আফুটানির
গপ্পো এবং সেই লোকটা
শাশ্বত
বোস
মরসুমের উষ্ণতম দিনের লেজের দিকটায় পৌঁছতে
পারলে কোনোমতে, নরম বিকেলটার কোলে মাথা রাখতে বড় সাধ জাগে। হাজার হোক দুজনেই আমরা সহযাত্রী!
জৈষ্ঠ্যের দীর্ঘ্য দিনের তপ্ত শাসন পেরিয়ে আসছি আমরা দুজনেই। মাসের প্রায় মাঝামাঝি
এখন। বুকের জল শুকিয়ে আসা কোন নদীর চর বেয়ে, গ্রামের নিতান্ত শুকনো, আলুথালু পথ ভেঙে,
এগিয়ে চলেছি মাইলের পর মাইল। রোদের তাপে বাইকের সিটে বেশীক্ষণ বসাটাই দায় হয়ে উঠেছে।
নদীর খাদে কুমারীর খন্ড খন্ড যৌবনের মত জেগে থাকা ক্ষতয় পড়ে বাইকের সাস্পেন্সরগুলো
নেচে নেচে উঠছে। সীমাহীন চাতক দৃষ্টি তখন দুচোখের ক্লান্ত পাতায় বুনে চলেছে শান্ত বটছায়া
আর স্নিগ্ধ কোমল জলরেখার মসৃণ ইন্দ্রজাল। নাগরিক কোন দুপুরে পোড়া বাসস্ট্যান্ডের কাছে
ভিড় মেখে বেরোনো মানুষটার মত সহসা নিবৃত্তির স্বপ্ন ভেঙে একগাদা হতাশা আর নৈরাশ্যে
ভরে যায় বুক। মুখ ফুটে অস্ফুটে বেরিয়ে আসে, “তোমার বুকে জল নেই তটিনী! কস্তুরী মৃগের
নাভিও তো গন্ধহীন! আমায় কি দেবে তুমি? এত তেষ্টা নিয়ে যাই কোথায়?”
আমার আজকের গন্তব্য পাণ্ডুয়া ব্লকের পশ্চিমের গ্রামগুলো।
পাইকারা থেকে মান্দারণের পথে বিঘের পর বিঘে ধানজমি, ধু ধু করা ক্ষেত, প্রায় বুজে যাওয়া
নদীচর এসব পেরোলে এদিকটায় দু এক ঘর বসতি চোখে পড়ে। তবে চাষবাস বরাবরই বেশী হয় এদিকে।
স্বর্ণ মাসুরি, পঙ্কজ, কলমা,
মোহনভোগ, ঝিঙ্গেশাল, রাজ ঝিঙ্গেশাল, বাংলার এসব বিলুপ্তপ্রায় ধান এদিককার প্রায় ভূমিজ
ফসল। পাণ্ডুয়ার বিডিও অফিস থেকে নোটিশ এসেছে কাল বিকেলে। এদিককার চাষীদের মধ্যে সার-বীজ
এর ব্যবহার, ফসল বীমা, সরকারি কৃষি প্রকল্প গুলো সম্বন্ধে সচেতনতা আরো বাড়াতে হবে।
তাই আজ সক্কাল সক্কাল এই কৃষিবন্ধু ভাইয়ের বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়া। পিঠের ব্যাগে জমা
করা কৌটোর খাবার আর জলের বোতল, আমার সাথেই আমার রথের নৃত্যের তালে তালে জগঝম্প তুলেছে
রীতিমত! তাছাড়াও ব্যাগে বীজের স্যাম্পল আছে। আশেপাশের বেশ কয়েকটা পঞ্চায়েতের কৃষি বোর্ড
থেকে বিডিও অফিসে খবর গেছে, বেশ কয়েক ঘর চাষী মরসুমে রবি বা খারিফ কোনটাই চাষ করে উঠতে
পারছেন না। তাই উপরতলার হুকুম, গ্রাউন্ড লেভেল থেকে রিপোর্ট জোগাড় করতে হবে ওদের অসুবিধেটা
ঠিক কোথায়, সেটা খুঁজে বের করতে হবে। সরকার সবসময় সবরকম ভাবে চাষীদের পাশে আছে’, এই
বার্তাটা ওদের মন মাথায় জমিয়ে দেওয়া দরকার। ফসল খারাপ হলে ত্রাণ যোজনার মাধ্যমে সরকার
পাশে আছে, আবার ফসল ভালো হলেও নির্ধারিত মূল্যের থেকে কম দামে ফসল কিনে নিয়ে পাশে আছে,
সার, বীজে সাবসিডি দিয়ে পাশে আছে। মোটের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শাসকের বরাভয়
সর্বদা আছে সোনালি শস্যের এই জনক জননীদের প্রতি এবং সেটাই অনিবার্য্য, এই ভাবনাটাকে
বাঁচিয়ে রাখতে হবে, এইটাই খুব দরকার। কৃষক ও ফসলের মধ্যে আরো সুবিধাজনক নিবিঢ় সম্পর্ক
তৈরী করতে সরকার আজকাল যথেষ্ট তৎপর! চাষী যাতে ফসলের ন্যায্য দাম পায় তাই সরকার থেকে
কৃষক মান্ডি তৈরী করা হয়েছে পাণ্ডুয়া সদর বাজারের কাছে। এতে ফড়েদের দালালি কতটা বন্ধ
হয়েছে বলতে পারিনা, তবে আমাদের মত কৃষকসাথী প্রকল্পে কন্ট্রাক্টচুয়ালে মাসিক ১৬ হাজার
টাকা মাইনের চাকরী করা বোটানি গ্রাজুয়েটদের ঝামেলা বেড়েছে কয়েকশোগুণ! মাঝে মাঝেই কৃষক
মান্ডিতে ঢুঁ মারা, ফসলের পাইকারী রেট চেক করা, কৃষকদের সাথে মিশে নিত্যনতুন বীজ ও
সার ব্যবহারে তাদের উৎসাহিত করা, এসবই এখন করতে হয় আমাদের! তবু আপসোস নেই। রীতিমত গরীব
ঘরের শিক্ষিত বেকার আমি। এই বাজারে একটা চাকরি যেন পদ্মদীঘির ধারে উপুড় হওয়া সোনার
কলসী। এই যেমন এই মুহূর্তে উষ্ণ, উদাসীন প্রান্তর জুড়ে কম্পাসে নক্ষত্র মন্ডলের দিক
নির্ণয় করা নাবিক আমি। খুঁজে চলেছি একটু কৃষ্ণকায় ছায়া! উষর শুষ্ক দুটো ঠোঁটে আমার,
মধুকাটি ধানের গন্ধে ভরা নবান্ন সকালের মিষ্টি বাতাসের পিপাসা লেগে আছে। ঠিক যেমন পাখির
বিমগ্ন শরীরে লেগে থাকে মিহি চাঁদের পরাগ!
পাইকারা ঢোকার মুখের ঢালাই রাস্তার দুধারে, আদিগন্ত
বিস্তৃত তিলের ক্ষেত আলগা হাওয়ায় দুলে ওঠে। মাঠময় যেন প্রান্তিকজনের হাসি খেলা করে
যায়। সোনার কাঠি রুপোর কাঠি হয়ে যায়। ওই রাস্তা ধরেই আরো মাইল খানেক এগোলে সর্সা। ঝাঁপানতলা
পেরিয়ে সোজা পথ ধরলে গ্রাম্য গৃহস্থ জীবনের হাত ছানি। শান বাঁধানো পুকুর, বুড়ো শিবের
মন্দির, ধর্মতলা, রাস্তার গা বেয়ে উঠে যাওয়া ভাঙা পোড়ো বাড়ি। দিনের উড়নচন্ডী প্রহর
জুড়ে যেন মেঠো রূপকথার ধারাবাহিক দৃশ্যকোলাজ! জমির ঢালে মধুকূপী ঘাস সাদা বিড়ালের লেজের
মত সুড়সুড়ি দেয় আমার সমস্ত শরীর জুড়ে। বারো বিঘার ক্যানেলে জল প্রায় শুকিয়ে গেছে। নারী
পুরুষ নির্বিশেষে কিছু ক্ষেত মজুর সেখানে ধানের চারা বুনছে। এগুলো অসময়ের বোরো ধান।
এরা বোধহয় এবারে ভাগচাষের জমি পায়নি ঠিক সময়ে তাই এই অবস্থা। দু পাশের শাল বনে তখন
ঢেউ উঠেছে। সে হাওয়ায় যেন কার বুক ছুঁয়ে আসে অভিমানী হিম। অজানা পাখি অজানা গান বয়ে
নিয়ে আসে
“মাটিরও পিঞ্জিরায় সোনার ময়নারে
তোমায় পুষিলাম কত আদরে।”
পাখির পালক খসে পড়ে ঘাসের আগায়। বালিমাখা
মৌন জীবন ছুঁয়ে জেগে থাকে আমলকি সবুজের দেশ আর শিমুল শিরীষের নিমগ্ন শরীর।
পাইকারা থেকে শুরু
হয়ে ডিভিসি ক্যানেলটা, নিরম্বু উপবাসী মেয়ের মত আঁকা বাঁকা শরীরে বারোমাস্যা গল্প বুনে
চলেছে পর পর ধীর বেগে পার হয়ে যাওয়া শান্ত তরঙ্গহীন এই গ্রামজীবনে। দীর্ঘ্য আলোড়নের
পর মধ্যাহ্ন পেরিয়ে প্রদাহের এখন ধীর গতিতে পশ্চিমে ঢলার পালা। ‘আয় ঘুম যায় ঘুম পেরিয়ে’
গ্রাম্য গৃহস্থ্য ঘরের কোন দস্যি হয়তো তৈরী হচ্ছে বিকেলের ছেলেমানুষী দাপাদাপির জন্য।
সামনের কালভার্টটা পেরিয়ে বাঁ পাশের ফুটবল খেলার মাঠটা, একটা জাগতিক ধূলিকণার সরের
মধ্য দিয়ে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমায়। একটা দীর্ঘ্য রোদে পুড়ে যাওয়া জীবনের গন্ধ
ভেসে আসছে নাকে। মাঠের একেবারে কোণের দিকের বটগাছটা যেন আবহমানকাল ধরে অনেক রহস্যময়
মুহূর্তের সাক্ষ্মী। ওর অতীত নেই, ভবিষ্যৎ নেই। পরিমার্জনাহীন লাবণ্যের আবহে ওর গা
বেয়ে নেমে আসা ঝুড়িগুলো যেন আমায় নিয়ে ডুব দেয় ভাবনার ইন্দ্রলোকে। বালিভেজা মৎস্যকন্যার
মত নরম মাটি হাতড়ে আমায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায় সুঠাম কালো এক অবয়বের সামনে। যেন গ্রামীণ
উপকথায় চলে আসা এক আদিমানব! এই বুঝি তার আদিম যুদ্ধের শৃঙ্গার! কালের গর্ভে হেলে পড়া
দেউলের গায়ে ধাক্কা খেয়ে নিঃস্ব, জড়বদ্ধ পৃথিবীর ভারী শ্বাস ফিরে ফিরে আসে, প্রখর জৈষ্ঠ্যে
ফুটিফাটা হয়ে যাওয়া দেবদারু পাতার জাল বেয়ে দ্রিমী দ্রিমী উলুধ্বনিতে, তির তির করে
কাঁপতে থাকা ক্লোরোফিলবিহীন অশ্বত্থের আড়ম্বরে। মনে হয় মহাশূন্য থেকে ছুটে এসে কার
বুকে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল! সেই বে-লাগাম ‘আমি’ময় মুহূর্তে বাক্যহীন প্রেমজ অভিব্যক্তির
ঘোর লাগে আমার চোখেমুখে।
অনন্তকালের এই যাত্রাপথে হয়তো কোনো সুনির্দিষ্ট অন্তিম
বিন্দু নেই। দিকভ্রষ্ট ভূমিরূপের অবাধ্য মানচিত্র জুড়ে স্থূলতা খুঁজে বেড়ানোই হয়তো
এই উদযাপনের মূল উদ্দেশ্য। সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে ঝেড়ে ফেলে এই তপ্ত দুপুরে গাঢ় ছাই
রঙের এই যে উন্মাদনা আমার চারপাশ জুড়ে, এই মুহূর্তে একে উপভোগ করা ছাড়া আর কি কোন উপায়
আছে?
জঙ্গলটা খুব ঘন নয়,
হয়তো খুব দীর্ঘ্যও নয়! মোরামের রাস্তার ওপর থেকেই বেশ চোখ টানে। কেমন যেন ছায়া ছায়া
সোঁদা সোঁদা গন্ধ! এই প্রখর তপ্ত দিনে এরকম একটা আশ্রয়ই তো চেয়েছিলাম। যেখানে একটা
গোটা দিনের ক্লান্তি, অভিমান, একাকীত্ত্ব সমর্পণ করা যাবে একটু ভারী, একটু উষ্ণ, একটু
দীর্ঘ্য এই সুঘ্রাণের কাছে। এই দুপুর রোদে মাঠঘাট সব শুনশান, এগিয়ে এসে কথা বলার মতন
কেউ নেই। তবে রিপোটের কি হবে? বিডিও ম্যাডামের কড়া নির্দেশ, আজ বিকেলের মধ্যে রিপোর্ট
পাঠাতে হবে ফ্যাক্স করে। তবে কি এবার চাকরিটায় টান পড়বে! এইরকম একটা দুশ্চিন্তা যখন
মাথার ভেতর চুল উড়িয়ে, কালো চশমার ওপার থেকে অজানা ভয় ভীতির সমীকরণ কষতে শুরু করেছে,
তখনই দেখা হল সেই ছায়াবয়বের সাথে। জঙ্গলটার ডান দিকে বিঘে দুই ক্ষেতি জমি। দেখে বোঝা
যায় খারিফ চাষের আদর্শ জমি। কিন্তু অজ্ঞাত কোন কারণে জমির মালিক সেখানে ওল গাছ বসিয়েছেন।
বেশ ঝোপালো গাছ হয়েছে এর মধ্যেই! ফসলের মালিকের হাতে দৈব গুণ না থাকলেও সে হাত যে চাষে
অভ্যস্ত সেটা বোঝাই যায়। এইরকম একটা জমিই তো চেয়েছিলাম। এর মালিকের সাথে কথা বলা দরকার।
খারিফ শস্যে কি অসুবিধে সেটা জানতে হবে। আপাতত এটাই আমার কাজ।
বাইকটাকে রাস্তার ধরে স্ট্যান্ড করে পায়ে
পায়ে ঢুকে পড়ি জমিতে। আলের পথ ধরে সামনের দিকে হাঁটতে থাকি। বাঁ দিকের জঙ্গলটা জায়গায়
জায়গায় পাতলা হয়ে পড়ন্ত বিকেলের রোদটাকে নিয়ে লুকোচুরি খেলছে। সেখানটায় বেশ কিছু জামরুল,
কাঁঠাল আর সিরিশ গাছ চোখে পড়লো। আমি অবশ্য মফস্সলের ছেলে। গ্রামে গঞ্জের ঝোঁপ-ঝাড়ের
সব গাছ চিনে বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয় মোটেও। সিরিশ গাছগুলোর গা বেয়ে নাম না জানা গুল্মলতা
আষ্টে পৃষ্টে নির্দিষ্ট প্যাটার্নে পেঁচিয়ে ফুটিয়ে তুলেছে নিজের জন্মদাগ। যেন জৈষ্ঠ্যের
খরবুকে মুখরিত সহস্র বাস্তুসাপ! কিছুদূর এগোতে দেখলাম একজন অশীতিপর বৃদ্ধ, আদুর গা,
পরনের মলিন লুঙ্গি হাঁটুর ওপর তুলে ঠাটা রোদ্দুরে জমির ওপর হাঁটু মুড়ে বসে। চন্দ্রগ্রহণের
রাতে ঘনিয়ে আসা অন্ধকারের মত কালো দুটো ঠোঁটে, মৃত চামড়ার ক্ষতর ভাঁজে চেপে ধরা বিড়িটার
ধোঁয়া কচ্ছপের গতিতে ছড়িয়ে গিয়ে একটা অদৃশ্য জাল তৈরী করেছে তাঁর মুখের চারপাশে। চোয়াল
ভাঙা মুখের জ্যামিতিক আয়তক্ষেত্রে, নির্দিষ্ট কৌণিক দূরত্ত্বে মুদ্রিত বলিরেখার শৈল্পিক
তীব্রতায়, সেই বিস্তার যেন নিরুত্তাপের পদবী লিখে চলে চলেছে অনবরত। হাত দুটো দুই হাঁটুর
উপর প্রসারিত। আঙুলগুলোয় মাঝে মাঝে মাছি এসে বসছে। গুটিয়ে ছোট হয়ে আসা সেই আঙ্গুলগুলো
প্রতিবর্ত ক্রিয়ার জৈবিক নিয়মে মধ্যাহ্ন মরুর পিঠে, লিখে চলেছে দুটো লাইনের মাঝের অন্তর্বর্তী
শূন্যতাকে। মাঝে মাঝে দমকা কাশির চোটে সারা শরীরটা যেন নির্দিষ্ট ছন্দে দুলে উঠছে।
এই মুহূর্তে এর সাথেই ভাব জমানো দরকার! কাছে গিয়ে গা ঘেঁষে বসি। একটা মাটি মাটি গন্ধ
যেন ওঁর গায়ে। যেন শিকড়ের সাথে নিবিড় সংযোগ! এই আদিম ধূসর প্রকান্ড মেঠো পৃথিবীটার
ব্যাপারে যেন কত কি আলাপ সারা বাকি ওঁর সঙ্গে! দু চোখের ঝাপসা কাঁচের আড়ালের দুটি মৃদু
চোখের চাহনিতে একবার তাকান আমার দিকে। আমি কেঠো একটা হাসি হেসে শুরু করি,
“নমস্কার চাচা, আমি কৃষি অফিস থেকে আসছি। এই আপনাদের
কিছু খোঁজ খবর লাগবে, এই আর কি!”
দীর্ঘ্য চার সাড়ে চার বছর এই লাইনে থাকতে থাকতে গ্রামের
কথ্য ভাষাটা কিছু শিখে নিতে পেরেছি। কানে কটূ শোনালেও এতেই যোগাযোগটা সুবিধার হয়, এটাই
আমার বিশ্বাস।
“দ্যান একখান বিড়ি আর আগুনখান দ্যান।”
শীর্ণ একখানা হাতের কুঞ্চিত ত্বক জুড়ে উজ্জ্বল রোদের
ঝিল্লি তুলে, বিড়ির প্যাকেটটা এগিয়ে দেন তিনি আমার দিকে। বিড়িটা ধরিয়ে আমি দুটো টান
দিয়ে নীল আকাশের দিকে ঘন একটা ধোঁয়া ছেড়ে শুধোই,
“নাম কি? চাচা?”
মাথাটা নীচু করে, প্রায় ক্ষয়ে যাওয়া কণ্ঠটা সখ্যতার
ডানায় ভর দিয়ে ভাসিয়ে দেন তিনি আমার দিকে,
"কলিম শেখ।"
বড় নিভন্ত সে স্বর! একটা অদ্ভুত তাড়ায় এবার পেয়ে বসে
আমাকে। সোজা কথায় ফিরে আসি,
“তা চাচা শুধু কি কাটা ফসলই চাষ করা হয়? এখন তো দেখছি
ওলকরা বসিয়েছেন। রবি খারিফ কিছু করেন না?”
ছুঁচোলো ধারালো মুসলমানি মুখটার নীচের দিকে থুতনির গোড়ায়,
এক গোছা বেজির লোমের মতন রং চোটে যাওয়া সাদা দাড়িতে তখন অস্থির হাওয়া লাগে। মুখটা আবার
নীচু হয়ে যায় নিজে থেকেই।
“গ্যামাকসিন দিলি পরে ছাপিলা বাঁচে নে।”
“ছাপ? মানে সাপ? কোথায়?”
কোনো জীবনবাদী দার্শনিকের এঁকে দেওয়া ধীর দাগের গভীর
রেখার মতন আঙ্গুল তুলে জঙ্গলের দিকে নির্দেশ করেন কলিম শেখ। বেশ কিছুক্ষণ আঙ্গুল তুলে
রেখে আবার নামিয়ে নেন। মহাকরুণার জাল বুনে, একটা ভয় ধরা বিস্ময় আর আতঙ্ক নিজের আবর্তে
ঘুরতে থাকে আমার চোখে মুখে। নিজের অগোচরে এক মারাত্মক ভুজঙ্গভীতি আমায় যেন পেয়ে বসেছে
তখন। অবশ্য এই বিশেষ মেরুদণ্ডী জীবটির প্রতি এক তীব্র আতঙ্ক বোধ করি সেই ছোট থেকেই।
খুব ছোটবেলায় তখন আমার বয়স বারো কি তেরো, আমাকে একবার সাপে কেটেছিল। পদ্মগোখরো, আমাদের
বাড়ির গোয়ালঘরে গরুর দুধে মুখ দিয়ে পেঁচিয়ে ছিল। লোকাল ওঝা থেকে হাসপাতাল সব কিছু করেও
টানা তিনদিন আমার জ্ঞান ফেরেনি!
আর কথা না বাড়িয়ে পা মেপে মেপে উঠে আসি সেখান থেকে।
একটু ঠান্ডা জলের আকণ্ঠ পিপাসায় তখন আমার ব্রম্ভতালুতে বেজে চলেছে বুভুক্ষু এক যন্ত্র
নিনাদ। জমি জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট ঢিবির মতন উঁচু মাটির নির্মাণগুলোর দিকে
চোখ পড়ে এবার। মাটির গায়ের গর্তগুলোই বোধহয় তেনাদের বাসা! জঙ্গলের দিক থেকে ভেসে আসা
অফুরন্ত ভেজা ভেজা গন্ধটাই যেন এই মুহূর্তে চারপাশ জুড়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া পাতার স্তুপের
মাঝে কেমোফ্লাজ করে পড়ে থাকা, অপার নৈঃশব্দ্যের সর্পগন্ধা!
কয়েক হাজার বছরের পুরোনো একটা অশ্বত্থ
গাছ। নানা অপ্রাপ্তিতে, নানা অবহেলায় তার চেহারার ফাটলটা আরো বড় হয়েছে। ঠিক সেখানটা
দিয়েই গলে বেরিয়ে এলো লোকটা। “হুর হুররর”, মুখ থেকে ভারী অদ্ভুত একটা শব্দ বের করছে
সে। সেই শব্দ শুনেই সামনের তালগাছের গুড়ি থেকে উঁকি মারতে থাকা তিনটে আদিবাসী ছেলেমেয়ে
এক ছুট্টে উধাও হয়ে গেলো, পাশের আদিবাসী বস্তিটার দিকে। দুটো ছোট ঢেকুর তুলে লোকটা
ক্রমশঃ এগিয়ে আসতে লাগলো আমার দিকে। দোহারা ছিপছিপে চেহারা, এক মাথা চুল আর দড়ির মত
পাকানো মুখ দেখলে মনে হয় এই গ্রামেরই লোক। হয়তো চাষবাস করে। ‘আমার সাথে কথা বলবে কি?’
এরকম একটা ভাবনার ভেতর দিয়েই আমার থেকে হাত পাঁচেক দূরত্ত্বে এসে লোকটি হঠাৎ বলতে শুরু
করে দিল,
“কলিম শেখের ঘর গিসলেন নাকি কত্তা? উহার জমিন দিখে আইলেন?”
উল্টো দিকের জামরুল গাছটা বেয়ে একটা কাঠবেড়ালি বার দুয়েক
উপরের দিকে উঠে তিনবার নীচের দিকে নেমে যায়। অস্ফুটে বলে উঠি,
“হ্যাঁ, লোকটা চাষবাস করে না?”
“চাষবাস কি করবে কত্তা? ও তো সাপেদের নিয়া ঘুমায়! সে
বড় সাংঘাতিক জিনিস কত্তা! এই বড় বড় দাঁড়াশ-খরিশ-কেউটে উহার ঘরটোয় জোড় নেগে পড়ি থাকতে
দেখছি। উহার ঘর, উহার জমিন সব ছাপেদেল বাস্তুভিটা কত্তা!” লোকটার চোখে জীবনের প্রতি
প্রগাঢ় ভালোবাসা খেলা করে যায়। পলক না ফেলা সাপেদের মতন শুকনো একটা দৃষ্টি দেয় সে আমার
দিকে। ভীষণ নিশ্চুপ, নির্ভার, উরোগামী সে দৃষ্টি!
“সাপেদের জন্য চাষ করে না? সত্যি?”
“ছাইড়েন তো কত্তা আফুটানী গপ্পো যত! বুড়ার তিনকূলে কেউ
নাই। সরকারের ভাতায় চলি যায় ভালো মতন। মরসুমে ঝিঙে, ওল, বেগুন, কপি চাষ করে। সেও গেরামে
ঘর ঘর বিলায়ে দেয়। ওই যে ন্যাংটা ছেলিগুলা, ওই যে দাঁড়ায়ে ছিল, ওগুলার মা কলিমের খেতি
কাজ করতো। একবার ঘন বোশেখে ফসল তুলতি যায়ে বাজ পড়ি মরি গেল। সেই থেইক্যা ওগুলা কলিমের
কাছেই থাকে, খায়, ইস্কুল যায়।”
এই অব্দি বলে লোকটা চুপ করল। চারপাশ আড়
চোখে দেখে নিয়ে, পা টিপে টিপে আমার দিকে সরে এল। তারপর আমার কানের ঈষৎ কাছে পাকা কামরাঙ্গার
মতন নিজের লম্বাটে মুখটা নিয়ে এসে বলল, “বাইরের লোক দেখলি ওগুলা ভিক্ষা চায়! সুযোগ
বুঝলি হাত থেকি জিনিস কারি নিয়া পালায়। সাইবধান কত্তা!” কথাগুলো শেষ করার সময় বুনো
শুয়োরের গুমর ভাঙার মত ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ করলো যেন লোকটা! গোটা মুখ জুড়ে একটা দেঁতো হাসি
এনে কলিম শেখের জমি বাড়ির দিকে চেয়ে মাথা নাড়তে লাগল। ঠোঁটের ফাঁকে তার বিড়ি খাওয়া
দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছে কালো পোড়া পর্দার মতন।
“আফুটানির গপ্পো কি বলবো কত্তা! ওই শালা কলিম একসময়
মস্ত চোর ছেল। আশপাশের গেরামে গেরস্থ বাড়িতে সিঁধ কাইটতো। দু দু বার জেল খেটিছে। তারপর
বসন্তে উহার বৌ মোলো। সাধু সাজি এখন কলিম কয় গোরে যাবির পর উহার জমিন এই আদিবাসীদের
দিয়া যাবি। উহাদেরই তো জমিন! লয় কি? শালা কয় কি, উহার আগে এই গেরামে আদিবাসীদের একটা
স্কুল খুলবি। উহারা নিজেদের ভাষা শিখবি, পড়বি! আফুটানি গপ্পো আর করে কয় কত্তা!”
লোকটা আবার দাঁত বার করে মাথা দোলাতে
থাকে শূন্যের দিকে চেয়ে। এতক্ষণে বোঝা যায় এটা ওর মুদ্রাদোষ! হয়তো ঠিক এই সময় ওর মন-মাথা
অন্য কিছু করার সংকেত দিচ্ছিল ওর স্নায়ুতন্ত্রে! ততক্ষণে আসছে শ্রাবণের ভরা কালো মেঘখণ্ডের
থেকে আগাম কোন সংকেত উলম্বভাবে ভেসে এসে ভেদ করে দিয়ে গিয়েছে ওর মগজের বৃত্তাকার সংবেদনশীলতাকে।
হয়তো তখনও ওর পুরো কথা বলা শেষ হয়নি। হয়তো তখনও বাকি রয়ে গেছে অনেকখানি এলেবেলে কনভার্সেশন!
এমন একটা সময়ে হঠাৎ লোকটা পেছন ফিরে হাঁটা শুরু করে দিল। যেদিক থেকে এসেছিল ঠিক সেইদিকেই।
দেখলে মনে হবে যেন এবেলা থেকে ওবেলার দিকে ক্রমশঃ চলে যাচ্ছে লোকটা। তবু এই চলে যাওয়ার
মধ্যে কোন ক্ষোভ নেই, কোনো বিষাদ বা অবসাদ নেই। শুধু মুহূর্তটায় দোষ গুণে ভরা এই গ্রামটার
আকাশ বাতাস জুড়ে ভেসে বেড়ায় একটা সমবেত গুঞ্জন। অনেকটা, পরিতক্ত্য কোন প্লাটফর্মে চলে
আসা মালগাড়ির মতন! আদিবাসী পাড়াটা জুড়ে ঘরে ঘরে শিশুরা হয়তো তখন সেন্থিলি পড়ছে। আর
কিছুক্ষনের মধ্যেই হয়তো এখানে সন্ধ্যা নেমে আসবে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটা নির্জন
আধ্যাত্মিকতা বাতাসে এসে মিশে গিয়ে, একটা প্রকান্ড কালো মেঘের সঞ্চার করেছে আকাশের
পশ্চিম দিকের কোণে, কোনো এক অজানা উত্তরের খোঁজ পাওয়ার আশায়। সত্যিই কি মাটির বাস্তুতন্ত্রের
একনিষ্ঠ প্রহরী হয়ে সাপেদের ক্ষতি করবে না বলে কলিম শুধু কাটা ফসল চাষ করে? নাকি সবটাই
আফুটানির গপ্পো?
