অন্তরে পেয়ে বাহিরে হারাই > ইন্দ্রাণী তুলি

 

অন্তরে পেয়ে বাহিরে হারাই

ইন্দ্রাণী তুলি


হিরণ্য-নগরের ধনবান শ্রেষ্ঠী, পিতা সামন্ত দাসের আশ্রয় ছেড়ে খুব কম বয়েসেই মহামায়া-বিহারের আচার্য শীলব্রত’র কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে ভগবান বুদ্ধের শরণ নিয়েছে সুনন্দা কিন্তু কেন যেন শান্তি নেই তার মনে। করণীয় প্রাত্যহিক কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে পালন করে চললেও সে সর্বদাই এক ঘোরের মধ্যে থাকে, এক অদৃশ্য বলয় যেন সর্বদা ঘিরে রাখে তাকে। প্রশ্ন করে সদুত্তর পান না আচার্য, শীলব্রতও। 

নির্জন রাতে বিহারের অলিন্দে দাঁড়িয়ে নিদ্রাহীন কিশোরীটি কী যে ভেবে চলে, কার অপেক্ষাতে যে সে রাতের পরে রাত কাটিয়ে দেয়… তার মনের হদিস পায় না কেউই।

কে যেন কবে তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিল, ফিরে আসবে। আবার দেখা হবে তাদের। প্রতীক্ষায় কেটে যায় সকাল, দুপুর, সন্ধ্যে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। তার ‘চমকিত মন চকিত শ্রবণ তৃষিত ব্যাকুল আঁখি’ আশায় আশায় থাকে। মন চঞ্চল হয়ে ওঠে বনের পাখির কূজনে, পাতার মর্মরে, বিদ্যুতের চমকানিতে। 

দিবাস্বপ্নে বেজে যায় বাঁশি। কে বাজায়, কোথা থেকে ভেসে আসে সে সুর! চোখ খুললেই উধাও হয়ে যায় সেই জাদুকরী বাঁশির তান যা অজানা কোনো অরূপের মোহে আকর্ষণ করতে থাকে সুনন্দাকে। যে রাতে ঘুম নামে তার চোখের পাতা জুড়ে… স্বপ্ন দেখে সে।

কোথাকার কোন এক পাহাড়ের ওপরে ঘন বেতের জঙ্গল আর বাঁশের বনের মধ্যে লুকনো এক অর্ধভগ্ন পাষাণ মূর্তি। নিঝুম রাতে সেই পাহাড়ের বেতগাছ হাওয়ায় দোলে, বাঁশবনে সির সির শব্দ তুলে বয়ে যায় মাতাল বাতাস। বেত ডাঁটার ছায়ায়, পাষাণ মূর্তির মুখ ঢাকা পড়ে আছে। সেই অন্ধকার অর্ধরাত্রে জনহীন পাহাড়ের বাঁশের বনে ঝোড়ো হাওয়া ঢুকে কেবলই বাজিয়ে চলে মেঘ মল্লার। 

ভোরে ঘুম ভাঙলে, আশ্চর্য হয়ে ভাবতে বসে সুনন্দা, কেন এই স্বপ্নটা তাড়া করে ফেরে তাকে? কোথায় সেই পাহাড়… বেতবন… পাথরের মূর্তি… তা কি কেবলই অর্থহীন দু:স্বপ্ন? 

উত্তর খুঁজতে, জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া আষাঢ় শুক্লপক্ষের এক গভীর রাতে সকলের নজর এড়িয়ে বিহার ত্যাগ করে গেল সুনন্দা। 

মহামায়া বিহারের তোরণদ্বারে দাঁড়িয়ে আছেন চিন্তিত, আচার্য শীলব্রত। সুনন্দাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিহারে, আশেপাশে কোথাওই তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। মধ্যবয়সী এই শ্রমণ উপসম্পদা পশ্চাৎ মহামায়া বিহারের অধ্যক্ষ পদে বৃত হয়েছেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পূর্বে তিনি, এক বর্ধিষ্ণু বৈশ্য ছিলেন শ্রেষ্ঠী সামন্ত দাসের মিত্র। 

 

রাজগৃহের বৈপুল্লগিরির ওপর থেকে, ধীর গতিতে নেমে আসছেন এক বৃদ্ধ বৌদ্ধ ভিক্ষু। পাহাড় সুকঠিন প্রস্তরময়, শ্যামলিমার অভাব দৃষ্টিকে পীড়া দেয় অথচ, পাহাড়ের সানুদেশ সবুজের ভারে ভারাক্রান্ত। কত না তার বর্ণবৈচিত্র্য- নীলাভ, হরিদ্রাভ, কচি-কলাপাতা, কৃষ্ণাভ-হরিৎ বা পান্না রঙে রাঙানো। রাতে বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায়, সদ্যস্নাতা সুন্দরীর মতো স্নিগ্ধ ও পবিত্র সেই সবুজের রূপ। বারে বারেই ভিক্ষুর নজর চলে যাচ্ছিল ঈশান কোণে জমে ওঠা কৃষ্ণবর্ণ মেঘরাজির দিকে। তাঁর চোখের দৃষ্টি গভীর ও অন্তর্ভেদী। জীবন দেখেছেন তিনি। সঙ্কীর্ণ মেঠো পথ পেরিয়ে তিনি এসে পৌঁছলেন সমতলে। দু'পাশে ঘন গাছের সারির ফাঁকে, যতদূর চোখ যায় ফসলে ভরে আছে প্রান্তর। আষাঢ় মাস, বর্ষার ঘন মেঘে ছেয়ে আছে আকাশ। পরম রমণীয় প্রকৃতির রূপ আকর্ষিত করল আচার্য বসুমিত্রকে। 

রাজগৃহ নগরের তোরণদ্বার পার করে কিছুদূর যাওয়ার পরেই নজরে আসে গাছপালায় ঘেরা এক প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার- আম, জাম, কাঁঠাল গাছের প্রাচুর্যে ভরা। সামনের আঙিনাটি তকতকে করে নিকোনো। বিহারের পেছনে পদ্ম পুকুর। বর্ষা-মেঘের ছায়াতে কালো তার জল। সরোবর জুড়ে ফুটে আছে পদ্ম, উড়ে বেড়াচ্ছে মধু লোভী ভ্রমরের দল। সুগন্ধিত পুষ্পের সুবাসে আকাশ বাতাস আমোদিত। 

দু'দিন হয়ে গিয়েছে, আচার্যের জন্যে এই বিহারে অপেক্ষা করছে সুনন্দা। 

দূর থেকে ভিক্ষুকে বিহারের দিকে আসতে দেখেই উঠে দাঁড়াল মেয়েটা। সূর্যাস্তের রোদ তার শ্যামল আননটিকে করে তুলেছে অনিন্দ্য সুন্দর। সুনন্দা মুখ তুলে তাকাতেই বিহারাচার্য বসুমিত্র সেই কোমল, নিষ্পাপ চোখ দুটিতে চোখ রাখলেন। আনত হয়ে ঋষি পুরুষটির পদরজ গ্রহণ করে মাথায় ছোঁয়াল সুনন্দা।

“কল্যাণমস্তু!”

শীর্ণ হাতদুটি বাড়িয়ে তার মস্তক স্পর্শ করলেন ভিক্ষু। 

এক অদৃশ্য শীতল তরঙ্গ সঞ্চালনে কেঁপে উঠল সুনন্দার দেহবল্লরী। দূরবর্তী কোনো এক পর্বত শিখর থেকে এক জলপ্রবাহ এসে যেন জুড়িয়ে দিল সুনন্দার তপ্ত শরীর। হঠাৎ করেই তার দু'চোখ ছাপিয়ে নেমে এল বাঁধভাঙা অশ্রু। স্নেহময় পিতার কথা মনে পড়তে, মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল সুনন্দা। পিতাকে ছেড়ে আসার দুঃখ-জোয়ারের সঙ্গে মিশে গেল তাকে নি:সঙ্গ করে প্রদ্যুম্ন’র চলে যাওয়ার ব্যথার নদী, কথা দিয়ে কথা না রাখার হাহাকার। সুনন্দার বুকের ভেতরে থমকে থাকা গাঢ় অভিমানের মেঘই যেন তার চোখের আগল ভেঙে নেমে আসতে থাকে। 

“তোমার নাম কী, তুমি কী চাও কল্যাণী?”

“আমি ভিক্ষুনী সুনন্দা। আপনার দয়ার কণামাত্র ভিক্ষা করছি।” 

“আমি তুচ্ছ মানব। কথা দিলাম আমার সাধ্যাতীত না হলে তোমার ইচ্ছাপূরণের সবরকম চেষ্টাই আমি করব।” 

সুনন্দাকে বিহারে আমন্ত্রণ জানিয়ে, তার যথাযথ সৎকারের নির্দেশান্তে নিজের পাঠকক্ষে প্রবেশ করলেন আচার্য বসুমিত্র। 

 

নৈশাহার সম্পন্ন হলে, সুনন্দার ডাক পড়ল আচার্যের পাঠকক্ষে। ঘরে ঢুকে, তাঁর পায়ের কাছে বসল সুনন্দা। 

“এখানে কেন কল্যাণী, বেদীর ওপরে বস।” 

চরণ বন্দনা করে, স্মিতমুখে চুপ করে তার নিজ স্থানেই বসে রইল সুনন্দা।

হাসলেন আচার্য। “বল মা, কী তোমার সমস্যা!”

“আমার পূর্বাশ্রম কেটেছে আমার পিতা, শ্রেষ্ঠী সামন্ত দাসের ছত্রছায়ায়। মহামায়া বিহারের আচার্য, ভিক্ষু শীলব্রত আমার পিতার বন্ধু স্থানীয়। পিতার সঙ্গে খুব ছোট বয়স থেকেই আমি ওই বিহারে যাওয়া আসা করতাম। শিক্ষার্থী প্রদ্যুম্ন’র সঙ্গে আমার সেখানেই প্রথম পরিচয়।”

সুনন্দার চোখে ভাসল সেই পাতলা চেহারা, স্বপ্নালু চোখ আর কোমল দাড়িগোঁফে ঘেরা, প্রদ্যুম্ন'র উজ্জ্বল রূপ। তার স্বপ্ন পুরুষ, যাকে হাত বাড়িয়ে একবার ছুঁয়ে দেখতে সাধ জাগত।

“শুনেছি বারানসীর প্রসিদ্ধ গায়ক ইন্দ্রদ্যুম্নের পুত্র সে, পিতার কাছেই সঙ্গীতে হাতেখড়ি হয়েছিল তার। খুব ভালো বাঁশি বাজাতে পারত প্রদ্যুম্ন। পড়াশোনায় বিশেষ মন ছিল না কিন্তু  বড় প্রকৃতি প্রেমিক ছিল সে…”

সুনন্দাকে বাধা দিয়ে আচার্য বললেন “ছিল বলছ কেন, সে কি আর নেই?”

“আমি জানি না আচার্য। সে'কথাই বলতে বসেছি আপনাকে।”

“বল…”

“আচার্য শীলব্রত অত্যন্ত অনুশাসন প্রিয়, অন্যান্য ছাত্রদের তুলনায় প্রদ্যুম্ন'র মধ্যে বেশি চঞ্চলতা আর কৌতুকপ্রিয়তা লক্ষ্য করে তাকে অধিক শাসনে রাখবার চেষ্টা করতেন কিন্তু সে ছিল সব বিধি-নিয়মের বাইরে। অবাধ্য বলা যায় না, কম বয়সের চপলতা হয়তো। অজানা অচেনাকে জানবার অদম্য আকাঙ্খাই বোধহয় তার সঠিক চরিত্র চিত্রন। আমাদের মধ্যে সখ্য গড়ে উঠেছিল, তার বাঁশির ভক্ত ছিলাম আমি। মাঝে মাঝেই সে যখন ভদ্রাবতী নদীর তীরে বসে বাঁশি বাজাত, বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসে চুপ করে বসে শুনতাম আমি। সঙ্গীতে বিভোর সেই কিশোর আমার উপস্থিতি টেরই পেত না।”

“বড় হয়ে সেই বাল্য-সখ্য কি প্রেমে বদলে গিয়েছিল?”

চোখ নত করে, মাথা নেড়ে সুনন্দা বলল “আমি জানি না আচার্য কিন্তু একদিন তাকে না দেখলে আমার মন অস্থির হতো। আর, আজ কতদিন হয়ে গেল তার দেখা পাইনি আমি।”

“কী হয়েছে, সবিস্তারে বল আমাকে।”

“গত বছর জৈষ্ঠ্য সংক্রান্তিতে দশপারমিতার পুজোর দিন প্রদ্যুম্ন'র সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার। কে জানে কেন বেদে, সাপুড়েদের আশেপাশেই ঘোরাঘুরি করছিল সে। আমাকে রাগ করতে দেখে, বুঝিয়ে বলেছিল ‘এক বীণবাদকের অপেক্ষাতে আছি আমি, তাঁকেই খুঁজছি…’ বীণবাদন শিখতে প্রবল আগ্রহী ছিল সে। 

সে’দিন আমার অনুরোধে, আমাকে বাঁশি শুনিয়েছিল প্রদ্যুম্ন কিন্তু বড় প্রাণহীন ছিল সেই বাঁশির সুর। তার মন যেন অন্য কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছিল, বাঁশির সুরের সঙ্গে তার আত্মার যোগ ছিল না।

তারপরে আর একবারই আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার। 

প্রদ্যুম্ন বলেছিল 'দরকারি কাজে যাচ্ছি, সম্পন্ন হলেই ফিরে আসব।' 

খুব বেশি অন্যমনস্ক, বড় দুঃখী লেগেছিল তাকে।

আষাঢ় মাসের সেই সে'দিনের পরে, তার সঙ্গে আর দেখা হয়নি আমার। বিহারে নেই সে, আচার্য জানেন না সে কোথায় গেছে। শুধু…”

“শুধু…?”

“আমার মনে হয়েছিল, ভিক্ষু পূর্ণবর্ধন কিছু জানলেও জানতে পারেন যদিও তাঁকে প্রশ্ন করে সদুত্তর পাইনি আমি। 

পিতার নির্বাচিত পাত্রকে অগ্রাহ্য করে তাঁকে আমার বিবাহে অনীহার কথা জানিয়ে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আমি বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হয়ে প্রব্রজ্যা নিতে চাই আর… তারপরেই আমি বিহারে যোগ দিয়ে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলাম।

কিছুদিন ধরেই এক দুঃস্বপ্ন আমাকে বড় ব্যাকুল করে তুলেছে। আমার প্রশ্নের জবাব পেতে আপনার দ্বারে এসেছি। আমি বিশেষ কিছু চাই না আচার্য, আমি প্রব্রাজিকা… শুধু তার সন্ধান পেতে চাই, নিশ্চিত হতে চাই যেখানেই থাকুক সে ভালো আছে।”

“আমার জানবার উপায় কী? আচ্ছা, আমি পূর্ণবর্ধনের কাছে বার্তাবাহক পাঠিয়ে খবর নেওয়ার চেষ্টা করছি। তাঁর কিছু জানা থাকলে আমাকে অবশ্যই জানাবেন।” শান্ত গলায় বললেন আচার্য।


পুকুর ঘাটে বসেছিল সুনন্দা। তার অশান্ত মন তোলপাড় হচ্ছিল নানাবিধ প্রশ্নে। বুঝতে পারেনি, কখন তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন আচার্য বসুমিত্র।

“কল্যাণী…”

চমকে উঠে, জলে পড়ে যেতে যেতে সামলে নিয়ে, উঠে দাঁড়াল সুনন্দা। আচার্যকে প্রণাম করে, উৎসুকভাবে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

“এস আমার সঙ্গে।”

বসুমিত্র'র সঙ্গে তাঁর পাঠকক্ষে প্রবেশ করে, তাঁর পায়ের কাছেই বসল সুনন্দা। 

“আমি চিঠি পাঠিয়েছিলাম, পূর্ণবর্ধনের কাছে। তাঁর উত্তর এসেছে।”

কথা না বলে, আগ্রহভরে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সুনন্দা। 

“প্রদ্যুম্নকে তুমি আর কোনদিনই দেখতে পাবে না সুনন্দা।”

চিন্তিত দেখাল আচার্যকে। প্রশ্ন না করে, উন্মুখ হয়ে চেয়ে রইল সুনন্দা, তার চোখে বেদনার ছায়া ঘনাল।

“এক ঠগ কাপালিক, গুণাঢ্য'র হাতের পুতুল হয়ে অন্যায় করেছে প্রদ্যুম্ন আর সেই অনুচিত কর্মের প্রতিকার সাধনের পথে হারিয়ে গেছে নিজেই।”

“আচার্য, আমি বাস্তবের মুখোমুখি হতে চাই। সব সহ্য করে নেব, যাইই হয়ে থাক তার সঙ্গে…”

“নদীর ধারে, যেখানে তোমাদের দেখা হতো… অদূরে, পাহাড়ের ওপরে এক মন্দিরের ভগ্নস্তূপ চোখে পড়েছিল তোমার?'

মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাল সুনন্দা।

“হিন্দু দেবী, সরস্বতীর মন্দির। শোনা যায় প্রায় দুই শত বৎসর পূর্বে এক গায়কের গাওয়া শুদ্ধ মেঘ মল্লার রাগের সঙ্গীতে আকৃষ্ট হয়ে সুরলোকের দেবী এই মর্ত্যধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সেই উপলক্ষে দেবী-মূর্তি প্রতিষ্ঠার পরে, তীর্থস্থল হয়ে উঠেছিল ওই স্থান। কথিত আছে, আষাঢ় পূর্ণিমার রাতে কেউ যদি শুদ্ধ স্বরে মেঘ মল্লার আলাপ করে, আকর্ষিত হয়ে আজও দেবী মর্ত্যলোকে অবতীর্ণ হন। 

অবন্তীর প্রসিদ্ধ গায়ক সুরদাস মেঘ মল্লারে সিদ্ধ ছিলেন। দুঃখজনকভাবে, একবার তাঁর সঙ্গে এই কাপালিক সেই স্থানে উপস্থিত থেকে এই অলৌকিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে আর লোভাতুর, অশালীন বাসনার বশবর্তী হয়ে দেবীকে পাওয়ার কামনাতে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। ক্ষমতাহীন সেই দুরাত্মা কাপালিক সফলতা পাওয়ার আশায় তান্ত্রিকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে থাকে। তার হীন উদ্দেশ্য উন্মোচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে দূরদূর করে তাড়িয়ে দিতেন তান্ত্রিকেরা কিন্তু এই পৃথিবীতে তো অসৎ মানুষের অভাব নেই, তাদেরই কারুর সহায়তায় দেবীকে বশে আনার উপায় শিখে, প্রদ্যুম্ন'র সাহায্য পেতে তাকে সুমিষ্ট কথার জালে জড়িয়ে বশ করে ফেলেছিল গুণাঢ্য। তার কাছে নিজের অসাধু ইচ্ছে গোপন রেখে তার সরলতার সুযোগ নিয়ে, আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাতে তান্ত্রিক-হোমের পরে প্রদ্যুম্নকে বাঁশিতে মেঘ মল্লার বাজানোর অনুরোধ করেছিল সে। মেঘ মল্লারের শুদ্ধ সুরের মূর্ছনা আকাশ বাতাসকে মথিত করে ফেলেছিল। ধরাতলে দেবী সরস্বতীর আবির্ভাব হতেই মন্ত্রবলে তাঁকে বন্দী করে ফেলেছিল পাপিষ্ঠ গুণাঢ্য।”

উদাস দেখাল বসুমিত্রকে। 

সুনন্দার চোখে পলক পড়ল না, কথা না বলে সতৃষ্ণ নয়নে সে আচার্যের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

“ঘটনাক্রমে গুণাঢ্যের অবর্তমানে, তারই আলয়ে এক বিহ্বল নারীকে দেখে, খোঁজ খবর নিয়ে সবকিছু জানতে পারে প্রদ্যুম্ন। আত্মগ্লানির অনলে জ্বলতে থাকা ছেলেটার মনে হয়েছিল অজান্তে হলেও অমার্জনীয় অপরাধ করেছে সে। পূর্ণবর্ধনকে সব কথা জানিয়ে প্রতিকারার্থে, দেবীর মুক্তির উপায় সন্ধানে তাঁর সাহায্য চেয়েছিল প্রদ্যুম্ন। পূর্ণবর্ধন বলেছিলেন ‘এই ঘটনা তোমার অত্যধিক চঞ্চলতার পরিণাম। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে, এখন পারলে ওই কাপালিকই পারবে তোমাকে সাহায্য করতে। গুণাঢ্যকে খুঁজে বার করবার চেষ্টা কর।’

সেই রাতেই, কাউকে কিছু না জানিয়ে বিহার ত্যাগ করেছিল প্রদ্যুম্ন। 

যাওয়ার আগে সে তোমার সঙ্গে দেখা করেছিল। আশ্বাস দিয়ে গিয়েছিল ফিরে আসবে কারণ সে নিজেও জানত না তার ভবিষ্যৎ জীবনে তার জন্যে কী অপেক্ষা করে আছে।”

“তারপর?”

“অনেকদিন প্রদ্যুম্ন'র কোনো সন্ধান না পেয়ে, খোঁজ করে গুণাঢ্য'র দেখা পেয়েছিলেন পূর্ণবর্ধন আর তখনই সবকিছু জানতে পেরেছিলেন তিনি।

লোভী অমানুষ গুণাঢ্য’র দেখা পেয়ে, কাতর প্রদ্যুম্ন তাকে আর চোখের আড়াল হতে দেয়নি। গুণাঢ্য'ও অবশ্য তখন জ্বলে মরছিল অনুতাপ বহ্নিতে। অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই স্বভাবজাত চপলতায়, নিজের অন্যায্য কর্মের প্রতিকারের চেষ্টায়, দেবীকে মুক্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে গুণাঢ্য'র নির্দেশানুসারে, বন্দী দেবী সরস্বতীর ওপরে মন্ত্রপূত বারি সিঞ্চন করেছিল প্রদ্যুম্ন। দেবীর মুক্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রস্তরীভূত হয়ে গিয়েছে সে। 

তোমার প্রদ্যুম্ন আজ প্রাণহীন পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওই মন্দিরে।”

“তার প্রাণ ফিরে পাওয়ার কি কোনো উপায়ই নেই, আচার্য?”

“বড় নির্মম, অমোঘ ছিল দেবী বন্ধনের সেই মন্ত্রশক্তি… তার বিরোধী শক্তিসম্পন্ন মন্ত্র আছে হয়তো! তবে মনে হয় তা হবে কঠিনতর…”

“আচার্য দেব! যতই কঠিন হোক না কেন, আমি সাধব সেই অসাধ্যসাধন। আপনি শুধু সেই শাপমোচনের উপায় বলে দিন, যে প্রক্রিয়াতে প্রদ্যুম্ন তার প্রাণ ফিরে পাবে আর দেবী সরস্বতীও সুরক্ষিত থাকবেন।”

“আমার তো কিছুই জানা নেই সুনন্দা, ওই মন্দিরের কাছে গিয়ে খোঁজ করে দেখতে পার যদি সেই কাপালিকের দর্শন পাও। সে তোমাকে নির্দেশ দিলেও দিতে পারে। সবই অনিশ্চয়তায় ঢাকা। আমি তো বলব তুমি বিহারে ফিরে যাও। প্রদ্যুম্ন'র সঙ্গে যা হয়েছে, তা তার ভবিতব্য, তাকে খণ্ডাবে কে?”

কোনো কথা না বলে, পাঠকক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে এল সুনন্দা। কঠোর প্রতিজ্ঞায় তার মুখমণ্ডল দৃঢ়, প্রদীপ্ত তার প্রাণাধিকের প্রাণপ্রতিষ্ঠা নিমিত্ত।


আচার্য বসুমিত্র'র দিগদর্শন অনুসারে ভদ্রাবতী নদীর নিকটে, পাহাড় চূড়ার ভগ্ন মন্দিরের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল সুনন্দা।
 তখনও সূর্যাস্ত হয়নি কিন্তু পাহাড়ের তলদেশে নেমে এসেছে ঘন ছায়া। পাহাড়ের উপরিভাগ ঝিকিয়ে উঠছে পড়ন্ত রোদে। বাঁদিকে জলখাতের চিহ্ন ধরে এগিয়ে চলল সে। দক্ষিণমুখী এই পথের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল গভীর জঙ্গলে ঢাকা, যা কখনো হয়তো’বা এক সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। নির্জন পথ, পায়ের চিহ্ন নেই বললেই চলে। কখনো সখনো কেউ হয়তো সেই পথে আসে জ্বালানি সংগ্রহ করতে। 

পাহাড়ের পেছনে, মেঘে ঢাকা আকাশেও নেমে এসেছে বেলা শেষের ছায়া। নগর খুব বেশি দূরে নয়। ভেসে আসছে কোলাহলের গুঞ্জন, মন্দিরের শঙ্খ ঘন্টার মধুর ধ্বনি। শিলাকীর্ণ পাহাড়ে চড়ে ফাটল ধরা, ভাঙাচোরা, পরিত্যক্ত মন্দিরে পৌঁছল সুনন্দা। অজানিতের আশঙ্কায় কম্পিত তার তরুণ হৃদয়। 

আচার্য বসুমিত্র ভুল বলেননি তো, প্রদ্যুম্ন কি সত্যি সত্যিই প্রস্তরীভূত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে এই মন্দিরে? নিজের অজান্তে হলেও দেবী সরস্বতীকে বন্দী করতে সাহায্য করে, পাপের ভাগী হয়ে সাজা পেয়েছে প্রদ্যুম্ন। তাহলে সুরদাস নামধারী অসৎ গুণাঢ্য'র শাস্তি হলো না কেন? এই পৃথিবী কি চিরকাল একই নিয়মে ঘূর্ণিত হয়ে চলবে, স্বার্থপর অন্যায়কারী আর কাপুরুষেরাই ক্রমাগত জয়ী হবে?

সেই মন্দিরেই থেকে গেল সুনন্দা। 

স্বপ্নে দেখা সেই ভগ্ন মন্দির, প্রস্তর মূর্তি, বেতস লতা আর বাঁশের বন তাকে সত্যের মুখোমুখি এনে ফেলেছে। সে তো স্বপ্ন ছিল না, ছিল দৈবাদেশ। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরই তাকে বারে বারে স্বপ্নাদেশ পাঠিয়ে, তার পরবর্তী কর্তব্য সম্বন্ধে অবহিত করতে চেয়েছিলেন। 

মন্দিরের আগাছা পরিষ্কার করে, অঙ্গন নিকিয়ে তার প্রিয়ের মূর্তির দেখাশোনার মাধ্যমে, গুণাঢ্য'র অপেক্ষায় সময় অতিবাহিত করতে লাগল সুনন্দা। প্রাপ্ত ফলমূলে ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করে সে, কখনো কখনো অভুক্তই থাকে। সুনন্দার দৃঢ় বিশ্বাস এক না একদিন সেই কাপালিকের দেখা সে পাবেই।

 

ফিরে এসেছে আষাঢ় পূর্ণিমার রাত, চরাচর ভেসে যাচ্ছে জোছনায়। একদৃষ্টিতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে সুনন্দা। রূপোর থালার মতো পূর্ণিমার নিটোল গোল চাঁদটাই যেন ওর নিয়তি। মন খারাপের স্রোত বয়ে চলে তার শিরায় শিরায়। দু'চোখ থেকে ঝরে পড়া মুক্তো কণার প্রবাহ তাকে  ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

ভারী বর্ষণের পরে, ঝকঝকে পরিষ্কার আকাশ সজ্জিত হয়েছে তারার মালায়। ছোটবেলাতেই আকাশের অধিবাসীদের চিনতে শিখিয়েছিলেন বাবা। তার জন্মের পরেই সুনন্দার মা সেই আকাশেরই তারা হয়ে গিয়েছেন। বাবার চিনিয়ে দেওয়া নক্ষত্রদের দেখতে দেখতে তার মনে হলো, আবার এসেছে আষাঢ় মাসের সেই পূর্ণিমা, দেবীর আবির্ভাবের রাত। সে আজ সেই কাপালিকের দেখা পেলেও পেতে পারে। 

সামনের ছোট পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা, ঝরনা দিয়ে তৈরি ছোট জলাশয়টি ভরে আছে পদ্মফুলে। কুমুদ তুলে এনে প্রদ্যুম্নকে সাজাবার আকাঙ্খাতে জলে পা ডোবাতেই, শুকনো পাতার ওপরে পায়ের শব্দ পেয়ে, পেছনে ফিরে তাকাল সুনন্দা। 

অনতিদূরে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ। মানুষ না বলে প্রেতাত্মা বললেই তার সঠিক বর্ণনা হয়। মহামায়া বিহারের কলাবিৎ, ভিক্ষু বসুব্রত'র চিত্রিত ‘জরা’ চিত্রের জীবন্ত রূপ যেন। লোলচর্ম-কুশ্রী শীর্ণদর্শন মানুষটির পরিধেয়ের বর্ণ পুরাতন পুঁথির ভূর্জপত্রের মতো অপ্রীতিকর। ওই প্রতিকৃতিই যেন কোনভাবে জীবন্ত হয়ে সুনন্দা'র সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। 

“তুমি কে দেবী?”

“আপনি গুণাঢ্য?”

বৃদ্ধের চোখে বিস্ময় ঝলকে উঠল। তাকে কথা বলতে না দিয়ে, সুনন্দা বলল “আপনারই প্রতীক্ষাতে বহুদিন অতিবাহিত করেছি আমি। আপনি আমাকে সেই পথ প্রদর্শন করুন যে পথে চলে আমি প্রদ্যুম্ন’র শাপমোচনে সফল হতে পারি।” 

গুণাঢ্যের চোখের দৃষ্টি কোমল হলো।

“আমার সাহস ছিল না কিন্তু তাকে তো আমি সাবধান করেছিলাম জননী, বলেছিলাম একবার পাষাণে রূপান্তরিত হওয়ার পরে মুক্তির আর কোনো উপায় থাকবে না। স্বয়ং দেবীরও ক্ষমতা নেই তার প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার। 

“শুনেছি, কিন্তু সত্যিই কি প্রদ্যুন্ম'র জড়তা-মুক্তির কোনো উপায় নেই… আপনাদের তন্ত্র কী বলে?”

“এই জিজ্ঞাসা নিয়েই আমি গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম আমার গুরু আজীবকের কাছে…”

“কী নিদান দিয়েছেন তিনি?”

“সে বড় কঠিন ব্রত মা, দেবাদিদেবকে পাওয়ার জন্যে উমার তপস্যার অনুরূপ।” 

“আপনি আমাকে বলুন। যত দুরূহই হোক আমি পারব, পারতে আমাকে হবেই।”

“শুধু কঠিনই নয় মা, তার পরিণতিও যে মর্মান্তিক, প্রাণঘাতী। সার্থক তপস্যান্তে যেইমাত্র পাথরে প্রাণ সঞ্চার হবে, তৎক্ষনাৎ জীবনাবসান হবে তপস্বীর।”

“আপনি আমাকে বলুন সেই মন্ত্র, দিন সেই মন্ত্রপুত বারি। আমি আমার প্রাণের আহুতি দিয়েই প্রদ্যুম্নকে ফিরিয়ে আনব।”

“মন্ত্রপুত বারি তো এখন পাওয়া যাবে না। আজ আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা, আজ থেকে এক বৎসরকাল যাবৎ পালন করতে হবে সেই ব্রত। সামনের আষাঢ় পূর্ণিমায়, সূর্যাস্তের পরে আমি আবার আসব মন্ত্রপূত জল আর দেবীর উদ্ধার-মন্ত্র নিয়ে।”

“আমাকে নির্দেশ দিন, কীভাবে আমি আমার তপস্যাতে সফলতা পাব।”

“বহু যত্নে লালিত তোমার সুকোমল তনু-মন এই কঠিন তপস্যার ভার নিতে পারবে না মা।”

প্রতিশ্রুতিতে অটল, উন্মুখ সুনন্দা নিঃশব্দে গুণাঢ্য'র চোখে চোখ মিলিয়ে তার নির্দেশাবলীর আশাতে রইল। মাথা নেড়ে নিজের অসহায়তা প্রকাশ করল ওই পাপিষ্ঠ কাপালিক।

“এখন বর্ষাকাল। অবিরাম ধারা বৃষ্টির মধ্যে অনাবৃত শিলার ওপরে দিনযাপন করতে হবে। পৌষ-মাঘের দুর্জয় শীতের রাতে, তুষার শীতল জলে আকণ্ঠ ডুবে করতে হবে জপ। গ্রীষ্মের দাবদাহে, মাথার ওপরে জ্বলন্ত সূর্যকে রেখে, বৃত্তাকারে অগ্নিকুণ্ড সাজিয়ে তার মাঝে পালন করবে পঞ্চতপা।

শুধুমাত্র ঝরে পড়া পাতার রস পানে কালাতিপাত করতে সক্ষম হলে জীবন বাসনা মুক্ত হবে তুমি। সেই পাতাও পরিত্যাগে সফল হলেই তুমি হয়ে উঠবে অপর্ণা। 

ব্রহ্মচারিণীর ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্তি হলেই সাধকের সংযম ও মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে। মন্ত্রপুত বারি, মন্ত্রোচ্চারণ এবং কঠিন তপস্যার ফলস্বরূপ প্রস্তরীভূত প্রদ্যুম্ন'র মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হবে আর তৎক্ষনাৎ প্রাণ হারাবে তুমি।” 

ভীরু, স্বার্থপর কাপালিক দ্রুত স্থানত্যাগ করতেই, ইষ্টদেবকে স্মরণ করে, কঠোর তপস্যায় ব্রতী হলো সুনন্দা।

 

বৎসরান্তে আষাঢ়ী পূর্ণিমার সন্ধ্যায় মন্ত্রপুত বারি নিয়ে পর্বতশীর্ষের সেই মন্দিরে উপস্থিত হলো গুণাঢ্য। সেই জল সে তুলে দিল অপর্ণা, সুনন্দার হাতে। অতি কঠোর জপে তপে দেবী উমা’র মতই শাণিত হয়েছে সেই মহীয়সীর রূপ।

পূর্ণিমার রাতে মন্ত্রোচ্চারণ পশ্চাৎ, মন্ত্রপুত পবিত্র বারিতে তার প্রিয়ের মূর্তিকে সিঞ্চিত করল সুনন্দা। তার সার্থক তপস্যা ফলপ্রসূ হলো। শাপমোচন হতেই প্রাণের স্পন্দন এল প্রদ্যুম্ন'র প্রস্তরীভূত দেহে। ধীরে ধীরে জেগে উঠল নিষ্প্রাণ পাথর। শর্তানুযায়ী, সুনন্দার নিথর শরীর লুটিয়ে পড়ল প্রদ্যুম্ন'র পায়ের কাছে। 

নাই বা হলো দেখা প্রেমাস্পদ'র সঙ্গে, বেঁচে থাক সে এই সুন্দর ভুবনে রঙ রূপ রস গন্ধ উপভোগ করতে। তার প্রিয়ের চোখ দিয়েই না'হয় পৃথিবীকে দেখবে সুনন্দা। 

 

দৃষ্টি ফিরে পেতেই প্রদ্যুম্ন'র নজর গেল অদূরে দণ্ডায়মান, হতবাক গুণাঢ্য'র ওপরে। অভাবনীয় এবং অবশ্যম্ভাবী ঘটনার ঘনঘটায় কিংকর্তব্যবিমুঢ় সেই কাপালিক। তারপরেই প্রদ্যুম্ন’র চোখ পড়ল ভূলুণ্ঠিত নারীদেহে। নত হয়ে কাছাকাছি পৌঁছতেই সে বুঝতে পারল প্রাণহীন শরীরের অধিকারিণী সুনন্দা। 

কী ঘটেছে তা বুঝতে না পেরে বিস্মিত প্রদ্যুম্ন গুণাঢ্যকে জিজ্ঞাসা করবার জন্যে মাথা তুলে দেখল সেখানে কেউ নেই, পালিয়ে গেছে দুর্বৃত্ত কাপালিক।

মন্দির ছেড়ে প্রদ্যুম্ন বেরল গুণাঢ্য'র খোঁজে। তার দেখা পাওয়া খুব দরকার, সেই’ই বলতে পারবে কীভাবে এই অসম্ভব সম্ভবিত হলো, প্রাণ সঞ্চার হলো প্রদ্যুম্ন’র প্রস্তরীভূত দেহে।

কিন্তু সুনন্দা! এই ঘটনার সঙ্গে সে কীভাবে জড়িয়ে পড়ল, কী ছিল তার ভূমিকা?

 

অন্ধকার ঘিরে ধরেছে সম্পূর্ণ চরাচরকে। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় মায়াবী হয়ে আছে পাহাড় জঙ্গল নদী। গুণাঢ্য'র চিহ্নমাত্র কোনখানে নেই। 

হঠাৎই পাশের ঝোপে বিচলন লক্ষিত হতে, দুই হাতে ঝোপঝাড় সরিয়ে এগোবার চেষ্টা করল প্রদ্যুম্ন। চাঁদের ঝকঝকে আলো পড়েছে শঙ্খ লাগা জোড়ার ওপরে। এত কাছ থেকে মিলন খেলায় মগ্ন নাগেদের দেখে উত্তেজিত প্রদ্যুম্ন সরে যাওয়ার জন্যে ঘুরে দাঁড়াতেই, তার পায়ে তীব্র ব্যথা অনুভূত হলো। সাপের ছোবল? লেজে পা পড়েছে নির্ঘাত।

বন জঙ্গলের রীতি নীতির সঙ্গে অভ্যস্ত প্রদ্যুম্ন'র কিছুই বুঝতে বাকি রইল না। দুঃখ পেল না সে। অদূর, অবশ্যম্ভাবী ভবিষ্যতের কথা ভেবে, পরিতৃপ্তিতে মন ভরে উঠল তার। 

সুনন্দা নেই। সুনন্দাহীন জীবন থাকল কি গেল, কী আসে যায়! নিজেকে বাঁচাবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করল না প্রদ্যুম্ন, ফিরে গেল সুনন্দার কাছে। 

বিচ্ছেদই যদি ছিল তাদের নিয়তি তাহলে তাদের আবার দেখাই বা হলো কেন?

কীভাবে শাপমুক্ত হলো প্রদ্যুম্ন,  সুনন্দার মৃত্যুর কারণই বা কী? গুণাঢ্য'র মন্ত্র তন্ত্রই কি দায়ী এই ঘটনাবহুল পরিস্থিতির জন্য? সব জিজ্ঞাসা রয়ে গেল অনুত্তরিত।  

আবার জন্ম হবে তোমাদের। দুঃখ পাবে, দুঃখ দেবে, তবেই হবে ছন্দপাত অপরাধের ক্ষয়।

দৈববাণী শুনতে শুনতেই বিষদুষ্ট প্রদ্যুম্ন'র প্রাণহীন দেহ লুটিয়ে পড়ল তার ভালবাসা, সুনন্দার শীতল কঠিন নিষ্প্রাণ দেহের ওপরে।



*কালজয়ী কথাসাহিত্যিক শ্রী বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোট গল্প মেঘ মল্লার'এর অনুপ্রেরণায় রচিত*

 

Post a Comment

Previous Post Next Post