পাহাড়ের কাছে এক ভালোবাসার দরবার
ভাস্কর সিনহা
পারদটা বড়ই বেয়াদবি করতে শুরু করেছে। ওপরে
ওপরে উঠে থার্টি-থ্রি ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করেছেই। থার্মোমিটারের কাঁটা যেন
আঙুল তুলে গরমকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এখানে, মরুদেশের এই কোণায়, গ্রীষ্মকাল কোনো
সুশীল ভদ্রলোকের মতো দরজায় কড়া নেড়ে আসে না; ও আসে এক বেওয়ারিশ পাড়াপড়শির
মতো, যে ফেব্রুয়ারি মাস পেরোবার আগেই বাড়ির গায়ে গুঁতো মারা শুরু করে দেয়।
ভালোবাসার মাসটা তখনও অর্ধেক পার হয়নি, আর শহরবাসীর ঘাম ছুটে যাওয়ার অবস্থা।
যখন
দুনিয়াটা যেন একটা ধীরে ধীরে জ্বলা চুলোর মতো গরম হতে থাকে, তখন একটাই বুদ্ধি কাজ
করে—পালানো। পালাতে হবে শীতলতার সন্ধানে, ঠান্ডা হাওয়ার প্রতিশ্রুতির পিছনে। আর
এই বিশাল সোনালী মরুভূমির বুকে, পাহাড়ের কাছে আশ্রয় না নিলে আর কোথায় যাওয়া
যায়? আর এই কাজের জন্য রাস আল খাইমার জেবেল জেইস-এর মতো জায়গা আর হয় না। এক
হাজার পাহাড়ের ভিড়ে দাঁড়িয়ে এই চূড়াটা যেন শীতের এক গুজব, একটি গোপন ইশারা।
গল্প আছে, গভীর শীতে এখানে নাকি বরফেরও দেখা মেলে—সাদা, কোমল, কয়েক টুকরো বরফ!
তাই গাড়ির
মুখ দক্ষিণে ঘুরিয়ে এমিরেটস রোড ধরে ছোটা শুরু। জিপিএস-টা মিথ্যে করে একশো আশি
কিলোমিটার বলে দিল—শহরের জ্বালা আর পাহাড়ের শীতলতার মধ্যে এক মিষ্টি দূরত্ব।
দুবাই শহরটা প্রথমে পিছলে গেল। কাচ আর ইস্পাতের
সেই কল্পনাপুরী আস্তে আস্তে রিয়ারভিউ মিরর থেকে মুছে গেল, যেন ভবিষ্যতের স্বপ্ন
শেষ হয়ে আসছে। তারপর এল ধূসর দুবাই মরুভূমি। প্রকাণ্ড ঢেউ খেলানো বালির রাশি,
রংহীন, নিস্তব্ধ। আর তার বুকে উটের রাজা—মহিমান্বিত, ধীর, জাহাজের মতো দুলতে দুলতে
চরছে। আমাদের গাড়ির দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। ওরা এই দেশের আসল বাদশা। শুধু
চিবিয়ে চলে, আর সময়টাকে নিজের করে নেয়।
শারজায় ঢুকতেই মাটির রং বদলে গেল। দুবাইয়ের
ধূসর বালি এখন টকটকে লালচে, যেন মাটির ভেতর লজ্জার আভা। শারজা নিজেও খুব সুন্দর
একটি শহর, সংস্কৃতির শহর। কিন্তু শহরের এক অংশে এমন জটলা, যেন একটা পুরোনো অসুখ
লেগেই আছে। কিন্তু রাস্তা, এই এমিরেটস রোডটি দারুণ। ছোট ছোট এমিরেটগুলোকে সেলাই
করে এগিয়ে চলে—রাস আল খাইমা, উম্ম আল কুওয়াইন, আজমান—এমনকি ওমানের গল্পও জড়িয়ে
আছে এর সঙ্গে। দূর ওমানেরও হাজার পাহাড় নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে, আমাদের গন্তব্যের
পাহাড়ের নির্বাক ভাইয়েরা।
পথের কষ্ট নেই। পিচ ঢালাই রাস্তা মজবুত, আর
ধারের নিচু দেওয়ালগুলো দৃশ্য আড়াল করে না। এমারাত বা ইনক-এর পেট্রোল পাম্পে একটু
থামা। শুধু গাড়ির নয়, নিজেদের পিপাসাও মেটানো। জল গলায় নামানোর শব্দ, বিস্কুটের
প্যাকেট খোলার মরমর শব্দ—এইসব ছোট ছোট, দুষ্টু মজা। ভ্রমণের এই সহজ মাধুরী।
রাস আল খাইমা। এক লাজুক এমিরেট। ছোট, শান্ত।
সমতলে ছবির মতো দোতলা-একতলা বাড়ি। আর রাস্তার ধারে ধারে হঠাৎ হঠাৎ দেখি
সাইনবোর্ড—ছাগলের সাইনবোর্ড! হলুদ ত্রিকোণে কালো ছাগল লাফ দিচ্ছে। আবুধাবিতে যেমন
উটের সাইন থাকে, এখানে ছাগল। সত্যি মিষ্টি! মনে হয়, আদিবাসীদের জীবিকা এটাই, ওদের
পাহাড়ি ছাগলগুলো পাথরে পাথরে ঘুরে বেড়ায়।
আর শুরু হলো চড়াই। সমতল থেকে প্রায় পঁচিশ
কিলোমিটার ধীরে ধীরে ওপরে ওঠা। ছোট ছোট তাঁবু চোখে পড়ল—পরিবার নিয়ে ক্যাম্পিং
করছে কেউ কেউ, বাড়ির কাছেই একটু শীতলতা খুঁজছে। আরও ওপরে, পাহাড়ের গায়ে গায়ে
চোখে পড়ল এক একটি চমৎকার বাড়ি। সাধারণ মানুষের জন্য না, নিশ্চয়ই আদি
পর্বতবাসীদের বাসস্থান। পাহাড়ের মতোই পুরোনো ওদের শিকড়।
তারপর এল ছন্দপতন। হঠাৎ রাস্তায় বাধা। পুলিশ।
গাড়ির লম্বা লাইন। উপরে ওঠার টোল চালু হয়েছে অনলাইনে। আমরা আগে খোঁজ নিয়েছিলাম।
ওপরের হোটেল আর জিপলাইনের জন্য অনলাইন বুকিং জানতাম। কিন্তু টোলের কথা জানতাম না।
কিছুদিন আগে আল আইনের জেবেল হাফিত-এ উঠেছিলাম, সেখানে এমন কিছু ছিল না। তাই এটা
দেখে খানিকটা দুষ্টু-মিষ্টি রাগ হল। মনে হল, পাড়ার ছেলেরা রাস্তা আটকে চাঁদা
তুলছে! এত গাড়ি দেখে বোঝা গেল, আমরাই একা নই বিরক্ত। তবুও মোবাইল দিয়ে অনলাইন
পেমেন্ট করে রওনা দিলাম। মাঝে রাস্তা মেরামতের কাজ দেখলাম, টোলের টাকা হয়ত তারই কাজে
লাগবে। সরকার তো জনগণের টাকাতেই দেশ চালায়, তাই না?
রাস্তাটা আরও চমৎকার হলো। এটা শুধু চড়াই নয়,
যেন সাপের মতো বাঁক নেওয়া এক পথ। পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা, জিগজ্যাগ, উল্টোপাল্টা
বাঁক। ইঞ্জিনিয়ারিং-এর এক আশ্চর্য নিদর্শন। উঠতে উঠতে শেষমেশ পৌঁছে গেলাম শিখরে,
১২৫২ মিটারে। বুর্জ খলিফার চেয়েও উঁচুতে। আমরা দাঁড়িয়ে আছি সংযুক্ত আরব
আমিরশাহির ছাদে।
গাড়ি থেকে নামতেই অন্য জগতে চলে এলাম। শহরের যে
বাতাস ভারী হয়ে গায়ে জড়িয়ে ধরত, সেটা এখানে হালকা, চঞ্চল। সে নাচছে। দুষ্টুমি
করে চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে, ওড়না উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ধুলো নেই, শুধু রোদে
পোড়া পাথরের এক নির্মল গন্ধ। গাড়ির থার্মোমিটার বলছে ১৮ ডিগ্রি! ৩৩ ডিগ্রির জ্বর
ছেড়ে এই আরাম! কী অপরূপ বৈপরীত্য!
দাঁড়িয়ে আছি ভিউইং ডেক পার্কে, দেশের সবচেয়ে
উঁচু রেস্তোরাঁর পাশে। দৃশ্যটা এক নীরব, মহাকাব্যিক কবিতা। হাজার চূড়ার ভিড়।
কোনোটা উজ্জ্বল রোদে ঝলমল করছে, যে রোদ এত ওপরে এসে একেবারে সদয় হয়ে গেছে।
কোনোটা আবার গভীর নীলচে-বেগুনি ছায়ায় ঢাকা। পাহাড়ের পোষাকের ভাঁজ। কিছুক্ষণ
শুধু বসে রইলাম, শ্বাস নিতে নিতে। এখানে বেঞ্চ আছে, বাচ্চাদের খেলার জায়গা আছে,
এমনকি টেলিস্কোপও আছে দূরের পৃথিবী দেখার জন্য। আর কী আশ্চর্য, ১৮ ডিগ্রিতেও পাখা
বসানো আছে! অলস ঘুরছে। যেন আমাদের আরামের অভ্যেসটা পাহাড়ের চূড়ায়ও ছেড়ে আসতে পারিনি।
নীচে শহর এক মিথ্যার মতো। এই প্রকাণ্ড পাহাড়ের
পায়ের কাছে ওর কোনো অস্তিত্ব নেই। সেখানে গরম, জটলা, ধোঁয়া। আর এখানে শুধু
পরিষ্কার, শীতল নিস্তব্ধতা।
এবার না খেয়ে উপায়? রেড রক বারবিকিউ-তে বসতেই
হবে। না খেলেই যেন অপরাধ। অপরাধটা স্বীকার করলাম। খাবার এল। আর খেতে খেতেই
চারপাশের মানুষদের নাটক দেখছিলাম। এক বাবা পরিবারের ছবি তুলছেন। নিজের জীবনস্মৃতি
ধরে রাখতে ব্যস্ত। কোমর বেঁকিয়ে, হাত উঁচিয়ে কোনওরকমে সঠিক অ্যাঙ্গেল খুঁজছেন।
কিন্তু ব্যালেন্স রাখতে পারলেন না। আর মুহূর্তেই মোবাইল হাত থেকে ফসকে খাদের মধ্যে
পড়ে গেল। পরক্ষণে নিস্তব্ধতা—গভীর খাদের চেয়েও গভীর। তারপর সবাই মিলে
"আহারে! বাছারে!" বলে সান্ত্বনা দিতে শুরু করল। এই আমাদের স্বভাব। আমরা
সবাই ওর হয়ে দুঃখ পেলাম, কিন্তু কিছু করার নেই। তাকে সিকিউরিটির সঙ্গে কথা বলতে
বলে আমরা উঠে পড়লাম, কারণ ফেরার সময় হয়েছিল।
নামার পথে সোনালি আলো, শেষ বিকেলের মিষ্টি রোদ।
পাহাড়ি রাস্তায় স্ট্রিট লাইট নেই। তাই অন্ধকার নামার আগেই নীচে পৌঁছতে হবে। নিচে
নামা চড়াই চড়ার চেয়েও সতর্কতার কাজ। ধীরে ধীরে নামলাম, আর শেষমেশ সমতলে ফিরে
এলাম।
আর তারপর শারজার ট্র্যাফিক, দূষণ আর গরম। গাড়ির
থার্মোমিটার আবার ৩০-এর দিকে উঠতে শুরু করল। পাহাড়ের শীতল হাওয়া, যেন এক স্মৃতি
হয়ে গেল। তখনই পরিষ্কার বুঝলাম, কেন পাহাড় এত শান্তির জায়গা, ধ্যানের জায়গা।
কেন দেবতারা ওপরে থাকেন। কেন দেবাদিদেব মহেশ কৈলাসেই বাস করেন। শুধু ঠান্ডার জন্য
নয়। শুধু দৃশ্যের জন্য নয়। নীরবতার জন্য। পৃথিবীর কোলাহল সেখানে পৌঁছতে পারে না।
সেখানে হৃদয় নিজের স্পন্দন শুনতে পায়।
আর সেই স্পন্দনে, ভালোবাসা দিবসের দিনে, একটা
পরিচিত উষ্ণতা অনুভব করলাম। মরুরোদ থেকেও বেশি উষ্ণ। তুমি। এই পৃথিবীর এক কোণ
থেকে, গরম আর ট্র্যাফিকের মাঝে দাঁড়িয়ে, আমি তোমাকে নিয়ে চলি। তুমি আমার মনের
ভেতর এক সূর্যালোকিত উষ্ণতা। পাহাড় ছিল দারুণ, ছিল মুগ্ধকর। কিন্তু পাহাড় একটা
জায়গা। তুমি একটা অনুভূতি, যা আমি প্রতিটি জায়গায় নিয়ে যাই। বি মাই
ভ্যালেন্টাইন। চিরকাল।




