গোলকধাঁধার খোঁজে :: পিনাকী রঞ্জন পাল

 

গোলকধাঁধার খোঁজে

পিনাকী রঞ্জন পাল

 


(এক)

 জলপাইগুড়ির কাছাকাছি এক মফস্বল গ্রাম। সেখানে, তালগাছ আর বাঁশঝাড়ের আবডালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে 'ধনঞ্জয় বাবুর ইংলিশ একাডেমি'। নামটা শুনলে মনে হয় যেন কোনো বিশাল বড়সড় স্কুল, কিন্তু আদতে এটি একটি জীর্ণ, পুরোনো স্কুল। স্কুলের দেয়ালগুলোর গা থেকে খসে পড়া চুন-বালি দিয়ে নাকি ইঁটের পিজবোর্ড বানানো যায়। স্কুলের একমাত্র আকর্ষণ ছিল তার সেকেলে কিন্তু রহস্যময় পরিবেশ, আর লাইব্রেরি। 

আমাদের গল্পের নায়ক উদয়ন ঘোষাল, ক্লাস সেভেনের তুখোড় ছাত্র। তুখোড় মানে পড়াশোনায় নয়, তুখোড় মানে অ্যাডভেঞ্চার আর রহস্যের গন্ধে। তার সঙ্গী বলতে তুষার চক্রবর্তী। তুষারের চেহারা গোল আলুর মতো, ওজন হাফ টন, আর ভাতের প্রতি তার অমর প্রেম। কিন্তু সাহস? সেটা তুষারের অভিধানে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

সেদিন ছিল শনিবার। টিফিনের পর উদয়ন আর তুষার লাইব্রেরিতে বসেছিল। তুষার নতুন আসা ভূতের গল্পের বইয়ে মন দিয়েছে, আর উদয়ন পুরনো বইয়ের তাকে চোখ বোলাচ্ছে। হঠাৎ, একটা হলদেটে, মলাটছেঁড়া বই হাতে নিয়ে উদয়ন দেখল, তার ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বেরিয়ে এল। কাগজটা খুলতেই তার চোখ কপালে। এটা একটা মানচিত্র! আঁকা-বাঁকা রেখা, কিছু অদ্ভুত প্রতীক চিহ্ন, আর মাঝখানে লাল কালিতে ক্রস চিহ্ন দিয়ে লেখা: "গোলকধাঁধা ঘর – প্রবেশ নিষেধ"।

"কিরে, কী দেখছিস?" তুষার ঢোঁক গিলে বলল, ভূতের গল্পে গা ছমছম করছিল ওর।

উদয়ন মানচিত্রটা তুষারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, "দেখ, এটা মনে হচ্ছে আমাদের স্কুলেরই মানচিত্র। আর এই ক্রস চিহ্নটা দেখ, এটা লাইব্রেরির পেছনের তালা দেওয়া দরজাটার দিকে ইঙ্গিত করছে।"

লাইব্রেরির পেছনে সত্যিই একটা মরচে ধরা তালা দেওয়া দরজা ছিল। সবাই বলত ওটা নাকি "গোলকধাঁধা ঘর"-এর প্রবেশপথ। কেউ কেউ বলত, বহু বছর আগে এক ছাত্র নাকি ওই ঘরে ঢুকে আর ফিরে আসেনি। তারপর থেকেই দরজাটা তালাবদ্ধ। ভানুবাবু, স্কুলের কেয়ারটেকার, যিনি বহু বছর ধরে এই স্কুলেই আছেন, তিনিও নাকি ওই ঘরের ধারে কাছে কাউকে ঘেঁষতে দেন না।

ঠিক তখনই ভানুবাবু লাইব্রেরিতে ঢুকলেন। তাঁর বুড়ো শরীরটা বাঁশের কঞ্চির মতো রোগা, মাথার চুল উসকোখুসকো। উদয়ন আর তুষার মানচিত্রটা লুকোতে পারল না। ভানুবাবু মানচিত্রটা দেখেই থমকে গেলেন। তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল, চোখে একটা অদ্ভুত ভয়ের ছাপ। তিনি কাঁপতে কাঁপতে বললেন, "এটা... এটা তোমরা কোথায় পেলে? এটা খুব খারাপ জিনিস! ভুলেও ওই ঘরের দিকে যাবে না!" বলেই দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তার এই অস্বাভাবিক আচরণ উদয়নের মনে আরও কৌতূহল জাগাল।

তুষার তো ভয়েই শেষ, "দাদা রে! ভানুবাবুর মুখটা দেখেছিস? মনে হচ্ছে যেন এখুনি ভূত দেখেছেন!"

ঠিক এই সময়েই ক্লাসের সবচেয়ে বুদ্ধিমতী ছাত্রী, নয়না রায়, লাইব্রেরিতে ঢুকল। নয়না বরাবরই শান্ত স্বভাবের, কিন্তু তার চোখ দুটো যেন সব রহস্যের গভীরে প্রবেশ করতে পারতো। উদয়ন আর তুষারের ফিসফিসানি শুনে সে এগিয়ে এল। উদয়ন তাকে মানচিত্র আর ভানুবাবুর আচরণের কথা বলল। নয়না মনোযোগ দিয়ে মানচিত্রটা দেখল, তার চোখে একটা বুদ্ধির ঝিলিক।

"এই মানচিত্রটা সাধারণ কিছু নয়," নয়না বলল। "আর ভানুবাবুর প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে এর পেছনে বড় কিছু একটা লুকিয়ে আছে।"

তুষার কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, "কী লুকিয়ে আছে বলতো? কোনো ভূত-টুত নয় তো?"

নয়না মৃদু হাসল, "ভূত থাকুক বা না থাকুক, এর পেছনে একটা রহস্য তো আছেই। আর সেই রহস্যটা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।"

উদয়ন বুঝতে পারল, এবার সে একা নয়। নয়না তাদের এই দুঃসাহসিক অভিযানের সঙ্গী হতে চলেছে। 

 (দুই)

 সেই রাতে, যখন গ্রামজুড়ে গভীর ঘুমের রাজত্ব, উদয়ন, তুষার আর নয়না চুপিচুপি স্কুলের দিকে পা বাড়াল। তুষার তো কাঁধের ব্যাগেই এক প্যাকেট বিস্কিট আর একটা টর্চ নিয়ে এসেছে। "ভূতেরা খিদে পেলে হামলা করে না তো?" ফিসফিস করে বলল সে।

উদয়ন ওকে ধমক দিল, "চুপ! ভূতেরা বিস্কিট খায় না, আর যদি খায়ও, সেটা তুই হবি!"

স্কুলের লোহার গেটটা পুরোনো, ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে খুলতেই গা ছমছম করে উঠল। চাঁদের আবছা আলোয় স্কুলের পুরনো ভবনটা যেন এক দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে পিনপতন নীরবতা। কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক আর দূর থেকে ভেসে আসা প্যাঁচার ভৌতিক চিৎকার। লাইব্রেরির কাছে পৌঁছাতেই একটা ঠান্ডা বাতাস এসে গা ছুঁয়ে গেল। তুষার তো কেঁপে উঠল, "উফফ! এ কি শীত নাকি ভূতের নিশ্বাস?"

উদয়ন টর্চ জ্বেলে মানচিত্রটা দেখল। মানচিত্রে লাইব্রেরির পেছনে একটা নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করা আছে। তারা সাবধানে সেদিকে এগিয়ে চলল। পুরনো আলমারির স্তূপ, ভাঙা চেয়ার-টেবিল পেরিয়ে অবশেষে তারা তালা দেওয়া দরজাটার সামনে পৌঁছাল। দরজার গায়ে পুরোনো কচি লতা পেঁচিয়ে আছে, মনে হচ্ছে যেন অনন্তকাল ধরে কেউ এদিক মাড়ায়নি।

"ভানুবাবু কেন এত ভয় পাচ্ছিলেন?" নয়না ফিসফিস করে বলল। "এই দরজার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গোপন পথ আছে।"

তারা দেয়ালের গা ঘেঁষে খুঁজতে লাগল। মানচিত্রে কিছু অদ্ভুত প্রতীক চিহ্ন আঁকা ছিল। ঠিক তখনই, দেয়ালের একটা জায়গায় উদয়নের হাত পড়ল। একটা ঢিলা ইট। সেটা সরাতেই একটা ছোট্ট ফোকর দেখা গেল। ভেতরে নিকষ কালো অন্ধকার। আর সেই ফোকর দিয়ে একটা ঠাণ্ডা বাতাস বেরিয়ে এল, সঙ্গে একটা ভেতরের মৃদু হিসহিস শব্দ।

"এটা কিসের শব্দ?" তুষার ভয়ে চোখ বড় বড় করে বলল, "মনে হচ্ছে কেউ শ্বাস নিচ্ছে!"

নয়না কান পেতে শুনল। "শব্দটা আসছে নিচের দিক থেকে। মনে হচ্ছে এটা বাতাস চলাচলের পথ, বা কোনো সুরঙ্গের মুখ।"

তারা টর্চ জ্বেলে ফোকরের ভেতর দিয়ে উঁকি দিল। একটা সরু সুড়ঙ্গ নিচের দিকে নেমে গেছে, আর তার ভেতরের দেয়ালে সেই একই রকম অদ্ভুত প্রতীক চিহ্ন খোদাই করা। চিহ্নগুলো যেন কোনো প্রাচীন রহস্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

"তার মানে এই তালা দেওয়া দরজাটা কেবল ধোঁকা!" উদয়ন উত্তেজিত হয়ে বলল। "আসল পথটা লুকিয়ে আছে অন্য কোথাও!"

তারা তিনজন ওই সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢোকার সাহস পেল না। কারণ সুড়ঙ্গটি এতটাই সরু যে, তিনজনের একসাথে ঢোকা সম্ভব নয়। তা ছাড়া, ভেতরে কী আছে, কিছুই স্পষ্ট নয়।

"এখন কী করবি?" তুষার বিস্কিটের প্যাকেটটা খুলতে খুলতে বলল, "পেটে ছুঁচো দৌড়াচ্ছে, অ্যাডভেঞ্চার করার এনার্জি পাচ্ছি না।

নয়না মানচিত্র আর প্রতীক চিহ্নগুলো মিলিয়ে দেখতে লাগল। "এই চিহ্নগুলো সম্ভবত কোনো ধাঁধার অংশ," সে বলল। "আর এই ধাঁধার উত্তর জানলেই আমরা গোলকধাঁধা ঘরের আসল প্রবেশপথ খুঁজে পাব।"

হঠাৎ, তাদের মাথার ওপর থেকে একটা অদ্ভুত ঘরঘর শব্দ ভেসে এল। মনে হলো যেন লোহার কিছু ঘষা খাচ্ছে। তুষার লাফিয়ে উঠল, "ভূত! ভূত এসেছে! মা গো!"

উদয়ন আর নয়না একে অপরের দিকে তাকাল। এটা ভূতের শব্দ নয়, এটা অন্য কিছু। যেন স্কুলের ভেতরেই কোথাও কিছু একটা নড়ছে। এই রাতে কে থাকতে পারে স্কুলে? তাদের বুক দুরুদুরু করছে, কিন্তু রহস্যের আকর্ষণ তাদের পিছু হটতে দিচ্ছে না। 

 (তিন)

 "ঘরঘর" শব্দটা কিছুক্ষণ পরেই থেমে গেল। তুষার তো ততক্ষণে বিস্কিটের প্যাকেট শেষ করে ফেলেছে। নয়না বলল, "মনে হচ্ছে শব্দটা দোতলার দিক থেকে এসেছিল।" উদয়ন মানচিত্রটা আরেকবার খুঁটিয়ে দেখল। হ্যাঁ, উপরের দিকে একটা ছোট গোল চিহ্ন আছে।

তারা তিনজন এবার সাবধানে দোতলার দিকে পা বাড়াল। সিঁড়িগুলো কাঠের, প্রতি পদক্ষেপে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন স্কুলের অতৃপ্ত আত্মারা তাদের পদধ্বনি শুনছে। দোতলায় পৌঁছে তারা দেখল একটা পুরোনো লোহার আলমারি নড়ানো হয়েছে, আর তার পেছনে একটা লুকোনো দরজা! দরজাটা কাঠের, কিন্তু তার গায়ে অদ্ভুত নকশা আঁকা।

"এই তো!" নয়না উত্তেজিত হয়ে বলল, "এটা নিশ্চয়ই গোলকধাঁধা ঘরের আসল প্রবেশপথ!"

তুষার ভয়ে ভয়ে বলল, "কিন্তু... ভেতরে কী আছে? যদি সত্যিই ভূত থাকে?"

উদয়ন দরজার হাতলে হাত দিল। হাতলটা ঠাণ্ডা আর মরচে ধরা। একটু চাপ দিতেই ক্যাঁচ করে একটা শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল। ভেতরে নিকষ কালো অন্ধকার। বাতাস যেন জমাট বেঁধে আছে।

"ভেতরে ঢুকতে হবে," উদয়ন বলল। "নইলে রহস্যের সমাধান হবে না।"

নয়না টর্চ জ্বেলে ভেতরে আলো ফেলল। একটা দীর্ঘ, সরু প্যাসেজ। প্যাসেজের দেয়াল জুড়ে সেই একই অদ্ভুত প্রতীক চিহ্ন। তারা তিনজন ভেতরে ঢুকল। দরজাটা তাদের পেছনে আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল, একটা ভারী 'ঠক' শব্দ করে। তুষার তো ভয়েই অজ্ঞান হওয়ার জোগাড়। "এটা কী হলো?" তার গলা শুকিয়ে কাঠ।

ভেতরে ঢুকতেই তারা একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা লাভ করল। তাদের মনে হলো যেন সময় এখানে অন্য নিয়মে চলছে। ঘড়ির কাঁটা যেন দ্রুত ঘুরছে, আবার কখনো থেমে যাচ্ছে। একটা মৃদু গুঞ্জন শব্দ তাদের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। প্যাসেজটা শেষ হয়েছে একটা বিশাল, ফাঁকা ঘরে। ঘরের ভেতরে কোনো আসবাবপত্র নেই, শুধু মাঝখানে একটা পাথরের ফলক আর তার ওপরে কিছু খোদাই করা লেখা।

"এটা গোলকধাঁধা ঘর," নয়না ফিসফিস করে বলল। "কিন্তু কোনো গোলকধাঁধা তো দেখছি না।"

ঠিক তখনই পাথরের ফলকের লেখাগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একটা গম্ভীর, যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "স্বাগত, অনুসন্ধানী! এই গোলকধাঁধা তোমাদের মনকে পরীক্ষা করবে। তিনটি ধাঁধার উত্তর দাও, নইলে এই ঘর তোমাদের চিরতরে আটকে রাখবে।"

তুষার আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, "ধাঁধা! এ তো পরীক্ষা!"

প্রথম ধাঁধা ভেসে এল: "আমি যখন একা থাকি, আমি শূন্য। যখন আমি অন্যের সাথে থাকি, আমি সবকিছু। আমি কে?"

উদয়ন কিছুতেই উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না। তুষার ঘামতে শুরু করেছে। নয়না চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগল। হঠাৎ তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। "আমি জানি! এটা 'কথা'!"

মুহূর্তেই ঘরের দেয়ালগুলো সরে গিয়ে নতুন একটা পথ খুলে গেল! তারা বুঝতে পারল, এটাই এই গোলকধাঁধার নিয়ম - ধাঁধার উত্তর দিলে পথ খুলবে, না পারলে ফাঁদে পড়বে।

দ্বিতীয় ধাঁধা ভেসে এল: "আমার অনেক দাঁত আছে, কিন্তু আমি কিছু খাই না। আমি কে?"

এবার তুষার অবাক করে দিয়ে বলে উঠল, "আমি জানি! আমি জানি! চিরুনি!"

আশ্চর্যজনকভাবে তুষারের উত্তর সঠিক ছিল। আবার একটা পথ খুলে গেল। তুষার নিজের বুদ্ধিতে নিজেই অবাক!

তৃতীয় এবং শেষ ধাঁধাটা ছিল আরও জটিল: "যেখানে নেই কোনো রাস্তা, সেখানে আছে এক গোপন দ্বার। সে দ্বার খুলতে চাই বুদ্ধি নয়, এক অন্যরকম চাবি। সেই চাবি কোথায়?"

এই ধাঁধা শুনে তিনজনের মাথা ঘুরে গেল। বুদ্ধি নয়, অন্যরকম চাবি! এটা কী হতে পারে? সময় যেন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ঘরের দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে তাদের দিকে সরে আসতে লাগল, যেন তাদের ফাঁদে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা বুঝতে পারল, যদি এবার উত্তর দিতে না পারে, তবে এই গোলকধাঁধা ঘর তাদের চিরতরে গ্রাস করবে! উদয়ন, নয়না আর তুষার মরিয়া হয়ে ভাবতে লাগল, সেই 'অন্যরকম চাবি'টা আসলে কী হতে পারে?

 

(চার)

 

দেয়ালগুলো ক্রমশই এগিয়ে আসছিল। তুষারের মুখ সাদা, ভয়ের চোটে তার পেট গুড়গুড় করছে। উদয়ন আর নয়না শেষ ধাঁধাটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে। "যেখানে নেই কোনো রাস্তা, সেখানে আছে এক গোপন দ্বার। সে দ্বার খুলতে চাই বুদ্ধি নয়, এক অন্যরকম চাবি। সেই চাবি কোথায়?"

"বুদ্ধি নয়... তাহলে কী?" উদয়ন বিড়বিড় করল। "যদি এটা কোনো শারীরিক চাবি না হয়?"

নয়না হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল। তার চোখে বুদ্ধিদীপ্ত ঝলক। "সময়! অন্যরকম চাবি... হয়তো আমাদের নিজেদের ভেতরের কিছু!"

"কী?" তুষার ভয়ে প্রায় কাঁদতে শুরু করেছে। "আমার ভেতরে তো শুধু বিস্কিট আর ভয় ছাড়া আর কিছু নেই!"

"না তুষার," নয়না উদয়নের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমাদের বন্ধুত্ব! আমাদের বিশ্বাস! এই তো আমরা তিনজন মিলে সব ধাঁধা সমাধান করেছি। প্রথমটা উদয়নের কৌতূহল, দ্বিতীয়টা তোর চিরুনি... মানে তোর ভেতরের সরলতা। আর এখন... আমাদের ঐক্য!"

উদয়ন মাথা নাড়ল। "ঠিক বলেছিস! গোলকধাঁধার উদ্দেশ্য শুধু বুদ্ধি পরীক্ষা নয়, এটা সাহস আর বন্ধুত্বেরও পরীক্ষা!"

তারা তিনজন হাত ধরাধরি করে পাথরের ফলকের দিকে তাকাল। উদয়ন বুক চিতিয়ে বলল, "আমাদের চাবি আমাদের বন্ধুত্ব! আমাদের বিশ্বাস! আমরা তিনজন একসাথে!"

মুহূর্তেই এক অদ্ভুত আলোয় ভরে উঠল ঘরটা। দেয়ালগুলো তাদের জায়গায় ফিরে গেল। পাথরের ফলকটা দু’ভাগ হয়ে গেল, আর তার নিচ থেকে একটা প্রাচীন কাঠের সিন্দুক বেরিয়ে এল। সিন্দুকের ভেতরে কিছু প্রাচীন মুদ্রা, কিছু গয়না আর একটা হলদেটে কাগজ।

"এটা তো গুপ্তধন!" তুষার আনন্দে চিৎকার করে উঠল, ভয়ের কথা ভুলে গিয়েই!

ঠিক তখনই, লোহার আলমারির পেছনের গোপন দরজাটা ক্যাঁচ করে খুলে গেল। দাঁড়িয়ে আছেন ভানুবাবু! তার চোখে জল, মুখে একটা স্বস্তির হাসি। তিনি আগের চেয়েও বুড়ো দেখাচ্ছেন যেন।

"তোমরা পেরেছ!" ভানুবাবু ফিসফিস করে বললেন। "বহু যুগ ধরে আমি এই চাবির অপেক্ষায় ছিলাম। এই ধাঁধা আমার পূর্বপুরুষদের তৈরি করা। তারা জানত, একদিন সঠিক মনের অধিকারী কয়েকজন এই রহস্যের সমাধান করবে।"

তারা অবাক হয়ে ভানুবাবুর দিকে তাকাল। "আপনি কে?" উদয়ন জিজ্ঞেস করল।

ভানুবাবু মৃদু হাসলেন। "আমি এই ধাঁধার একজন রক্ষক। আমার বংশের কাজ এই গোলকধাঁধা আর এর রহস্যকে রক্ষা করা। অনেক বছর আগে যে চক্র এসেছিল, তারা শুধু ধনসম্পদ চেয়েছিল, তাই তারা এই ধাঁধা সমাধান করতে পারেনি। তারা শুধু বাইরের তালা ভাঙার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এই গোপন দরজা বা আসল চাবির কথা জানত না। আমি জানতাম, আসল উত্তরটা বুদ্ধিতে নয়, বরং বিশ্বাস, সাহস আর বন্ধুত্বের মধ্যে লুকিয়ে আছে। আমি যুগ যুগ ধরে সেই উত্তর খুঁজছিলাম, কিন্তু আমি নিজে এই ধাঁধার সমাধান করতে পারতাম না, কারণ এর জন্য বিশুদ্ধ মন আর নতুন প্রজন্মের দরকার ছিল।"

ভানুবাবু সিন্দুকের গুপ্তধন দেখিয়ে বললেন, "এই সম্পদ স্কুলেরই। আমার পূর্বপুরুষেরা স্কুলের উন্নতির জন্য এটা রেখে গিয়েছিলেন, কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য এই ধাঁধা তৈরি করেছিলেন।"

উদয়ন, নয়না আর তুষার বুঝতে পারল, তারা শুধু একটা রহস্যই সমাধান করেনি, স্কুলের এক পুরনো গুপ্তধন খুঁজে বের করেছে, যা এখন স্কুলের উন্নয়নে কাজে লাগবে। গ্রামের মানুষ, শিক্ষক-শিক্ষিকারা সবাই তাদের প্রশংসা করল। উদয়ন, নয়না আর তুষার মুহূর্তেই স্থানীয় হিরো হয়ে উঠল।

"গোলকধাঁধা ঘর" আর তালাবদ্ধ রইল না। ভানুবাবু বললেন, "এই ঘর এখন খোলা থাকবে। ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্ম এই ঘরের নতুন নতুন ধাঁধার মুখোমুখি হবে। কারণ জ্ঞান আর সাহসের পরীক্ষা কখনো শেষ হয় না।"

তারা বুঝতে পারল, জীবনের প্রতিটি গোলকধাঁধায় শুধু বুদ্ধি দিয়ে জেতা যায় না। কখনো কখনো প্রয়োজন হয় সাহস, বন্ধুত্ব আর আত্মবিশ্বাস, যা যেকোনো কঠিন পথকে সহজ করে দেয়। আর এভাবেই, ধনঞ্জয় বাবুর ইংলিশ একাডেমি শুধুমাত্র একটি স্কুল না হয়ে, হয়ে উঠল জ্ঞান, সাহস আর বন্ধুত্বের এক অনন্ত প্রতীক।

Post a Comment

Previous Post Next Post