গজারোহী দলিত => দর্পণা রায়

গজারোহী দলিত

দর্পণা রায়



ভারতে জাত-ধর্মের রাজনীতি বরাবরই ছিল এবং স্বাধীনতার আট দশকের পরেও তা কমার নাম নেই, বরং বেড়েই চলেছে। তারই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের চেষ্টা করছে সরাসরি দলিত রাজনীতির পরাকাষ্ঠা ‘বহুজন সমাজ পার্টি’। দলটির প্রধান নেত্রী ও তাঁর ভাইয়ের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। কিন্তু সেই সভায় যখন বিশেষভাবে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের এমন এক বিশিষ্ট লেখিকা যাঁকে একাধারে জাতীয়তাবাদী, লিঙ্গসাম্যবাদী ও জাতপাত রাজনীতির বিরোধী এক প্রতিবাদী চরিত্র হিসাবেই পাঠকসমাজ থেকে নেট দুনিয়া চেনে। যদিও সভার মুখ্য অতিথি মঞ্চে ওঠার আগেই তিনি চলে এসেছিলেন।

কৌতুহল বশত কথা বললাম তাঁর সঙ্গে। নামটা প্রকাশ করতে মানা করলেন, যদিও অনেকেই হয়তো অনুমান করতে পারবেন। জাতপাতের প্রসঙ্গ উঠেছে বলেই জানাতে হচ্ছে, আসানসোল মহকুমার ডিশেরগড় অঞ্চলের এক ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে তিনি। তবে গত ২৭ বছর ধরে তিনি উত্তর চব্বিশ পরগনার বাসিন্দা এবং সুপরিচিত লেখিকা। প্রথমে ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশনের সাম্প্রতিক নিয়ম নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গ নিয়ে খানিক ইনফর্ম্যাল আলোচনা হলেও আমার মূল প্রশ্নটা ছিল দলিত রাজনীতি নিয়ে, কারণ তেমন একটি সভাতেই খানিকক্ষণের জন্য তাঁকে দেখা গিয়েছিল।

প্রথম প্রশ্নই ছিল, "আপনি ঐ সভায় গেলেন কী উদ্দেশ্যে? রাজনীতিতে আসতে চেন?"

"আমাকে যিনি আমন্ত্রণ করেছিলেন তিনি শিল্পী সংগঠন করেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সেই সঙ্গে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের উন্নতি সাধনের লক্ষে গঠনমূলক আলোচনার জন্য ডেকেছিলেন। আমার বর অমত করেননি যদিও আঁচ করেছিলেন মতুয়াদেরই সভা হতে পারে। একটু কৌতুহল বশতই গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম পুরোদস্তুর নির্বাচনী সভা। গান হচ্ছে মনুবাদ বিরোধী। তারপর মূল সভা শুরু হওয়ার আগেই চলে আসি।"

"পশ্চিমবঙ্গে তো বিএনপি-র কোনও ভিত্তিই নেই। তাহলে? কী মনে হয় ওরা কিছু ছাপ ফেলতে পারবে?"

"হিন্দু ভোট মূলত মতুয়া ভোট কাটতে পারবে খানিকটা। বিশেষত উত্তরবঙ্গে পার্টিকুলারলি কোচবিহারে ওদের একটা প্রেজ়েন্স আছে। যে ভদ্রলোক আমাকে আমন্ত্রণ করেন তিনি কিন্তু গোস্বামী, মানে সো কলড নিম্নবর্ণের তো নন।"

“আপনার কী মনে হয়, দলিত কারা? স্বাধীনতার আট দশক পরেও তারা এখনও দলিত কেন ও কীভাবে?”

সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গল্পের ছলে জানিয়ে বললেন, “আমার শ্বশুরবাড়ি রাঁচীতে। রাঁচীর জনজাতি সমাজে দেখেছি খ্রিস্টান পরিবারগুলির ছেলেমেয়েরা অনেকেই চোস্ত ইংরেজীতে কথা বলে, আর প্রভূত জমিজমা সম্পত্তির মালিক। তারা আদিবাসী সমাজের মাথা হয়ে নিজেদের সমাজের অন্যান্যদের শোষণ করে, আর তাদের বোঝায় তাদের দারিদ্র্য দুর্দশার জন্য বর্ণহিন্দুরা দায়ী।  অন্যদিকে আমার দাদুর সামান্য জমি ও বাঁধ (দিঘী) কেনা ছিল। চুক্তি নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছিল, তবে আমার দাদু বা বাবা-কাকাদের দেখেছি চাষী ও জেলেরা স্বেচ্ছায় যেটুকু দিত সেটাই পাওনা জ্ঞানে নিতেন। কোনও দিন জোর করা তো দূর দাবিও সেভাবে করতেন না। আমার মা তো বলতেন, লাঙল যার, জমি তার।

আমার দাদু ছিলেন বেঙ্গল কোলের সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার। বাবা কাকারা সবাই চাকরি করে পরিবার প্রতিপালন থেকে যৎসামান্য দানধ্যান সমাজসেবা করেছেন। চাষের চাল আলু হয়তো এক সময় কাকাদের খানিক সুরাহা করত। সেও এমন সুরাহা যে শেষে বেচে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে হল। ও, বলতে ভূলে গেছি, দাদু গান্ধীর ডাকা ভারত ছাড়ো আন্দোলনে পথে নেমে পুলিশের মার থেকে জেলের হাওয়া পর্যন্ত খেয়েছেন। একবার এক সাহেবকে 'ব্লাডি ইন্ডিয়ান'  বলে অন্য কাউকে বকতে দেখে ঝাঁপিয়ে উঠে তার কলার ধরে চড় মেরে বছর খানেক পালিয়ে বেঁচেছিলেন। কিন্তু আমার দাদু ঠাকুমাকে ফ্রীডম ফাইটার কার্ড রেলের পাস ইত্যাদি যেসব সুবিধা সরকার দিত বা দেয়, তার কোনোটাই পেতে দেখিনি। স্বাধীনতা সংগ্রাম করলে যে বিশেষ খাতির মেলে সেটাই জানতাম না। বড় হয়ে শুনেছি পিসির কাছে সেই না নেওয়ার গল্প। 

আমার ঠাকুমার বাপের বাড়ি পঞ্চকোট মহারাজের কাছ থেকে বিশাল জমিদারি পাওয়া পরিবার। তাঁরাই বা জমিদারি নিয়ে কী করেছেন? আমাদের ডিশেরগড় অঞ্চলের তিনটে স্কুল, বাজার ইত্যাদির জমি থেকে বরাকর পর্যন্ত প্রায় ৬-৭ কিলোমিটার লম্বা, আর চওড়া কত বলতে পারব না, জমি দান করেছেন। ওখানকার রায়সাহেব যাঁর আসল পদবী মণ্ডল, তাঁকে মানুষ করেছেন সাঁকতোড়িয়া গ্রামের মাহাতা পরিবার। মাহাতা টাইটেল, আসলে মুখার্জী। সম্ভবত বাবার দাদামশায়ের বাবা বা তাঁর বাবা নিজের বাড়িতে রেখে গরীব ছেলেকে মানুষ করেছেন। তখন তো রায়সাহেব হননি, তবে হয়ে মাহাতা পরিবারকে নাকি অ্যাকমলেজ করতেন। আমি তখন জন্মাইনি, সব শোনা কথা। আর সেই মুখুজ্জে বা মাহাতা জমিদার মশাইরা প্রায় সব ভাইয়েরাই নিজের ছেলে মেয়েদের পড়াশুনো শিখিয়ে মাস্টার, ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তার বা সাধারণ চাকুরিজীবী বা নিদেনপক্ষে শিক্ষিত গৃহবধু ইত্যাদি বানিয়েছেন। গরীবের জমি ছিনিয়ে নেওয়া তো দূর, উল্টে দানই করেছেন। আমাদের বাড়ির গেট বড় রাস্তায় হলেও বাড়ির দরজা বেশ ভেতরে। গেটের সামনে রাস্তার একেবারে ওপরেই জমি জুড়ে থাকে কয়েক ঘর বাউরী পরিবার। তাদের কয়েকজনের ঝাঁচকচক দোতলা তিনতলা বাড়ি। আমাদের বাড়িটাই পরিচর্যার অভাবে পোড়োবাড়ি মনে হয়।"

পরবর্তী প্রশ্ন ছিল, তাহলে গরীবদের পদদলিত করছে কারা? উচ্চবর্ণের মানুষ নাকি তফশীলি ও দলিত তকমার দাবিদার শ্রেণীরই কিছু মানুষ? মানে দলিত কারা?” 

এই প্রশ্নটা করায় তিনি জানালেন, "আমি আমার পরিবারের কথা বললাম। ব্যাপারটা সব বর্ণহিন্দুর বেলা এক নয়, পরিবার টু পরিবার মানুষে মানুষে ভ্যারি করে। আমাদের এলাকারই জশাইডি গাঁয়েই বাঘে গোরুতে এক ঘাটে জল পান করাতে সক্ষম এক মুখুজ্জে পরিবার আছে। সাদার কালো সবরকম ব্যবসা মিলিয়ে ওরাই আসলে এলাকার জমিদার কাম ডন। কিন্তু মোটের ওপর আমি বামুনদের আমি নিতে কম ও দিতেই বেশি দেখেছি। যেখানে তথাকথিত তফশিলী ও দলিত তকমাধারীরা সূচ্যগ্র মেদিনী ছাড়ার পক্ষপাতী নয়।

“দেখুন শিক্ষার অভাবে অনেকে তথাকথিত নিম্নবর্ণই একদা সত্যিই শোষিত হয়েছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীদের জাত সচেতনতা একমাত্র প্রতিফলিত হয় পাত্র চাই পাত্রী চাই কলামে। নাহলে যে হারে আমরা বেড়াতে যাই, সোশালাইজ় করি, তাতে সবার হাতেই খাই, সবার পাশেই বসি। কিন্তু শুধু ব্রাহ্মণ বলে আমাদের পরিচয় হয়ে গেছে উৎপীড়ক শোষক শ্রেণী। মানে মহেশ  গল্পের জমিদারের মতো। নিম্নবর্ণ মানে তথাকথিত নিম্নবর্ণ বা শিডিউলড কাস্ট বা ট্রাইব যারা তারা অনেক সুসংগঠিত। তারা নামে দলিত কিন্তু বাস্তবে সুবিধাভোগী। বলা হচ্ছে শোষিত, কিন্তু ভূমিকা আসলে শোষকের। 

প্রসঙ্গত বামপন্থীরা যতই মনুবাদসে আজাদী চাক, আর দলিত ও ওবিসি করে গলা ফাটাক, এরা কিন্তু বামচেতনা দ্বারা আদৌ প্রভাবিত হতে চায় না। তাদের হিসেব খুব সহজ, এতদিন উচ্চবর্ণের লেকেরাই সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করেছে, এবার সেই জায়গাটা দলিত জাতের কেউ ছিনিয়ে নেবে। একজন রাষ্ট্রপতিতে তারা সন্তুষ্ট নয়। মানে সোজাসুজি কাস্ট ওয়ার। আজকের অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের গলায় কিন্তু সেই ওয়ার ক্রাইটাই শুনেছি।"

 

বাস্তবিকই দলিত কথাটা ভারতীয় রাজনীতিতে নিছক সুবিধাভোগী জাতি-বাচক পদ, দলিত নেতারা আদৌ দলিত নয়। তাদের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি থাকে, যেটা তারা কামিয়ে করে নেয় মনুবাদের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান আউড়ে।

প্রশ্ন করলাম, ব্রাহ্মণ্যবাদ ও মনুবাদ কি আপনি সমর্থন করেন? এগুলো নিয়ে আপনার কী ধারণা?”

লেখিকা বললেন, “ব্রাহ্মণ্যবাদ ও মনুবাদ আধুনিক সমাজে এমনিতেই অচল হয়ে গেছে। কিছু কিছু পকেটে প্রপার্টির জন্য অ্যান্ড ইন ফর্ম অফ সেক্সুয়াল রাদার সেক্সিস্ট ভায়োলেন্স রূপে প্রকট হয়। এগুলো সমর্থন করলে আজ আমি নারী হিসাবে এই জায়গায় আসতেই পারতাম না। এখন শুধু মনুসংহিতা নয়, অন্যান্য স্মৃতিশাস্ত্রগুলোও লিঙ্গবৈষম্য থেকে জাতিবৈষম্যের ঠিক জনক না হলেও অন্যতম পৃষ্টপোষক। সুতরাঅং ধরে নেওয়া যেতেই পারে, ব্রাহ্মণ্যবাদ জাত ভেদাভেদের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু সেটা তো ছিল বর্ণাশ্রম। সেই বর্ণভেদ অনুযায়ী সমাজে ছিল চারটি মাত্র বর্ণ — ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। এখন জাতিভেদ যদি ব্রাহ্মণ্যবাদের কুপ্রভাব হয়, তাহলে তথাকথিত দলিত সমাজে ৬০০০ তফশিলি জাত তৈরি হল কী করে? আর তাদের মধ্যে তফশিলি উপজাতি না জাতি নাকি ওবিসি নিয়ে এত বিবাদই বা কীসের?

মণিপুর অশান্ত কীসের জন্য? তফশিলি জাতি জনজাতি রূপে জমি ও চাকরিতে সংরক্ষণ পাওয়ার জন্য বিবাদের জেরেই তো। মণিপুরের পাহাড়ি জমি পুরো কবজা করে বসে আছে কুকিরা যাদের মধ্যে মিশে আছে আরাকানীরাও। এরা অধিকাংশত খ্রিস্টান ও কিছু মুসলিম হয়েও তফশিলি জনজাতি হিসাবে স্বীকৃত এবং বিশাল সম্পত্তির মালিক গোষ্ঠীপতি জমিদার বা জনজাতি রাজা হলেও সংরক্ষণে অগ্রাধিকার লাভের দাবিদার। আর মৈতৈরা বেচারা হিন্দু বৈষ্ণব বলে তাদের সমতলের সামান্য জমিটুকুতেও খাবলা বসে যাচ্ছে। তাই তারাও জনজাতি হিসাবে সংরক্ষণ দাবি করেছে বলেই তো আগুন লেগে গেছে। প্রসঙ্গত যারা পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে মণিপুরের সমতুল্যতা খুঁজে পেয়ে তর্ক করে, তারা হয় একেবারেই অজ্ঞ কিংবা মস্ত শয়তান। 

যাইহোক কথা হচ্ছিল ব্রাহ্মণরা কী অন্যায় করেছে, আর দলিতরা কেন দলিত। দেখুন অস্বীকার করার জায়গা নেই, গোবলয়, পশ্চিম ভারত ও দাক্ষিণাত্যে জাতপাতের বিভেদ সত্যিই আছে। রীতিমতো কাস্ট ভায়োলেন্স — জাতের নামে চরম উৎপীড়ন করার ঘটনার খবরগুলো মিথ্যে নয়। কিন্তু বাংলার সমাজে এর প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু? আমাদের সমাজে কি আদৌ এখন জাতদেদ আছে একমাত্র বৈবাহিক সম্বন্ধে প্রেফারেন্স ছাড়া? কিন্তু জাতভিত্তিক সংরক্ষণ আইন সারা ভারতেই প্রযোজ্য, যেটা পশ্চিমবঙ্গে আরও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। ওবিসি-এ ক্যাটিগোরি তৈরি করে প্রকৃত ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসকে বঞ্চিত করে একটি সম্প্রদায়কে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে যাদের মধ্যে বেশ ধনী পরিবারের ছেলেরাও সুবিধা নিচ্ছে।

লেখিকা জানালেন, "কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের UG বিভাগে একবার গিয়েছিলাম। আধিকারিক ভদ্রলোক একজন সাঁওতাল, নামটা মনে পড়ছে না। নিজের সেই বছর মানে ২০২৪-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা গ্রন্থ দিয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবীবিদ্যা বিভাগে রাখা বা আলোচনা করা যায় কিনা বিবেচনার জন্য। কথা বলতে বলতে ঘরে হঠাৎ প্রায় জনা পঁচিশ পুরুষ ঢুকল, অলমোস্ট যেন মিছিল করে। কথাবার্তায় বুঝতে পারলাম, আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদে তারা শামিল হয়েছে।

আধিকারিক ভদ্রলোক আমাকে বললেন, 'জানেন আদিবাসীদের সঙ্গে কত অন্যায় হচ্ছে?’ বললাম, ‘একই পরিবার বংশপরম্পরায় সুবিধা পায়, আর বহু প্রান্তিক পরিবার একবারও পায় না। এই কথা বলছেন?’ কথাটা একেবারে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘সেটা কোনও ব্যাপার না। আজকাল জেনারেল ছেলেমেয়েরাও ফলস কাস্ট সার্টিফিকেট বানিয়ে সরকারি চাকরিতে ঢূকে পড়ছে। ধরুন আপনি ব্যানার্জী কিন্তু নাম বদলে করে নিলেন হাঁসদা।' বললাম, ‘আসলে আইনটা আছে বলে মাঝেমাঝে আইনের অপব্যবহার হয়।’ এই উত্তরটা আরোই পছন্দ হল না। আমাকে আদিবাসী সমাজের ওপর বই লিখতে বললেন। আমি হুদুর দুর্গার ব্যাপারটা এড়িয়ে গিয়ে বললাম, অসুর জনজাতির সহজাত মেটালার্জিক্যাল জ্ঞান নিয়ে লিখতে পারি। মনে হল না প্রস্তাবটা তাদের এজেন্ডার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বা মনঃপূত হল না।  আর যখন বললাম, ‘আমি তো নিজেকে আদিবাসীদের চেয়ে আলাদা মনে লরি না। আমরাও আদ্যি কাল থেকে আছে। খাঁটি আর্য রক্ত কি আমার শরীরেও আছে, বাঙালীরা তো আর্য-অনার্যের মিলনেই তৈরি বলে মনে করেন অনেক নৃতাত্ত্বিক। গায়ের রং মুখের গড়ন-- কতটুকু তফাত? মিলেমিশেই তো আছি, মিলেমিশেই থাকব।‘ এই কথাটাই মনে হল ওদের সবচেয়ে অপছন্বদ হল। এককথায় নিজেরা যে সুবিধাভোগী নিশ বা সংকীর্ণ গোষ্ঠী তৈরি করেছে, তাদের কায়েমি স্বার্থ বিঘ্নিত হয়, এমন কিছুকে তারা মেনে নেবে না; সেটা সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য হলেও না। যাইহোক, কয়েকবার ভদ্রলোককে ফোন করে যে আপডেট পেয়েছি, তা হল আমার বইটি তিনি এখনও যথাস্থানে পেশ করতে পারেননি।

হিন্দু সমাজের সংস্কার তো বহুবার হয়েছে। এই বাংলাই তার পীঠস্থান। তাহলে সমস্যাটা কোথঅয়?

 লেখিকা বললেন, "আমি এতদিন লক্ষ্য করেছিলাম হিন্দু সমাজের সংস্কারক হিসাবে রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের প্রতি কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের মনোভাব বেশ বিরূপ। কারণ তাঁরা সনাতন হিন্দুধর্মের সব শাস্ত্র যে নারীনির্যাতনের পক্ষে ছিল না, সেটা  চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে মেয়েদের বাঁচা ও শিক্ষালাভের পথ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আজকে নিয়ে দু'টি তথাকথিত পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর সভায় উপস্থিত থেকে দেখলাম, দিদিপন্থী বা মোদীপন্থী মতুয়া হোক অথবা বহেনজীপন্থী দলিত, সংরক্ষণ ও সুবিধাভোগী এই লোকগুলো ভারতের প্রথম আধুনিক মানুষ বলে ইতিহাসখ্যাত রামমোহন রায় এবং বিদ্যা ও দয়ার সাগর ঈশ্বরচন্দ্রের প্রতি আরও অনেক বেশি বিদ্বেষপ্রবণ। কারণ এঁরা ছিলেন ব্রাহ্মণ। 

বিজেপি-র মতুয়া গোষ্ঠীর এক তালেবর একটি নামকরা বাংলা কাগজের সম্পাদকমণ্ডলীতে আছে, এক অনুষ্ঠানে আমি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম উচ্চারণ করায় "আনন্দবাজারীয় মাকু" বলে সবার সামনেই আমাকে আক্রমণ করে। তখন ভেবেছিলাম মনে হয় বিধবাবিবাহ স্ত্রীশিক্ষার মতো ব্যাপারগুলো তার পথভ্রষ্ট হিন্দুত্বে বেধেছে। কিন্তু আজকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পেয়ে বহুজন সমাজ পার্টির সভায় বাঙালী সমাজে অস্তিত্বহীন মনুবাদের বিরুদ্ধে বজ্রনির্ঘোষ শুনে আমার বর আমাকে টিপে দিলেন, 'তোমাকে বলতে ডাকলে খবরদার রামমোহন বিদ্যাসাগরের নাম উচ্চারণও কোরো না এখানে।'

আমাদের মঞ্চে তোলার তোড়জোড় চলছে। যে ভদ্রলোক ডেকেছিলেন, তিনি মঞ্চে উঠে নিজের মার্জিত বক্তৃতা রাখতেই হাততালি দিয়ে ও হাত নেড়ে তখন মানে মানে পালিয়ে এলাম। ভদ্রলোক দেখতে পেয়ে ছুটে এলেন। অনেক অনুরোধ করলেন দু মিনিটের মধ্যেই মঞ্চে ডেকে পরিচয় জানিয়ে বরণ করে নেবেন সুপরিচিত দলিত পার্টির সর্বভারতীয় সমন্বয়কের সামনে। সেটা যে আনুষ্ঠানিক ভাবে আমাদের দলের সদস্য করা সেটা বূঝতে অসুবিধা হল না। আমরা তাঁকে যোগাযোগ রাখব বলে জোর করে চলে এলাম। তেমন বুদ্ধিমতী হলে হয়তো সংবাদ শিরোনাম হওয়ার সুযোগ হারাতাম না। কিন্তু বাংলার সমাজে যখন জাতপাতের বিভাজন নেই, সেখানে এমন বিভাজনকামী একটি দলে প্রবেশ করে জনহিতে কাজ করার সুযোগের আশা করি কী করে? কয়েকটি গান ও সঞ্চালকের বক্তৃতা শুনে মনে হল, আমার পদবীর কারণে ওরা আমাকে জাতশত্রু রূপেই দেখবে? 

দেখুন, মতুয়ারা হরিনামে মাতোয়ারা বলেই তো মতুয়া। তা হরিনাম দ্বারা সমগ্র হিন্দু সমাজকে প্রথম জাতপাত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ করে ধর্মান্তরণের হাত রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন শ্রী চৈতন্যদেব। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণ। অথচ সেই হরিনাম আমাদের এক করে রাখতে পারল না, একটা বিভাজন থেকেই গেল। ধর্মগুরুরা মোস্টলি আপার কাস্ট। হয়তো সেই কারণেই অন্তজদের জন্য পৃথক হরি উপাসক সম্প্রদায় তৈরি করলেন সম্মানীয় হরিচাঁদ ঠাকুর ও ব্যপ্তি ঘটান গুরুচাঁদ ঠাকুর। অন্তজ বিশেষত চণ্ডালদের পরিচয় দিলেন নমঃশূদ্র রূপে। হয়তো সমাজে তখনও জাতিভেদ প্রকট ছিশ বলেই এই সংস্কার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু তাতে এখন মনে হচ্ছে, বাঙালী হিন্দু সমাজে পাকাপাকি পাকাপাকি একটা বিভাজন রেখা তৈরি হয়ে গেছে। এখন তো এদের মধ্যেও রাজনৈতিক বিভাজন দেখেছি— কেউ ঘাসফুল কেউ পদ্মফুল। তাদের মধ্যে তৃণমূলের মমতাবালা ঠাকুর তো মতুয়াদের হিন্দু মনেই করেন না, অথচ বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত নির্যতিত হিন্দু হিসাবেই তিনি ভারতীয় নাগরিকত্বের দাবিদার। দেখলাম গুরুচন্দ্র ভক্ত সবুজ বা গেরুয়া দলেরই হোক বা দ্বিতীয় পাণ্ডবের নামে জয়ধ্বনি দেওয়া সরাসরি দলিত পলিটিক্স করা গজারোহী বাহিনীর, তথা কথিত দলিতরা মন থেকে কখনোই সাধারণ জাতের অসংরক্ষিত ভারতীয় জনসাধারণকে মেনে নিতে পারে না। ব্রাহ্মণরা বুজে জড়িয়ে এক পংক্তিতে খেতে ও খাওয়াতে রাজি। কিন্তু ওরা ঘৃণা বিদ্বেষ ত্যাগ করতে রাজি নয়। সবর্ণরা দু’ হাত বাড়িয়ে ডাকলেও ওরা এক পাও এগিয়ে আসতে নারাজ। শুধু যোগ্যতার পরীক্ষার উত্তীর্ণ না হয়েও রাজদণ্ডের লালসা। ওদের লক্ষ্য একটাই— ক্ষমতার শিখরে বসা ও জ্ঞাতিগুষ্টিকে বসানো। দ্রৌপদী মুর্মুর রাষ্ট্রপতি হওয়া তাদের ক্ষুধার আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছে মাত্র। সত্যিই যারা দলিত ছিল, সেই কার্মাটারের সাঁওতালরা একসময় বিদ্যাসাগরের সেবা ও সাহায্যে অভিভূত ছিল। বাবাসাহেব আম্বেদকরকে এক মারাঠী ব্রাহ্মণই নিজেদের পদবী পরিচয় দিয়ে পড়াশুনো শিখিয়ে বিলেত পাঠিয়ে শেষ পর্যন্ত ভারতীয় রাজনীতির একটি কঠিন স্তম্ভে পরিণত করেছিলেন।

ভালো করে ভেবে দেখুন, দলিত বা পিছিয়ে পড়া হোক বা জনজাতি সমাজ— তাদের সত্যিকারের ভালোর জন্য তথাকথিত উচ্চবর্ণের হিন্দুরাই প্রাণপাত করেছেন।"

শেষ প্রশ্ন, রাজনীতিতে আসার পরিকল্পনা বা ইচ্ছা আছে?

"ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই। রাজনীতি করার মানসিক গড়ন আমার নেই। দেখুন, মানুষকে তার ন্যায্য নাগরি্কযা অধিকার পাইয়ে দেওয়া, নারী শিশু ও নিরাপরাধ পুরুষদের নিরাপত্তা দেওয়া, জীবিকার ব্যবস্থা করা, স্বাস্থ্য  পরিষেবা  দেওয়া, শিক্ষা, শিল্প সবেতে সংস্কার সাধন -- এগুলো মানে সমাজের সামগ্রিক সেবা সফলভাবে করা যায় রাজনৈতিক ক্ষমতা হাতে থাকলে। কিন্তু বিশুদ্ধ সমাজসেবা করার মানসিকতা নিয়ে বর্তমান রাজনীতিতে টিকে থাকা যায় না। অন্তত আমার অভিজ্ঞতা তাই বলে।"

 

দর্পণা রায়

২৪-০৪-২০২৬




 

Post a Comment

Previous Post Next Post