তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে ও ভারতের প্রস্তুতি > সম্পাদকীয়

 

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ভারতের প্রস্তুতি

শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

<=০=>

সারা বিশ্ব জেনে গেছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি ভেস্তে গেছে। ইজ়রায়েল তো পাক মধ্যস্থতায় শান্তি বৈঠকে অংশগ্রহণই করেনি। এই খবর তেমন চমকপ্রদ মনে হল না, কারণ ১৫ দিনের জন্য ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পিণ্ডি ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই চটকে যেতে আমরা ইতিমধ্যে দেখে ফেলেছি। আমেরিকার দোসর ইজ়রায়েল দু' সপ্তাহ কেন দু’ ঘণ্টাও কাটেনি, লেবাননে হামলা শুরু করে দেয় হিজবুল্লার হুর প্রাপ্তির মনোবাসনা পূরণে।

এই যুদ্ধে আদর্শগত ভাবে কোনও পক্ষকে সমর্থন করাই মুশকিল। ইরান নিজেদের প্রথম সারির নেতাদের হারিয়েও প্রতিপক্ষকে যা দুর্দান্ত টক্কর দিচ্ছে, তাতে ভারতের বেশ কয়েকজন সমর ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞকেই ইরানের বীরত্ব নিয়ে উচ্ছ্বসিত হতে দেখেছি। ইরানের নারীনাগ্রহ নিয়ে পুরুষ বিশেষজ্ঞদের বিচলিত না করতেই পারে; কিন্তু হুতি, হিজবুল্লা ও হামাসকে সরাসরি প্রযোজনা করে, এমনকি আইসিস-কেও ক্রমাগত মদত দিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে ইরান যেভাবে উত্যক্ত করে গেছে, তাতে উপসাগরীয় মুসলিম দেশগুলোই ইরানের সমর্থনে দাঁড়াতে পারছে না তো একটি সন্ত্রাসক্লিষ্ট রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে আমাদের পক্ষে তো পারার কথা নয়।

উত্যক্ত কথাটা অনেক নরম, অনেকটা এপস্টেইনকে দুষ্টু বলার মতো। ইরান নিজের দেশের নাগরিক বিশেষত মেয়েদের প্রতি যে বিদ্বেষ ও হিংস্রতার নজির রেখেছে, রাজনৈতিক পালাবদল না হওয়ায় তার তীব্রতা কমানোর বদলে বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে ইজ়রায়েলকে অস্থির করার চেষ্টাতেও বিরাম নেই। গাজ়ার হামাস সাময়িকভাবে দমে গেল তো ইয়েমেনের হুতি ও লেবাননের হিজবুল্লাকে ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। ইজ়রায়েল বহু বছর ধরেই এই জঙ্গী সংগঠনগুলোর জ্বালাতন সহ্য করে আসছে। তার সহিষ্ণুতার সীমা ভারতের মতো অপরিসীম নয়। ভারত যেমন আমেরিকার কথায় অপারেশন সিন্দুরের মতো সফল অভিযান সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর আগেই প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, তেমনটা করার পাত্র ইজ়রায়েল নয়। সুতরাং হিজবুল্লাকে নিশ্চিহ্ন করতে গিয়ে ইজ়রায়েল লেবাননকেও ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফেলছে। ইজরায়েলের বক্তব্য হিজবুল্লার মতো জঙ্গীরা সক্রিয় থাকতে লেবানন যুদ্ধবিরতির ভৌগোলিক আওয়ায় পড়ে না যুদ্ধ বিরতির অঞ্চলে লেবানন পড়ে না; আর তাই লেবাননের সাধারণ নির্বিরোধ মানুষের ওপরেও সাদা ফসফরাসের মতো মারাত্মক রাসায়নিক বোমা বর্ষণ করা যেতে পারে। গাজ়া পট্টিতে হানা দেওয়ার সময় থেকেই ইজ়রায়েল যে শাসিয়ে রেখেছিল, গোটা পশ্চিম এশিয়ার ভূগোল বদলে দেবে, তার থেকে পিছু হঠার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না নিজেরা ইরান ও তার 3 H (হামাস, হুতি, হিজবুল্লা) বাহিনীর হামলায় ক্ষতবিক্ষত হয়েও। 

ইরান স্বভাবতই খেপে গেছে। বড়দাদা আমেরিকা যুদ্ধ বিরতির কথা বলছে আর ছোট ভাই ইজ়রায়েল তার এয়সি কী তেয়সি করে দমাদম দিয়ে যাচ্ছে। ফলে যেটা তার নিয়ন্ত্রণে আছে, সেই হরমুজ প্রণালীর সাগরতলে মাইন বিছিয়ে ভারত সহ কিছু বন্ধু রাষ্ট্র ছাড়া আর কোনও দেশের জাহাজকে পেরোতে দিচ্ছে না।

পারমাণবিক বোমার হুমকি দিলেও সেটা যে আমেরিকার নিজের অর্থনীতির পক্ষেও ভয়াবহ হবে, তা ট্রাম্পের মতো সেয়ান পাগলও ভালো মতো জানে। বেগতিক দেখে হরমুজ প্রণালী খোলানোর উদ্দেশ্যে তাই বাধ্য হয়ে মুখ রক্ষার জন্য হুজুরে হাজির পাকিস্তানকে বলে ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতা করতে, যার পরিণতি তো শুরুতেই বললাম।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেরা পথ না পাওয়ায় রেগেমেগে হরমুজ প্রণালীর ঢোকা-বেরোনোর সরু মুখটাই আটকে রাখা শুরু করেছে। টহলদারি ইরানী নৌকো দেখলেই দে দমাদম। ইরানও হার মানবে না। প্রায় নিঃস্ব হতে বসেও সমানে পাল্টা মার দিচ্ছে-- তবে ওয়াশিংটনে তো নাগাল পৌঁছাবে না, নিজেরই প্রতিবেশে আমেরিকার ঘাঁটিগুলোতে এবং অবশ্যই ইজরায়েলে। মানে যুদ্ধ থামার বদলে পরিস্থিতি জটিলতর হচ্ছে। আর তার মানে বিশ্ব বাজারে খনিজ তেলের দাম বৃদ্ধি ও উপলভ্যতা হ্রাস।

    এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি উত্তরোত্তর উদ্বেগজনক ও অনির্দিষ্টকালের জন্য দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে সারা বিশ্বেই অপরিশোধিত তেলের সংকট। পরিশোধিত তেলেও সংকট সমানুপাতিক হারে। ভারত তেল শোধনে ওস্তাদ হলেও ক্রুড অয়েল আমদানিই  করতে হয়। ফলে প্রতিটি দেশকেই বিকল্প শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ভাবতে হচ্ছে। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়।

এর জন্য বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ইদানীং সেই বিদ্যুৎকে কাজে লাগানোর জন্য শুধু ইলেকট্রিক্যাল নয়, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশও বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়। ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের আবশ্যিক উপাদান হল মাইক্রোচিপ। এই মাইক্রোচিপের আভ্যন্তরীণ পরিবাহী সার্কিটটি হল ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট যেটা আমাদের ঘরবাড়িতে সাধারণ অয়ারিংএর মতো নয়, এটা মাইক্রোচিপের ওপর বিশেষ উপায়ে একপ্রকার খোদিত বা অঙ্কিত থাকে। বোকা ইলেকট্রগুলো সেই ছাপ বেয়েই ছোটাছুটি করে বিদ্যুৎ পরিবহন সচল রাখে।

যাইহোক, এই মাইক্রোচিপ নির্মাণ করার জন্য দরকার সেমিকন্ডাক্টর, যার মূল উপাদান হয় সচরাচর সিলিকন (Si)। এই কারণেই কম্পিউটার প্রযুক্তি যার আরেক নাম information technology ও তজ্জনিত পণ্য উৎপাদন কেন্দ্রগুলো Siicon valley নামেও বিশেষ মর্যাদা পায়। যেমন ভারতের সিলিকন ভ্যালি অভিধা লাভ করেছে ব্যাঙ্গালোর।

সেমিকন্ডাক্টরের উপকারিতা বা বলা যায় অপরিহার্যতা নিশ্চয়ই আর বুঝিয়ে বলতে হবে না। আপনার টেলিভিশন থেকে হাতের মোবাইল, এয়ার কন্ডিলনার থেকে ছোট ছোটখাটো ইলেকট্রনিক গেজেট, যেখানেই ইনাটিগ্রেটেড সার্কিট লাগে, সেগুলোর মাইক্রোচিপ সেমিকন্ডাক্টরের ওপরেই তৈরি করা হয়। সেমিকন্ডাক্টর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় না, কিন্তু বর্তমানে যেকোনও পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কনট্রোল প্যানেলগুলোতে যে ইলেকট্রিক ইউনিট ব্যবহৃত হয়, তার আভ্যন্তরীণ ইনটিগ্রেটেড সার্কিট তৈরি হয়েছে কোনও না কোনও মাইক্রোচিপ যেটি তৈরি সেমিকন্ডাক্টর দিয়ে। সারারণ সোলার সেলে এমনিতে যদিও সেমিকন্ডাক্টর অপরিহার্য নয়, তবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও দক্ষতা বা আউটপুট বাড়ানোর জন্যও আধুনিক সোলার প্যানেলে মাইক্রোচিপ ব্যবহৃত হচ্ছে।

ছোট থেকেই শুনে আসছি fossil fuels are depleting, এই দিয়ে চিরকাল চলবে না। তাই বিকল্প শক্তির উৎস সন্ধান করতে হবে। তাই কাজটা যে আজ শুরু হয়েছে তা নয়। জলের তোড়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বা বাতাসকল থেকে বিদ্যৎ তৈরি তো বহু পুরোনো। গত ৩-৪ দশকে সৌরবিদ্যুতের প্রচলনও বেড়েছে। আগের চেয়ে সেলার প্যানেল সুলভ হয়েছে, নিজেদের বাড়িতে লাগাতে পারলে কেন্দ্র সরকার থেকে ভর্তুকিও দেয়। আর এখন খনিজ তেল সংকটে এইসব নিয়ে বেশি করে ভাবতে হচ্ছে।

 ভারত এ যাবত নিজের যা সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা তার ৯০% আমদানি করে এসেছে। অধিকাংশটাই তাইওয়ান থেকে। বিশ্বের প্রথম সিলিকন ভ্যালি টেক্সাস হলেও বর্তমানে মাইক্রোচিপের চাহিদা মেটানোয় তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া সহ পূর্ব এশিয়ার গুটিকতক দেশ বিশাল বাজার করে নিয়েছে। ভারতের নিজস্ব সেমিকন্ডাক্টর কারখানা বলতে ৪টি, যার মধ্যে গুজরাটে ৩টি ও আসামে ১টি। এইগুলি ও সংশ্লিষ্ট শিল্পে ২০২১-এ প্রায় ৭৬,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের ফল। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এখন যথাসম্ভব বাড়িতেই বানাতে চাইছে। এবং এটা করা আশু প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কারণ শুধু তেলের অভাব নয়, আরও গুরুতর।

সবার নজর যখন মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির দিকে, সেই ফাঁকে চীন তাইওয়ান দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। চীনের পুরো নাম Peoples Republic of China আর তাইওয়ানের আরেক নাম Republic of China. এই ইচ্ছাটা একেবারে অযৌক্তিক নয়। দূটি দেশেই চৈনিক ভাষা চলে। চীনে ম্যান্ডারিন চাইনিজ় বেশি আর তাইওয়ানে ক্যান্টনিজ় চীনা ভাষার সংখ্যাধিক্য যদিও দুটোর মধ্যে মিলের চেয়ে শুনেছি অমিল বেশি। আমাদের অবশ্য কানে সবই ‘চ্যাংচুং চিয়াই’।

যাইহোক, তাইওয়ানের একটা রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজেদের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে স্বতন্ত্র দেশ হিসাবে থাকতে চাইলেও অন্যান্য কিছু গোষ্ঠী বাস্তবতা বুঝে চীনের গর্ভে লীন হতে চাইছে। কারণ চীন কার্যত দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানকে সমুদ্র পথে সব দিক দিয়ে ঘিরে ফেলেছে। আমেরিকা দূতাবাস গড়ে আধিকারিক ভাবে PRC কে মান্যতা দিলেও তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি করতে ছাড়েনি। আমেরিকার কথায় নেচে তাইওয়ান চীনের থেকে দূরত্ব ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু উপসাগরীয় যুদ্ধ দেখিয়ে দিল, আমেরিকার সঙ্গে বন্ধুত্বের ফল কেমন সুখের হয়। ফলে প্রকাণ্ড চীনের সঙ্গে পুচকে চীন পাঙ্গা নিলে ফল কী হতে পারে, সেই বাস্তবটাও বূঝতে পারছে।

অবশ্য দুটি চীন দেশের পরস্পরের বিরুদ্ধে সামরিক প্রস্তুতি চলছেই। তাইওয়ান জানে চীনের সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে এঁটে ওঠা অসম্ভব। তাই শুধু আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য অবলম্বন করেছে পর্কুপাইন স্ট্রাটেজি যাতে চীনের দামী রণতরীগুলোকে কমদামী ড্রোন ইত্যাদি দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যায়। ভারতের জনৈক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমর বিশেষজ্ঞ তো ঝোপ বুঝে কোপ মেরে এই ফাঁকে ভারতকে তাইওয়ানের কাছে ড্রোন বেচে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু এটা মোটামূটি ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞদের কাছে পরিষ্কার, যে ২০২৭-এ তাইওয়ান বা রিপাবলিক অফ চায়না পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না-তে লীন হথে চলেছে। ভৌগোলিক ভাবে দূরত্ব থাকলেও রাজনৈতিক ভাবে। হয়তো খানিক স্বায়ত্বশাসন থাকবে। কিন্তু চীন তাইওয়ানকে গিলে ফেললে তাইওয়ানের পক্ষে স্বাধীনভাবে সেমিকন্ডাক্টর ও মাইক্রোচিপ নির্মাণ ও রপ্তানির সুযোগ থাকবে কিনা বলা যাচ্ছে না। এই অনিশ্চয়তা থেকেই ভারতের এই তৎপরতা। বোঝা গেল?

 এর মধ্যে ভারতের জন্য আরেকটা সুখবর, কল্পাক্কমে ইন্দিরা গান্ধী অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারে থোরিয়াম থেকে ইউরেনিয়াম-২৩৩ তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ তৈরির মাধ্যমে পরমাণু বিদ্যুৎু উৎপাদনের দিকে একটা বড় ধাপ সম্প্রতি পার করা গেছে। পদ্ধতিটি হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা প্রায় ৮০ বছর আগে অনূমান করে গিয়েছিলেন। বিশ্বজোড়া সংকটের পরিস্থিতির মধ্যে তার ফলিত সাফল্য খুবই আশাব্যঞ্জক। বিশেষজ্ঞদের মতে এর ফলে আগামী চারশ বছর ভারত নিজের শক্তির বা বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সক্ষম, স্বয়ংসম্পূর্ণ।

কিন্তু শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন করে কী হবে যদি ব্যবহার করার মতো উপযুক্ত যন্ত্রপাতি না থাকে। আগেই বলেছি, আধুনিক ইলেকট্রিক যন্ত্র বা যন্ত্রাংশগুলোর আভ্যন্তরীণ সার্কিট বা বিদুৎ পরিবহনের মাধ্যম হল ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট যা নির্মিত হয় সেমিকন্ডাক্টরের ওপর। বর্তমান বিশ্বের সম্ভবত ৯০% (অনুমান করে বলছি) বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি আগেকার মতো ঠিক ইলেকট্রিক্যাল নয়, বরং ইলেকট্রনিক যার প্রাণভোমরা হল এই সেমিকন্ডাক্টর নির্মিত মাইক্রোচিপ, যার প্রধান উপাদান সিলিকন হলেও সঙ্গে ফসফাস সহ আরও কয়েকটি মৌল দরকার হয়। মোটের ওপর সেমিকন্ডাক্টর > মাইক্রোচিপ > ইলেকট্রনিক যন্ত্র ছাড়া আজকের পৃথিবী অচল। আর এর জন্য সেমিকন্ডাক্টর নামক উপাদানটির আমদানি ক্রমশ অনিশ্চয়তার দিকে ঢলছে। এই কারণেই ভারত সেমিকন্ডাক্টর নির্মাণে স্বয়ঃসম্পূর্ণ হওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে।

এখন ভারতে সিলিকনের অভাব নেই। সুবিশাল উপকূলরেখা ও অসংখ্য নদনদীর অববাহিকায় বালির অভাব নেই, যা আসলে সিলিকন ডাই অক্সাইড (SiO2)। সেখান থেকে ঝপাঝপ সিলিকন নিষ্কাষণ করাই যায়। বাকি উপাদানগুলো সংগ্রহ করতে পারলে তাইওয়ানকে কিছুদিন ড্রোন বেচার পরেও নিজেরা সেমিকন্ডাক্টরে স্বাবলম্বী হতেই পারি। উপসাগরীয় যুদ্ধে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বা পাকাপাকি চিরপঙ্গুতা চলে এসেছে। কিন্তু অন্যকে কাঠি বা খবরদারি কোনোটাই না করে যদি নিজেরা নিজেদের মতো স্বাবলম্বী হতে পারি, তাহলে সেটাই প্রাপ্তি।

শুধু দুঃখ লাগে নিজের রাজ্যটিকে নিয়ে। সেই প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমল থেকে শুনছি সলটলেকে IT Hub হবে। আইটি হাব মানে কিছূ সফটওয়্যার কোম্পানির দপ্তর প্রতিষ্ঠা নয়, আইটি হাবে কম্পিউটারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নির্মাণ ও সংযুক্তির করা মানে হার্ডঅয়ার নির্মাণের কাজটা আরও প্রাথমিক। পশ্চিমবঙ্গেও সিলিকনের অভাব নেই। সমুদ্রতট আছে, নদনদী আছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বালি বিখ্যাত হয়েছে গেছে চোরাপাচারের জন্য। কিন্তু অভিযোগগুলোর গল্পই জ্বলন্ত প্রমাণ মাইক্রোচিপ তৈরির প্রধান উপকরণ সিলিকন ডাই-অক্সাইড বা বালির অভাব নেই। বাকি উপকরণগুলোর কিছুকিছু আমদানি করা যায়। দরকার শুধু একটু রাজনৈতিক সদিচ্ছা। লক্ষ্যণীয় ভারতের ৪টি সেমিকন্ডাক্টর কারখানাগুলো রয়েছে গুজরাট ও আসামে। দুটোই নেপো-কিড, মানে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল শাসিত রাজ্য। অবশ্য সেই যুক্তিতে মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, অন্ধ্রপ্রদেশ -- এগুলোও শিল্প দ্বারা বর্ষিত হতে পারত। বস্তুত সেমিকন্ডাক্টর না হলেও অন্যান্য মাঝারি থেকে ভারী শিল্পে হয়েওছে। প্রগতি করেছে তামিলনাড়ু, বিহার সহ একাধিক রাজ্য। কিন্তু কৃতিত্ব দিতে হয় আসামকে, যে রাজ্যে তেল ও গ্যাসের খনি ছাড়া প্রযুক্তিগত শিল্প তেমন ছিল না, সেও পেরেছে আশীর্বাদ ছিনিয়ে নিতে। 

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে কেন্দ্র সরকারের কি কোনও বোঝাপড়া নেই বা ছিল না? থেকে থাকলে সেটা কি কেবলই ‘সেটিং’ নামে কলঙ্কিত হওয়ার জন্য? গুজরাট তো গুছিয়ে নিয়েইছে। কেন্দ্রের সঙ্গে যুগপৎ সহযোগিতা ও দরাদরি করে আসামের রাজ্য সরকারও ভারতের দূরদর্শিতার আশীর্বাদ ছিনিয়ে নিয়েছে; আগামীদিনে অপরিহার্য সেমিকন্ডাক্টর নামক বস্তু উৎপাদনের কারখানা নির্মাণও করে ফেলেছে। আর আমরা শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতার যূপকাষ্ঠে রাজ্য ও রাজ্যবাসীর স্বার্থ বলি দিয়ে নিজেদের সোনার বাংলাকে শ্মশান করে ফেলেছি।

৪ঠা মে ২০২৬-এর পর যারাই ক্ষমতায় আসুন, প্রার্থনা সল্টলেক নিউটাউনে বা ইস্টান বাইপাসের ধারে, যেখানেই সম্ভব, প্রস্তাবিত আইটি হাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে রাজ্যের নতুন প্রজন্ম উপকৃত হয়। একটা প্রজন্ম তো ধ্বংস হয়েই গেছে, এরপর এখানকার সেরা মস্তিষ্কগুলো আর হয়তো বাইরের বাজ্য বা দেশে যেতে বাধ্য হবে না। সুযোগ পেলে আপনাদের সঙ্গে রাজ্য ও দেশের মঙ্গলে সাহায্যই করবে—সরকারে যেই থাকুক।  


 AI ছবি: শুভঙ্কর চ্যাটার্জী

1 Comments

  1. দুর্দান্ত লেখা। অনেক পরিশ্রম করে গবেষণা মূলক লেখা। অনেক তথ্য পেলাম। চিরকালীন সংগ্রহ করে রাখার মতো।

    ReplyDelete
Previous Post Next Post