হকার হটাও ট্রেডার বাঁচাও
কাঁকিনাড়ায় বৃদ্ধ হকারের আত্মহত্যার খবরটা ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে গিয়েছে, মানুষ শুনেছেন কার্তিক সাউ'য়ের ঘটনা। ট্রেনে হকারি করবার "অপরাধে" সম্প্রতি তাকে ১৪০০ টাকা ফাইন করা হয়েছিল, উপরন্তু কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানসিক অবসাদেও ভুগছিলেন - রবিবার সকালে নিজের পসরা স্টেশনে রেখে তিনি দূরপাল্লার ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়েছেন...
বহু লোকজন আছেন যারা এবারেও বোঝাতে আসবেন যে এই হকারগুলি সমাজের কী পরিমাণ ক্ষতি করছে। এদের দেওয়া ঠোঙা ট্রেন ময়লা করছে, ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে, নিজের বাড়ির চাতালে বসিয়ে ঝালমুড়ি বেচতে বলুন, আপনি দেখতে গেছেন কেন ঝাঁপ দিয়েছে - ইত্যাদি ইত্যাদি.... কিন্তু তারা কি জানেন যে তার আগের দিন'ই RBI এবং TransUnion CIBIL ভারতের ২০০ জন ঋণখেলাপি পলাতকের লিস্ট পাবলিশ করেছে যাদের মোট ফ্রডের অ্যামাউন্ট ৩ লক্ষ কোটি। তিনের পরে মাত্র ১২'টা শূন্য।
লিখলে খানিকটা এরকম দেখায় - ৩০০০০০,০০,০০,০০০
আর ২০১৪ থেকে ২০২৩ অবধি যত কর্পোরেট ঋণ "রিটন অফ" হয়েছে তার পরিমাণ - ১৯০০০০০,০০,০০,০০০ (আরেকটা সংখ্যা বেশি - ঊনিশ লক্ষ কোটি)
যদি বিদেশী ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া ঋণ'ও সাথে জুড়ে দিই তাহলে সংখ্যাটা হয় - ২৫০০০০০,০০,০০,০০০ (দ্বিতীয় অঙ্কটার থেকে মাত্র ৬ লক্ষ কোটি বেশি)
বিজয় মাল্য, নীরব মোদীর পরেই যে গুণধরের নাম আসে, সে হল মেহুল চোক্সী। নাম তো শুনেছেন কেউ কেউ - সে একের পর এক মোট নয়টি ব্যাঙ্ক থেকে লোন তুলেছিল। সে আর তার কোম্পানি গীতাঞ্জলি লিমিটেড - মিলিত ভাবে প্রায় ১৪ হাজার কোটি লুটেছে... মাত্র দশটা শূন্য। কিন্তু আপনি একটা লোন ডিফল্ট করে আরেকটা লোন তুলে দেখান দেখি... ছাড়ুন, তিনমাস EMI না দিয়ে দেখান দেখি!!
একই ভারতবর্ষের দুজন মানুষ - একজন ১৪০০ টাকা ফাইন দিয়ে অবসাদগ্রস্ত হয়ে আত্মঘাতী হয়, অন্যজন ১৪ হাজার কোটি টাকা চুরি করে অন্য দেশের প্রিমিয়াম গ্যালারিতে বসে ক্রিকেট ম্যাচ উপভোগ করে বলিউড নায়িকাদের সাথে নিয়ে। এদিকে সরকার তাদের খুঁজেই পায় না! সরকার তাদের আনতে পারে নাকি পারে না বাদ দিন, সরকার বলেছে এই ঋণখেলাপিকে নাকি "ফ্রড" বলা যায় না। কারণ সবার নাম তো সামনেই আছে! এটা লিটেরালি সরকারের বক্তব্য!!!
দেখুন আমাদের দেশে গরীব রোজ মরছে। এই কার্তিক সাউ আজ না মরলে কাল হয়ত ট্রেনের পাদানি থেকে পিছলে পড়ে মরত, নয়ত পরশু হার্টের রোগে বিনা চিকিৎসায় মরত... তাকে নিয়ে বিচার চাইবার বা বাজার গরম করবার কোনো ইচ্ছেই আমার নেই - আমি জানতে চাইছি আপনারা, যাদের আর্থিক অবস্থা ওই কার্তিক সাউয়ের থেকে সামান্যমাত্রই ভালো, তারা কেন কার্তিকদের মতন মানুষদের উপরে সহানুভূতিশীল নন?
কাল ভগবান না করুক আপনার পরিবারের কারও কঠিন কোনো রোগ হলে আপনিও হয়ত ঘটি বাটি বেচে খোলা আকাশের তলায় দাঁড়াবেন - এটাই তো প্রখর বাস্তব এখন এই দেশের।
গত বারো বছরে যাদের নেট ওয়র্থ ১২০০% বেড়েছে তাদের জন্যে কোন স্বার্থে গলা ফাটাচ্ছেন আপনারা? আপনাদের এখনও কোনো সন্দেহ আছে যে বিজেপি শুধুমাত্র বড়লোকদের পার্টি? যত বড়লোক ঋণখেলাপি করে পালিয়ে যায় তাদের টাকা কাদের থেকে তোলা হয় জানেন? আশা করি একেবারে অন্ধভক্ত না হলে বুঝতেই পারবেন যে আপনার আমার থেকেই তোলা হয়। মিনিমাম অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স মেইনটেনেন্সের নামে, অতিরিক্ত ATM ট্রানজেকশনের নামে, SMS অ্যালার্ট ফি, ডেবিট কার্ড, মেইনটেনেন্স ফি, সিগনেচার ভেরিফিকেশন... আরও কত কী!!
আর যাদের থেকে তোলা হচ্ছে তারা কারা? ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক বলছে ভারতবর্ষে কেউ দিনে যদি ২ ডলার (approx) অর্থাৎ ১৯০ টাকা মতন রোজগার করে তাহলেই সে আর গরীব নয়। কিন্তু নীতি আয়োগ রিপোর্ট বলছে ভারতের একটা বড় অংশ ১০০ দিনের কাজের উপরেই নির্ভরশীল। ১০০ দিনের কাজের গড় মজুরি কমবেশি ২৫০ টাকার কাছাকাছি - কিন্তু সরকার গড়ে ৪৩ দিন কাজ দিতে পারছে তাদের... অর্থাৎ বছরে তাদের আয় ৪৩×২৫০ = ১০,৭৫০ টাকা। মানে দৈনিক আয় ২৯ টাকার মতন।
এই মানুষগুলিকে গরীব থেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত বানানোর জন্যে অনান্য দেশ হলে কী করত? এদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করত, কোনো স্কিল ডেভেলপমেন্ট করবার সুযোগ করে দিতো... কিন্তু মোদী সরকার কী করেছে? বলেছে প্রথমে তো রোজগারের সংখ্যাটা কমিয়ে ৫৪ টাকা করো... যাতে ৫৪ টাকা দিনে রোজগার করলেই আর কাউকে গরীব না বলা যায়। তারপরে তাদের আসল গড় রোজগারের সাথে সরকারি স্কিমগুলিকে জুড়ে দাও। মানে কেউ যদি রেশনে ৫ কিলো চাল পায় তাহলে তার মাসিক রোজগারে ১৫০ টাকা জুড়ে দাও, কেউ উজ্বলার গ্যাস পেলে সেখানে ৯৫০ টাকা, কেউ কৃষক সম্মান পেলে তাকে বছরে ৬,০০০ টাকা জুড়ে দাও... ইত্যাদি। এইভাবে হিসেব করে দেখা গেল ২০২৪'এ এসে ভারতে আর মাত্র ১১ কোটি গরীব পড়ে আছে... বাকি সবাই বড়লোক। তাই এখন কোটিপতি হকার আর অস্থায়ী দোকানদারদের উচ্ছেদ করা চলছে যাতে সবাইকেই ভাতার আওতায় আনা যায়, এবং ভাতাজীবি গরীবদের গড় ইনকাম আরও বাড়িয়ে দেখানো যায়।
নতুন ভারতে আপনাদের স্বাগত - এখানের মিডিয়া এইসব তথ্য আপনাকে শোনাবে না। কারণ ২০১৪ - ২০২৩, এই দশ বছরে গোদী মিডিয়াকে সরকারের পক্ষ থেকে মোট ২২ হাজার কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নরেন্দ্র মোদীর মুখ ওয়ালা বিজ্ঞাপন ছিল ১৫ হাজার কোটি টাকার মতন। তবুও অদৃষ্টের পরিহাস দেখুন.... যে গোদী, মোদিকে আঁকড়ে ধরে উপরে উঠতে চাইছিল - সেই চাটুকারিতাই তাদের লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ভারতের সবথেকে বড় ৬'টা মিডিয়া হাউজের বার্ষিক মুনাফা যেখানে ২০১৪ সালে ছিল ৭৬১ কোটি টাকা - সেটা ২০২৩ সালে কমতে কমতে এসে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ২৫৪ কোটি টাকা... তারপরের হিসেব আমার কাছে নেই কিন্তু ডেটা বলছে প্রতি বছর ১২% মানুষ টিভিতে খবর দেখা ছেড়ে দিচ্ছেন। ভোট আর খেলা না থাকলে মানুষ খবর বিমূখ হচ্ছেন। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ ধীরে ধীরে গায়েব হয়ে যাচ্ছে... TRP কমছে।
মিডিয়ায় এসব হিসেব নেই কিন্তু কিছু মানুষ সব হিসেব যত্ন করে রেখে দিচ্ছে। আপনার বৃদ্ধ বাবা মা - আপনার কোলের সন্তানকে জাল ওষুধ খাইয়ে ইলেক্টোরাল বণ্ডের অবৈধ ১৬ হাজার কোটি টাকা চুরি করেছে - সে টাকা অবৈধ ঘোষণা হওয়ার পরেও ফেরত দেয় নি, দেশের স্বার্থে জণগনের দেওয়া PM Care Fund এর ৭ হাজার কোটি টাকা পুরোটাই চুরি করে নিয়েছে। হিন্দু হিন্দু বলতে বলতে মানুষের ভক্তির - ভালোবাসার রাম মন্দিরের অনুদান... সব চুরি করে নিয়েছে। আপনার জল, জঙ্গল, জমি তো বাদ দিন - পাতের খাবার পর্যন্ত চুরি করে নিয়ে বেচে দিয়েছে আদানী - আম্বানি - জিন্দালদের হাতে। সব হিসেব থাকছে...
এই সরকার আর বেশিদিন নেই। আগামী সরকার এলে মনে রাখবেন এখানে যে অবস্থায় বাম বা তৃণমূলকে আপনারা পেয়েছেন - তার থেকেও খারাপ অবস্থায় দেশে বিজেপিকে পাবেন। দেশদ্রোহী চোর বিজেপিকে সমর্থন করবার আগে সাবধান.... সবার হিসেব হবে কিন্তু অচিরেই।
