মেয়েটি
অর্পারই সিনিয়র, তন্বী। তন্বী গত এক
মাস ধরে নিখোঁজ। ভিডিয়োতে দেখা যাচ্ছে অরিন স্যার খুব ধীরে, শান্ত হয়ে তন্বীর আঙুল কাটছেন, যেন তিনি ক্লাসে শেক্সপিয়রের কোনও সনেট পড়াচ্ছেন।
তন্বীর মুখে টেপ লাগানো। চোখ দুটো ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। চিত্কার করছে, কিন্তু তা বাইরে আসছে না। অর্পা ল্যাপটপের দিকে একদৃষ্টে
তাকিয়ে আছে, তার চোখ সরছে না। ঠিক তখনই
তার ফোনে নোটিফিকেশনের আওয়াজ। অরিন ঘোষের ফেসবুক আইডি থেকে মেসেঞ্জারে মেসেজ। ‘চকোলেটটা খেয়েছ? ভয় কি একটু কমেছে, নাকি বেড়েছে?’ অর্পা কাঁপতে কাঁপতে লিখল, ‘আপনি কে? তন্বী কোথায়?’ রিপ্লাই এল সঙ্গে সঙ্গে, ‘জানতে চাও? তবে সামনে এসো। এখন রাত ১১টা ৩৫। রাসবিহারী থেকে
চেতলার দিকে এসো, কেওড়াতলা শ্মশানের
ঠিক পরেই একটা পুরনো গোডাউন আছে, নাম নিশুতি মঞ্জিল।
দশ মিনিটের মধ্যে না এলে তন্বীর পরের আঙুলটা তোমার কাছে পৌঁছে দেব।’ অর্পা বেশ
বুঝতে পারছে, সে মরণফাঁদে পা দিয়েছে।
পুলিশে খবর দেওয়ার সময় নেই। একটা ছোট ছুরি ব্যাগে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল অর্পা।
আজ যেন
এলাকাটা অন্য়দিনের থেকে বেশি নির্জন। ইতিউতি গাড়ি হুস করে বেরিয়ে যাচ্ছে, ব্রিজের ওপর উঠে অর্পা হাঁটছে। কেউ কোত্থাও নেই। বেশ ভয় ভয় করছে, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। রাতের দিকে এদিকটায় সে অনেকবারই এসেছে, তবে সঙ্গে কেউ না কেউ ছিল। আজ সে একা, একদম একা। চারপাশটাও বেশ একা। অদ্ভুত কিছু আওযাজ
মাঝে মাঝে শুনতে পাচ্ছে। পাশ দিয়ে ধুলো উড়িয়ে একটা ট্রাক বেরিয়ে গেল, ধুলোর আড়ালে নিশুতি মঞ্জিল যেন প্রেতাত্মার মতো দাঁড়িয়ে
আছে। অর্পা লোহার গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল। চারপাশে চামড়া পোড়া আর ফরমালিনের তীব্র
গন্ধ। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ
একজন তার মুখ চেপে ধরল। অর্পা ছাড়ানোর চেষ্টা করল, ধস্তাধস্তি করছে, কিন্তু লোকটার গায়ে
অসুরের শক্তি। তাকে টেনে নিয়ে গেল ভেতরের একটা আলো-আঁধারি ঘরে। চেয়ারে বসিয়ে তার
হাত-পা বেঁধে দেওয়া হল। আলো জ্বলে উঠল। অর্পা দেখল অরিন ঘোষ দাঁড়িয়ে আছেন। গায়ে সেই নীল
শার্ট, যেটা পরেই তিনি আজ
ইউনিভার্সিটি এসেছিলেন। অর্পা দেখল অরিন স্যারের হাতে একটা ধারালো স্ক্যালপেল।
"তুমি বড় অবাধ্য অর্পা।" অরিন বললেন। "আমি তোমাকে বলেছিলাম তুমি বড় ভীতু, এত ভয় করতে নেই, কিন্তু তুমি গোয়েন্দাগিরি শুরু করে দিলে।"
অর্পা চিৎকার করে উঠল, "কেন করছেন এসব? আপনি তো একজম শিক্ষক!"
অরিন
শব্দ করে হেসে উঠলেন।
"শিক্ষক? ওটা তো একটা খোলস, অর্পা। আমি আসলে একজন কালেক্টার। মানুষের সৌন্দর্যের স্থায়ী রূপ সংগ্রহ করি।
তন্বীর চোখ দুটো খুব সুন্দর ছিল, তাই ওগুলো এখন আমার
ড্রয়িংরুমে ফরমালিনে ভাসছে। আর তোমার? তোমার এই গোপন
মুগ্ধতা ভরা চোখ দুটো আমার সংগ্রহে থাকাটা খুব দরকার, অর্পা ডার্লিং।"
অরিন যখন স্ক্যালপেলটা অর্পার চোখের কাছে নিয়ে এলেন, অর্পা হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, "স্যার, আপনি কি জানেন আপনার ৩১৫ নম্বর রুমে কাল কারা গিয়েছিল?"
অরিন একটু থমকালেন। "কারা?"
"পুলিশ
নয় স্যার, ইপ্সিতা। আপনার ল্যাপটপের সব
ডেটা এখন ইন্টারনেটে লাইভ হচ্ছে। আমি ল্যাপটপ অন করার সঙ্গে সঙ্গেই একটা স্ক্রিপ্ট
রান করেছে, যা আপনার এই ঘরের
আইপি অ্যাড্রেস ট্র্যাক করে পাবলিক সার্ভারে পাঠিয়ে দিয়েছে। আপনি কী ভাবেন, আপনার ফোন নম্বর আমি ডায়েরি থেকে পেয়েছি? ওটা ডার্ক ওয়েব থেকে কেনা আপনার প্রোফাইল।"
অরিনের
মুখে এই প্রথমবার ভয়ের রেখা দেখা দিল। তিনি পাগলের মতো নিজের ফোনের দিকে তাকালেন।
কিন্তু কোনও সিগন্যাল নেই।
"জ্যামার স্যার।" অর্পা হাসল, তার চোখমুখ থেকে ভয় উধাও, মুখের রেখায় খেলা করে বেড়াচ্ছে হাড় হিম করা নিষ্ঠুরতা। "আমি যখন মেসেজ দিয়েছিলাম ‘নক নক’, ওটা রোমান্টিক নক ছিল না স্যার। ওটা ছিল আপনার সিস্টেমের ফায়ারওয়ালে দেওয়া প্রথম ধাক্কা।"
হঠাৎ
ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল চারজন লোক। তাদের পরনে কালো পোশাক। অর্পা নিজের হাতের
বাঁধন এক ঝটকায় খুলে ফেলল। অরিন অবাক হয়ে দেখলেন, অর্পার হাতের বাঁধনটা আগে থেকেই আলগা ছিল। কিন্তু সেটা কী করে
সম্ভব? অরিন বুঝে উঠতে পারছেন না, কী ঘটছে। অর্পা উঠে দাঁড়িয়ে অরিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
"আপনি
ভেবেছিলেন আপনিই একমাত্র শিকারি, স্যার? আমি গত তিন বছর ধরে আপনার মতো মানুষদেরই খুঁজে
বেড়াই। তন্বী আমার বোন নয়, আমার টিমের একজন
মেম্বার। আপনাকে এই গোডাউনে টেনে আনার জন্য তন্বীকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করতে হয়েছে
আমাদের।"
অরিন অবাক হয়ে বললেন, "তুমি... তুমি কে?"
অর্পা
পকেট থেকে একটা কার্ড বের করল। তাতে লেখা ‘ইন্টারপোল
সাইকোলজিক্যাল প্রোফাইলিং ইউনিট’।
"আপনার
সাতাশ জন শিকারের গল্প আমি জানি স্যার। আজ সাতাশ নম্বর পাতার সমাপ্তি হবে। তবে
ফরমালিনে নয়, ফাঁসির দড়িতে।"
বৃষ্টি
শুরু হয়েছে। সেই আওয়াজ ভেতরে এসে পৌঁছচ্ছে। পুলিশ এসে অরিন ঘোষকে নিয়ে গেল। অর্পা জানালার
পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে। তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল তন্বীর
মেসেজ, ‘মিশন সাকসেসফুল। তন্বী সেফ।’ অর্পা পকেট থেকে সেই ডার্ক
চকোলেটের শেষ টুকরোটা বের করে মুখে দিল। খাঁটি তেতো স্বাদ। তার মুখে মৃদু হাসি, আর কোনও মেমোরি কার্ড আছে নাকি!
কলকাতা
শহর আগের মতোই ব্যস্ত। কিন্তু অর্পার কাছে এই রাত সত্যিই জাদুকরময়। কারণ আজ রাতে
এক জাদুকরের হাত থেকে পৃথিবী রক্ষা পেয়েছে, তবে তার বদলে অর্পাকে
বিসর্জন দিতে হয়েছে নিজের ভেতরকার সেই সাধারণ মেয়েটাকে, যে একদিন সত্যিই কোনও এক লেকচারারের মায়াবী চোখে মুগ্ধ হতে
চেয়েছিল। এখন সে শুধুই একটা
যন্ত্র। এক হাড় হিম করা শীতল যন্ত্র।
