ও চাঁদ - সামলে রেখো বাংলাকে
অরিজিৎ ঘোষ
কথা মুখ:
বাঙালি জীবনে চাঁদ গানে, গল্পে, কবিতায়, গ্রন্থে, কপালে, প্রেমে-
অপ্রেমে, দোলে, পূজায়, স্বামীর কল্যাণে নানা ভাবে জড়িয়ে আছে। তবে কখনো এক
চাঁদের প্রভাব থাকে তো সময়ের স্রোতে অন্য চাঁদ এসে সেখানে বসে। কিন্তু বাঙালি
মননে যে চাঁদ এখনো দেদীপ্যমান এবং পৃথিবীর শেষ বাঙালি অস্তাচলে গেলেও যে চাঁদ
এভাবে থাকবে সেই চাঁদ হল সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, অভিনেতা, নাট্যকার, চিকিত্সক, চিত্রশিল্পী, গায়ক, বাদক, প্রকাশক, স্বাধীনতা
সংগ্রামী, প্রকৃতি- পশু-
পাখিপ্রেমী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
এই অবধি পড়ে যে সুধী পাঠক পাতা পরিবর্তন
করে সাহিত্যরসে সমৃদ্ধ অন্য পাতায় যাবেন এবং মনে মনে ভাবতে পারেন “আবার সেই শরৎচন্দ্র! ছোট বয়স থেকে পড়ে এত বড়
হলাম, আবার তার কথা এই আধুনিক, সুন্দর পত্রিকায় পড়বো! না থাক, সেইতো দেবদাস, মহেশ, রামের সুমতি, শ্রীকান্ত, বিন্দুর ছেলে, পথের দাবী- এই সবইতো থাকবে! আর শরৎচন্দ্র
সম্পর্কে জানিনা এমন কোনও ঘটনা আছে নাকি?”- তাঁর সাথে সহমত হয়ে জানাই, সমাজের আয়না হিসেবে থাকা সেইসব
লেখা ও চরিত্র ছাড়া সত্যই শরৎবাবুকে নিয়ে আলোচনা হয়না ঠিক। তবে আপনি যদি ইন্দ্রর মতো স্বাধীন
হতে চান, সব্যসাচীর মতো প্রতিবাদী হওয়ার
ইচ্ছা থাকে, যদি আপনি নারী হন অথবা নারী নাও হন
কিন্তু নারীর সামাজিক ও পারিবারিক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং শ্রদ্ধাশীল হন, আপনি যদি পূর্ণাঙ্গ সমাজ সচেতক হন
তাহলে অনুরোধ জানাই এ লেখা না হোক আপনি আরো একবার শরৎসাহিত্য পড়ুন। যাহার অমর স্থান প্রেমের আসনে।/ ক্ষতি
তার ক্ষতি নয় মৃত্যুর শাসনে- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বীকারোক্তি:
‘শশী’র অস্তাচলে যাওয়ার পর ‘রবি’র এ লেখাই বুঝিয়ে দেয় সাহিত্যের
আকাশে থাকা ‘চন্দ্র’ শুধু এক জীবন ঋতুর ‘শরৎ’ নয়, তিনি আজীবন উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, সত্যিই অপরাজেয় কথাশিল্পী। উল্লেখ করা
যেতেই পারে তিনি ছিলেন গণ মানুষ, পল্লী ও
প্রান্তিক সমাজ, নারীদের
মর্যাদা অধিকার দাবীর, ছোঁয়া ছুঁয়ি, জাতপাত বিরোধী, ইংরাজ শাসক
বিরোধী, রাজনীতি সচেতন, প্রেমকে
সমাজের শেকল ভেঙে শ্রদ্ধা শেখানোর সাহিত্যিক। সমাজের বঞ্চিত, নিগৃহীত, দুর্বল, নিরুপায় মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন। “উপন্যাস লেখার
ক্ষেত্রে মরালিস্ট বা উপদেষ্টা না হয়ে দোষে গুণে মানুষ যা, সেই ভাবেই তার
কথা লেখা উচিত” এই ভাবনা
থেকেই তিনি লিখতেন। বলতে পেরেছিলেন “সংসারে
যারা শুধু দিলে, পেলে না কিছু, এদের
কাছেও কি ঋণ আমার কম? এদের বেদনাই
দিলে আমার মুখ খুলে, এরাই পাঠালে
আমাকে মানুষের কাছে মানুষের নালিশ জানাতে।”
শরৎচন্দ্রের এই ‘জীবন বিক্ষা’ (attitude to life) কে মনে রেখে তাঁকে নিয়ে আলোচনা
করলে কেন তিনি জন্মের
(৩১শে ভাদ্র, ১২৮৩ বঙ্গাব্দ; ১৫ই
সেপ্টেম্বর, ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার)
সার্ধশতবর্ষ (২০২৫) এবং মৃত্যুর ৮৮ বছর (২রা মাঘ, ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ; ১৬ই জানুয়ারি, ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার) পার করেও ভীষণ
ভাবে প্রাসঙ্গিক, আলোচিত (হয়তো
এখনো কিছু ক্ষেত্রে সমালোচিতও) তা বোঝা সহজ হবে। আধুনিক কালে তাঁর লেখাকে Gender politics, Subaltern studies, Psychological realism এসব নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হচ্ছে। শরৎচন্দ্রের
লেখায় আবেগের এমন ছোঁয়া আছে যা খুব সহজেই মন ছুঁয়ে যায়। বিশেষ চমকসৃষ্টি না করে, কল্পনার আশ্রয় না নিয়ে বা ইতিহাস
চর্চার সাহিত্য না লিখেও যে জনপ্রিয়তা পাওয়া যায় তা প্রথম তিনিই করে দেখান। এসব কারণেই ‘বামুন দাদা’ তাঁর সময় থেকে এখনও পর্যন্ত
সমানভাবে বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন বয়সীদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন।
তাঁর
সৃষ্টি এতটাই জনপ্রিয় যে হিন্দী, মারাঠি, গুজরাটি, তামিল সহ একাধিক ভারতীয় ভাষা, অন্যদিকে ইংরেজি, উর্দু, বার্মিজ, ফরাসি, রুশ সহ বিভিন্ন বৈদেশিক ভাষাতে অনুদিত হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকগুলিই যেমন তাঁর
জীবিতকালে অনুদিত হয়েছে, মৃত্যুর অনেক পরেও বেশকিছু লেখার অনুবাদ হয়েছে। যেমন ১৯২০তে হিন্দিতে দেবদাস অনুবাদ করা
হয়েছিল, আবার ৭০ দশকের প্রথম দিকে রুশ ভাষাতেও অনুবাদ হয়। বিভিন্ন ভাষায় সবচেয়ে বেশি অনুদিত হয়েছে দেবদাস, এছাড়াও শ্রীকান্ত, চরিত্রহীন, পরিণীতা, পথের দাবী সহ একাধিক উপন্যাস, ছোট গল্প এই তালিকায় আছে। তাঁর অমর সৃষ্টিগুলি নিয়ে অনেক
বছর আগে থেকে এখনও অবধি সিনেমা, নাটক এবং টেলিভিশনের ধারাবাহিক তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে এবং হবেও। বই পাড়াতে খবর নিলে জানা যাবে এখনো
তাঁর বই বিক্রিতে ভাঁটা পড়েনি। একজন
সাহিত্যিকের মৃত্যুর এত বছর পরেও এমন জনপ্রিয়তা তার প্রতিভাকেই স্বীকৃতি দেয়। এসব
কারণে বলাই যায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শরৎচন্দ্রের গুরুত্ব অপরিসীম। আর এই কারনেই আপনি ফেলে আসা ছাত্র
জীবনে বেশ কিছু শরৎ সাহিত্য উপহার পেয়েছেন, বুক শেল্ফে আরো কিছু আছে।
খুব সহজে কারোর মন বোঝা সহজ নয়, তার ওপর সে মন যদি একটা বৃহত্তর জাতির হয়! বাঙালির মন বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। বাঙালি কি তাকে বুঝতে পেরেছে? পুরোটা? বোঝার জন্য চেষ্টা কি জারি রেখেছে? শুধু পাঠ্যসূচিতে নয়, চেনা সেই বৃত্তের বাইরে? একটা বাস্তব উদাহরণ দিই গত বছর ডিসেম্বর মাসে আমার বাড়ির পাশের শহরের বইমেলাতে গিয়েছিলাম, উদ্দেশ্য ছিল ঐদিন সভাঘরে আলোচনার বিষয় ‘নারীর মর্যাদায় ও চলচ্চিত্রে শরৎচন্দ্রের ভূমিকা’তে শ্রোতা হিসেবে থাকা। এমনিতেই জন্মস্থান হিসেবে একই জেলার বলে আলাদা টান তো আছেই, এছাড়াও যেসব সাহিত্যিকদের প্রভাব আমার জীবনে আছে তাদের মধ্যে শরৎচন্দ্র অন্যতম। শৈশবে লালু হয়ে নিজের বাড়ির গাছ থেকে ডাব, আম, ফুল চুরি করেছি; শ্রীকান্ত হবার ইচ্ছা মনে পুষে রেখেছি- হয়তো কোনও ইন্দ্রনাথ ছিলনা তাই, তবে বেনারসে গিয়ে রাজলক্ষীকে খুঁজেছি। ইচ্ছা আছে এই বাংলার ‘লোয়ার পোজুন ডাঙ’ এ বসে জীবন চর্চা করি, আমার জীবনে দেখা অন্নদাদিদি, কিরণময়ী, কমলদের কথা লেখার খুব ইচ্ছা হয়। মনে পড়ে যায় আমার জীবনের ‘রমা’র কথা- যাকে পেলাম না বলে “যাকে তাকে গছিয়ে দেওয়ার নামই বিবাহ নয়! মনের মিল না হলে বিবাহ করাই ভুল” এ আমার জীবনের আপ্তবাক্য করে নিয়েছি, হুমম দেবদাস হইনি। হয়তো আমার জীবনেও কোনো কমললতা ছিল। আমিও যৌথ পরিবারে বেড়ে উঠেছি- জেঠুর কড়া নজরদারিতে পড়তে বসে ভাবতাম আমার জীবনে কেন ‘ছিনাথ’ বহুরূপী আসেনা, মায়ের পোষ্য ‘নেলো’কে নিয়ে আমার ছুঁড়ে দেওয়া রাবারের বল আনিয়েছি। বেণী ঘোষালের মতো অশিক্ষিত জমিদার না হলেও ‘নেতা’ সে তো আপনারও দেখেন।
শরৎচন্দ্রের সাহিত্যে যেভাবে বিধবা বা স্বামী পরিক্তত্যাদের ভাবনা বহুবার এসেছে এই ২০২৬এ আমার কি তার বাইরে বের হয়েছি? “বিধবার বৈধব্য জীবনের জয় বাদ্য নয়, আনন্দলোকের বিসর্জনের বাজনা” এ কথার সারমর্ম থেকে কী সমাজ নতুন কিছু ভাবছে? যারা অভয়া আর রোহিণীর মতো জীবন যাপন করছেন তাঁদের আমরা কী সমালোচনা করি না? আমার এই প্রাক পঞ্চাশের জীবনে এনাদের নানা নামে, নানারূপে দেখেছি। এটা ঠিক, বহু চরিত্রই এখনো বাস্তবে দেখিনি কিন্তু মনে করি নতুন শতাব্দী রজত জয়ন্তী পার করলেও শরৎচন্দ্রের লেখা ‘সব চরিত্রই কাল্পনিক’ নয়। স্বীকার করি এভাবেই তিনি আমার জীবনে আছেন, এটাও স্বীকার করি তাঁর সাহিত্যের আরো কিছু চরিত্র গোপনে আমার জীবনে আছে- কেউ যদি তার মনের পৃষ্ঠা খোলা রাখেন, কখনো কোনো অবকাশে সেই জীবন কাহিনীর আলোচনা সেই পৃষ্ঠায় লিখব।
প্রসঙ্গে ফিরি, বহু আগে থেকেই বইমেলা কর্তৃপক্ষ আমার পরিচিত সেই শহর ও তার আশেপাশে প্রচারের সব মাধ্যমে এই আলোচনার খবর ছড়িয়ে দিয়েছিল। প্রায় ৭০এর ওপর আসন সংখ্যা, খুব বিখ্যাত শরৎ গবেষক আলোচনার জন্য উপস্থিত। উপস্থিত ১১ জন, যাদের মধ্যে একজন সঞ্চালিকা, একজন সভা মুখ্য, একজন আলো ও অন্য একজন শব্দ কর্মী- বাকিরা সাধারণ শ্রোতা যাদের মধ্যে মহিলা তিনজন, এনাদের মধ্যে দুজন বরিষ্ঠ নাগরিক। আলোচনার সময় ছিল বইমেলা অনুসারে ‘প্রাইম টাইমে’- মাঠে ‘বইপ্রেমী’ মানুষের ‘ভিড়ে’ শীতের শীতলতা ম্লান। ঘণ্টা খানেকের আলোচনা পনের মিনিটে শেষ হবার পর বিশেষ ঘোষণায় একঘণ্টা আগে শুরু হল কবি সম্মেলন, ৪৫ জন কবির কবিতা পাঠ শেষে আমার দ্বি- চক্র যানে বাড়ি ফিরতে সময় লেগেছিল মিনিট কুড়ির বদলে প্রায় দেড় ঘণ্টা। সংস্কৃতি ভালোবাসা একটি সংস্থার উদ্যোগে সেদিন বইমেলার মাঠ থেকে অনতিদূরে এসেছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা- অভিনেত্রী ‘জুড়ি’, সেই ‘নাইট শো’র ভিড়ের জন্য প্রশাসনকে বাধ্যতামূলক ভাবেই রাস্তায় যান নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছিল; অতিরিক্ত সংযোজন করি সেই অভিনেতা ‘পরিণীতা’র চরিত্র ছিলেন।
এমনিতেই প্রবন্ধ পড়ার ধৈর্য আমাদের কম থাকে কারণ সেখানে
তত্ত্ব আর তথ্যের জটিলতা থাকে, তার ওপর যদি সবকিছু জানি যে বিষয়ে বা যার সম্পর্কে তাকে নিয়ে আরো একটি
প্রবন্ধ হলে পাঠক কমে যায়। এই
বিশ্লেষণ মূলক প্রবন্ধে আবশ্যিক ভাবে শরৎজীবনী থাকবে, একইসাথে তাঁর সাহিত্য কেন প্রিয় ও কাছের হয়ে উঠেছিল, এখনো কী সেই ভাবনা প্রাসঙ্গিক? অথবা স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর
ভূমিকা কী ছিলো? এসব ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবো। আসুন কিছু সময় নিয়ে 'শেডস অফ লাইফ' এ থাকা ‘আমি’কে দেখি।
দীপের যে
অংশটা শিখা হইয়া লোকের চোখে পড়ে, তাহার জ্বলার ব্যাপারে কেবল সেইটুকুই তাহার সমস্ত
ইতিহাস নহে
ন্যাড়া চাঁদের জীবন পথ:
পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান ‘ন্যাড়া’ র জন্ম ব্রিটিশ ভারতের প্রেসিডেন্সি বিভাগের হুগলির দেবানন্দপুরে, মৃত্যু কোলকাতায়। শেষ জীবনে যকৃতের ক্যান্সার ধরা পড়ে, যা পাকস্থলীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, ১৯৩৭ সালে শরৎচন্দ্র প্রায়শই অসুস্থ থাকতেন। ওনার চিকিত্সক ছিলেন ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, ডাঃ কুমুদশঙ্কর রায়, ১৯৩৮ সালের ১২ জানুয়ারি ডাঃ ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় কথাশিল্পীর অপারেশন করেছিলেন, কিন্তু ১৬ তারিখ সকাল দশটায় এই চাঁদের মানব রূপ চিরতরে গ্রহণে ঢাকা পড়ে। দেবানন্দপুর ছিল মতিলাল বাবুর মামার বাড়ি- আদি বাড়ি ছিল বর্তমান উত্তর চব্বিশ পরগনার কাঁচড়াপাড়ার মামুদপুর গ্রামে। ভুবনমোহিনী দেবীর আদি বাড়ি ছিল একই জেলার হালিশহরে, কিন্তু তাঁর বাবার পরিবার পরে ভাগলপুরে চলে যান- এই ভাগলপুরেই শরৎচন্দ্রের সাহিত্য জীবনের বিকাশের শুরু, এই শহরের প্রভাব তাঁর জীবনেও, সাহিত্যের চরিত্র গুলিতেও। তিনি প্রথমবার ১৮৮৬ সালে মামার বাড়ি যান, এরপর ১৮৮৯ এ দেবানন্দপুরে ফিরে আসা, আবার ভাগলপুরে যাওয়া ১৮৯৪ সালে, আদমপুরের সাহিত্য চর্চা, মায়ের মৃত্যুর বাবার সাথে খঞ্জরপুরে বসবাস, বনেলীরাজ এস্টেটের চাকরি, চাকরি করতে গিয়ে ‘নীরদা’র সংস্পর্শ, এসবের সাথে সাহিত্য চর্চা সব কিছুই চলতে থাকে। বাবার কিছু মুল্যবান পাথর বিক্রির জন্য মনোমালিন্য হওয়াতে চলে গিয়েছিলেন মুজ:ফরপুর। প্রথমে সন্ন্যাসী জীবন, গান শোনানোর জন্য চাকরি জীবন শুরু করেছিলেন।এখানেই পেয়েছিলেন তাঁর ‘কুমার সাহেব’ মহাদেব সাহুকে, যেভাবে বন্ধু রাজেন্দ্রনাথ মজুমদারকে সাজিয়েছিলেন ইন্দ্র রূপে। হয়তো পিয়ারী বাঈ, বিজলি বাঈ দের সাথেও পরিচয় হয়েছিল। বাবা মারা যাবার খব পেয়ে ফিরে আসেন ভাগলপুর, কিছুদিন থেকে কোলকাতা বাস। এরপর ১৯০৩ সালে ভাগ্যান্বেষণে তিনি রেঙ্গুন চলে যান, প্রথমে থাকতেন মাসী অন্নপূর্ণা দেবীর বাড়ি, পরবর্তী নানা সময়ে নানা কারণে বাস ও বাসা বদল করতে হয়েছে শরৎবাবুকে, বদল হয়েছিল চাকরি জীবনের। তাঁর দুটি বিয়েই হয়েছিল বার্মাতে। ১৯১৬ সালের ১৬ই এপ্রিল বর্মা মুলুক ত্যাগ করেন। এত বৈচিত্র আর কোনো সাহিত্যিকের জীবনে নেই, এই কারণেই হয়তো সমালোচক দেবীপদ ভট্টাচার্য লিখেছিলেন “... আগমন বিজয়ীর বেশে, শুধু সাহিত্য সেবার দ্বারা জীবনে যশ ও অর্থ তিনিই প্রথম লাভ করেন...”।
ছাত্রবৃত্তি, ডাবল প্রমোশন পাওয়া মেধাবী পড়ুয়া শরৎচন্দ্র তাঁর ছাত্র জীবন শেষ করতে পারেননি মূলত টাকার অভাবে, এফ. এ. পরীক্ষার ফি যোগাড় করা তাঁর সম্ভব হয়নি। প্রথমে দেবানন্দপুরের ‘প্যারী পণ্ডিত’ এর পাঠশালা, সিদ্ধেশ্বর ভট্টাচার্যের বাংলা স্কুল, এরপর ভাগলপুরের দুর্গাচরন এম. ই. স্কুল ১৮৮৭ সালে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় পাশ করে, প্রথম বছর বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান তো পায়ই, পেয়ে যায় একেবারে ডাবল প্রোমোশন। ভর্তি হন ভাগলপুর জেলা স্কুল, ১৮৮৯ সালে ফিরে আসেন দেবানন্দপুরে- ভর্তি হন হুগলী ব্রাঞ্চ স্কুল। ১৮৯২ সালে সে স্কুলও ছাড়তে হয় কারণ ফি দিতে পারেননি। ১৮৯৪এ আবারো ভাগলপুরে ফিরে এসে তেজনারায়ণ জুবিলি কলেজ ভর্তি হন কিন্তু পরীক্ষা দিতে না পারার জন্য তাঁর প্রথাগত শিক্ষা জীবন শেষ হয়। কিন্তু সেই তিনিই ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী স্বর্ণ পদক, ১৯৩৬ এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ‘ডি লিট’ উপাধি পান, প্রঙ্গগত সেই সময়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার এফ.এ.রহমান আয়োজিত সেই বিশেষ কনভোকেশনে ‘ডি লিট’ প্রাপ্তির জন্য আমন্ত্রিত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যদুনাথ সরকার; এছাড়াও জগদীশচন্দ্র বসু ও প্রফুল্লচন্দ্র রায় সম্মানসূচক 'ডি এসসি' উপাধি গ্রহণের জন্য আমন্ত্রিত ছিলেন, তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসুস্থতার কারণে উপস্থিত হতে পারেননি। অন্য সবাই সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরাধীন দেশে আঞ্চলিক ভাষায় সাহিত্য রচনা করে শতকরা মাত্র দশভাগ সাক্ষরের দেশে হাওড়া ও কলকাতায় তিনটি বাড়ি ছিল তাঁর, ছিল গাড়ি। এই অর্জনও অভাবিত নয় কী!
“মানুষ তো দেবতা নয়
সে যে মানুষ! তার দেহ দোষে গুণে জড়ানো”
পটভূমি:
বাংলা গদ্যসাহিত্য
তদানীন্তন সময় বা তার আগে দুটো ধারায় জনপ্রিয় ছিল- এক উপন্যাস ও দুই
ছোট গল্প। বলা যায় উপন্যাস সাহিত্যের তখন ঐশ্বর্য পর্ব। উপন্যাসের দিক থেকে
সম্রাট ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, অন্যদিকে সাহিত্য
জগতে মধ্য গগনে ‘রবি’। শরৎচন্দ্র মানবিকতার দিক থেকে যুগান্তকারী, রবীন্দ্রনাথ দার্শনিক ও রূপকধর্মী, বঙ্কিমচন্দ্র আদর্শবাদী ও জাতীয়তাবাদী। তিনজনের সাহিত্য
বাংলা ভাষার ভিন্ন ভিন্ন স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।ঔপনিবেশিক শাসনের চাপ, জাতীয়তাবাদের
উত্থান, সমাজসংস্কারের
আন্দোলন, নারীশিক্ষা ও বাল্য- বিবাহ
বিরোধী প্রচেষ্টা সব মিলিয়ে বঙ্গসমাজ এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। একই সাথে
ছিল ধনী ও নির্ধনের বৈষম্য, লিঙ্গ বৈষম্য, হিংসা, বিদ্বেষ, অবহেলা, ঘৃণা, স্বার্থপরতা, নীচতা, শঠতা। স্বাধীনতার আন্দোলন
পদ্ধতি বদলে প্রবল আকার ধারণ করেছে- এই সময় ‘শশী’র উদয়। পাঠক (এবং বৃহত্তর
পাঠিকাও) ধীরে ধীরে বাঁধা পড়তে লাগলেন শরত্চন্দ্রের গল্প, উপন্যাস এমনকি
প্রবন্ধেও। শরৎচন্দ্র ছিলেন
পরিব্রাজক, সমাজের সব স্তরের মানুষের সাথে
মিশেছিলেন, উপার্জনের জন্য একাধিক কাজ করেছেন, খুব গভীরে ভাবলে বোঝা যায় নিজের অভিজ্ঞতার বাইরে কোনো ঘটনাকে সাহিত্যে রূপ
দেননি। প্রাক যৌবনে তাঁর দেবানন্দপুরের পরিবেশে কাটানো স্বেচ্ছাচারী জীবন, প্রথমবার ভাগলপুরে মামার বাড়ির কঠোর অনুশাসনের মধ্যেও নিজেকে
মুক্ত করে স্বাধীন ভাবে ‘দুষ্টুমি’ করা
থেকে শুরু করে রেঙ্গুনের রূপজীবি মানুষদের সাথে সময় কাটানো সব কিছুই ছিল লেখার
পটভূমি।
তাঁর সাহিত্য শুধুমাত্র সাহিত্য রস নয় বরং তা ছিল সমাজকে আয়না দেখানোর এক সাহসী প্রয়াস। তাই তিনি বিশেষ
শ্রেণির পাঠকের গণ্ডী ছেড়ে ঢুকে পড়েছিলেন বৃহত্তর অন্দরমহলে, অন্তরমহলে। শরৎচন্দ্র প্রথম বাংলা সাহিত্যকে
অভিজাততন্ত্র থেকে মুক্ত করে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেন। তিনি ছিলেন ‘সেকুলার হিউম্যানিস্ট’। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিক আর বিংশ
শতাব্দীর প্রথমদিকে তত্কালীন বাংলা জুড়ে সামাজিক পরিবর্তনের যে ঢেউ আছড়ে পড়েছিল, তার গভীর মানবিক ও নৈতিক টানাপোড়েন
শরৎচন্দ্র তাঁর কথাসাহিত্যে এমনভাবেই তুলে ধরেছিলেন যে, সময়ের দীর্ঘ ব্যবধান সত্ত্বেও সেগুলোর প্রভাব আজও অম্লান। মাত্র
একষট্টি বছর চার মাসের জীবনের মধ্যে সবমিলিয়ে সর্বাধিক ত্রিশ বছরের লেখক জীবনে যা রচনা
করেছিলেন সেগুলোর মূল্যায়ন এখনো পুরোপুরি হয়নি।
‘From my father, I inherited nothing, except as I believe,
his restless sprit and keen interest in literature’- (E.T. Thomson- Sriniketan-
1922) এ
থেকে খুব স্পষ্ট যে বাবা মতিলাল চট্টোপাধ্যায়ের থেকে সাহিত্যনুরাগ শিখেছিলেন শরৎচন্দ্র
চট্টোপাধ্যায়, এর সাথে এসেছিল অস্থির মানসিকতা। অন্যদিকে অপরের সন্তানকে নিজ
সন্তানের মতোই ভাবা, পশু
প্রীতি, সহমর্মিতা, এসব প্রভাব যে তাঁর সাহিত্য
সৃষ্টিতে দেখা যায় তা শিখেছিলেন মা ভুবনমোহিনী দেবীর থেকে। এ বিষয়ে Dr.
Subodh Chandra Sengupta র লেখা `Sarat
Chandra Man and Artist` বই থেকে উল্লেখ করতে হয়
“That undermine a joint family and the undercurrents of tolarence and
generosity, which, under shifting garbs, sustain it”। তিনি ছিলেন ‘সম্পূর্ণ সাহিত্যিক’- এই সাহিত্যের
প্রভাব আজকেও যেন ‘আধুনিক’ আর এই কারণেই
হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন “শরৎচন্দ্র ঘরোয়া বাঙালী জীবনে
সার্থক পাঁচালীকার”।
শরৎসাহিত্যের দীপ্তি: নিজের গ্রাম দেবানন্দপুরে থাকার সময়েই শরৎচন্দ্র তাঁর সাহিত্য সাধনা শুরু করেছিলেন- লিখেছিলেন ‘কাকবাসা’, ‘ব্রহ্মদৈত্য’ ও ‘কাশীনাথ’। এরপর ভাগলপুরে থাকাকালীন বন্ধু বিভূতিভূষণ ভট্টর পারিবারিক উদ্যোগে প্রকাশিত হাতে লেখা মুখপত্র ‘ছায়া’তেও একাধিক লেখা লিখেছিলেন, কিন্তু মুদ্রণ আকারে প্রকাশিত লেখার ক্রম হিসেবে শরৎচন্দ্রের প্রথম বই ‘বড়দিদি’ (১৯১৩ সাল) ও শেষ বই ‘শেষ পরিচয়’ (১৯৩৯ সাল ওনার মৃত্যুর পর প্রকাশিত, জীবিতকালে প্রকাশিত শেষ বই বিপ্রদাস- প্রকাশকাল ১৯৩৫)। ‘শেষের পরিচয়’ উপন্যাসটি শরৎচন্দ্র শেষ করতে পারেননি, মাত্র পনেরটি পরিচ্ছেদ লিখেছিলেন; বাকি ছাব্বিশ পরিচ্ছেদ লেখেন রাধারাণী দেবী। যে পাঠক বলতে চান তথ্যের অসংগতি আছে- তাঁকে জানাই একদম ঠিক ভেবেছেন, আসলে এখানে একক বই আকারে প্রকাশিত বছরের ক্রম অনুসারে এই তথ্য; ‘ভারতী’, ‘যমুনা’, ‘ভারতবর্ষ’ এসব পত্রিকাতে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত বছর গুলি উল্লেখ করলাম না। ১৯০৩এ মামা সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় এর নামে ‘মন্দির’ লিখে অভিজাত ‘কুন্তলীন’ পুরস্কার পেয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র লেখালিখির ক্ষেত্রে ফরাসি সাহিত্যিক এমিল জোলাকে গুরু মানতেন।
শুধু একজন জনপ্রিয় কথাশিল্পী নন, তিনি ছিলেন এক সমাজমনস্ক সাহিত্যিক। সাহিত্য মানুষের জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাহিত্যের মাঝে মানুষ যখন নিজের জীবনের চিত্র খুঁজে পান তখনই মানুষ সে সাহিত্য ধারণ করেন। বর্তমানের যান্ত্রিকতা, একাকিত্ব, বা সম্পর্কের টানাপোড়েনের যুগে তাঁর লেখা সব স্তরের মানুষকে সান্ত্বনা, তৃপ্তি ও আনন্দ দেয়। এই ২০২৬ সালেও মনে হয় তাঁর লেখা যেন অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কোনো বিষয়ের ওপর লেখা, প্রতিবাদ- এভাবেই তিনি সফল।
“মনের
বার্ধক্য আমি তাকেই বলি…, যে মন সুমুখের দিকে চাইতে পারে না, যার
অবসন্ন, জরাগ্রস্ত মন ভবিষ্যতের সমস্ত আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে কেবল
অতীতের মধ্যেই বেঁচে থাকতে চায়।”
চলতি
পথের পন্থী !
নাকি পরিপন্থী ? যে পাঠক পাতা উল্টে এই লেখার এই
অংশ অবধি এসেছেন তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে এই স্বীকারোক্তি করি, যেটুকু বুঝেছি জন্মের সার্ধ শতবর্ষ পার করেও বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় শরৎচন্দ্র
চট্টোপাধ্যায়ের এক জীবন্ত উপস্থিতি অনস্বীকার্য। তাঁর
সহজ ভাষা, মানবিক দৃষ্টি, নারীচরিত্রের শক্তিশালী উপস্থাপন, সামাজিক
প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক সচেতনতা তাঁকে অনন্য করে তুলেছে। তিনি কেবল এক যুগের লেখক নন; তিনি চিরকালীন মানবিকতার শিল্পী। সময়ের স্রোত বয়ে গেছে, সমাজ বদলেছে, প্রযুক্তি
এগিয়েছে কিন্তু মানুষের প্রেম, বেদনা, আকাঙ্ক্ষা, প্রতিবাদ
ও স্বপ্ন বদলায়নি। সেই চিরন্তন মানবিক সুরই শরৎসাহিত্যকে আজও প্রাসঙ্গিক করে
রেখেছে। আরো প্রাসঙ্গিক কারণ শরত্সাহিত্যের মধ্যে আছে সংবেদনশীল হৃদয়, সংস্কারমুক্ত স্বাধীন মনোভাব, ব্যাপক জীবনজিজ্ঞাসা- যা
পরবর্তীকালের বাংলা সাহিত্যের গতিপ্রকৃতিকে অনেকটাই পরিচালনা করেছিল। শরৎচন্দ্রের লেখার ‘reread value’ বেশ গাঢ়। তাই তিনি আমাদের বর্তমানেরও সহযাত্রী। তাঁর
সাহিত্যের জনপ্রিয়তা তাকে “ভিনভাষী, ভিনজাতির
ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে”।
শরৎচন্দ্রের
অন্যতম প্রধান কৃতিত্ব তাঁর সাহিত্যের ভাষা। সে ভাষা যেমন প্রয়োগের দিক থেকে, তেমনিই মানবিক সংবেদন। তিনি এমন এক গদ্যভঙ্গিতে লিখতেন, যা ছিল সহজ, আবেগময়, অথচ প্রাঞ্জল। ফলে সাধারণ মানুষ
সহজে বুঝতে পারেন। লেখার ক্ষেত্রে
তিনি Novel of the local colour বা Novel of the soulএ বিশ্বাসী
ছিলেন। বিভিন্ন পটভূমির লেখা হলেও কথ্য ভাষার ব্যবহার অনেক বেশি নারী
পুরুষের কাছে তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে। শরৎচন্দ্রের
উপন্যাসের ভাষারীতি সম্পর্কে সুবোধ চন্দ্র সেনগুপ্তর মত ছিল “প্রকৃত পক্ষে শরৎচন্দ্রের
স্টাইলের প্রধান গুণ এই যে, এখানে তথাকথিত সাধুভাষা ও চলিত ভাষার সমন্বয় হইয়াছে। চলিত
ভাষার স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা এবং সাধুভাষার সমৃদ্ধির মধ্যে দিয়ে তিনি সামজ্ঞস্য গঠন
করিয়াছেন”।
এছাড়াও তাঁর কালজয়ী চরিত্রগুলোর সাথে আপামর বাঙালি নিজেকে খুঁজে পায়, বর্ণময় রঙিন নয়- সে জীবন সাদা কালো
কখনো ধূসর। তাঁর কলম তৎকালীন রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের কুসংস্কার এবং বৈষম্যের মূলে কুঠারাঘাত করেছিল। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সংকীর্ণ সমাজব্যবস্থা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে তাঁর এই আপোষহীন লড়াই তৎকালীন সময়ে ছিল অত্যন্ত বৈপ্লবিক এবং আজও। সাহিত্যিক
কৃতিত্বের পাশাপাশি সামাজিক চেতনা নির্মাণেও তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক ও
সুদূরপ্রসারী যেভাবে মহেশ গল্পে তিনি এক অন্য সম্পর্কের কথা বলেছেন আমরা যারা ‘পোষ্য’ প্রিয় তারা বুঝি ভালো ‘ভাষা’ কিভাবে হয়- সে লেখার সামাজিক বার্তার কথা নাই বা বললাম।
আর কোন গুণে শরৎচন্দ্র আজও
স্মরণীয়, বরণীয়? নারীর প্রতি তাঁর সংবেদনশীল মন। শরৎচন্দ্র নারী চরিত্রের নতুন ভাষ্য রচনা করেছিলেন। তাঁর নারী চরিত্ররা একমাত্রিক নয় তারা জটিল, দ্বিধাগ্রস্ত, আবেগপ্রবণ, তবু দৃঢ়। বাঙালি নারীর
সুখ দুঃখ, বেদনা, হাসি কান্না- ই কেবল নয়, তার তিতিক্ষা, প্রেম, প্রয়োজনে
গর্জে ওঠা, সততা, বলিষ্ঠ আত্মপ্রত্যয় নিয়ে তাদের যে বহুমাত্রিকতা, একের পর এক রচনায় তার
চমৎকার বিশ্লেষণ আছে শরৎচন্দ্রের লেখায়। প্রায় ২৩টি প্রধান উপন্যাসের একাধিক নারী
চরিত্র যেন গেঁথে আছে শরৎপ্রেমীদের অন্তরিক্ষে। সেসব নারীর কেউ কেউ সাধারণ মেয়ে, কেউ
বা মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান, আবার কেউ বা
নিম্নবর্গ কিংবা সমাজের দৃষ্টিতে ভ্রষ্টা,
অধিকাংশই বিধবা, কেও প্রেমহীন জীবন কাটান, কারোর মধ্যে ‘পরকীয়া’
করার সাহস আছে। তিনিই প্রথম বাংলা সাহিত্যে নারীকে শুধুমাত্র ‘গৃহবধূ’ বা ‘মাতা’ হিসেবে না দেখিয়ে একজন ‘মানুষ’ হিসেবে দেখিয়েছিলেন। তারা করুণার পাত্র নয়; বরং
আত্মমর্যাদা, প্রতিবাদ ও অন্তর্লৌকিক শক্তি সামনে এসেছিল। পুরুষশাসিত সমাজে
কেবল নারীরই দোষ দেখানো হয়। শরৎচন্দ্র ‘নারীর মূল্য’ প্রবন্ধে লিখেছেন : ‘সমাজ
নারীর ভুলভ্রান্তি এক পাইও ক্ষমা করিবে না, পুরুষের ষোলো আনাই
ক্ষমা করিবে।’ তাঁর ভবঘুরে জীবনে যেসব নারীর সান্নিধ্যে এসেছিলেন সেসব বাস্তব অভিজ্ঞতা
থেকেই তিনি ‘নারীর মূল্য’
এঁকেছিলেন। মূলত সামাজিক নানা বন্ধনে, ধর্মীয় জীর্ণ আচারে এবং কুসংস্কার জীবনকে যেখানে
বিষাক্ত করে রেখেছিল, সেই প্রচলিত হিন্দু সমাজের অনুশাসন মেনে নিয়েই
শরৎচন্দ্র উপন্যাসের নারী চরিত্র তৈরি করেছিলেন। তাঁর নারীরা স্বপ্ন দেখে আবার সংগ্রামও করে, বাস্তবে পা দিয়ে মহত্ব ও
বৈচিত্র্যে তারা অসামান্যা। এই শতাব্দীর ২৫ বছর পার করেও নারীদের
সম্পর্কে তাঁর দেখানো সমস্যা, অনাচার সবকিছুই বর্তমান। বর্তমান feminist literary criticismএর আলোকে দেখলে বোঝা যায়, শরৎচন্দ্র নারীর
অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সামাজিক অবস্থান অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে বিশ্লেষণ করেছেন। যদিও
তিনি সম্পূর্ণ আধুনিক নারীবাদী ছিলেন না, তবুও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যুগান্তকারী। যে স্বাধীনতা, নীতি অভয়া, কমল,
বিজয়াকে দিয়েছেন সেগুলো কী আমরা আজ দিতে পারবো?
যেভাবে অচলা এসেছে সেই অচলা তো এখনো মনে মনে নিজেকে পোড়াচ্ছেন, অন্যদিকে ‘পল্লী সমাজ’ এর
জ্যাঠাইমা- নিজের সন্তানের হাতে মুখাগ্নি করাবেন না,
কারণ সে সন্তান অত্যাচারী এমন মা কী আজ নেই ? ‘পথ
নির্দেশ’ এ হৈম-র
মধ্য দিয়ে যে ইচ্ছা পূরণ করেছেন সে ইচ্ছা পূরণ করতে তো অনেকেই চান। ‘মন্দির’ এর
অপর্ণা, ‘বড়দিদি’র বড়দিদি
বা ‘পল্লী সমাজ’ এর
রমার মধ্যে কোথাও যেন ‘নিরূপমা দেবী’র
মিল পাওয়া যায়। তাঁর সব নারী চরিত্রকে একদিকে আর ‘শেষ প্রশ্ন’এর কমল কে অন্যদিকে রেখে আপনি যদি নিজে বিশ্লেষণ করেন বোঝা যাবে এতো আজকেই ঘটল। ১৯৩১ সালে কমলকে
দিয়ে বলিয়েছেন “যৌবন যেদিন শেষ, নারীও সেদিন মৃত”, বা বিবাহ বিষয়কে অস্বীকার করে তথা কথিত ‘সহবাস’ পছন্দ করা তাকে দিয়ে বিবাহ সম্পর্কে বলাতে পেরেছেন “ওতে মড়ার ঘর তৈরি হবে, জ্যান্ত মানুষের শোবার ঘর তৈরী হবে না”- পাঠক আপনি বলবেন এ কথা নিভৃতে কেউ
বলে না? আপনি যদি নারী হন আরো একবার এ গল্প পড়ুন, দেখবেন কখন যেন নিজের ছবি দেখতে পাচ্ছেন।
একটা সময় অবধি শরত্সাহিত্য
নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ছিল- বলা হত উনি ও ওনার লেখা অশ্লীলতার দোষে দুষ্ট, এটা ঠিক খুব কম
বয়স থেকেই তিনি নেশা করতেন তাঁর জীবনের যতকিছু নিন্দা সেগুলোর অন্যতম এটা, এছাড়াও তাঁর নারী চরিত্রগুলো নিয়ে, পতিতালয়ে যাওয়া
এসব নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছিল। তবে সেসবের বেশ কিছু ঈর্ষা থেকে প্রচারিত ও অন্যদের ‘ভাইরাল’ হবার মানসিকতা থাকলেও কিছু কিছু বিষয়ের সত্যতা ছিলই। নারীর সামাজিক অপমান ও দ্বৈত নৈতিকতার যে ছবি তাঁর
লেখায় পাওয়া যায়, তা ‘স্লাট শেমিং’ এর কবলে পড়েছিল, কিন্তু
এটাও ঠিক এভাবেই তিনি বিশ্ব সাহিত্যের জন্য একাধিক ‘ক্লাট’ উপন্যাস বা গল্প লিখে গেছেন। বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিশেষত ‘শেষ প্রশ্ন’এ যেভাবে যৌন স্বাধীনতার উল্লেখ করেছেন
সেই সময়ের প্রেক্ষিত ভাবলে যেমন আশ্চর্য হতে হয়,
তেমনিই বোঝা যায় যে উদ্দেশ্য নিয়ে রচনা করেছেন, তা করতে গিয়ে
শাস্ত্রের অসম্মান করা হয়েছে কি না, দেশাচারের ওপর কটাক্ষ করা হয়েছে কি না তা
ভেবে কোথাও থামেননি। লিখেছেন, ‘যাহা সত্য তাহাই বলিব এবং বলিয়াছিও, অবশ্য
ফলাফলের ভার পাঠকের ওপর।’
অনেকের ধারণায় তাঁর
লেখায় প্রাধান্য ছিল চোখের জলের, নাকের নথের, পায়ের মলের– তা যে নয়
সেটা সবচেয়ে বেশি বুঝেছিল ইংরেজ শাসক। তখন রাজদ্রোহী হওয়ার আশঙ্কা মাথায় রেখে অনেকে সাহিত্যচর্চা করতেন। তিনি তা করেননি বলেই পথের দাবী
নিষিদ্ধ হয়, এ যুগেও কী ‘যুগের দাবী’ তোলার লেখক আছেন?
প্রকাশ্যে গান্ধী বিরোধীতা করেছিলেন, কেন
রাজনীতিতে এসেছিলেন তার যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, পথের দাবী নিয়ে রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের সেই অর্থে নিশ্চুপ থাকার প্রতিবাদ করেছিলেন। “সাহিত্যিক হিসেবে শরৎচন্দ্র বড়
ছিলেন বটে, কিন্তু দেশপ্রেমিক হিসেবে ছিলেন
আরো বড়”- সুভাষচন্দ্র বসুর এই উক্তি বুঝিয়ে দেয় শরৎচন্দ্রের ভাবনা ও কার্যকলাপ এক
প্রকৃত স্বদেশ প্রেমিকের পরিচয় দেয়। শরৎ
শব্দ কানে এলেই মনে আসে শারদীয়ার কথা, অকালবোধনের কথা। যেখানে অশুভর বিনাশ হয়েছিল, অত্যাচারী শাস্তি পেয়েছিল। এই শরৎ এর বিষয়ে আলোচনা করলেও বোঝা
যায় তিনিও স্বদেশ ব্রতের মহাদীক্ষা নিয়ে পরোক্ষে ইংরেজ শাসকের ভিতে আঘাত করেছিলেন। তাই ‘পথের দাবী’
নিষিদ্ধ প্রসঙ্গে ইংরাজ সরকার নিযুক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল
ব্রজেন্দ্রনাথ মিত্র বলেছিলেন “ Towards
the end of the book, the hero works himself upon a state of frenzy, throws away
all restraints and preaches pure Bolshevism”।
১৯২৬ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত হয়েছিল
পথের দাবী, ১১ই ডিসেম্বর
এই বিবৃতি প্রকাশের পর ১৯২৭ এর ৪ জানুয়ারী পথের দাবী কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। তিনি ভারতীয় রাজনীতিবিদ, স্বাধীনতা সংগ্রামী বা বিপ্লবী
হিসেবে নয় একজন সাহিত্যিক হিসেবেই উজ্জ্বল হয়ে আছেন কিন্তু তত্কালীন জাতীয় সমস্যা, রাজনৈতিক সার্বভৌমের জন্য অহিংস ও
বৈপ্লবিক আন্দোলন তাঁর ওপর প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৩০ সালে চন্দননগরে প্রবর্তক সঙ্ঘের সভায় বিপ্লবী মতিলাল
রায়, চারুচন্দ্র রায়, বসন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের
উপস্থিতিতে বলেছিলেন Reform নয়
তিনি চান Revolution- আমূল পরিবর্তন। আসলে স্বদেশপ্রেমের জন্য কোনো
নির্দিষ্ট নীতি ও আদর্শের প্রতি গোঁড়ামি ছিল না, তাই তাঁর লেখায় উঠে এসেছে “আমরা
সবাই পথিক, মানুষের মন্যুষত্বের পথে চলবার
সর্বপ্রকার দাবি অঙ্গীকার করে আমরা সকল বাধা ভেঙ্গেচুরে চলব”। রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেসের
সাথে তিনি সরাসরি যুক্ত থাকলেও ঐ মতবাদের প্রতি পুরোপুরি অনুগত ছিলেন না। অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে
শরৎচন্দ্র প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন; মহাত্মা গান্ধীর প্রবল ব্যক্তিত্বে
আকৃষ্ট হন, চরকা কাটেন, খদ্দর পরেন- কিন্তু অসহযোগ
আন্দোলন পরিত্যাগের কারণে শেষ পর্যন্ত গান্ধীজীর মত ও পথ থেকে সরে আসেন। তাঁর বক্তব্য ছিল “Non violence খুব Nobel idea, কিন্তু achievement
of freedom is Nobler hundred times nobler” শেষ অবধি সুভাষচন্দ্র বসুর
মতাদর্শকে সমর্থন করেছিলেন। তাঁর মত ছিল “রক্তের গঙ্গা বয়ে যাবে চারিদিকে, সেই শোণিত প্রবাহের মধ্যেই ত ফুটে
উঠবে স্বাধীনতার রক্ত কমল”।
১৯২০ সালে শরৎচন্দ্র জাতীয় আন্দোলনে যুক্ত হন, মাধ্যম ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ যাঁর
পরিকল্পনায় স্থাপিত ‘নারী
কর্মমন্দির’এর অন্যতম সহযোগীও ছিলেন
শরৎচন্দ্র। ১৯২১ থেকে ১৯৩৬ অবধি তিনি হাওড়া জেলা কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। বিপ্লবী বিপিনচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
ছিলেন শরৎচন্দ্রের মামা এছাড়াও বারীন্দ্রনাথ ঘোষ, উপেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, চারুচন্দ্র রায়, শচীন সান্যালের মতো প্রথম সারির
বিপ্লবী নেতারা তাঁর বন্ধু ছিলেন। বিপ্লবের কাজে সহায়তা করার জন্য ‘চরিত্রহীন’ ও ‘পথের দাবী’র সত্ব বেঙ্গল ভলেণ্টিয়ার্স দলের
শীর্ষ নেতা হেমচন্দ্র ঘোষেকে দিতে চেয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র বিপ্লবী কালীপদ
ভট্টাচার্যের মাধ্যমে পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন আত্মগোপন করে থাকা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার
লুণ্ঠনের নায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনকে। ১৯২৭ সালে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলনে থাকা বিক্ষোভকারী বিপ্লবী বিপিনচন্দ্র
গঙ্গোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ, জ্যোতিষচন্দ্র ঘোষ প্রমুখরা
মান্দালয় থেকে জেলমুক্ত হয়ে ফেরার পর হাওড়া টাউন হলে তাদের সম্বর্ধনার ব্যবস্থা
করেন শরৎচন্দ্র।
মানুষের
চিন্তা করার অফুরন্ত শক্তি বা সীমাহীন ক্ষমতা থাকতে পারে- তা অনেকক্ষেত্রেই 'মেটিরিয়াল কন্ডিশন' বা পরিবেশ, পরিস্থিতি, স্থান- কাল- পাত্র দ্বারা
নিয়ন্ত্রিত বা সীমিত। শরৎচন্দ্রের জীবন তাঁর সাহিত্য এর ব্যতিক্রম নয়। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে বলা
কঠিন যে তিনি কতটা স্বদেশ প্রেমিক ছিলেন, তাঁর লেখা স্বদেশ ব্রতের জন্য কতটা সহায়ক ছিল। কিন্তু এটা স্বীকার করতেই হবে
দেশের অভ্যন্তরে যখন স্বাধীনতার আকাঙ্খা তীব্র হয়ে উঠছে তখন শরৎচন্দ্র সমাজ
বিপ্লবের ঝাণ্ডাকে ঊর্ধে তুলে ধরেছিলেন- বক্তৃতা করে নয়, ভাবনা, লেখা তথা কাজে এ সমাজ আজ এক অন্যভাবে বিপ্লব চায় কিন্তু দল
পদ পুরস্কারের বাঁধনে থাকা অধিকাংশ সাহিত্যিকরা কী তাঁর মত করে ভাবতে বা লিখতে
পারেন? এই
কারণেও জন্মের সার্ধশতবর্ষ পার করেও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 'ভিশন' (Vision) ভাবেও প্রাসঙ্গিক।
এই সময়ে যখন আমরা দেখি সমাজ থেকে কুসংস্কার, নারীবিদ্বেষ বা জাতপাত পুরোপুরি মুছে যায়নি, তখন বুঝতে পারি শরৎচন্দ্রের লেখনীর প্রয়োজনীয়তা আজও ফুরিয়ে যায়নি। কারণ তিনি যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন
প্রেম বনাম সমাজ, ব্যক্তিস্বাধীনতা বনাম সামাজিক
বিধি, নারীর মর্যাদা, শ্রেণিবিভেদ সেগুলো চিরকালীন। শরৎচর্চা
মানে কেবল অতীত স্মরণ নয়; বরং বর্তমানকে নতুন চোখে দেখা।
তাঁর চরিত্ররা আমাদের শেখায় মানবিকতা, সহানুভূতি
ও প্রতিবাদ এই তিনই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাঁর সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ব্যক্তি স্বাধীনতার মূল্য কতখানি। শরৎচন্দ্রের লেখার সার্থকতা ও মহত্ত্ব এইখানেই
তিনি মানুষকে ভালোবাসতে পেরেছিলেন, কৃতিত্ব তিনি সত্যের শক্তিকে ধারণ
করতে পেরেছিলেন। অসংখ্য মানুষের মধ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্পৃহা জাগিয়ে
তুলেছেন।
‘সব চেয়ে জ্যান্ত লেখা সেই, যা পড়লে মনে হয় গ্রন্থকার নিজের অন্তর থেকে সব কিছু ফুলের মতো বাইরে ফুটিয়ে তুলেছে’।
সমাপ্তির
পথে:
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যে সমাজ, প্রেম, নারীর
অধিকার ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তা
আজকের বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে মিলে যায়, সময় অতিক্রম করে আধুনিক সমাজেও জীবন্ত। এটা ঠিক চার খন্ডে
প্রকাশিত ‘শ্রীকান্ত’ পড়লে শরৎ চরিত্র জানা যায়, তবুও হরেক রকম
সামাজিক বিবর্তন, আধুনিক সমাজের যৌক্তিক আবেদন, যুগ ও কালের
সমৃদ্ধ আঙিনা সব কিছুকে ছাপিয়ে এই মহান সৃজন ব্যক্তিত্ব এখনও বাংলার ঘরে ঘরে
সেভাবে স্থান পেলেন না। আমরা ধীরে ধীরে নীতি, নৈতিকতা, এ দেশে গড়ে ওঠা উচ্চমার্গের সংস্কৃতির ভিত থেকে নিজেদের যেন
সরিয়ে নিচ্ছি। আমরা মুখে বড় বড় কথা বলি কিন্তু হৃদয়কে বড় করতে পারিনা, দৃষ্টিহীনের হাতী নিয়ে ভাবনাকে
গুরুত্ব দিলে হাতীর চেহারা সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হবে। তাই যাঁরা নিজের ও অন্যের লেখা
পড়ার অবকাশে এই লেখাও পড়লেন তাঁদের কাছে অনুরোধ শরৎচন্দ্রের জীবন বোধ ও আধুনিকতাকে
বেশি করে উপলব্ধি করার জন্য ওনার সাহিত্য পড়ুন, হয়তো আরো বেশি অনুভব করবেন আপনি, এই সমাজ সত্যের মুখোমুখি। মানুষই যেখানে শেষ কথা সেখানে
শরৎসাহিত্যের আবেদন কখনো অসাড় হতে পারে না। কেননা তিনি একজন মানবদরদী শিল্পী। তাঁর সাহিত্যকে নতুন প্রজন্মের
কাছে পৌঁছে দেওয়া, তাঁর মানবতাবাদকে জীবনে ধারণ করা আমাদের কাজ। আসুন আমরা তাঁর কলমের অমর সুর দিয়ে আমাদের সমাজকে আরও সংবেদনশীল করি, সব ধরণের বৈষম্য মুছিয়ে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার
দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই। প্রার্থনা করি আবার কোনো শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যেন এ সমাজে আসেন, এসে তাঁর লেখনী ও কাজে এ দেশ, এ বাংলাকে সমতার পথে নিয়ে যেতে
পারেন- যতদিন না হচ্ছে ততদিন ওই চাঁদকেই বলব “ও চাঁদ সামলে রেখো বাংলা কে”।
তথ্য
ও গ্রন্থ ঋণ:
১ শরৎ রচনাবলী ভাষা
প্রযুক্তি গবেষণা পরিষদ, পশ্চিমবঙ্গে সরকার।
