সত্যজিৎ
রায়ের চলচ্চিত্রে নারীর মূল্যায়ন
মিঠুন মুখার্জী
"নারীকে আপন ভাগ্য জয়
করিবার
কেন নাহি দিবে অধিকার।
হে বিধাতা?
('সবলা', রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)”
পুরুষ শাসিত সমাজ
ব্যবস্থায় নারী সত্যই পরাধীন। একবিংশ শতকে এসে নারী আপন ভাগ্য জয় করতে শিখলেও পুরুষের
তুলনায় নারীর গুরুত্ব ক্ষীণ। অথচ নারী সৃষ্টির কান্ডারী। পুরুষের পাশাপাশি তাদের গুরুত্বকে
অস্বীকার করা যায় না। প্রাচীন পৃথিবীতে নারীর উপর অকথ্য অত্যাচার হয়েছে। সবকিছুই
মুখ বুজে সহ্য করেছে সে। আবার কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে কেউ কেউ।
সে কারো জায়া, কারো জননী, কারো ভগিনী রূপে সমাজে অবস্থান করেছে। নারী এককথায় সর্বংসহা।
নারীকে
বাদ দিয়ে ভালো কোন কাজ যেমন হয়নি, তেমনি নারীকে নিয়েই সমাজের যত সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
নারীকে বাদ দিয়ে যেমন সাহিত্য সৃষ্টি হয়নি, তেমনি চলচ্চিত্রে নারীর অবদান অপরিসীম।
নির্বাক যুগ থেকে সবাক যুগ সবসময় নারীকে প্রয়োজন হয়েছে। কারণ, এই সমাজ নারী ও পুরুষের
যৌথ প্রচেষ্টায় এগিয়ে চলেছে। তাকে বাদ দিয়ে পুরুষ যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি নারীও।
তবে নারীকে দেখানোর দৃষ্টিভঙ্গি সবার চোখে এক রকম নয়। কেউ ঘরের চার দেয়ালে বা দাসি
বৃত্তিতেই নারীকে আবদ্ধ রেখেছেন। আবার কেউ নারীকে পুরুষের সমান করে দেখেছেন। যারা নারীকে
পুরুষের সমকক্ষ হিসেবে দেখেছেন তাদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য কিংবদন্তি চলচ্চিত্র
পরিচালক সত্যজিৎ রায়। তিনিই তার চলচ্চিত্রে নারীকে আপন ভাগ্য জয় করতে শিখিয়েছেন।
তিনিই ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রথম অস্কার বিজয়ী পরিচালক।
বাংলা চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায় সকলেরই পরিচিত একটি নাম।
তার চলচ্চিত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারী চরিত্রেরা ভিড় করে এসেছে। কেউ কেউ প্রধান আবার
কেউ কেউ অপ্রধান চরিত্রের ভূমিকা পালন করেছেন। তবে তাঁর সবকটি চলচ্চিত্রে যে নারীই
প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন এমন কিন্তু নয়। কোন কোন চলচ্চিত্রে নারীর ভূমিকা নগণ্য
বা নেই বললেই চলে। এমন কয়েকটি চলচ্চিত্র হলো 'সোনার কেল্লা', 'গুপিগাইন বাঘা বাইন',
'হীরক রাজার দেশে', 'জয় বাবা ফেলুনাথ' প্রভৃতি। কিন্তু বেশিরভাগ চলচ্চিত্রেই নারী
পুরুষের পাশে উজ্জ্বল ভূমিকা নিয়েছে।
সত্যজিৎ রায়ের প্রথম
চলচ্চিত্র 'পথের পাঁচালী' তে প্রধান নারীর চরিত্র আছে দুটি। সর্বজয়া ও দুর্গা। হরিহরের
পত্নী ও সংসার-সন্তান অন্ত প্রাণ এই সর্বজয়া। মা অন্নপূর্ণার মত সে সংসার ও সন্তানদের
আগলে রেখেছেন। অন্যায় সে একদম পছন্দ করেন না; তা অন্যে করুক কিংবা তার আপনজনেরা। তাই
অন্যায় করলে সন্তানদের শাসন করতে দেখা গেছে তাকে। অপরদিকে দুর্গা এই উপন্যাসে খুবই
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। হরিহর ও সর্বজয়ার কন্যা সে।বোন হিসেবে দুর্গাকে দেখা
যায় ভাইয়ের প্রতি স্নেহশীল, মমতাময়ী এবং রক্ষাকারী। যে কিনা ভাইয়ের হাত ধরে বন্ধুর
পথ অতিক্রম করতে সাহায্য করে।
অপু ও দুর্গার ট্রেন দেখার দৃশ্য, খেলাধুলা করা, ভাই বোনের সম্পর্ক সত্যজিৎ রায় অসাধারণ
ভাবে অঙ্কন করেছেন। বিভূতিভূষণের বাস্তব অনুভূতি থেকেই 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসের দুর্গার
আবির্ভাব ঘটেছে। সর্বজয়া ও দুর্গা দুজনেই উপন্যাসটিকে পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
কিন্তু দুটি চরিত্রের মৃত্যু দর্শকের হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে।
‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রের পর সত্যজিৎ রায়ের পরিচালিত
চলচ্চিত্র হল ‘অপরাজিত’। এই চলচ্চিত্রে সর্বজয়ার মৃত্যুর মুহূর্ত দেখানো হয়েছে। শহর
থেকে এসে অপু তার মা সর্বজয়াকে মৃত অবস্থায় দেখে ভেঙে পরে।
অপু ত্রয়ীর শেষ চলচ্চিত্র
'অপুর সংসার'। যেখানে প্রধান নারী হিসাবে অপর্ণাকে দেখানো হয়েছে। অপর্ণার স্বামী অপুর
প্রতি রোমান্টিক ভালোবাসা ও সাংসারিক দায়িত্ববোধ খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন সত্যজিৎ
রায়। অপুর সাংসারিক জীবনে ভাঙন ধরেছে অকালে সন্তান হতে গিয়ে অপর্ণার মৃত্যুতে। অপুর
জীবনে অপর্ণার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে খুব সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন তিনি। অপুর দারিদ্র্য
জীবনকে অপর্ণা মেনে নিয়ে সর্বংসহা নারীর পরিচয় দিয়েছে। এই চলচ্চিত্রে অপুর চরিত্রে
অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অপর্ণার চরিত্রে অভিনয় করেছেন শর্মিলা ঠাকুর।
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের
'আদরিনী' গল্প অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় পরিচালনা করেন 'দেবী' চলচ্চিত্রটি। এই চলচ্চিত্রে
প্রধান নারী চরিত্র দয়াময়ী। ১৮৬০ সালের পটভূমিকায় সেই সময়ের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের
অন্ধবিশ্বাসের বলি হওয়ার উদাহরণ যেন দয়াময়ী। সতের বছরের বালিকা বধূ, যার স্বামী পড়াশোনার
জন্য কলকাতা চলে গেলে শ্বশুর সেবায় ব্রতী হয় সে। পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থায় নারী কতটা
অসহায় তা এই চলচ্চিত্রে দেখিয়েছেন পরিচালক। কুসংস্কারাচ্ছন্ন শ্বশুর স্বপ্ন দেখে
পরদিন থেকে দয়াময়ীকে দেবী কালী রূপে জ্ঞান করে নমস্কার করা ও পুজো করা এবং দয়াময়ী
অসহায় ভাবে তা মেনে নেওয়ার মধ্যে নারীর প্রতি পুরুষের স্বেচ্ছাচার, নির্যাতন ও সামাজিক
দায় প্রকাশিত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের
'নষ্ঠনীড়' ছোটগল্পের অনুসরনে সত্যজিৎ রায় তৈরি করেছেন 'চারুলতা' চলচ্চিত্রটি। কর্মপাগল
পরিবারের কর্তা ভূপতির স্ত্রী চারু। যেকারণে সদ্য যৌবন প্রাপ্ত বধূ উচ্চবিত্তের সংসারে
থেকেও এককী। তার এই একাকিত্ব যেন বাঙালি সমাজের বহু নারীর প্রতিকৃতি। যে কিনা সামাজিকতা
রক্ষায় সুখী থাকার অভিনয় করে। তারপর তার সুপ্ত প্রতিভা জাগ্রত হয় যখন দেবর অমলের আগমন
ঘটে। তাদের মধ্যে মিশ্র অনুরাগ মিল-অমিলের অসম্ভব বা সম্ভাবতার চাইতেও বেশি। ১৮৭৯ সালের
প্রেক্ষাপটে নারীর ভালোবাসার বিভিন্ন রূপের আধার যেন চারুলতার চারু।
নরেন্দ্রনাথ মিত্রের
ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত সত্যজিতের ‘মহানগর’ চলচ্চিত্রটি। মুক্তি পায় ১৯৬৩ সালে। ছবিটি
যেন নারীর ক্ষমতায়নের চিত্রায়ন। সেই সময়ে গল্পের আরতি যেন নারী মুক্তির পটচিত্র। স্বামীর
চাকরি হারানোর পর মধ্যবিত্ত পরিবারের হাল ধরতে স্ত্রী হিসেবে আরতি বিক্রয়-প্রতিনিধির
কাজ শুরু করেন। ১৯৫০ সালের পটভূমিতে রক্ষণশীল পরিবারে এ যেন বাঁধ ভাঙার মতোই কঠিন।
তারপরও আরতির মাঝে থাকা প্রবল স্রোত সেই বাঁধ ভেঙে উপভোগ করে স্বাধীনতার প্রথম ধারণা।
শহুরে জীবনে নিজের অভ্যন্তরে থাকা চরিত্র পরিবর্তণ না করেই মুখোমুখি হয় বাস্তবতার।
স্বামী-স্ত্রীর পাশাপাশি পথ চলার এই গল্পের এই চিত্রায়ন খুব কম ছবিতেই সূক্ষ্মভাবে
ফুটে উঠতে দেখা গেছে। আরতি চরিত্রের মধ্যে দিয়ে একটা নতুনত্বের সন্ধান দিয়েছেন সত্যজিৎ
রায়। আরতি চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিখ্যাত অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়।
'দেবী' চলচ্চিত্র
নির্মাণের পর সত্যজিৎ রায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'পোষ্টমাস্টার' , 'মণিহারা' ও 'সমাপ্তি'
গল্প তিনটি নিয়ে তৈরি করলেন 'তিনকন্যা' নামক চলচ্চিত্রটি। ছোট্ট রতনের পোস্টমাস্টারের
প্রতি ভালোবাসা, মণিমালিকার স্বামীর থেকে সোনাকে অগ্ৰাধীকার দেওয়া ও তার ভয়ংকর স্বর্ণপিপাসা,
মৃন্ময়ীর পাগলীনি সত্তাকে দেখিয়েছেন তিনি। এই তিনটি কাহিনীর তিন নারী চরিত্রকে এনে
নারী চরিত্রের বিচিত্র রূপকে দেখাতে চেয়েছেন সত্যজিৎ রায়। রতনের বয়স ৮-৯ বছর , মণিমালিকার বয়স ২০-২৫ বছর ও মৃন্ময়ী ষোড়শী।
রতন চরিত্রে অভিনয় করেছেন চন্দনা বন্দ্যোপাধ্যায়, মণিমালিকার চরিত্রে কনিকা মজুমদার
ও মৃন্ময়ী চরিত্রে অপর্ণা সেন।
শর্মিলা ঠাকুরকে নায়িকার
চরিত্রে নিবার্চন করে আরও দুটি চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন সত্যজিৎ রায়। 'নায়ক' ও 'অরণ্যের
দিনরাত্রি'। নায়ক চলচ্চিত্রে একজন সাংবাদিক হিসেবে অভিনয় করেছেন তিনি। চরিত্রটির
নাম ছিল অদিতি। ট্রেনে করে যাত্রার সময় চলচ্চিত্রের নায়ক অরিন্দমের সঙ্গে তার দেখা
ও পরিচয় হয়। কথোপকথন সূত্রে অরিন্দমের সাক্ষাৎকার ও তার প্রতি ভালোবাসা এই চলচ্চিত্রের
বেশিরভাগ অংশ জুড়েই উপস্থাপিত হয়েছে। অদিতি চরিত্রের মধ্যে দিয়ে আধুনিকা ও বিচক্ষণ
নারীর উপস্থাপনা করেছেন তিনি। অরিন্দমের চরিত্রে অভিনয় করেছেন উত্তম কুমার। 'অরণ্যের
দিনরাত্রি ' সিনেমার শুটিং হয়েছে ঝাড়খণ্ডের কাছে। এখানে প্রধান নারী চরিত্র ছিল অপর্ণা।
অপর্ণা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শর্মিলা ঠাকুর। তার অসাধারণ অভিনয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়,
রবি ঘোষ ও শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়কে অবাক করে দিয়েছিল। এই চলচ্চিত্রে মুম্বাইয়ের
অভিনেত্রী সিমি গায়েওয়ালের অসাধারণ অভিনয় সকলের মন কেড়ে নিয়েছে। দুলি নামের এক
আদিবাসী মেয়ে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি।
১৯১৬ সালে কবিগুরু
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম চলিত ভাষায় ১৯০৫ সালে ঘটা ‘স্বদেশী আন্দোলন’-এর প্রেক্ষাপটে
‘ঘরে বাইরে’ নামক উপন্যাস রচনা করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে সত্যজিৎ রায় সেই উপন্যাস
অবলম্বনে ‘ঘরে বাইরে’ নামক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।এখানে প্রধান তিন চরিত্র বিমলা,
নিখিলেশ চৌধুরী, ও সন্দীপ মুখুজ্যে। ছবিতে অভিনয় করেন বিমলা চরিত্রে স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত,
নিখিলেশ এর চরিত্রে ভিক্টোর ব্যানার্জী এবং সন্দীপের চরিত্রে সৌমিত্র চ্যাটার্জী। বিমলার
স্বামী নিখিল জমিদার, আর পাঁচটা বিত্তশালী জমিদারের থেকে নিখিল একেবারেই আলাদা।নিখিল
চায় না তার স্ত্রী বিমলা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চাপে পড়ে নিজের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন
দেয়।আর পাঁচটা পর্দানশীন মেয়ের মতো দুর্বিষহ হয়ে উঠুক তার জীবন। সে চায় তার স্ত্রী
প্রথা ভেঙে অন্দরমহল থেকে বেড়িয়ে এসে আধুনিক যুগের সঙ্গে পরিচিত হোক। উদারমনস্ক নিখিলের
শখ তার স্ত্রীকে ইংরেজি শিখিয়ে, পশ্চিমা সঙ্গীত-সাহিত্য শিখিয়ে, পশ্চিমের পোশাক পরিয়ে
আধুনিক নারী রূপে গড়ে তোলার। অবশেষে নিয়মের শিকল ভেঙে স্ত্রীকে অন্দরমহল থেকে বাইরে
এনে এক বিপ্লব সৃষ্টি করে নিখিল। বিমলা তাঁর স্বামী ছাড়া জীবনে যে পুরুষটির কাছে এসেছিল
সে স্বদেশী বিপ্লবের নেতা তথা নিখিলের সহপাঠী সন্দীপ। জমিদার বন্ধু নিখিলের বাড়িতে
থেকে সেই গ্রামে সন্দীপ চালাতে থাকে তাঁর স্বদেশী আন্দোলনের কার্যকলাপ। চলচ্চিত্রে
সন্দীপ সারাদিন সবাইকে বিদেশি জিনিস বর্জন করে দেশি দ্রব্য গ্রহন করার পরামর্শ দেয়,
আবার দিন শেষে তারই বিদেশি সিগারেট ছাড়া চলে না।অন্দরমহলের চৌকাঠ পেরিয়ে সন্দীপের কাছে
আসতেই সন্দীপের বাচনশৈলীর মোহ বিমলাকে আকৃষ্ট করে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিমলা নিজেকে সামলাতে
না পেরে আত্মসংযম হারায়।শুরু হয় ত্রিকোণ প্রেমের উপাখ্যান,চলতে থাকে বিমলা সন্দীপের
গোপন অভিসার এবং বিমলার মনেও স্বদেশী মনোভাব গড়ে তুলতে সক্ষম হয় সন্দীপ।
ছবিতে প্রথম বার সত্যজিৎ
রায় বিমলা ও সন্দীপের এবং বিমলা ও নিখিলের চুম্বন দৃশ্য দৃশ্যায়িত করে সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে
সাহসিকতার পরিচয় দেন। ছবিতে নারী মুক্তির বিষয়কে অন্য আঙ্গিকে দেখানো হয়েছে। বিমলা,
নিখিল,সন্দীপ এরা শুধুমাত্র চরিত্র নয় এরা ভিন্ন চিন্তাধারা,ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ।
যার মধ্য দিয়ে তৎকালীন সময়ের বাংলাই প্রকাশিত হয়। ছবির শেষ দিকে বিমলা তাঁর ভুল বুঝতে
পেরে নিখিলের কাছে ফিরে আসে। নিখিলও খুব সাধারন ভাবে মানব মনের ভুল ভেবে নিয়ে বিমলাকে
ক্ষমা করে দেয় এবং কাছে টেনে নেয়। স্বদেশী আন্দোলনের জেরে উদ্ভূত দাঙ্গার সময় সন্দীপ
পালিয়ে যায় এবং দাঙ্গাকারীদের হাতে মৃত্যু হয় নিখিলের, বিধবা হয় বিমলা। ঘরের প্রতীক
বিমলা ও বাইরের প্রতীক সন্দীপকে কেন্দ্র করে এই ছবি ‘ঘরে বাইরে’।
অনঙ্গ বউ চরিত্রটি
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের "অশনিসংকেত" উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নারী
চরিত্র, যা সত্যজিৎ রায়ের একই নামের চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের অভিনেত্রী ববিতা অসাধারণভাবে
ফুটিয়ে তুলেছেন। এই চরিত্রটি গ্রামীণ সরলতা, নারীত্বের গৌরব, দাম্পত্য নিষ্ঠা ও পবিত্রতার
প্রতীক, যা উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা উভয়েরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে
তার জীবনচিত্র ফুটে ওঠে। অনঙ্গ বউয়ের মধ্যে গ্রাম্য সরলতা, নির্মলতা ও পবিত্রতার এক
অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায়, যা তাকে অন্যান্য চরিত্র থেকে আলাদা করে তোলে।স্বামীর প্রতি
তার অগাধ ভালোবাসা, আনুগত্য এবং দাম্পত্য সম্পর্কের প্রতি তার নিষ্ঠা চরিত্রটিকে মহিমান্বিত
করেছে। নারীত্বের গৌরব, সৌন্দর্য ও শুচিতার এক আদর্শ রূপ হলো অনঙ্গ বউ, যিনি কেবল সৎগুণে
পরিপূর্ণ।
'অশনি সংকেত' উপন্যাসের
পটভূমিতে যে দুর্ভিক্ষ নেমে আসে, সেখানে অনঙ্গ বউয়ের জীবনযাত্রা ও তার সম্পর্কের টানাপোড়েন
এই মহাকালের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। ১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সত্যজিৎ রায়ের 'অশনি সংকেত'
ছবিতে ববিতার অনবদ্য অভিনয় এই চরিত্রটিকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেয় এবং তিনি খ্যাতি
লাভ করেন।সত্যজিৎ রায় চেয়েছিলেন এমন একজন অভিনেত্রীকে, যার মধ্যে গ্রামীণ সারল্য রয়েছে,
যা ববিতার মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন। সুতরাং, অনঙ্গ বউ চরিত্রটি শুধু একটি কাল্পনিক
চরিত্র নয়, এটি গ্রামীণ নারীদের জীবন, তাদের সরলতা ও ভালোবাসার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি,
যা বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে এক বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।
সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে
অপ্রধান নারী চরিত্রগুলো সিনেমার মূল আখ্যানের পরিপূরক হিসেবে কাজ করলেও, তাদের উপস্থিতি
সবসময়ই অত্যন্ত অর্থপূর্ণ। এই চরিত্রগুলো খুব কম সময়ের জন্য পর্দায় এলেও, সামাজিক
বাস্তবায়ন, মানসিক টানাপোড়েন এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চিত্র নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে
তোলে।সত্যজিৎ রায়ের ছবির এমন কিছু উল্লেখযোগ্য অপ্রধান নারী চরিত্রের বিবরণ নিচে দেওয়া
হলো—
১) বানি : 'মহানগর'
চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র আরতির (মাধবী মুখোপাধ্যায়) ছোট ননদ হল বানি। জয়া ভাদুড়ীর
(বর্তমানে জয়া বচ্চন) অভিনীত এই কিশোরী চরিত্রটি পড়ালেখায় মনোযোগী, কিছুটা চঞ্চল এবং
সিনেমার তারকাদের নিয়ে কল্পনায় বিভোর। মধ্যবিত্ত পরিবারের সীমিত পরিসরের মধ্যে থেকেও
তার চিন্তা ও স্বপ্নগুলো বেশ উজ্জ্বল। সত্যজিৎ রায় অনেক ভেবেচিন্তে জয়া বচ্চন(ভাদুড়ী)কে
এই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নির্বাচন করেছিলেন।
২) মণি : চারুলতা
চলচ্চিত্রের চারুলতার (মাধবী মুখোপাধ্যায়) ননদ ও অমলের (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) বোন
হল মণি। সে তার স্বামীর সংসারে যাওয়ার আগে চারুলতার নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে এক সতেজ বাতাস
নিয়ে আসে। এই চরিত্রটি চলচ্চিত্রের কাহিনীকে মনোরম করে তুলেছে।
৩) নিরূপমা ও ইন্দিরা
ঠাকুরণ : 'পথের পাঁচালী' চলচ্চিত্রের দুর্গা ও অপুর বাবার কাকাঝি হল নিরূপমা। সে বয়সে
বৃদ্ধা এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল হলেও, তার মধ্যে গ্রামীণ অন্ধবিশ্বাস ও রক্ষণশীলতার পাশাপাশি
এক ধরণের সরলতা ও স্নেহ ফুটে ওঠে। ইন্দিরা ঠাকুরণ চরিত্রটিকে এই্ চলচ্চিত্রে খুবই স্বল্প
সময়ের জন্য দেখা গেলেও এই চরিত্রটির অসাধারণ অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। এই চরিত্রে
অভিনয় করেছেন চুনীবালা দেবী।
৪) বিলাসী : 'অশনিসংকেত'
চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র অনঙ্গর (ববিতা) প্রতিবেশী ও বান্ধবী ছিল বিলাসী। চরম দুর্ভিক্ষের
প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ নারীদের ক্ষুধা, বেঁচে থাকার লড়াই এবং পুরুষতান্ত্রিক শোষণের শিকার
হওয়া বিলাসী চরিত্রের মধ্য দিয়ে মর্মস্পর্শীভাবে ফুটে ওঠে। এই চরিত্রটির ভূমিকা চলচ্চিত্রে
স্বল্প পরিসরে থাকলেও দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
৫) মায়াদি : 'অরণ্যের
দিনরাত্রি' চলচ্চিত্রের অসীম ও তার বন্ধুদের বনভোজনে বেড়াতে গিয়ে শহরের আধুনিক, প্রগতিশীল
এবং কিছুটা রহস্যময়ী এক নারীর সাক্ষাৎ মেলে। তার উপস্থিতি পুরুষ চরিত্রগুলোর অহমিকা
ও দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুনভাবে প্রশ্ন করে। সেই চরিত্রটিই হল মায়াদি।
৬) তুলসী : 'সীমাবদ্ধ'
চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র শ্যামলের (বরুণ চন্দ) স্ত্রী হল তুলসী। যদিও সে চিত্রনাট্যের
একেবারে প্রধান অংশে নেই, তবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী কর্পোরেট জীবনে শ্যামলের পারিবারিক ভিত্তির
ভারসাম্য ও মানসিক আশ্রয়ের জায়গায় সে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই অপ্রধান চরিত্রগুলোর
ব্যাপ্তি সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু সত্যজিৎ রায় সেগুলোকে
এত নিপুণভাবে তৈরি করেছেন যে তারা খুব সহজেই দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।
প্রধান নারী চরিত্রের পাশাপাশি অপ্রধান এই নারী চরিত্রগুলি তার চলচ্চিত্রের কাহিনীকে
মহিমান্বিত করেছে।
পরিশেষে বলা যায়
বাংলা চলচ্চিত্রে নারী চরিত্রগুলিকে তাদের স্বতন্ত্র মহিমায় মহিমান্বিত করে তুলেছেন
অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়।
নারীদের পুরুষের পাশাপাশি সংসারে সমান গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। তবুও পুরুষতান্ত্রিক
সমাজে নারীরা কিছুটা অবহেলিত। তিনি দেখিয়েছেন পুরুষ ও নারী উভয়ের উপর ভর করেই সংসার
ও সমাজ টিকে থাকে। সত্যজিৎ রায় তার চলচ্চিত্রে নারী ক্ষমতায়নের এক নতুন যুগের সূচনাও
করেন, যেখানে নারীরা স্বাবলম্বী এবং কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই তাদের পুরুষ সঙ্গীদের
সাথে হাতে হাত ধরে চলে।
তথ্যসূত্র।।
১)। 'সত্যজিৎ রায় ১০০', সম্পাদক: সুমন
সেনগুপ্ত, 'দেশ' পত্রিকা।
২)) 'শতবর্ষের সত্যজিৎ রায়', সম্পাদনা:
কৌশিক পাল, 'আনন্দলোক' পত্রিকা।
৩)'সত্যজিৎ রায় তথ্যপঞ্জি', দেবাশিস
মুখোপাধ্যায়, 'সৃষ্টি' প্রকাশন।
৪)'সত্যজিতের ডায়েরি', সম্পাদনা: রাজ্যশ্রী
বক্সী, 'আজকে শ্রী' পত্রিকা।
