বাঙালিয়ানা মানে ভারতবিরোধিতা নয় => শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

 বাঙালিয়ানা মানে ভারতবিরোধিতা নয় =

শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

পুনার বিয়েবাড়িটি ছিল একটি বাঙালী কায়স্থ পরিবারের। এদের আদি বসত ভাগলপুরে। অধুনা বিহারের এইসব অঞ্চলে একদা প্রচুর বাঙালীর বসবাস ছিল। বস্তুত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অঙ্গই ছিল অঙ্গ, বঙ্গ ও কলিঙ্গ। বৃহত্তর বাংলাই বলা যায়। সেখানকার বাসিন্দা মহেন্দ্র ঘোষের পানি চৌকি বা জলসত্ত্ব নেওয়া ছিল। এই মহেন্দ্র ঘোষের বংশধররা নিজেদের রাঢ়ী কায়স্থ বলে এবং সারা ভারতে কর্মসূত্রে ছড়িয়ে গেলেও নিজেদের মধ্যে দৃঢ় আত্মীয়তা বন্ধন বজায় রাখে। সত্যি বলতে কী, বাঙালী ব্রাহ্মণদের মধ্যে এই মিলমিশ নেই। ভাইয়ে ভাইয়ে, বোনে বোনে বনিবনাও তুলনায় অনেক কম। ব্যক্তিগত উদাহরণ আপাতত অপ্রাসঙ্গিক।

 

এই বিবাহবাসরে আলাপ হল এক মৈথেলী মহিলার সঙ্গে। তিনি বললেন, হিন্দীটা আমরা ব্যবহারিক প্রয়োজনে শিখেছি ঠিকই, কিন্তু বাড়িতে আমার ছেলেমেয়েদের মৈথেলীতে কথা বলতে বলি। আমার মাতৃভাষা তো হিন্দী নয়, মৈথেলী। কেন ছাড়ব নিজের ভাষা? কেন ভুলতে দেব আমার সন্তান সন্ততিদের?

ঠিকই তো। মৈথেলী একটি ধ্রূপদী ভাষা। আমরা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও পড়েছি মৈথেলীর কথা। বর্তমানে দেবনাগরী লিপি ব্যবহারে বাধ্য হলেও মৈথেলীর আসল লিপি হুবহু বাংলার মতো।মৈথেলী ব্রাহ্মণরা আমাদের মতোই মাছ-মাংসের ভক্ত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিহারের ভোজপুরী, মৈথেলী, মগধী ইত্যাদি ভাষাভাষীদের বোঝানো হয়েছে, তাদের মাতৃভাষা আসলে হিন্দীর উপভাষা, যে ভাষাটাকে আধিকারিক ভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সবে ১৯৫২ সালে। বিহারীরা সেটাই বুঝেছে এবং ভাষার প্রশ্নে বিহারভুক্ত বাংলার অংশ মানভূম সিংভূমে ও ধলভূমে বাঙালী ও বাংলাভাষী আদিবাসীদের ওপর প্রচণ্ড জোরজুলুমও চালিয়েছে, যদিও অসমীয়াদের মতো নৃশংস গণহত্যা চালায়নি। 

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-র বিপুল বিজয়ের পরেই কিছু ভক্তের এই মর্মে পোস্ট দেখলাম: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-র জয় হিন্দুদের এক জাতি রূপে প্রতিষ্ঠা করেছে। তার মধ্যে ভাষা ও জাতিগত স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার চেষ্টা মানেই হল বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা এবং অবশ্যই দেশদ্রোহ। 

এখন মারাঠীরা মারাঠী জাতিসত্তা ও ভাষা নিয়ে গর্বিত হয়েও ভারতীয় দেশপ্রেমী হতে পারে; গুজরাটী, বিহারী, তামিল, তেলেগু, পাঞ্জাবী-- কারোর নিজের জাতিসত্তা রক্ষা করে এবং ভাষা সংস্কৃতি নিয়ে গর্বিত হয়ে রাষ্ট্রবাদী দেশপ্রেমী ভারতীয় হতে সমস্যা নেই। শুধু বাঙালীর জন্য শর্ত হল, ভারতীয় দেশাত্মবোধ থাকলে তোমাদের বাঙালিয়ানা নিয়ে সচেতনতা ছাড়তে হবে। অথচ বিপরীত মেরুর প্রবল হিন্দুবিদ্বেষী গোষ্ঠী একটি স্লোগান আউড়ে গেরুয়া দলে ঢুকে হিন্দুত্বের পিণ্ডি চটকে দিলেও আপত্তি নেই। ঐ স্লোগানটা দিলেই হল!

নিতান্ত হাতে গোনা কয়েকজন সমর্থককে এন্টালির ৫০০ গুণ্ডার বাহিনীর বিজেপি-তে যোগদান বা অনুরূপ কাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখলাম। বাকিরা এখনও দলান্ধ হয়ে সবরকম অসঙ্গতির ওপর পর্দা ফেলার অসম্ভব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে শাসিয়েও রাখছে, প্রশ্ন করলেই তোমাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী দেশদ্রোহী হিসাবে শনাক্ত করা হবে।


আবার একবার বিহার ও বাংলার তুলনামূলক অহিংস সংঘাত প্রসঙ্গে আসি। কারণ সেই ইতিহাস থেকে অনেক শেখার আছে। 

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহারের ছুতোয় আসলে বাংলার অনেকটা অংশ নবনির্মিত বিহার ওড়িষা রাজ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ভাষাগত জোরজুলুমের জেরেই সেখানে দীর্ঘ ৫১-৫২ বছর ভাষা আন্দোলন চলে, আর তার ফলেই মানভূমের একটি অংশ পুরুলিয়া জেলা রূপে ১৯৫৬-র ১লা নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গভুক্তি বা বাংলায় ফেরে। বাঙালীর ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ছিল সেই পর্ব, যখন পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস, সিপিএম, হিন্দু মহাসভা সবাই একজোট হয়ে সেই আন্দোলনে মানভূমের বাঙালীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল।

এই প্রসঙ্গে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতেই হচ্ছে বিহারীদের প্রতি, যারা বাধা দিলেও এবং লাগাতার জুলুমবাজি ও নানান উপদ্রব চালালেও বাঙালীর ওপর খুনখারাপি ধর্ষণ চালায়নি। বরং রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী যখন রাজ্যের সীমা নতুন করে নির্ধারিত হয়েছিল, তখন পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার জন্য কিসানগঞ্জ জেলা থেকেও খানিকটা আপত্তি সত্ত্বেও বিহার দিয়ে দেয়। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শাসানি ছিল, বাংলা যদি নিজেদের দাবি প্রত্যাহার না করে, তাহলে বিহারের বাকি অংশে বাঙালীদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলা হবে। তা সত্ত্বেও সিংভূম ও ধলভূম যখন ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের কিছুটা নমনীয়তার কারণে বিহারেই থেকে গেল তখন তেমন অত্যাচারের কথা কিন্তু শুনিনি, যতখানি অত্যাচার আসামে বাঙালীর ওপর চলানো হয়েছিল। রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের সুপারিশ মতো গোয়ালপাড়ার পশ্চিমবঙ্গে আসার কথা ছিল। কিন্তু অসমীয়াদের অযৌক্তিক ও হিংস্র প্রতিরোধেই সেটা সম্ভব হয়নি-- তারা বাঙালীকে সহ্যও করবে না, যেতেও দেবে না। সেখানে বাঙালী যুগপৎ সাম্প্রদায়িক ও প্রাদেশিক হিংসার প্রকোপে একের পর এক গণহত্যার বলি হয়। সেসব কথা আজ শুভদিনে না হয় বাদ থাক। 


শুধু আমার হিন্দুত্ববাদী ভাইটিকে বোঝাতে চাই: 

হিন্দুত্ব হল এমন একটা সূতো যা ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে প্রাচীনকাল থেকে বেঁধে রেখেছে মালার মতো করে। কিন্তু বাঙালী বাঙালীর মতো করেই হিন্দু ছিল ও থাকবে, গুজরাটীরা গুজরাটীর মতো করে, মারাঠীরা মারাঠীর মতো করে। সবাইকে এক সূতোয় গাঁথতে গিয়ে যদি বাঙালিয়ানা নামক রত্নটি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা হয়, সেটাই হবে আসল বিভেদ, নিজস্ব জাতিসত্তা রক্ষার চেষ্টা কখনোই নয়। রামধনুর সাতটি রঙ পৃথকভাবে চেনা যায় বলেই তা সুন্দর। সব একত্র করে দিলে সাদা আর সব বাদ দিলে কালো। আমাদের দেশেও নানা বর্ণের ছটা মেনে নিতে অসুবিধা কোথায়? 


কিন্তু বাঙালীর এমন পোড়া কপাল যে তারা আজ এই সত্য মানতে রাজি নয়। পালাবদলের প্রক্রিয়ায় এমনভাবে বাঙালী ছেলেদের মস্তিষ্ক প্রক্ষালিত হয়েছে, যে নিজেদের দেশপ্রেমী সাব্যস্ত করার তাগিদে নিজেরাই নিজেদের জাতিসত্তা ত্যাগ করতে চাইছে। বুঝতে চাইছে না, রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে আমরা ভারতীয়, কিন্তু আমাদের জাতিসত্তা বা জাতীয়তা বাঙালী। এর মধ্যে কোনও বিরোধ বা কনফিউশন নেই, থাকা উচিত নয়। আমরা যুগপৎ জাতীয়তাবাদী ও রাষ্ট্রবাদী হতে পারি, একটির বিনিময়ে অন্যটি নই। আমার একাধিক জাতীয়তাবাদী গ্রন্থেই এই বিরোধ এবং বিভ্রান্তি কাটানোর চেষ্টা করেছি।


মহারাষ্ট্রে সকল জাতীয়তাবাদী তথা রাষ্ট্রবাদী সগর্বে বলে "জয় মহারাষ্ট্র"। কিন্তু বাংলায় "জয় বাংলা" মানে দেশদ্রোহ, যেহেতু প্রতিবেশী শত্রু দেশে এই স্লোগানটি বাঙালী জাতিসত্তার প্রতীক হিসাবে প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল এবং এখনও অপব্যবহৃত হচ্ছে। তাহলে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালী কী বলবে? "জয় পশ্চিমবঙ্গ"? কথাটা শুনতে যেমন খটমট তেমনি 'সোনার বাংলা' ধারণাটির সঙ্গেও তো সঙ্গতিপূর্ণ নয়। নাকি ভারতে পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলার জয়গান গাওয়াটাই নিষিদ্ধ, যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে বেশি আত্মবলিদান দিয়েছে?

ভারত সরকার পাকিস্তানের বজ্জাতির জবাব দিতে তাকে ভেঙে টুকরো করতে উৎসুক। কিন্তু বাংলাদেশের শত বজ্জাতি সহ্য করেও তার সার্বভৌমত্ব নিয়ে চিন্তিত। এই চিন্তা সেই রাষ্ট্রের সব সম্প্রদায়ের বাঙালীর হিতে নাকি এই রাষ্ট্রে বাঙালীকে নির্বল করে রাখতে, সেটা দেশপ্রেমী ও দেশবিরোধী দুই ধরনের বাঙালীই বিচার করুন; আমি আর কিছু বললাম না।

পুনশ্চ: আমার বাড়িতে কাজের মেয়েদের বিনামূল্যে বাচ্চাদের পড়ানো শুরু হয়েছে। আর ঘটনাচক্রে দুই জনেই হিন্দী মাধ্যমে পড়ে। আমি সুবিধা করতে পারি না বলে আমার মেয়ে দায়িত্ব নিয়েছে। ও উচ্চশিক্ষার জন্য কোথাও গেলে ওর বাবা পড়াবে। অর্থাৎ বাঙালী বিভেদকামী নয়, তার ছুৎমার্গও নেই। তারও তো নিজের মতো করে থাকার অধিকার আছে। এটুকুই বলার।


✍️শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

Post a Comment

Previous Post Next Post