“তাজী বোররাখ আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার!” => অরিজিৎ ঘোষ

 

“তাজী বোররাখ আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার!”

     অরিজিৎ ঘোষ

                                                                                                                                               (ছবির সুত্র: অন্তর্জাল)

কথামুখ: সাহিত্য শব্দটা খুব ছোট, কিন্তু এর ব্যাপ্তি বিশাল বিভিন্ন অঙ্গের কবিতা, গল্প, নাটক, গান সবক্ষেত্রে মনোরঞ্জনের জন্য লেখা হয়নি। বহুক্ষেত্রে সেগুলি যেমন সমাজের আয়না হয়ে উঠেছে পাশাপাশি একটা দেশের, একটা জাতির জীবন সংগ্রামের, প্রতিবাদের অনুঘটকের কাজ করেছে। লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তার প্রমাণ তবে সে সবের ব্যাখ্যায় না গিয়ে বলতেই হয় ভারত তার ব্যতিক্রম নয়। খুব বাস্তব হল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাস শুধুমাত্র রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, সশস্ত্র  অভ্যুত্থান- এসব দিয়ে বিচার করলে হবে না। উল্লেখ করা যেতেই পারে পরাধীন ভারতে ‘জনগণ’-র মনে জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ কখনো পরোক্ষ ভাবে সেই সময়ের বেশ কিছু সাহিত্যিকদের লেখা গল্প, উপন্যাস, গান, কবিতা, নাটক অন্যতম প্রভাবশালী ও সুদূরপ্রসারী হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস আর ‘বন্দেমাতরম’ গান বিশেষত ‘বন্দেমাতরম’ শব্দ যে প্রভাব রেখেছিল তা বোঝাবার জন্য প্রবন্ধ পড়ার দরকার নেই এছাড়াও একাধিক রবীন্দ্র সংগীত, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, চারণকবি মুকুন্দ দাস, দীনবন্ধু মিত্র সহ আরো অনেক সাহিত্যিকদের কলম তরবারি হয়ে উঠে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে আঘাত করেছিল ও অনেক ক্ষেত্রেই সফল হয়েছিল।

        এই সাংস্কৃতিক জাগরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগ্রামীর নাম কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বলা যায় পরাধীন ভারতে একাধিক নজরুলগীতি ও কবিতা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে বিপ্লবীদের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। প্রবন্ধকার আব্দুল আল আমিন এর মতে নজরুলের আগে বাংলা সাহিত্যে আর কেউ এমন করে বলতে পারেননি ‘আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস’ কিংবা ‘আমি মানি নাকো কোনো আইন’। বাস্তবিক বাংলা সাহিত্যে ‘প্রোটেস্ট পয়েট্রি’ রচনার ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃতের দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম গ্রন্থ তিনি উৎসর্গ করেছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের বিপ্লবী বীর বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে। সাধারণভাবে প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ প্রিয়জনকে উৎসর্গ করা হয়, কিন্তু তিনি তা করেননি। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি, গোঁড়ামি, ধর্মীয় সংকীর্ণতা তাকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি বলে তিনি এ কাজটি করতে পেরেছিলেন। উৎসর্গপত্রে তিনি লিখলেন, ‘ভাঙা বাংলার রাঙা যুগের আদি পুরোহিত সাগ্নিক বীর বারীন্দ্রকুমার ঘোষ শ্রীচরণাবিন্দেষু’। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বইয়ের প্রচ্ছদনির্মাতা।

        এ আলোচনাতে মূল বিষয় হবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যের ভূমিকা বা প্রভাব। এটা স্বীকার করে নিয়েই এই লেখা যে, নির্দিষ্ট ক্রমে তাঁর প্রভাব ও অবদান সম্পর্কে লেখা হবে না। উপরে উল্লেখ করা সকল সাহিত্যিকদের এই বিষয়ে প্রভাব, অবদানকে মাথায় রেখেও বলা যায় নজরুল ছিলেন সর্বাধিক বিদ্রোহী ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর। কারণ তাঁর লেখনী পরোক্ষ ভাবে নয় সরাসরি যুদ্ধংদেহী রূপ নিয়েছিল। একাধিক প্রতিকুল অবস্থা থেকেও কিভাবে নজরুলগীতি ও কাব্য ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢেলেছিল তার সবক্ষেত্রে গভীরে না গিয়ে কিছুমাত্র ‘চরণ’ স্পর্শ করে যাওয়া হবে।

শুরুর সেদিন: অধুনা পশ্চিম বর্ধমান জেলার (তৎকালীন বর্ধমান জেলা) আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া ব্লকের চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম কাজী নজরুল ইসলামের। বাংলা ১৩০৬ সালের ১১ জৈষ্ঠ (ইংরাজি ১৮৯৯, ২৪ মে), বাবা কাজী ফকির আহমেদ, মা জাহিদা বেগম। ছোট বেলায় কবি পরিচিত ছিলেন দুখু মিয়া নামে। পিতার দ্বিতীয় বিবাহের ষষ্ঠ (কোনো কোনো মতে পঞ্চম) সন্তান নজরুল ন’বছর বয়সে পিতৃহারা হন একাধিক উপায়ে অর্থ রোজগারের পর শেষদিকে যোগ দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে।  এই জীবন সংগ্রামের পর বিশেষত ১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ৪৯ নং বাঙালি পল্টনের হাবিলদার জীবনের শেষ প্রান্ত থেকে (১৯২০ সালের মার্চ মাসে এই রেজিমেণ্ট ভেঙে যায়) অনেক বেশি করে তিনি সাহিত্য চর্চা করছিলেন। কাজী নজরুলের স্বাধীনতা চেতনার শুরু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন থেকেই। ১৯১৭ সালে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে করাচিতে থাকাকালীন তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের স্বরূপ দেখেন। একজন ভারতীয় সৈনিক হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝিয়ে দেয় যে, ব্রিটিশরা ভারতীয়দের শুধু ব্যবহার করছে। সেখান থেকেই তাঁর ভেতরে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। সেনাবাহিনী ছেড়ে এসে তিনি কলমকে অস্ত্র করেন। এই সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতাই তাঁকে সাধারণ কবি থেকে একজন বিপ্লবী কবিতে পরিণত করে।

        নজরুলের সঙ্গীত বা নজরুল গীতি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মিছিল ও জনসভাগুলোর অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। বিশেষ করে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’, ‘চল চল চল’ এবং ‘জাগো অনশনবন্দী’ গানগুলো রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে অভূতপূর্ব উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার আলবার্ট হলে ভারতবর্ষের আপামর জনগণের পক্ষে কবিকে যে ঐতিহাসিক জাতীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল, সেখানে সভাপতিত্ব করেছিলেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এবং প্রধান বক্তা ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নজরুল সাহিত্যের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব মূল্যায়ন করতে গিয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর ভাষণে যে মন্তব্য করেছিলেন, তা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নজরুলের স্থানকে চিরস্থায়ী করে দেয়। নেতাজি বলেছিলেন:

“We may not be able to sing like Nazrul, but when we go to the battlefield, we shall sing his songs. When we go to prison, we shall still sing his songs. His writings have a strange power to stir the dead soul of the nation.” এই বক্তব্যই বুঝিয়ে দেয় নজরুলের গান সাহিত্য গুণের পাশাপাশি ছিল সশস্ত্র ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দানের রণসংগীত। পরবর্তীকালে নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজের অন্যতম গান হিসেবে ‘চল চল চল! / ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল, নিম্নে উতলা ধরণি তল’ নিয়মিত গাওয়া হত। এই ২০২৬ এও কী এ গান আর গাওয়া হয় না?

প্রতিবাদের বিস্তার:

এস বিদ্রোহী মিথ্যা সূদন আত্মশক্তি বুদ্ধ বীর
আনো উলঙ্গ সত্য কৃপাণ, বিজলি ঝলক ন্যায় অসির।

                                              আত্মশক্তি বিষের বাঁশি ১৯২৪

“KAZI NAZRUL ISLAM, often referred to as a ‘REBEL POET,’ was a remarkable Bengali poet, writer, composer, and revolutionary who played a pivotal role in INDIA’s struggle for Independence.”- by Amir Suhail Wani

সেই সময় ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন এবং ১৯২২ সালে চৌরিচৌরা কাণ্ডের পর গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত করলে তরুণ সমাজ হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে তৎকালীন প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মূলত পরোক্ষ, প্রতীকী ও সংস্কারমুখী। এই মাহেন্দ্রক্ষণে ‘কবি’ র নানা সাহিত্য সৃষ্টি ভারত তথা আপামর বাঙালির স্বাধীনতা, জীবন সংগ্রামে লড়াইয়ে প্রেরণার উত্‍স হয়ে উঠেছিল।

“কারার ঐ লৌহ- কপাট... হা হা হা পায় যে হাসি, ভগবান পরবে ফাঁসি!...” না মাঝের আর পরের লাইন গুলি লিখলাম না, জানি আপনি মনে মনে গাইছেন। সেই সময়ের তরুণ বিপ্লবীরা হাতে গীতা নিয়ে, ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি আর এই গান হাসি মুখে গাইতে গাইতে ব্রিটিশদের উপহাস করে ফাঁসির দড়ি নিজেরাই গলায় পরতেন। একটু পিছু হাঁটা যাক- সালটা ১৯২১, ডিসেম্বর মাস অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হয়ে কারাবাস হল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এর। এই ঘটনায় সারা বাংলায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তখন চিত্তরঞ্জন দাশ ‘বাঙ্গলার কথা’ সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন, এই পত্রিকাতেই লেখা দেওয়ার আমন্ত্রন যায় কবির কাছে। পাঠিয়েছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবী। প্রথম প্রকাশ হয় ২০শে জানুয়ারি, ১৯২২ সাল (৬ই মাঘ, ১৩২৮ বঙ্গাব্দ) শিরোনাম ‘ভাঙার গান’। পরবর্তীতে এই সৃষ্টি ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশ পায়। স্বদেশী আন্দোলনের বন্দীরা সমবেত কণ্ঠে এই গান গাইতেন, এই গান গাওয়ার তীব্রতা ব্রিটিশ জেলের ভিত নড়িয়ে দিত। যেকোনো ব্রিটিশ বিরোধী মিছিল, ধর্মঘট বা জনসভায় এই গানটি গাওয়া মাত্রই অবদমিত জনতার মধ্যে এক অভূতপূর্ব শক্তির সঞ্চার হতো। লাঠি বা বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েও বিপ্লবীরা গাইতেন “লাথি মার, ভাঙরে তালা / যত সব বন্দী- শালায় আগুন- জ্বালা।” এই গানের জন সম্মোহনী প্রভাবের কারণে শাসক ঐ বছরের ১১ নভেম্বর এই গান সহ ‘ভাঙার গান’কে রাজদ্রোহিতার অভিযোগে বাজেয়াপ্ত ও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

প্রতিরোধের প্রাচীর:        

             “বল বীর-

             বল উন্নত মম শির!

             শির নেহারি’ আমরি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির! ....”

এখনো যদি কোথাও উচ্চারিত হয় তাহলে এক শিহরণ জাগে। খেয়াল রাখতে হবে এ কবিতা (বিদ্রোহী) লেখা হয়েছিল ১৯২১ এর ডিসেম্বর মাসে, তখন তিনি সদ্য যুদ্ধ ফেরত বাইশ বছরের যুবক। ২৫ তারিখে লেখা এই কবিতা তিনি প্রথম শুনিয়েছিলেন তাঁর বন্ধু মুজফফর আহমেদকে, যা শুনে শুধু তিনি নন পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার আঁচ পেতে চাওয়া বাঙালি তরুণ সমাজ উদ্দীপিত হয়ে উঠেছিল। এর প্রথম প্রকাশ হয়েছিল ১৯২২ সালে ৬ জানুয়ারী, ‘বিজলী’ পত্রিকায়। গান্ধীজির ‘অসহযোগ’ আন্দোলন পরিত্যাগ ব্রিটিশদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রভাব ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুব সমাজের কাছে ‘মানসিক অসহযোগ’ এর উত্তাপ শুরু করেছিল।

১৯২২ সালেই ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত ‘ধূমকেতু’ র ১৩শ সংখ্যার সম্পাদকীয় অংশে ‘ধূমকেতুর পথে’ নামক প্রবন্ধে সরাসরি সংঘাতের পথে নামলেন কবি নজরুল ইসলাম। যার একটা প্রেক্ষাপট আছে, ভারতের তৎকালীন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতারা ব্রিটিশ শাসনে থেকে ‘ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস’ বা স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আলোচনা চালাচ্ছিল, যার তীব্র বিরোধিতা করেন কবি, ঐ সংখ্যায় তিনি লেখেন “সর্বপ্রথম, ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ- টরাজ বুঝি না, ... ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের হাতে।” এই লেখার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অপরিসীম, কারণ ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ‘পূর্ণ স্বরাজ’ বা স্বাধীনতার প্রকাশ্য ও লিখিত আনুষ্ঠানিক দাবি। এবং এর সরাসরি প্রভাব একাধিক গোপন বিপ্লবী দল যারা গান্ধীজির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সশস্ত্র সংগ্রাম চাইছিলেন যেমন যুগান্তর ও অনুশীলন সমিতির সদস্যদের উদ্বুদ্ধ করেছিল।

এর কিছু মাস পরেই তাঁর নিজের সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার (২৬ সেপ্টেম্বর, আগমনী সংখ্যা) লিখলেন ‘আনন্দময়ীর আগমনে’

                        জাগ্ রে তোরা, জাগ্ রে এবার, রক্তমাখা চরণতলে,
                        দে মা এবার শান্তিবারি, এই ভারতে দাবানলে।

এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় সকল পাঠকের জানা, তাই বিস্তারিত লিখলাম না। এই কবিতার প্রভাব বুঝতে পেরে ইংরাজ শাসক ৮ নভেম্বর এই সংখ্যা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, একই সাথে পত্রিকা বাজেয়াপ্তও করে। শেষ অবধি ২৩ নভেম্বর নজরুলকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর পরের ইতিহাস ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সোনার কালিতে লেখা। সেই ঐতিহাসিক বিচারপ্রক্রিয়ায় কবি কোনো আইনজীবী নিযুক্ত করেননি এমনকি কোনো ক্ষমা প্রার্থনাও করেননি। এর বদলে, ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি আদালতে যে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন, তা ইংরেজ শাসকের অহমিকাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তাঁর সেই লেখা ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে ইতিহাসের এক অসামান্য দলিল হয়ে রয়েছে। “আমার ওপর অভিযোগ, আমি রাজদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দী এবং রাজদন্ডে দণ্ডিত... রাজার পক্ষে রাজার নিযুক্ত রাজবেতনভোগী, রাজকর্মচারী। আমার পক্ষে  সকল রাজার রাজা, সকল বিচারকের বিচারক, আদি অনন্তকাল ধরে সত্য জাগ্রত ভগবান। ... রাজার বাণী বুদ্‌বুদ্, আমার বাণী সীমাহারা সমুদ্র। আমি ‘অমৃতস্য পুত্রঃ’।” ১৬ জানুয়ারি আলিপুর সেশন কোর্টের বিচারপতি কবিকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।

ব্রিটিশরাজের ভয়ের কারণ:

ওই অত্যাচারীর সত্য পীড়ন

আছে, তার আছে ক্ষয়;
সেই সত্য আমার ভাগ্য বিধাতা
যার হাতে শুধু রয়।

‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ প্রেসিডেন্সি জেল কলিকাতা ৭ জানুয়ারি, ১৯২৩ রবিবার

“রাজবন্দীর জবানবন্দী” লিফলেট আকারে জেলের বাইরে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তুমুল গণআন্দোলন শুরু হয়।

The prisoner is a young man of considerable literary ability and poetic talent... The language of the poem is highly inflammatory and is calculated to excite disaffection and hatred towards the Government established by law in British India. I sentence him to one year’s rigorous imprisonment.

১৯২৩ সালের জানুয়ারি মাসে আদালতের রায়ের পর নজরুলকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তিনি প্রায় আড়াই মাস জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্তবন্দি ছিলেন। ব্রিটিশরা ভেবেছিল জেলে পুরে নজরুলের বিপ্লবী চেতনাকে স্তব্ধ করে দেওয়া যাবে, কিন্তু বাস্তবে ঘটে উল্টোটা। নজরুল জেলের ভেতরেও তাঁর অদম্য প্রাণশক্তি দিয়ে এক উৎসবের পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। জেলে রাজবন্দীদের পায়ে ভারী লোহার বেড়ি বা শিকল পরিয়ে রাখা হতো। নজরুল সেই শিকলের ঝনঝনানি শব্দকে তালের মতো ব্যবহার করে জেলের ভেতরেই গেয়ে উঠতেন তাঁর স্বরচিত গান— “এই শিকল পরা ছল আমাদের এই শিকল পরা ছল...”। এই আলীপুর জেলে বন্দী থাকাকালীন ১৯২৩ সালের বসন্তকালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সদ্য রচিত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। রবীন্দ্র অনুগামী পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় যখন এই সুখবর এবং বইটির প্রতিচ্ছবি নিয়ে আলিপুর জেলে নজরুলের সাথে দেখা করতে যান, তখন নজরুল আনন্দে জেলের ভেতরেই নাচতে শুরু করেছিলেন।

        জেলে বসেই তিনি রচনা করেন ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ এর মতো কালজয়ী গান। আলিপুর জেলের ভেতরে নজরুলের তুমুল জনপ্রিয়তা, গান গেয়ে বন্দীদের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া এবং তাঁর অবাধ্য স্বভাব দেখে জেল কর্তৃপক্ষ চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারে নজরুলকে এখানে রাখলে জেলের ভেতরেই বিদ্রোহ ফেটে পড়বে। তাই কবিকে শাস্তি দিতে এবং সাধারণ বন্দীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে ১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিল আলিপুর জেল থেকে অত্যন্ত গোপনে এবং কড়া নিরাপত্তায় দূরবর্তী হুগলী জেলে স্থানান্তরিত করা হয়, আর এর পরেই জেলবন্দী থাকা অবস্থায় করেছিলেন বিখ্যাত ৩৯(মতান্তরে ৪০)দিনের আমরণ অনশন।

কবির শারীরিক অবস্থা চরম আশঙ্কাজনক হয়ে পড়লে সারা বাংলায় তোলপাড় শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দূর শিলং থেকে বিখ্যাত টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন— “Please give up hunger strike. Our literature claims you.” অনশন ত্যাগ করো, আমাদের সাহিত্য তোমাকে চায়, যদিও ব্রিটিশ জেল কর্তৃপক্ষ সেই টেলিগ্রাম নজরুলের হাতে পৌঁছাতে দেয়নি। অবশেষে ২৩ মে কবির পরম শ্রদ্ধেয়া ও স্নেহময়ী বিরজাসুন্দরী দেবী জেলে এসে নিজের হাতে কবিকে লেবুর শরবত খাইয়ে এই ঐতিহাসিক অনশন ভঙ্গ করান। নজরুলের এই অনশন শুধু নিজের আত্মমর্যাদার লড়াই ছিল না, এটি ছিল পরাধীন ভারতবর্ষের সমস্ত বিপ্লবীর অধিকার আদায়ের এক মহাকাব্যিক সংগ্রাম।

        নজরুলের সাহিত্যের প্রভাব এতটাই মারাত্মক ছিল যে ব্রিটিশ রাজশক্তি ভয় পেয়ে তাঁর একের পর এক বই— অগ্নিবীণা আংশিক, বিষের বাঁশী, ভাঙার গান, প্রলয়শিখা, চন্দ্রবিন্দু এবং যুগবাণী সম্পূর্ণ বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। ঝিলিমিলি ও আলেয়া নাটক, ‘অগ্নিবীণা’, ‘ফণিমনসা’, ‘সঞ্চিতা’, ‘সর্বহারা’, ‘‍রুদ্রমঙ্গল’ এগুলির প্রভাবও যথেষ্ঠ ছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামে নজরুলের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল তিনি আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে তুলে ধরা। তাই লিখেছিলেন “মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম”এর মতো কাব্য। কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গান শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছে। ব্রিটিশদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল হিন্দু-মুসলিম বিভেদ। নজরুল এই অস্ত্রটিকেই ভোঁতা করে দেন। তিনি একই হাতে শ্যামাসঙ্গীত ও ইসলামী গজল রচনা করেছেন। তাঁর এই অসাম্প্রদায়িক চেতনা ব্রিটিশদের বিভাজন নীতির বিরুদ্ধে ছিল এক প্রত্যক্ষ ও শক্তিশালী আঘাত। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম এক সময়ে ধর্মীয় উগ্রতায় রূপ নেয়। ১৯২৬ সালের ২ এপ্রিল কলকাতার রাজারাজেশ্বরী মিছিলকে কেন্দ্র করে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা বেধে যায়। ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর মদদপুষ্ট এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নজরুলকে ভীষণভাবে আঘাত করে। তিনি ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় লিখলেন
‘‘
অসহায় জাতি মরেছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ/ কাণ্ডারী। আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ/ ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম’? এই জিজ্ঞাসে কোন জন/ কাণ্ডারী! বলো, ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র।” ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের প্রেক্ষাপটে তিনি সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে ভারতের দুই বৃহৎ ধর্মীয় সম্প্রদায় তথা হিন্দু ও মুসলমান যদি একতাবদ্ধ হয়ে একদেহে একই স্বার্থে স্বাধীনতার লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম হয় তাহলে বৈরী অমানবিক শক্তি নস্যাৎ হতে বাধ্য।

কাজী নজরুল ইসলাম কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না, তিনি কোনো গোপন বিপ্লবী দলের সদস্যও ছিলেন না। কিন্তু তিনি যা করেছেন, তা অনেক রাজনৈতিক নেতার চেয়েও বেশি। তিনি ভারতের মানুষকে ভয় পেতে ভুলিয়ে দিয়েছিলেন। ব্রিটিশরা বন্দুক দিয়ে শরীরকে বন্দী করতে পারত, কিন্তু নজরুল মানুষের মনকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। মহাত্মা গান্ধী অহিংসার পথ দেখিয়েছিলেন, নেতাজি সশস্ত্র সংগ্রামের পথ দেখিয়েছিলেন, কিন্তু নজরুল দেখিয়েছিলেন মানসিক বিদ্রোহের পথ। তিনি শিখিয়েছিলেন “মাথা নত না করা”ই হলো প্রথম স্বাধীনতা। তাই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর প্রভাব ছিল প্রত্যক্ষ, অনস্বীকার্য এবং চিরস্থায়ী। যতদিন ভারতের আকাশে স্বাধীনতার সূর্য উঠবে, ততদিন সেই সূর্যের আলোয় নজরুলের ‘বিদ্রোহী’র তূর্য ধ্বনিত হতে থাকবে।

মনে রাখবো যা:                           গাহি সাম্যের গান

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,

নহে কিছু মহীয়ান।

আজ আমরা স্বাধীন। লালকেল্লায় তেরঙ্গা ওড়ে, স্কুলে- কলেজে জাতীয় সঙ্গীত বাজে। কিন্তু এই স্বাধীনতার বাতাসে আজও কি নজরুলের সেই ধূমকেতুর গন্ধ মিশে নেই? তিনি কোনোদিন ক্ষমতার অলিন্দে যেতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন মানুষের মনে স্বাধীনতার বীজ বুনে দিতে। তিনি সফল হয়েছিলেন। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, স্বাধীনতা মানে শুধু একটি মানচিত্রে অন্য রঙ লাগা নয়, স্বাধীনতা মানে মনের ভয় থেকে মুক্তি। নজরুল স্বাধীনতাকে শুধু ব্রিটিশদের তাড়ানো হিসেবে দেখেননি। তিনি দেখেছিলেন প্রকৃত স্বাধীনতা মানে দারিদ্র্য, শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্তি। তাই তিনি লিখলেন ‘সাম্যবাদী’। তাঁর ‘কুলি- মজুর’ কবিতাগুলো ভারতের খেটে খাওয়া মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে এই স্বাধীনতা সংগ্রাম তাদেরও। ইংরেজরা চলে গেছে, কিন্তু আজও যখন সমাজে অন্যায়, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা, দারিদ্র্য মাথা তোলে, তখনও নজরুল প্রাসঙ্গিক। কারণ তিনি শুধু ব্রিটিশ বিরোধী কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন সকল প্রকার পরাধীনতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কবি। তাই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদান কোনো একটি অধ্যায়ে লিখে শেষ করা যাবে না। তিনি সেই সংগ্রামের প্রাণভোমরা। তাঁর কবিতা ছিল মন্ত্র, তাঁর গান ছিল রণবাদ্য, আর তাঁর জীবন ছিল এক জ্বলন্ত মশাল। সেই মশাল আজও জ্বলছে, জ্বলবে- যতদিন একজন ভারতীয়ও অন্যায়ের সামনে মাথা নত করতে অস্বীকার করবে, ততদিন নজরুল বেঁচে থাকবেন আমাদের প্রতিটি শিরা-উপশিরায়।

 

তথ্য ও গ্রন্থ সূত্র:

Intelligence Bureau, Government of Bengal. _Fortnightly Report_, 15 March 1923. National Archives of India, New Delhi.

Bose, Subhas Chandra, Speech at Albert Hall, Calcutta, 15th December 1929, As reported in The Amrita Bazar Patrika, 16th December 1929,

Nazrul, Kazi. _Agnibina_. Nabajatak Prokashani, Kolkata, 1922. "Bidrohi" first published in _Bijli Patrika_, 6 January 1922.

_King Emperor vs Kazi Nazrul Islam_. Judgement by Mr. E.P. Chapman, Sessions Judge, Alipore, 16 February 1923. Calcutta High Court Records.

Nazrul, Kazi. _Rajbandir Jabanbandi_. _Dhumketu Patrika_, 14 August 1923.

Nazrul, Kazi. _Bhangar Gan_. Sebak Prokashani, Kolkata, 1923. "Karar Oi Louho Kapat" song.

Karim, Abdul. _Nazrul Geeti: A Study_. Bangla Academy, Dhaka, 2001. P 45.

Nazrul, Kazi. _Sondhya_. _Sondhya Patrika_, 1929. "Chol Chol" song.

Bose, Sisir K. _The Indian National Army: The Last War of Independence_. Netaji Research Bureau, Kolkata, 1995. P 105.

Speech at Singapore, July 1943.

Basu, Anjali. _Medinipur and the Freedom Movement_. Ananda Publishers, Kolkata, 2005. P. 210.

Nazrul, Kazi. _SindhuHindol_. Gurudas Chattopadhyay, Kolkata, 1927. "Thakbo Nako Boddho Ghore" song.

Nazrul, Kazi. _HinduMusalman_. _Langol Patrika_, 1925.

Nazrul, Kazi. _Samyabadi_. Gurudas Chattopadhyay, Kolkata, 1925.

Chatterji, Joya. _Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 19321947_. Cambridge University Press, 1994. P 91.

Tagore, Rabindranath. Letter to Kazi Nazrul Islam, 25 April 1926. _Rabindra Rachanabali_, Vol 18. VisvaBharati, 1990. P 342.

Dutta, Krishna & Robinson, Andrew. _Rabindranath Tagore: The MyriadMinded Man_. Bloomsbury, London, 1995. P 343.

Hossain, Rafiqul. _Kazi Nazrul Islam: A Biography_. Bangla Academy, Dhaka, 2010. P. 195-201.

Talukdar, Pabitra. "Nazrul and the National Movement". _Journal of Bengal Studies_, Vol 4, No 2, 2014. P. 55-70

Home Political Department Government of Bengal, File No. 345/Poll/1924, National Archives of India, New Delhi.

মিত্র অরুণ কুমার নজরুল জীবনের সত্য ও তথ্য, সাহিত্য প্রকাশ, কলকাতা, ১৯৮২ পৃ. ৮৯-৯২

রাজবন্দীর জবানবন্দী, আর্য পাবলিশিং হাউস, কলকাতা, ১৯২৩, পৃ ৭৯

ঘোষ শঙ্খ, বাজেয়াপ্ত নজরুল, প্যাপিরাস, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃ. ২২-২৮

ইসলাম রফিকুল, কাজী নজরুল- ইসলাম জীবন ও সাহিত্য, প্রথম প্রকাশ, ঢাকা পৃ. ১৪২

আহমেদ মুজফ্ফর , কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি কথা, ন্যাশনাল বুক এজেন্সী, কলকাতা, ১৯৬৯, পৃ. ৩৪-৪০

মুখোপাধ্যায় প্রভাতকুমার, নজরুল চরিতকথা, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৮৫, পৃ ১০২-১০৫  


 

 

 

Contact Address:

Arijit Ghosh. ‘Monosrija’  

62/A, Arabinda Pally Main Road, (Near Shishu Udyan). Post Office: Saradapally.

PIN: 712124; City: Bhadreswar; District: Hooghly;  Phone & Messaging:  +91 9836189528 

Email:  [ghosharijit0077@gmail.com]

 

Post a Comment

Previous Post Next Post