সম্পাদকীয় (৫ম বর্ষ) => প্রবাহমানতায় ভেসে

 

<(====( সম্পাদকীয় )====)>

প্রবাহমানতায় ভেসে

শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

ঈশ্বরের প্রতিবেশে আমি বড় একা

বহু বছর পর শারদীয়া দুর্গাপূজা রাজধানী তিলোত্তমা সহ রাজ্যের অনেকটা জুড়েই প্রাণোচ্ছ্বলতা পেয়েছে। দুর্গাপূজা শুধু বাঙালীর ধর্মবিশ্বাস নয়, সভ্যতা সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। কিন্তু বিগত দেড় দশক বাঙালীর সর্ববৃহৎ ও সর্বোত্তম উৎসব দুই লাগোয়া রাষ্ট্রের বাংলাতেই কমবেশি আক্রান্ত থেকেছে। বাংলাদেশে দুর্গাপুজোর বিরোধিতা, প্রতিমা ভাঙচুর, মণ্ডপ নোংরা করা ইত্যাদি সংবাদে নতুনত্ব নেই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গেও সদ্যপ্রাক্তন সরকারের অবস্থান ছিল গৃহস্থকে সতর্ক করে চোরকে চুরির সুবিধা করে দেওয়া। কিছু ক্লাবকে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থসাহায্য ও জাঁকজমকের সুবিধা দিয়ে হাত করে, আর মাদুর্গাকে কার্নিভালে অবতীর্ণ করিয়ে, অভূতপূর্ব প্যারেড দ্বারা চোখ ধাঁধিয়ে রাজ্যের প্রত্যন্ত ও গ্রামাঞ্চলগুলোতে মূর্তিপূজাবিরোধীদের চুরি-ডাকাতি-গুণ্ডামি-নষ্টামির ঢালাও অনুমতি দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা ব্যালান্স করা ছিল সরকারের অঘোষিত নীতি।

তাই মালদহ, মুর্শিদাবাদ, দুই দিনাজপুর থেকে দুই চব্বিশ পরগণা, বীরভূম, হাওড়া, হুগলি এমনকি খাস রাজধানীতেও বিশেষ সম্প্রদায় অধ্যুষিত অঞ্চলে পুজোর সঙ্গে প্যান্ডেল ভাঙা, প্রতিমা ভাঙচুর, গোমাংস ও বর্জ্য ফেলে রাখা ইত্যাদি উপসর্গ দেখতে জনতা অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছিল। আর তৎসহ নিত্যদিন অপরাধ বিশেষত ধর্ষণ, অপহরণ, ধর্মান্তরণ ও নারী-শিশু পাচারের মতো অপরাধকেও সমাজের স্বাভাবিক উপসর্গ বলে বাঙালী মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। দু-একটি ক্ষেত্র ছাড়া মিডিয়ার বিস্ময়কর নীরবতাতেও আমরা আর বিস্মিত হতাম না।

কিন্তু প্রতিদিন ভয়ে ভয়ে মরতে আর কতজনের ভালো লাগে? কতজনের কাছেই বা মেয়ের জীবনের বিনিময়ে কয়েক লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ বেশি লাভজনক মনে হয়? চাকরির বদলে ভিক্ষার মতো ভাতাতেই বা কতজনের অভাব মেটে? তাই মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন ও নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র হওয়ায় মনোগত ইচ্ছার প্রতিফলন ফেলতেও পেরেছে ইভিএম মেশিনে। কিন্তু SIR প্রক্রিয়া ও EVM মেশিনকে কাঠগড়ায় তুলে সংসদের বিরোধী নেতারা বৈদেশিক অর্থানুকূল্যে যতই গোলমাল করুন, মানুষের সমর্থন যে কেন্দ্রে বিদ্যমান শাসকদলের দিকেই কেন্দ্রীভূত, তা বাতাসে কান পাতলেই বোঝা যাচ্ছিল।

অনুপ্রবেশ ও অপরাধ জর্জরিত সীমান্তবর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের কাছে এই পরিবর্তন ছিল বাঁচা-মরার প্রশ্ন, যা নির্বাচনে অনেকাংশের উদাসীন শ্রেণীরও ৯০%-এর বেশি ভোটদানের মধ্যেই প্রতিফলিত। রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্য, চাকরি, অপরাধ দমন, শিল্পসংস্থা ইত্যাদির মাধ্যমে রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নের ব্যাপারে তাই রাজ্যবাসীর আশা ছিল প্রভূত। নতুন সরকার সেই আশা পূরণে চেষ্টা যে করেনি, তা নয়। কিন্তু দায়িত্বে আরোহণের মাসখানেক পর থেকেই একাধিক বিষয় নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি হয়ে গেল।

এখন নবগঠিত পশ্চিমবঙ্গ সরকার দায়িত্ব নিয়েই ৩৪+১৫=৪৯ বছর ধরে বিকশিত আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বাস্তুতন্ত্র তিন-চার মাসে বদলাতে পেরেছে, এমনটা সরকারে ক্ষমতাসীন কোনও মন্ত্রীও সম্ভবত দাবি করছেন না। প্রথম কয়েক মাস তো গেল তথ্য যাচাই করে প্রতিশ্রুত ভাতা দিতে এবং তাই নিয়ে বিতর্ক ও অভিযোগ সামলাতে, যার সঙ্গে রাজ্যবাসীর উন্নয়নের কোনও সম্পর্ক নেই। উপরন্তু কাজের নেশায় নেওয়া সরকারের বেশকিছু হটকারী পদক্ষেপ ও মন্তব্য তীব্রভাবে সমালোচিতই হয়েছে।

যেমন: রেলের জমি দখলমুক্ত করার জন্য হকার উচ্ছেদ। অন্ধ সমর্থক বা নতুন শাসকদলের সুয়ো হতে চাওয়া পাল্টিবাজরা যতই পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলার দোহাই দিক, ট্রেনে উঠে ফেরি করতেও বাধা ও মোটা জরিমানার জেরে হকারের আত্মহত্যার সংবাদও পাওয়া গেছে। শুধু রেলের জমি ও কামরা থেকে স্থানীয় গরীব ব্যবসায়ীদের তুলে দিয়ে বড় বড় কোম্পানির হাতে টেন্ডারের কৌশলে তুলে দিলে বিক্রেতারদের পেটে লাথি পড়ার পাশাপাশি ক্রেতা বা উপভোক্তাদের পকেটেও অতিরিক্ত মূল্যের চাপ পড়ে। একই ভাবে পথচারীদের অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে ফুটপাথ থেকেও পসার ভাঙা অভিযানের ফলাফলও অনুরূপ। ভাইপো ব্যানার্জীর অবৈধ প্রাসাদ বা জাভেদ খান-পুত্রের ৮০টি অবৈধ অট্টালিকা ও নির্মাণ অক্ষুণ্ন রেখে গরীবের কুটিরে বুলডোজ়ার চললে জনমানসে তার প্রভাব অনুকূল হওয়ার কথা নয়, হয়ওনি।

দ্বিতীয়ত: নারীনির্যাতনে এখনও রাশ টানতে পারেনি পূর্ণ বহুমত পেয়ে ক্ষমতাসীন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার। শিকার ও শিকারীর সাম্প্রদায়িক সম্পর্কও পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য মেনে বাংলাদেশের অনুরূপ। এই ব্যাপারে বিজেপি সরকার অন্তত কঠোর দমনমূলক অবস্থান নেবে, আশা করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানেও রাজ্যবাসী এখনও পর্যন্ত আশাহত। মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যম যথারীতি ঘটনাগুলির সুপরিচিত সাম্প্রদায়িক অভিমুখ দেখে নীরব থাকে বলে সমাজমাধ্যমে ভেসে আসা সংবাদই ভরসা— যেগুলো থেকে পরিসংখ্যান নিষ্কাশন সহজ নয়। একমাত্র বারুইপুর নাবালিকা গণধর্ষণ ও হত্যা কাণ্ড, যেখানে হিন্দু নরপশু দ্বারা মুসলিম নারীমৃগয়ার ব্যতিক্রমী উদাহরণ পাওয়া গিয়েছিল, সেটা নিয়েই মিডিয়া থেকে সোশাল মিডিয়া উত্তাল ছিল। এর সঙ্গে সেই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নারীপাচারেরও আভাস ভেসে উঠেও কোথায় যেন হারিয়ে গেল। মাঝখান থেকে যোগী বা হিমন্ত কেতায় এনকাউন্টার যে পশ্চিমবঙ্গের জনরোষ শান্ত করার বদলে বিতর্ক উস্কে দেয়, সেটাই প্রমাণ হল। অথচ বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা ও আইনের ফাঁক এড়িয়ে দ্রুত অপরাধ দমনে এই পদ্ধতিটির উপযোগিতা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এবার আসি দুর্গাপুজো প্রসঙ্গে। পুজোর তিন মাস আগে ছোটোখাটো ব্যবসায়ীদের সৎভাবে পরিশ্রমজাত উপার্জনের পথ রোধ করায় তাদের যা হওয়ার তা তো হয়েইছে; উপরন্তু কিছু অনাবশ্যক মৌখিক বিধিনিষেধ বিজেপি-র বাঙালীবিরোধী ভাবমূর্তিতে শিলমোহর দেওয়ার সুযোগ করে দিল। দুর্গাপূজাকে শারদীয়া উৎসব বা শারদোৎসব বলা যাবে না, পুজো ম্যারাপের কাছাকাছি বামপন্থী ন্যারেটিভের নাস্তিক বই বিক্রি করা চলবে না, মণ্ডপে আমিষ খাওয়া চলবে না, ডিজে বাজানো চলবে না, মণ্ডপে ভক্তিগীতি ছাড়া চটুল গান বাজানো চলবে না, প্রতিমার মুখ শিল্পের খাতিরে উদ্ভট করা চলবে না, থিম-পুজো চলবে না … ইত্যাদি পুজো আরম্ভের আগেই বহু বাঙালীকে অহেতুক যুগপৎ তটস্থ ও রুষ্ট করে দিল।

মধ্যপ্রদেশে এক কুখ্যাত জমিদস্যুর ভাই জনৈক বাবাজীর বাঙালী তার প্রাণের পুজো নাকি ঠিকভাবে করে না, পুজোমণ্ডপের পেছনে পশুমাংসের মতো “গন্দে গন্দে খানা” পাকিয়ে খায়, আমিষভাজী বলে বাঙালী “পাখণ্ডী”, হিন্দুধর্ম থেকে পরিত্যক্ত হওয়ার যোগ্য ইত্যাদি মন্তব্য শাসকদলের সমর্থন পাওয়ায় বাঙালীকুলে আমিষ ও নিরামিষ পন্থীদের মধ্যে স্পষ্টত বিভাজন দেখা দিল, যার ধাক্কায় শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, স্বামী বিবেবাকনন্দকে নিয়েও কুরুচিকর কার্টুন ও মিম ছেয়ে ফেলল সমাজ মাধ্যম।

অথচ উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গের বেশকিছু তথাকথিত সংখ্যালঘু বা দ্বিতীয় সংখ্যাগুরু অধ্যুষিত অঞ্চলে মণ্ডপ নির্মাণে বাধা, মূর্তি ভাঙা, পুজো বাতিল ইত্যাদির মতো অপ্রীতিকর ঘটনা এবারেও ঘটেছে। বাঙালীর বিদ্রোহও দারুণ বাছাইকামী। অবাঙালী হিন্দুদের মাতৃপুজো সংক্রান্ত অযাচিত উপদেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে যতটা সরব, পুজোবিরোধী বিকৃত মরুমস্তিষ্কদের প্রতি ততটাই আনত প্রশ্রয়ী। সুতরাং পুজোর আগেই একটা দ্বিমুখী দ্বন্দ্বে দ্বিধান্বিত ছিল পশ্চিমবঙ্গবাসী।

কিন্তু বাস্তবে দেখছি শহরাঞ্চলে, অন্তত রাজধানী মহানগরীতে পুজোর ঔজ্জ্বল্য, আড়ম্বর, শিল্পভাবনা, আনন্দ ও ভোজনরসে এতটুকু আড়ষ্টতা নেই। বরং প্রতিবেশী দেশে গ্রহণ লাগা মাতৃপূজার আবহে নিজেদের জাঁকজমক নিয়েই যেন লজ্জিত লাগছে। তার ওপর কলকাতার চোরবাগানের পুজোমণ্ডপে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। প্রবল বৃষ্টিতে বাহিরদ্বারে জমেছিল দর্শনার্থীর ভিড়। তার মধ্যে প্যান্ডেল ভেঙে পড়ছে রটনায় হুড়োহুড়ি করে বেরোতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ চলে গেল ১৯ জনের, আহত আরও অনেকে।

সরকার তৎক্ষণাৎ আহতদের কলকাতা মেডিকেল কলেজে (CMC) ভর্তি করিয়ে প্রয়োজনে রোগীর পরিবারের পছন্দমতো হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি দিয়েও চিকিৎসকের ছদ্মবেশে কিছু রাজনৈতিক জীবের আক্রোশ থেকে রক্ষা পেল না। সেইসব ডাক্তারের বক্তব্য: কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের মতো টার্শিয়ারি বা উচ্চতম চিকিৎসাকেন্দ্র যেখানে রাজ্যের জেলাগুলি থেকে জটিল রেফার করে পাঠানো হয়, সেখান থেকে প্রাইভেট হাসপাতালে রোগীকে স্থানান্তরিত করার সুপারিশ করা হবে কেন এবং সেই সুপারিশ কি রাজ্যে স্বাস্থ্যব্যবস্থার বেহাল দশাই স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে না, যদিও ওটা সুপারিশ নয় রোগীর পরিবারের ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে পছন্দমতো হাসপাতালে স্থানান্তরণের ব্যবস্থা মাত্র। অথচ ডাক্তাররা নিজেরাই স্বীকার করছেন, CMC-তে ট্রমা কেয়ার সেন্টার অর্থাৎ দুর্ঘটনার পর উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই; নিউরো সার্জারির জন্যও চিকিৎসক ও ব্যাবস্থাপনার অভাব রয়েছে। ফলে ঐ দুটি প্রয়োজনে তাঁরা নিজেরাই আরজি কর বা অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে রোগী পাঠিয়ে থাকেন। তাহলে প্রায় অর্ধশতাব্দীপ্রাচীন বেহাল স্বাস্থ্যপরিষেবার জন্য মাত্র পাঁচ-ছ মাস ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারকে দায়ী করে স্ববিরোধী অভিযোগ কেন?

আমাদের রাজ্যের যা রাজনৈতিক ঐতিহ্য, তাতে দুর্ঘটনা নিয়েও রাজনীতি হবে, সেটা বিস্ময়কর কিছু নয়। বিস্ময়কর নয়, এই মর্মান্তিক ঘটনার পরেও জনতার উচ্ছ্বাসে এতটুকু ভাঁটা না পড়া। এপার বাংলা তো দশকের পর দশক ধরে চলে আসা ওপার বাংলার পরিকল্পিত দুর্গাপুজো ম্যাসাকার নিয়েও রাগত বা মুহ্যমান কোনোটাই নয়। হয়তো এটাই প্রবাহমান জীবনের ধর্ম; সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাও।।

ঈশ্বর আমি তোমার সৃষ্টি নই,

তূমিই আমার নির্মাণ

শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

Post a Comment

Previous Post Next Post