মোড়কের আড়ালে
সুপ্রিয় দেবরায়
ডোরবেলের আকস্মিক শব্দে চমকে উঠে কল্পজগতের রঙিন দুনিয়া থেকে ঝুপ করে তমাল এসে পড়ে পলেস্তারা খসে যাওয়া রংচটা দেওয়াল সেকেলে কুলুঙ্গি-তাক বিশিষ্ট বৈঠকখানা ঘরের— লোহা কাঠের কড়িবরগা’র ছাদের নিচে। মাথার উপরে ঘুরছে তমালের জন্মের থেকে দেখা ঘিয়ে রঙের বিশাল লম্বাডাঁটির সিলিং ফ্যানটি। বাবা বলতেন এই বাড়ির সমস্ত ফ্যান তমালের দাদু কিনেছিলেন ‘ক্যালকাটা ফ্যান’ কোম্পানি থেকে। ক্ষীরোদবিহারী চক্রবর্তী নামক এক বাঙালি নাকি ১৯৩২ সালে এই কোম্পানিটি শুরু করেছিলেন। সেই ফ্যান আজও ঘুরে চলেছে। মাঝেমধ্যে একটু ঝামেলা করলেও, কোনওসময়ই ধর্মঘট ঘোষণা করে একেবারে দাঁড়িয়ে পড়েনি। সেরকম দরকার হলে হারুদা পাড়ার ইলেকট্রিক দোকান থেকে বীরেনকে ডেকে আনে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে বিডন স্ট্রিট আর গ্রে স্ট্রিটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তমালদের লাল পুরনো ইটের পৈতৃক বাড়িটি। প্রায় সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ওপরেই, কয়েক পা হেঁটে গলির ভিতরে। দোতলার কপাট খোলা সবুজ খড়খড়ির বড় বড় জানলা দিয়ে দিনভর হাওয়া-রোদ খেলে বেড়ায় কালো বর্ডার দেওয়া দাবার বোর্ডের সাদা-কালো রঙের মেঝেগুলিতে। দোতলা বাড়িটির ভগ্নপ্রায় দশা। অবিলম্বে সংস্কারের প্রয়োজন। সময়, পয়সার অভাব না থাকলেও— ইচ্ছেটা একদমই নেই তমালের। একতলার ভাড়াটে বেশ কয়েকবার যখন হুজ্জতি করে মাথা খারাপ করে দেয়, হারুদা গিয়ে সামাল দেয়। কোন মন্ত্রবলে তমাল জানে না, জানার চেষ্টাও করে না, ইচ্ছেটাই যে নেই। তবে হারুদা মারফৎ কানে এসেছে, ইতিমধ্যে কয়েকটি জলের কল, পাইপ বদল করা হয়েছে। ভাড়াটে পুরনো। সেই তমালের বাবার আমল থেকে। চলে যেতে বলতেও বাধোবাধো লাগে। তমাল বোঝে, এভাবে চলতে পারে না। আবার ভাবে, বাকি ক’দিনের জীবন এই ভাবেই যদি কেটে যায় মন্দ কী? বয়স অবশ্য তমালের এমন কিছু বেশি নয়। ভারতীয় জনগণের গড় জীবনীশক্তির আয়ু হিসেবে এখনও তিরিশ বছর হেসেখেলে কাটিয়ে দেওয়ার কথা, যদি অবশ্য আচমকা কোনও কেলেঙ্কারি না ঘটে। তমাল কি তাহলে কোনও মানসিক অবসাদে ভোগে? সেটাও তো বলা যায় না। তাহলে এতক্ষণ সে কল্প-জালের বুনটে কী করে লিখে যাচ্ছিল তার গল্পের নায়িকা রাধিকাকে নিয়ে।
— হেমন্তের নরম হলুদ রোদ্দুরের রোমে
ভেজা এক সকালে ফ্লোরাল প্রিন্টের পায়জামা আর কচি কলাপাতা রঙের ঢোলা কাঁধকাটা টিশার্ট
পরনে রাধিকার। চশমাটা চোখের তুলনায় বেশ বড়,
যেটা এখন স্টাইল। ডালপালা, মাটি, বাঁখারি জড়িয়ে কোনরকমে মাথানত করে দাঁড়িয়ে থাকা গোল
পাতার চালাঘরটির সামনে মাটির উঠোনে পাতা চাটাইটার ওপরে থেবড়ে বসে আছে সে। অর্কর ডান
হাত আলতো করে রাখা রাধিকার কোমরে। বাম হাতে ধরা পাশের চালাঘরটি থেকে আদিবাসী বউ সুলু বাগালের দেওয়া গ্লাসভর্তি
চা। কেমন করে যেন রাধিকা তখন তাকিয়ে ছিল দূরের ভালবাসার সর্বস্ব খোয়ানো মেয়ের মতো গা
এলিয়ে পড়ে থাকা ফসলকাটা খেত আর শাল-মহুয়ার ফাঁক গলে ধীরে ধীরে উঠে আসা কুসুম রঙা থালাটির
দিকে। হেমন্ত মানেই নরম ভোর, আদুরে সকাল— আলগা কুয়াশার জাল ছিঁড়ে বিন্দু বিন্দু হলুদ কিরণের
ছড়াছড়ি গোবর লেপা আঙিনায়। পুরুলিয়ার
এক প্রত্যন্ত গ্রামে অ্যানথ্রপোলজির ফিল্ড
ওয়ার্কের জন্য এসেছে রাধিকা আর অর্ক, আরও কয়েকজনের সাথে। পুরুলিয়ায় গেস্ট হাউজে উঠলেও গতকাল রাতে শুধু তারাই আশ্রয় নিয়েছিল
এই চালাঘরটিতে। —
গল্পটির পরমক্ষণ মুহূর্তটিতেই তমালের কল্পনা জগতে বিঘ্ন ঘটায়
ডোরবেলের সুমিষ্ট শব্দটি। কয়েকমাস তমাল এখন আবার গল্প লিখতে শুরু করেছে। পত্র-পত্রিকায়
ছাপা হচ্ছে। কিন্তু কারুর চাহিদা পূরণ করার জন্য নয়। যখন ইচ্ছে হয়, লেখে। অনেক গল্পই
অর্ধ-সমাপ্ত হয়ে পড়ে থাকে। তাও সম্পাদকরা তমালের খামখেয়ালীপনা সহ্য করেও তার লেখা গল্পের
আশায় প্রতীক্ষা করে থাকে। কলেজে পড়াকালীনও লিখত। তারপর একদিন দুম করে ছেড়ে দিল। কিছুদিন
আগে আঁকছিল। অয়েল-পেন্টিং নয়। পেন্সিল স্কেচ। কোনও মডেলকে সামনে বসিয়ে নয়। সৃষ্টি তার
অন্তর থেকে। হারুদা লুকিয়ে পাপিয়াকে দিয়েছিল। পাপিয়া যে সংবাদপত্রের অফিসে কাজ করে,
দেখানোর সঙ্গে সঙ্গেই হৈ-চৈ পড়ে যায়। ঐ সংবাদপত্র অফিসটির সহ-সম্পাদক তমালের বন্ধু।
ওর মাধ্যমেই পাপিয়ার চাকরিটা তমাল করে দিয়েছিল। কয়েকবছর আগে। তখন পাপিয়া বাংলায় অনার্স
নিয়ে পাশ করেছে। তমালের বন্ধুটি চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিল জেনেসিস আর্ট গ্যালারিতে। প্রশংসিত হয়েছিল। প্রায় সবগুলোই বিক্রি
হয়ে গিয়েছিল। তারপরেই হঠাৎ করে তমালের আঁকা বন্ধ।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা। তারপর ‘হারুদা’ বলে কয়েকবার হাঁক। কোনও সাড়াশব্দ
না পেয়ে পাপিয়া বুঝতে পারে সে বাজারে গেছে।
হারুদা দশ বছর বয়সে এই বাড়িতে এসেছিল। তমালের বয়স তখন ছয়। তমালের মায়ের গ্রামের বাড়ির
লোক হারুদা। মাকে হারানোর পর হারুদার বাবা হারুদাকে এই বাড়িতে রেখে যান। হারুদার বাবা
আর কাকার মধ্যে মনোমালিন্য হওয়ার পর ভিটে ভাগাভাগি হয়ে যায়। এই বাড়িতে থেকে হারুদা
দশ ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিল। যতদিন হারুদার বাবা বেঁচে ছিলেন, কয়েকমাস অন্তর হারুদা গ্রামের
বাড়িতে যেত। এখন আর যায় না। বাবার অংশটা কাকাকে বিক্রি করে দিয়েছে। বিয়ে করে গ্রামে
কিংবা চাইলে এখানে থেকেও ঘর-সংসার করার কথা তমাল অনেকবার বলেছে। হারুদার এক জবাব, বউদিমণি
না বুঝে-শুনে যে অন্যায়টা করল দাদাবাবুর সাথে! সংসার করার ইচ্ছেটাই তার আর নেই। হারুদার
এই কথা শুনে তমাল হা – হা করে হেসে ওঠে। তাহলে ‘বোহেমিয়ান’ দলে আর একজন অনুগত সদস্য
হোল। তমাল হারুদার থেকে চার বছরের ছোট হলেও, হারুদা তমালকে দাদাবাবু বলে সম্বোধন করে।
তমাল বাধা দেয়নি।
বারান্দা পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে জিজ্ঞেস করে, ‘কে, হারুদা?’
— না, আমি। পাপিয়া।
— তুই হঠাৎ! এই অসময়ে! তোর অফিস নেই?
— তোমার কিচ্ছু খেয়াল থাকে না, তমালদা।
আমাদের অফিস দুটোয় শুরু হয়। আর তাছাড়া আমি আজকে ছুটি নিয়েছি।
— কেন ছুটি নিয়েছিস? আর ছুটি নিলেও
----
— ওঃ তমালদা! আর বকবক না করে দরজাটা
খুলবে? পা ব্যাথা করছে যে।
নীল ডুরে শাড়ি পরে একমুখ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাপিয়া। হাতে
ধরা একটি টিফিন-কৌটো। কাঁধে ঝোলানো কাপড়ের ব্যাগ। ঈষৎ ধূসর-বাদামি রঙের মতো তার ত্বক।
পাতলা ঠোঁট। কোমর অবধি ঈষৎ ভেজা ছড়ানো চুল। মনে হচ্ছে একটু আগে স্নান করেছে। কপালে
ছোট্ট তুঁতে রঙের টিপ। রোগাটে গড়ন। পায়ে স্যান্ডেল। রূপটানের ধার ধারে না এই মেয়ে।
কিন্তু সৌন্দর্যের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে তার শরীর থেকে, ঘন কালো দুটো চোখ থেকে। পাইকপাড়াতে
থাকে। মাকে নিয়ে। ছোট্ট দেড় কামরার বাড়ি। বাড়িটা দাদুর আমলের।
— হাতে এইসব কী? আর মিটিমিটি হাসছিস
কেন?
— ও মা! তুমি ভুলে গিয়েছ! তোমার আজকে
জন্মদিন। সেই তিন বছর ধরে এই দিনে তোমার জন্য পায়েস করে আনছি। মাসিমা বলে গিয়েছিলেন।
— কেন মনে করিয়ে দিস বারবার। আমি ভুলে
যেতে চাই এই দিনটিকে।
— আমি জানি তুমি এখনও অনন্যাদি’কে মনে
করে কষ্ট পাও।
— তুই চুপ করবি? আমি অনন্যাকে ভুলে
গিয়েছি। কিন্তু তোরাই আবার এই দিনটিকে খুঁচিয়ে মনে করিয়ে দিস। চল, উপরে। কেমন পায়েস
বানিয়েছিস, চেখে দেখি।
পাপিয়া তমালদার নজর এড়িয়ে শাড়ির আঁচল দু’চোখ আর গালের ওপর আলতো
করে বুলিয়ে নেয়। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় একটু জোর করেই হি-হি করে হাসার চেষ্টা করে
বলে, ‘তুমি কিন্তু একদম রাগতে পারবে না। হারুদা মাংস আনবে। গতকাল বলে গিয়েছিলাম। আমি
রান্না করব।’
তমাল যতই ছন্নছাড়া জীবনযাপন করুক, অনুভূতিগুলো শুকিয়ে যায়নি।
পাপিয়ার ঈষৎ ভেজা কণ্ঠস্বর, অশ্রুজল কিছুই তার কান এবং চোখ এড়ায় না।
(দুই)
এলোমেলো। ছন্নছাড়া। ভবঘুরে। অকর্মা। উদ্দেশ্যহীন। আঞ্চলিক ভাষায়
ভাদাইম্যা। বলা হয় সাধারণত স্বল্প বুদ্ধির এবং ধীর গতির লোককে। কিন্তু বোহেমিয়ান! এলোমেলো,
ছন্নছাড়া জীবনযাপন করলেও তারা বুদ্ধিমান এবং মেধাবী। কৈশোরে, যৌবনে – বোহেমিয়ান হতে
কার না সাধ জাগে! কিন্তু তারা অল্প কিছুদিনেই সম্মুখীন হয় কঠিন বাস্তবের। বুঝতে পারে
জীবনটা রূপকথা নয়। বেশির ভাগেরই এক সময় শেষ হয়ে যায় ছন্নছাড়া জীবন। কিন্তু কিছু মানুষ
জীবনভর রয়েই যায় বোহেমিয়ান। বুদ্ধিমান, মেধাবী হয়েও জীবন চলে নিজের খেয়ালে। স্রোতে
ভাসিয়ে দেয় ইচ্ছেগুলিকে। তমাল পড়ে এই মুষ্টিমেয় গোষ্ঠী’তে।
একাধিক গুণ তমালের। অথচ সেই গুণগুলোর কোনও মূল্যই নেই তার কাছে।
তাদেরকে লালন করেনি, ভালবাসেনি। শিখরের কাছাকাছি পৌঁছেও সরে এসেছে। স্কুলের সবাই আশা
করেছিল বোর্ডের পরীক্ষায় প্রথম দশজনের মধ্যে নাম থাকবে। সবাইকে হতাশ করে তিনশোর পরে
নাম। পাড়ার শঙ্কর পালের হাত ধরে কত বড়-বড় ক্রিকেটার উঠে এসেছে। খেলেছে বড় ক্লাব, বাংলার
হয়ে। কভার ড্রাইভ, স্কোয়ার ড্রাইভ, হুক শট সবার চোখ জুড়িয়ে দেয়। কিন্তু তমাল কপি-বুক
শট, প্রয়োজন মতো ডিফেন্সিভ ক্রিকেট কিছুতেই খেলবে না। কোনও বলকেই মর্যাদা দিতে চায়
না। সব বলকেই সে পাঠাতে চায় সীমানার বাইরে।
ডট বল কী সে জানতে চায় না। তাও শঙ্কর পাল সুযোগ করে দিয়েছিল একবার সিলেকশন বোর্ডের
সামনে নিজেকে প্রমাণ করার। পুরো মাঠ হাততালিতে মুখরিত, যখন প্রথম দুটি বল চলে যায় তীব্র
গতিতে সীমানার বাইরে। তার পরের বলেই লেগ স্ট্যাম্প দু’টুকরো হয়ে যায়। সেই যে ব্যাট-প্যাড
গুটিয়ে রাখল ভাঁড়ার ঘরে, আর বের করেনি। পাড়ার ক্লাব ‘একফালি রোদ্দুর’ বিভিন্ন জায়গায়
অনুষ্ঠান করতে যায়। রীতিমতো ভাড়া করে নিয়ে যায়। তমাল ভাল গিটার বাজায়। খবর পেয়ে তমালকে
জোর করে পাড়ার ক্লাব ডেকে নিল। ঐসময় পাড়ায়-পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হওয়ার বেশ চল
ছিল। কয়েকটি অনুষ্ঠানের পর, ক্লাবের নাম এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ল – প্রায় প্রত্যেক সপ্তাহেই
বিভিন্ন জায়গা থেকে ডাক আসতে থাকে। তমাল তখন যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। অঙ্ক বিভাগের
স্নাতকোত্তর ক্লাসে। কলেজ ম্যাগাজিনে লেখে। ছবি আঁকে। ভাল ডিবেট করে। কলেজের মক্ষী-রাণীরা
তখন তার চারপাশে ঘুরঘুর করে। আলাপ করা, কথা
বলার অছিলায় তার গায়ের ওপর প্রায় ঢলে পড়ে। তমাল যখন স্নাতকোত্তর ক্লাসে, সেই সময় পাপিয়া বাংলা নিয়ে পড়তে আসে। বাবাকে
হারিয়েছে অল্প বয়সে। মা সেলাই ইত্যাদি করে অনেক কষ্টে সংসার চালায়। পাপিয়াও কয়েকটি
টিউশনি করে। অনন্যাও তখন অর্থনীতি নিয়ে পড়ছে সেকেন্ড ইয়ারে। অবস্থাপন্ন ঘরের আদুরে
মেয়ে। দেখতে চমৎকার। একটু রোগার দিকে হলেও, ভরাট যৌবন। কলেজের সমস্ত ছেলেই ওর সাথে
কথা বলার সুযোগ খোঁজে। কিন্তু অনন্যা কলেজে ভর্তি হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই তমালকে
ছিপ দিয়ে গেঁথে তোলে। ওইসময় অনন্যার মতো মেয়েদের কাছে তমালদের মতো এলোমেলো, ছন্নছাড়া,
গল্প-কবিতা লেখা ছেলেদের খুব চাহিদা। তখন মেয়েরা সাধারণত প্রেমে জড়িয়ে পড়ত, আজকালের
মতো রিলেশনে নয়। তমালের তখন উঠতি বয়স। অনন্যার সুন্দর সেটিং দাঁতের মিষ্টি মোহিনী হাসি,
আদুরে কণ্ঠস্বর, শাড়ির আড়ালে নাভির উপত্যকা বাধ্য করায় তমালকে জড়িয়ে পড়তে অনন্যার সাথে।
যেদিন অনন্যা ক্যান্টিনে বসে আছে তমালের সাথে, পাপিয়া হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হয়ে মিষ্টি
হেসে তমালকে বলে, ‘এই রোববারে সংবাদপত্রের পাতায় আপনার লেখা হলুদ শাড়ি গল্পটি পড়লাম।
কী সুন্দর প্রেমের গল্প লেখেন আপনি। কলেজ অনুষ্ঠানেও কিছুদিন আগে গিটার বাজানো শুনলাম।
একজন মানুষের কতো গুণ থাকতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস হত না।’ তমাল কিছু বলার আগেই পাপিয়া
চলে যায়। তমাল তখনও ওর নাম জানে না। তমালের কাছে মনে হয়, ও যেন ওর ঘন কালো চোখ দুটো
দিয়ে কথা বলছিল। ঠোঁট দিয়ে নয়। এরপর অনন্যার নজরে এসেছে তমালকে বেশ কয়েকবার পাপিয়ার
সাথে কথা বলতে। তমালের সাথে অনেকেই কথা বলে – জুঁই, নন্দিতা, কাকলি – আরও অনেকেই। কিন্তু
অনন্যার গাত্রদাহ পাপিয়াকে নিয়ে। ওর ঘন কালো চোখ দুটো নিয়ে। অনন্যার চটকদার, আকর্ষণীয়,
যে কোনও পুরুষের চোখে লোভনীয় চেহারা হলেও – ওর চোখের মণিদুটো বাদামি ঘেঁষা। তমাল একবার
ঘনিষ্ঠ অবস্থায় অসাবধানে বলেও ফেলেছিল, চুমু খাওয়ার সময় তোমার চোখের পাতাদুটো প্লিজ
বন্ধ রেখো – ভয় করে। পাপিয়াকে তমাল যেন এড়িয়ে চলে, মেয়েটি সুযোগসন্ধানী – এই নিয়ে বেশ
কয়েকবার তমাল-অনন্যার কথা কাটাকাটি-রাগারাগি হলে, দুম করে একদিন তমাল লেখা, ছবি আঁকা,
গিটার বাজানো – সব ছেড়ে দেয়। তমাল অবশ্য এরপরেও পাপিয়ার সাথে যোগাযোগ রেখেছে, ওদের
বাড়ি গিয়েছে। অনন্যার অজান্তে পাপিয়াকে নিজের বাড়ি এনে মায়ের সাথে আলাপ করিয়েছে।
বাবা-মা চেয়েছিলেন, তমাল মাস্টার্স করে ডক্টরেট করবে, কলেজে
অধ্যাপনা করবে। আদুরে মেয়ের আবদার আর বড়লোক শ্বশুরের বুদ্ধিতে, তমাল যে কেমন করে হঠাৎ একদিন অনন্যাকে রেজিস্ট্রি
ম্যারেজ করে বাড়িতে এনে হাজির করে – সেটা শুধু তমালের বাবা-মায়ের বোধগম্যের বাইরে ছিল
তা নয়, হারুদাও আজ পর্যন্ত তার উত্তর খুঁজে পায়নি। কয়েকদিন পর অনন্যার বাবা একটি হোটেলে
বড় করে দু’দিন ধরে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ের আয়োজন করেন। অনন্যার বাবার আপত্তি সত্ত্বেও
তমালের বাবা অর্ধেক খরচ বহন করেন। বড়লোক শ্বশুর তার পরিচিত একটি কোম্পানিতে তমালকে
ঢুকিয়ে দেন। ছয়মাস পরেই ছেড়ে দিয়ে তমাল একটি বেসরকারী স্কুলে চাকরি নেয়। ভালই চলছিল।
তমালের বাবা-মা, হারুদা সবার মনে হয়েছিল ছেলেটার মাথা এবার সুস্থির হয়েছে। কিন্তু রাতে
বন্ধ দরজার আড়ালে রোজ অশান্তি। অনন্যার পছন্দ নয় একজন মামুলি স্কুল শিক্ষকের স্ত্রী
হিসেবে পরিচয় দিতে তার বাপের বাড়ির আধুনিক সমাজে। এর মধ্যে পাপিয়া স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে
চাকরি খুঁজছে। আরও পড়ার ইচ্ছে থাকলেও, সেটাকে মনের ভিতরেই দমিয়ে রাখে। মায়ের বয়স হচ্ছে,
একটু আরামের দরকার। অনন্যার অজান্তেই তমাল ওর বন্ধুর সংবাদপত্রের অফিসে পাপিয়ার চাকরি
করে দিয়েছে। সহ-সম্পাদকের সহকারী হিসেবে। এদিকে প্রতিদিনের অশান্তি, ফোঁস করে ফেলা
শ্বাসের গরম হলকা, বিরক্তি-ভরা বাদামি মণির ধারালো দৃষ্টি এড়াতে – দু’বছরের মাথায় তমাল
স্কুলের চাকরি ছেড়ে অনন্যার বাবার সুপারিশে একটি বেসরকারী ব্যাঙ্কে লোন বিভাগে চাকরি
শুরু করে। ব্যাঙ্কের ম্যানেজার অনন্যার বাবার পরিচিত।
স্কুলের চাকরিটা ভাল লাগলেও, তমাল এখানে মানিয়ে নিয়েছে। বছর
খানেক পর একদিন ব্যাঙ্কে নিজের চেয়ারে জাস্ট এসে বসেছে, ক্যাশিয়ার-বাবু এসে তমালকে
কাগজে মোড়া একটি প্যাকেট দেন। বলেন, মেয়ের বিয়ের জন্য ধার করেছেন। ক্যাশে আছেন। তাই
তমালের কাছে ত্থাকুক। ছুটির সময় নিয়ে নেবেন। তমাল ড্রয়ারে রেখে দেয়। কাজের চাপে ভুলেও
গিয়েছিল। ঠিক ছুটির আগে ব্যাঙ্কে হৈ-চৈ। পাঁচশো টাকার একটা বান্ডিল ক্যাশ মিলাতে গিয়ে
কম পড়েছে। ব্যাঙ্কে তখন শুধু নিজেদের স্টাফ। ম্যানেজারের নির্দেশে সবার ডেস্কে, ব্যাগে
তল্লাশি চালানো হয়। তমাল কিছু বোঝার এবং বলবার আগেই ওর ড্রয়ার থেকে বান্ডিলটি বেরয়।
তমাল কিছু বলার চেষ্টা করতে গেলে, নজর চলে যায় ক্যাশিয়ার-বাবুর দিকে। সে কিছুই বলে
না। তমাল অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। যেহেতু টাকাটা পাওয়া গেছে, কিছু একটা
ভেবে ম্যানেজার পুলিশকে ডাকেন না। তমালকে ব্যাঙ্কে আসতে বারণ করা হয়। বলা হয়, অভ্যন্তরীণ
তদন্তের সময় খবর দেওয়া হবে হাজিরার জন্য।
তমাল ছন্নছাড়ার মতন কলকাতার রাস্তায় হাঁটতে থাকে। নিজেই জানে
না কখন পৌঁছে যায় পাপিয়াদের বাড়িতে। সেদিন পাপিয়ার অফ-ডে ছিল। পাপিয়াকে জড়িয়ে হু-হু
করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। এই প্রথম বোধহয় তমাল এইভাবে হাহাকার করে কাঁদল। পরদিন সকালে
মোবাইল সুইচ অন করতেই দেখে, বাবার এবং অনন্যার অনেকগুলি মিসড কল। সঙ্গে সঙ্গেই অনন্যার
ফোন। ‘এটা কী করলে তুমি! তুমি এখন কোথায়? বাবা পুলিশে খবর দেবেন বলেছিলেন। আমি না করেছিলাম।
এমন একটা কাজ তুমি করেছ, পুলিশকে মিসিং ডাইরি কি করা যায় এই সময়!’ তমাল কিছু বলার আগেই
পাপিয়া চায়ের কাপ ও কয়েকটি বিস্কিট টেবিলের ওপর রেখে বলে, ‘গরম থাকতেই খেয়ে নাও, তমালদা।
কাল থেকে কিছুই খাওনি।’
‘ওঃ, তুমি ওই ডাইনি’টার বাড়িতে! এখন বুঝতে পারছি তুমি কেন ব্যাঙ্কের
টাকা সরাতে গিয়েছিলে।’ তমালের হাতে ধরা মোবাইলটা শব্দহীন।
তমাল বাড়ি পৌঁছে দেখে, অনন্যা চলে গেছে। বাবা কেমন যেন নির্বাক
হয়ে গেছেন। মা পায়েসের বাটি থেকে এক চামচ মুখের সামনে তুলে ধরেন। তমাল মুখ সরিয়ে নিতে
গেলে বলেন, ‘জন্মদিনের দিন খেতে হয়।’
মাস-খানেকের মধ্যেই বাবা সবাইকে ছেড়ে চলে যান। ব্যাঙ্ক থেকে
তদন্ত কমিটি ডেকেছিল। কিন্তু এটা অপরিষ্কার থেকে যায় ক্যাশরুম থেকে টাকার বান্ডিলটি
কী করে তমালের ড্রয়ারে পৌঁছে যায়। ক্যাশ-বাবু যেমন নীরব, তমালও আত্মপক্ষ রক্ষার্থে
কিছুই বলে না। ক্যাশ-বাবু যে আগেই তমালের বাড়ি এসে ক্ষমা চেয়ে গেছে। সংসারের চাপ। ছেলে
বেকার। মেয়ে অবিবাহিতা। বুদ্ধি লোপ পেয়েছিল। নইলে ব্যাঙ্কের একজন অভিজ্ঞ কর্মচারী এরকম
কাজ করে! ব্যাঙ্কের চাকরিটি চলে গেলে হয়তো তাকে আত্মহত্যা করতে হবে। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের
কিছু করার অবকাশ ছিল না। তমালের চাকরিটি আর থাকে না। ছয় মাস পর ডিভোর্সের কাগজ আসে।
তমাল সই করে দেয়। খোরপোশ বাবদ এককালীন একটা নির্ধারিত টাকায় রফা হয়। এর কিছুদিন পর
মা’ও চলে যান। তখন অবশ্য হারুদার সাথে পাপিয়াও মায়ের পাশে ছিল।
(তিন)
মাংসে সব মশলা মাখা হয়ে গেছে। ঘন্টা-খানেক ধরে এখন মাংসের ভিতরে
ঢুকবে। হারুদা কফি দিয়ে গেছে। টেবিলের ওপর খোলা ল্যাপটপে লেখাটা পড়তে পড়তে পাপিয়া বলে,
‘তুমি গল্প লিখছিলে, তমালদা? শুরুটা তো বেশ সুন্দর। প্রেমের কাহিনি মনে হচ্ছে। কিন্তু
তুমি তোমার সব প্রেমের গল্পেই পরিণতি দুঃখের কর। আগে তো এরকম করতে না।’
— ঠিক করেছি এই গল্পটা আর লিখব না।
তমাল বারান্দায় গিয়ে রেলিং ধরে দাঁড়ায়। সিগারেটে কয়েকটি টান
দিয়েই নিভিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পরেই অনুভূত হয় নীল ডুরে শাড়ির আঁচল তার শরীরে-মুখে। বইছে
এলোমেলো পাগলা হাওয়া। চোখ থেকে আঁচল সরিয়ে দেখতে পায় পাশে দাঁড়ানো পাপিয়াকে। মধ্য-সকালের
নরম হলুদ রোদ হামাগুড়ি দিচ্ছে তার ঈষৎ ধূসর-বাদামি রঙের শরীরে।
— কোনও লেখার রূপ-রস-রঙ থাকে বইয়ের
মলাটের মোড়কের আড়ালে। উপন্যাসের মতোই চকচকে-তকতকে সুন্দর মনোরম রূপে। তমালদা, তুমি
কেন নিজেকে এমনভাবে আবদ্ধ করে রাখো? মলাট’টা উল্টোতেই দাও না।
— উপন্যাসের পাতা ওল্টালেই চোখে পড়বে
নিউজ প্রিন্টের খসখসে লালচে আভাযুক্ত কাগজ। কয়েক পাতা নাড়াচাড়া করলে ক্লান্ত হয়ে পড়বি।
— তুমি কি কিছুই বোঝো না! নাকি বুঝতে
চাও না? একবার অনুমতি দাও না মলাট’টা উল্টিয়ে ওই লালচে কাগজগুলিরই সুবাস নিতে।
— পাপিয়ারা জোড়া বাঁধে না।
— আমি কি তাই চেয়েছি? শুধু তোমার পাশে
থাকতে দাও। দূরে সরিয়ে দিও না।
— যদি ক্ষণিকের উত্তেজনায়, অসাবধানতায়
--- ।
— ভয় নেই। পাপিয়া পাখির মতো ডিম ছাতারে
পাখির বাসায় ছেড়ে আসব না। আমিই তা দিয়ে বড় করব।
একটু যেন কেঁপে ওঠে তমাল। এতক্ষণ নামিয়ে রাখা বড় বড় কালো চোখ
পাখির মতো ডানা মেলে পাপিয়া তাকাল তমালের দিকে। পাপিয়া কি তাহলে চেষ্টা করছে তার সর্বশক্তি
দিয়ে হারিয়ে যাওয়া বোহেমিয়ান তমালকে খুঁজে বের করতে, মলাটের মোড়কের আড়াল থেকে! তমালও
ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে এলোমেলো বেয়াড়া
পাগল হাওয়ার ঝাপটায়, ডুবে যেতে থাকে দীঘল কালো চোখের প্রতিবিম্বে। আর তখনই এই মধ্য-সকালে
শুনতে পায় ‘পিউ কাঁহা, পিউ কাঁহা’ ডাক। কে ডাকল? না কেউ ডাকেনি। এ ডাক যে নিজের অন্তঃস্থল
থেকেই।
