সীমান্ত প্রহরায় লাদাখ ।। ১০ ।। লে সার্কিট-২ (খ)

 ১০

লে সার্কিট-২ (খ)

৩১শে জুলাই ২০২২

 


পিতা ও কন্যা কারোরই পরের দিন বেরোনোর ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু পর্যটকদের অন্যতম দ্রষ্টব্য হেমিস মনেস্ট্রি বাকি, দেখা হয়নি জোহরাওয়ার দুর্গও। শে প্যালেস তো বন্ধই পেলাম দালাই লামার পুজোর ঠেলায়। রিগজ়িনের বক্তব্য জানাতেই শৈলেনসহ আরও কয়েকজন হৈহৈ করে উঠল। লাদাখ এসে হেমিস না দেখে ফেরা মানে কলকাতা এসে যাদুঘর না দেখার সমতুল্য। কত রহস্যময় ইতিহাস সেখানে।

        বাস্তবিকই Lost Years of Jesus, যিশুর অন্তর্ধান রহস্য, তথা ভারতে কাটানোর সাক্ষীস্বরূপ লাদাখের হেমিস মঠ ও কাশ্মীরের রোজ়াবেল সমাধি ইত্যাদি নিয়ে জনশ্রুতি ও বিতর্কের কথা তো আমি নিজেই একসময় কাগজে লিখেছি। কাশ্মীরে যিশুর তথাকথিত সমাধি দেখা হয়নি, তখন পরিস্থিতি অত্যন্ত বিরূপ ছিল। আর লে-তে একদিন সময় হাতে থাকতেও হেমিস না দেখে ফিরে যাব? কিন্তু লামার যজ্ঞ …?

        আরে ধুর! হেমিস প্রকাণ্ড মঠ। সব বন্ধ রেখে সন্ন্যাসী-লামারা সবাই যজ্ঞক্ষেত্রে ছুটে আসবে, এটা সম্ভব? কথাটা কে বলেছিল মনে নেই, তবে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এবং আমার কর্তা ও কন্যা – দুজনেরই ছুটি নামঞ্জুর করে ৩১শে জুলাইও বেরিয়ে পড়লাম সকালে জলখাবার খেয়ে। নতুন গাড়ি ভাড়াও পাওয়া গেল ৩৫০০ টাকার বিনিময়ে। মেসের এক কর্মীরই গাড়ি। রোজকার না করলেও খরচের স্বাধীনতা আমার আছে।

        লে শহর থেকে মঠ বা গুম্পা ৪০.৮ কিলোমিটার ও জাতীয় উদ্যান ৫১ কিলোমিটার দূরে, আর আমাদের ডেরা থেকে তারও বেশি। মঠ ও উদ্যানের মধ্যেও অনেকটা দূরত্ব। মানে সারাদিনের কর্মসূচি।

 হেমিস গুম্ফা: 


মঠ বন্ধ না খোলা সেই দ্বিধা নিয়েই ৩১ জুলাই বেরিয়েছি। হেমিস-এর মিউজ়িয়ামে পার্বত্য হিমালয়ে বৌদ্ধ ধর্মের নানান ইতিহাস জানা গেলেও সেখানকার লামা ও কর্মীরা মোটেই বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। অনেক বিধিনিষেধ। উপরন্তু যিশুর ভারত আগমন নিয়ে কোনও তথ্যই পাওয়া গেল না। তার ওপর বৃষ্টির জন্য শীত ও বিরক্ত দুটোই লাগছিল।

        মাথাপিছু ৫০ টাকার টিকিট কেটে সংগ্রহশালায় ঢুকে নানা মূর্তি ও সামগ্রীর মতো কিছু প্রাচীন কুণ্ডলী বা স্ক্রোলও কাচের বাক্সের সাজানো ছিল। সেই চুরি যাওয়া ঐতিহাসিক স্ক্রোলের সমসাময়িক কোনটি, তার কোনও প্রতিলিপি আছে কিনা, আর কোনোটিতে যিশু সংক্রান্ত কোনও আভাস আছে কিনা – কিছুই জানা গেল না। ছবি তোলা নিষেধ। বাধ্য হয়ে শেষে ৪৫০ টাকা দিয়ে একটা সচিত্র বই কিনলাম, যদিও বইতেও সব ছবি নেই।

       একটা পাহাড় চূড়ায় একটা বুদ্ধ মূর্তি চোখে পড়লেও কাছে পৌঁছোনোর চেষ্টা করলাম না। বেরোনোর সময় ফটকের সামনে সাদা রঙের, হাতিসহ নানা মূর্তি শোভিত একটা সৌধ দেখে সেখানে গিয়ে দেদার ছবি তুললাম। এটাও মন্দির জাতীয় কিছু হবে, তবে মূল কক্ষ বন্ধ ছিল। কাচের পাল্লা দিয়ে ঝাঁকিদর্শন হল। কিন্তু সেটা ঘিরে প্রশস্ত চত্ত্বরটা এত সুন্দর, বর্ণময় ও তার চারপাশের দৃশ্যও বেশ মনোরম লাগায় ছিঁচকে বৃষ্টির মধ্যেও ভালো লাগছিল। ছবিগুলোয় শুভঙ্করের মুখের অভিব্যক্তি অবশ্য সে কথা বলছে না।

        হেমিস লাদাখের প্রাচীনতম মঠগুলির অন্যতম ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি আকর হলেও বর্ণ প্রাণ ও সারল্যে থিকসে বা মা তারার মন্দির অনেক বেশি টেনেছে আমাকে। মুগ্ধ করেছে ডিসকিট মঠও, যেখানে আমার মুখে বৌদ্ধ তারা-কালীর সঙ্গে হিন্দু তারা-কালীর সম্পর্ক আছে শুনে রিগজ়িন মন্তব্য করেছিল, “মা তো ওহী হ্যায়, জগহা কে সাথ রূপ বদল যাতা হ্যায়।”   

 

লে বাজার বা মল:

হেমিস মঠ থেকে বেরিয়ে কিছু দূরেই একটা বৌদ্ধ নিরামিষ রেস্তোরাঁয় দ্বিপ্রাহরিক আহার সারলাম। জায়গার নাম সম্ভবত কারু। ভারি স্নিগ্ধ সুন্দর রেস্তোঁরা যদিও ক্রেতা বলতে আমরাই। খাবার স্বাদও দারুণ। সেখানে কিছু জামাকাপড়ের দোকানও ছিল যদিও ঠিক বাজার এলাকা নয়। আমি হেমিস ন্যাশনাল পার্কের কথা বলতে ড্রাইভার আমল দিল না। মঠ থেকে নাকি অনেক দুরে। বাপ-বেটী সোৎসাহে ওর সঙ্গে তাল দিয়ে বলল ঘরে ফিরবে।

        শুভঙ্কর ও তৎসহ তার কন্যার গুঁইগাঁইয়ের মধ্যে লে বাজার বা মল যাওয়া হল বটে, কিন্তু এক ঘণ্টায় কোনও মহিলার বাজার হয়? আমার লাদাখি পোশাক কেনার খুব ইচ্ছা ছিল। বিক্ষুব্ধ কাশ্মীরে কথায় কথায় “কাশ্মীর হমারা হ্যায়, আপ ইন্ডিয়া সে আয়ে হো”, এমনকি “ডার্টি বেঙ্গলী” শুনেও আমরা হ্যাংলার মতো কাশ্মীরি কোশিদাকারী বা সূচীশিল্পশোভিত শাল, পোশাকের কাপড়, কাঠের হস্তশিল্প -- কত কী কিনি; আর এই হাসিখুশি নির্বিরোধ (এখনও পর্যন্ত), “মা তো একই হ্যায়” ভাবনায় সম্মতি জানানো মানুষগুলোর কাছ থেকে কিছু নিয়ে যাব না?

        বড়ো কাশ্মীরি দোকানগুলো চোখ টানলেও বাঙালির কাছে নতুন নয়। ছোট-ছোট পসরা সাজিয়েছে মূলত ভারতে আশ্রিত তিব্বতিরাই। একটি তিব্বতি মেয়ে কথায়-বার্তায় বেশ চৌকোশ। তাকে দূরাগত পর্যটক হিসাবে দামি (এক্সপেন্সিভ) জিনিসে কিঞ্চিত ছাড় পাওয়া যাবে কিনা প্রশ্ন করায় শুনতে হল, “আই অ্যাম গিভিং ইউ মাই ভ্যালুয়েবল টাইম। দ্যাট ইজ় মাচ মোর এক্সপেন্সিভ দ্যান ইউর পারচেজ়।” ইচ্ছা করছিল পছন্দ করা জিনিসগুলো ফেরত দিতে। পরিবর্তে পেতলের চাবির রিং ও কানের দুলজোড়ার টাকা মিটিয়ে এগিয়ে গেলাম অন্য দোকানে। সেখানে সঙ্গম থেকে কেনা আমার শাঁখা-গালা-পাথর খচিত পেতলের নেকলেসটার সঙ্গে ম্যাচিং কানের দুল ও একজোড়া বালাও পেয়ে গেলাম। এইটুকু নিয়ে ঘরে ফেরার এতটুকু ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু কী করি? মেয়ে হাত ধরে টেনে গাড়িতে বসিয়ে দিল। ওরা দুজনেই ফিরতে অধীর, ক্লান্ত। আমার লাদাখি পোশাকের শখ পূরণ হল না।

 

জোহরাওয়ার দুর্গ:

পথে আগেই জোহরাওর ফোর্ট চোখে পড়েছিল। এবার ডেরায় ফেরার আগে বিকেলের দিকে গেলাম সেখানে। চিন্তা হচ্ছিল, বন্ধ হয়ে যায়নি তো লে প্রাসাদের মতো। গিয়ে শুনলাম, সেখানেও শব্দালোক প্রদর্শনী আছে; রাত আটটা থেকে। ততক্ষণ অপেক্ষা করার ধৈর্য্য আমারও ছিল না, পরের দিন ভোরের উড়ানে বাড়ি ফেরার পালা। দুর্গের ভেতরটাই ঘুরেফিরে দেখতে লাগলাম।

        এমন কিউট দুর্গ আর আছে কিনা জানি না। ঠিক মনে হল রাজস্থানের প্রকাণ্ড কোনও দুর্গের একটি মাটি লেপা মিনিয়েচার। দুর্গের আদলেই খাঁজকাটা প্রাকার, কিন্তু অশ্বারোহী সৈন্য কেন, বছর দশেক আগের আমিই চেষ্টা করলে ঐ প্রাচীর টপকে যেতে পারি। প্রবেশ মুখে দু’দিকে দু’টো হলঘরে নানান আসবাব, ছবি, ফ্রেমে বাঁধানো বর্ণনা ইত্যাদি। বাইরের চত্ত্বরটা আরও মিষ্টি। সিঁড়ি দিয়ে দুর্গ-প্রাকারের ওপর নিরীক্ষণ স্থল বা ওয়াচ টাওয়ার জাতীয় স্থানে উঠলাম। সবই কাদায় দিয়ে গাঁথা ও লেপা পাথর নির্মিত মনে হল। অবশ্য সেই রূপটা কৃত্রিমভাবে রচিত কিনা বলতে পারব না, গোটা দুর্গটাই সেনা প্রহরায় টিপটপ।

       আকাশে আলো কমে এসেছে। আরেকটু অপেক্ষা করলেই লাইট-অ্যান্ড-সাউন্ড শোয়ে হয়তো জোহরাওয়ার রাজবংশ কিংবা স্থানীয় ইতিহাস ফুটে উঠবে। হয়তো হল অফ ফেম কিংবা শয়তান সিং স্মৃতিসৌধের মতোই আবিষ্ট করে রাখার মতো কোনও কাহিনি। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও সবসময় উপায় থাকে না। তার ওপর এক ভদ্রমহিলা দলছুট হয়ে বেশ ফাঁপরে পড়েছেন। তাঁর ফোন লাগছিল না। একে তো চাইলেই যানবাহন পাওয়া যায় না, তার ওপর এই দুর্গ বাজার ও বসতি থেকে কিছুটা তফাতে; অন্তত সন্ধ্যার আলোয় তাই মনে হচ্ছিল। পর্যটক সমাগম আছে এবং দরকারে আমাদের পরিচিতদের কাছেও সাহায্য পাওয়া যাবে, এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া নিরাপদ ভেবে মহিলাকে নিজেদের গাড়িতে তুলে হল অফ ফেমের সামনে নামিয়ে দিতেই তার সঙ্গে তার দলের সাক্ষাৎ হয়ে গেল। 

        অতিথিনিবাসে ফিরে দেখলাম চেমদে মঠ ও হেমিস জাতীয় উদ্যান ছাড়া আর সর্বত্রই গিয়েছি। অবশ্য দালাই লামার দয়ায় দু-এক জায়গায় যেতে হয়নি বা গেলেও ভেতরে ঢুকে সিঁড়ি ভাঙতে হয়নি। অর্থাৎ মাসখানেক ধরে বিস্তর গবেষণা করে প্ল্যান-এ, প্ল্যান-বি এইভাবে ভ্রমণসূচি বানানোটা বৃথা যায়নি। শরীর-অশরীরের জন্য যে সাবধানতা বা সংস্থান রেখেছিলাম, তার সৌজন্যে শেষ দিন পর্যন্ত মোটামুটি পাস করার মতো সিলেবাস কভার হয়ে গেল। হাতে বেশি সময়, অঙ্গে ভালো স্বাস্থ্য এবং সঙ্গে উৎসাহী ভ্রমণসঙ্গী থাকলে লে থেকে কাশ্মীর রাজ্যের কার্গিল ও দ্রাস সেক্টরও ঘুরে আসা যায়। আমরা এবারের মতো ওগুলো বাদই রেখেছিলাম।

 

মেসে ফিরে:

সেনা বা সীমা সড়কের ডেরায় খাদ্যের অপচয় দেখেছি। ডিএডি সম্ভবত অ্যাকাউন্টস্‌ বিভাগ বলেই সেদিক দিয়ে যথেষ্ট মিতব্যয়ী। উপরন্তু এসে থেকে পঞ্চাশবার শুনেছি মেসে পার্টি আছে। তাই সহায়ক বেচারা আমাদের খাদ্যের দিকে মনোযোগ দিতে পারেনি, এমনকি যৎকিঞ্চিত তরকারি ছাড়া বলে রাখা সত্ত্বেও রুটির সঙ্গে স্যালাড রাখাটাও বাহুল্য মনে করেছে। এই নিয়ে আমি একটু মেজাজ করে ফেললাম। রাঁধুনে ছেলেটা বেচারা ক্যাজ়ুয়াল লেবার। ম্যাডাম গুস্‌সা করেছেন শুনে ভয়ে কুঁকড়ে ছিল পাছে কমপ্লেন করে দিই। ফেরার দিন ওর দ্বিধান্বিত হাতে একশো টাকার নোট আশ্বস্ত করলাম, “রখলো, খুশি সে দে রহে হ্যায়”।

        কিন্তু এ তো বখশিস্, বিল কোথায়? মেসে শুভঙ্করের পরিচিতরা যুক্তি করে বিল লুকিয়ে রেখেছিল। খানিকক্ষণ টানাটানির পর আমরা জোর করে সাতদিনের ভাড়া আর দু’দিনের খাওয়ার দাম চুকিয়ে দিলাম।

-

পূর্ববর্তী পর্ব :  : ৯।। লে সার্কিট-২ (ক)                                                   পরবর্তী সংখ্যা : ১১।। প্রত্যাবর্তন


Post a Comment

Previous Post Next Post