সাময়িক স্বস্তি কিন্তু চাপা অস্বস্তি
শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়
তবে কিছু একটা হয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের আশঙ্কা ছিল নির্বাচন হবেই না, ভেস্তে যাবে। তবু কিছু একটা হয়েছে, যদিও বাংলাদেশের নির্বাচন শেষ পর্যন্ত ভারত সহ আন্তর্জাতিক মহলের দাবি মেনে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি যেহেতু আওয়ামীলীগ শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে লড়তে পারেনি।
এখন যে হারে ওদেশে মারামারি ও সাম্প্রদায়িক হিংসার রমরমা দেখা যাচ্ছিল নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে, তাতে দুই বাংলার মানুষেরই আশঙ্কা ছিল, জামাত শিবির তার ছোটখাটো সহযোগী দলগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশের মসনদে বসে দেশটাকে দ্বিতীয় আফগানিস্তান বানিয়ে ছাড়বে।
কিন্তু নির্বাচনে বিএনপি-র ১১-দলীয় জোট ২০৮ টি আসন পেয়ে বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করে জামাত শিবিরকে গণতন্ত্রের মানচিত্র থেকে মুছে দিয়েছে।
ছাপ্পাছুপ্পি প্রশাসনকে কব্জা করে অনিয়ম, এসব তো বাঙালীর রক্তে -- কী ওপার কী এপার। সেদিকে তাকালে ইউনূসের বদান্যতায় জামাতের দিকেই কারচুপির সুবিধা বেশি ছিল। শেষ মুহূর্তের সমীকরণ কী হয়েছিল জানা নেই, তবে বাংলাদেশের মানুষ আপাতত স্বস্তিতে। এমনকি বিএনপি জমানায় মার খাওয়া হিন্দু সমেত সংখ্যালঘুদের মধ্যেও নাকি খানিক উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। ভোটে হারার ক্ষোভে জামাত কিছু হিন্দু বাড়িতে পুনরায় অগ্নিসংযোগ করেছে বলে লাইভ দেখানো হল আজতক বাংলা চ্যানেলে। তবু হিন্দুরা আনন্দিত। জানি না, বিএনপির কীর্তি জামাতের বলে উপস্থাপিত কিনা।
এখন লক্ষ্যণীয় ব্যাপার, বাংলাদেশের এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক (আমি শুনে নাম মনে রাখতে পারি না) মন্তব্য করেছেন, তারেক জিয়া যাঁর বিরুদ্ধে গ্রেনেড হামলা সহ হাফ ডজন নাশকতার অভিযোগ থাকায় তাঁকে দেশান্তরী হতে হয়েছিল, তিনি নিজে স্বীকার করেছেন ভারতের সাহায্য ছাড়া তাঁর পক্ষে বাংলাদেশে ফেরা ও নির্বাচনে লড়া কোনও মতে সম্ভব ছিল না। চিরশত্রু আওয়ামীলীগের পরোক্ষ সমর্থনও বিএনপি-র খুব কাজে লেগেছে। তাই হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও আওয়ামীলীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ব্যাপারে তারেক একটা ইতিবাচক ভূমিকা নিতে পারেন বলে অনুমান করছেন রাজনৈতিক মহল।
গণতন্ত্রে শুধু জেতার জন্য নয়, বিরোধী হিসাবেও এমন অন্তত একটি বা একাধিক দল লাগে, যাদের গণভিত্তি আছে। জামাতের সেটা তৈরিই হয়নি। যদিও তুরস্ক ও পাকিস্তান থেকে প্রচুর অর্থ সাসায্য পেয়েছে, কিন্তু কোনো দেশেই জামাতের শাখা ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়নি; জঙ্গী সংগঠন হিসাবেই চিহ্নিত রয়ে গেছে। তাই তারেককে স্বস্তিতে রাজনীতি করতে ও শাসনকাজ চালাতে হলে বিপুল জনভিত্তি সম্পন্ন দল আওয়ামীলীগকে মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে হবে। তবে রাষ্ট্রপতি ইউনূস মিঞাই হবে কিনা, সেই ব্যাপারে এখনও কিছু শুনিনি।
ভারতের প্রাক্তন সামরিক আধিকারিক ও বর্তমানে কূটনীতি বিশেষজ্ঞ আর কে শ্রীবাস্তবকে একটা কথা বলতে কয়েকবার শুনেছি। ৫০ জনের মবকে ৫০০ করে দেখানোর টেকনিক্যাল কৌশল অবলম্বন করে ও সেইমতো প্রচার চালিয়ে জামাত চেষ্টা করেছে জনমানসকে প্রভাবিত করতে। কিন্তু মানুষকে বোকা বানাতে পারেনি। কিছু মেয়েকে দিয়ে নারীর অধীনতার পক্ষে মন্তব্য করিয়ে প্রচার চালালেও অধিকাংশ মেয়ের মনকে সত্যিসত্যি বস্তাবন্দী করতে পারেনি। জামাত অবশ্য শতখানেক কেন্দ্রে পুনরায় ভোটের দাবি করেছে।
যাইহোক, মাত্র ৩৫-৪০% ভোটারের অংশগ্রহণে প্রাপ্ত ফলাফলকে আপাতত বাংলাদেশ ও ভারত দুই রাষ্ট্রের পক্ষেই স্বস্তির মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বেচারা হিন্দুদের বাঁচার জন্য কোনও না কোনও ঘাতককে আঁকড়ে ধরা ছাড়া গতি নেই। ১৯৪৬-এ কলকাতা দাঙ্গায় সুরাবর্দির অন্যতম সেনাপতি মুজিবরকেই বঙ্গবন্ধু মেনে পুজো করেছে। ফলশ্রুতি: একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বারা ৩০ লক্ষাধিক বাঙালী (সিংহভাগ হিন্দু) নজিরবিহীন নৃশংতার বলি হয়ে মরেছিল, ১০ লক্ষাধিক (মুখ্যত হিন্দু) নারী ধর্ষিতা হয়ে বেয়োনেটের খোঁচায় ছিন্নভিন্ন হয়ে মরেছিল বা জীবন্মৃত হয়ে ছিল, বা খুব ভাগ্যবতীরা যুদ্ধশিশুর পতিতা মা হয়ে বেঁচে ছিল। ১৯৭১-এ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ তৈরি হল ভেবে ইন্দিরার ভারত শরণার্থীদের আগমনে আইন করে একটু রাশ টানার চেষ্টা করার পাশাপাশি মুজিবের সঙ্গে এমন চুক্তিও করে, যে বাংলাদেশে পুনরায় ভারতের পক্ষে বিপজ্জনক শক্তির উত্থান হলে ভারত দরকারে আবার সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে। কিন্তু বর্তমান ভারত দেড় বছর ধরে সবরকম অভব্যতা, হিংস্রতা এমনকি উত্তরপূর্ব ভারত নিয়ে হুমকিও অগ্রাহ্য করেছে পরম সহিষ্ণুতায়। এই সহিষ্ণুতার মধ্যে আদৌ মহত্ব আছে কিনা, সন্দেহাতীত নয়।
তারেক জ়িয়া রহমান আপাতত ভারতের অবদান আলগোছে স্বীকার করেছেন ঠিকই, কিন্তু প্যারিস প্রবাসী রাশেদ হায়দার সহ অধিকাংশ বাংলাদেশী রাজনৈতিক বিশ্লেষকই ভারতের হস্তক্ষেপ নিয়ে যে রোজই স্বপ্নের রূপকথা শোনাতেন, তা মোটেই ভিত্তিহীন ছিল না। আজকেও বাংলাদেশের প্রতিনিধি বললেন, "ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি অনুযায়ী ভারত যদি হস্তক্ষেপ করত দেড় বছর লাগত না, জামাত সহ সন্ত্রাসীদের তিন মাসের মধ্যে নতজানু করানো যেত। কিন্তু ভারত বিরল সংযম দেখিয়ে গণতান্ত্রিক পথে থেকেই বাংলাদেশকে সাহায্য করেছে।"
তিনি মুক্তিযুদ্ধ থেকে আজ অবধি ভারতের ভূমিকা নিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেও বোঝা যাচ্ছিল, ভারতের ইন্দিরাসুলভ সক্রিয়তা তাঁরও প্রত্যাশিত ছিল; নতুবা ভারতের কী কী করার এক্তিয়ার ছিল, সে কথা তিনি সঞ্চালিকার কাছে সময় কেড়ে নিয়ে জোর দিয়ে বলতেন না।
মনে করিয়ে দিই, মুক্তিযুদ্ধের পর ওদেশে হিন্দুদের ওপর ন্যক্করজনক গণহত্যাগুলো বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)র আমলেই হয়েছে খালেদা জ়িয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বে। আবার হাসিনার নিয়ন্ত্রিত সাম্প্রদায়িক নীতির অধীনেও টুকটাক সাম্প্রদায়িক হিংসা ঘটেই চলেছিল, ২০২১ সালে দুর্গাপুজোর সময় যার বিস্ফোরণ ঘটে।
এইখানে প্রশ্ন: কংগ্রেসের শাসন না হয় তুষ্টিকরণের রাজনীতিনির্ভর, কিন্তু ২০১৪-র পর থেকে ছাপান্ন ইঞ্চির সিংহবক্ষ আসার পরেও তো বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ড আরও বেশি করে ও নির্বিঘ্নে ঘটেছে। এমনকি ২০২১-এ দুর্গাপুজোয় হনুমানের কোলে কোরান কাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশময় আগুন জ্বললেও সিংহমশাই সামান্যতম হুংকার পর্যন্ত করেননি, ২০২৪-এ তথাকথিত আগস্ট বিপ্লবের সময় তো তিনি নির্বিকল্প সমাধিস্থ।
বুঝতে অসুবিধা হয় না, বহু সহিংস কীর্তির পাণ্ডা তারেক রহমান ও ভারতমিত্রের ভান করে হিন্দুনিগ্রহের নেত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে ঠেকায় পড়ে পরস্পরকে lesser evil জ্ঞানে সেয়ানে সেয়ানে রাজনৈতিক কোলাকুলি হল মাত্র। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের হ্যাংলারা আবার হয়তো বাংলাদেশে দাওয়াত পাবে। কিন্তু মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদের শিকড় যথাস্থানে রয়েই গেল। এর ফল হবে বাঙালী জাতির পক্ষে ভয়াবহ, যেমনটা ভণ্ড ভগওয়াওয়ালাদের অভিসন্ধি। দুর্গতিনাশিনী নিজে অবতীর্ণ না হলে তাঁকে পুজো করার ভক্ত আর অবশিষ্ট থাকবে না।
✍️শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩|০২|২৬