তুরুপের তাস
দেবব্রত
সাহা
দীর্ঘ কুড়ি পঁচিশ বছর সক্রিয় রাজনীতি করে দীপেশবাবু বুঝেছেন রাজনীতি করাটা সার্কাসের তারের উপর ছাতা মাথায় হেঁটে যাওয়ার দক্ষতা অর্জন করা। নিজের ব্যালান্সটি নিজের বুদ্ধি ও অদূরদর্শিতার উপর নির্ভরশীল। কখন যে কোন সুইং এর সামনে পড়েও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, সেটা বেশ রপ্ত করে নিয়েছেন। তারই ফলশ্রুতি হিসেবে বর্তমানে অঞ্চল সভাপতির পদ পেয়েছেন। বর্তমানে আবার ব্লক বা এরিয়া সভাপতি হওয়ার বিশেষ চেষ্টায় আছেন।
দীপেশবাবু জানতেন রাজনীতি পুরোপুরি করতে গেলে
সাংসারিক দায়ভার নিজের কাঁধে রাখলে চলবে না। তাই সাংসারিক সব ভার ধীরে ধীরে
গিন্নি অনুভা দেবীর উপর ন্যস্ত করেছেন। ছেলে ছোট সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে। তাকে
কলেজ রাজনীতিতে ঢুকিয়ে আগামী দিনে সত্যিকারের রাজনীতিটা করা রপ্ত করিয়ে
নিচ্ছেন। ছেলেও বাবার উপদেশ শিরোধার্য করে নিয়েছে।
একমাত্র মেয়ে মিথিলা এমএ পাস
করেছে। কিন্তু মেয়ে মিথিলার সামনে কোনদিন রাজনীতির কথা মুখে আনতে পারেননি।
মেয়েকে একটু সমীহ করে চলতেন। মিথিলার দৃঢ় সিদ্ধান্ত ছিল অন্য যে কোন পেশা হোক তা
নেবে তবে রাজনীতির আঙিনায় পা রাখা কখনো নয়। ওর ধারণা বর্তমানের রাজনীতি পঙ্কিলতায়
ডুবে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। চোখের সামনে বাবার রাজনৈতিক কার্যাবলী ছোটবেলা থেকে দেখে
দেখে অনেক কিছু শিখেছে। নিজের আত্মমর্যাদা, নৈতিকতা, বোধ বুদ্ধি, ইত্যাদি জলাঞ্জলি
দিয়ে দলের নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে। নিজের বিচার বোধ লুপ্ত হয়ে যাবে। কোনটা
ন্যায় কোনটা অন্যায় কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা সে বিচার্য তোমার নয়। দল যে
সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই কলুর বলদের মতো অনুসরণ করতে হবে। এখানেই মিথিলার দৃঢ়
আপত্তি।
এখন মেয়ের বিয়ের জন্য গিন্নির
অনবরত চাপে চাকুরীরত পাত্রের সন্ধান করতে গিয়ে তিনি শুনলেন দলীয় রাজ্যের এক
সহসভাপতি নাম বিহারীলালবাবু তার বিটেক পাস বিদেশি কোম্পানিতে দু বছর চাকুরীরত
ছেলের জন্য উপযুক্ত পাত্রী খুঁজছেন। সুযোগ মতো একদিন দীপেশবাবু নিজেই তার মেয়ের
কথা বলে বিহারীলালবাবুকে বাড়িতে চায়ের আমন্ত্রণ জানালেন। বিহারীলালবাবু আগেই
দীপেশবাবুর মেয়ের কথা শুনেছিলেন। দেখতে শুনতে ভালো ,শান্ত, শিক্ষিতা-তাই
দীপেশবাবুর আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন।
বিহারীলালবাবুর চা আপ্যায়নের ভার মেয়ে মিথিলার উপর
দিয়েছিলেন। মিথিলা প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি । এখন মিথিলাকে দেখে বিহারীলালবাবুর
বেশ পছন্দ হয়ে গেল। তিনি মিথিলার সঙ্গে আলাপ জমাবার চেষ্টা করতেই বিহারীলালবাবু
যে রাজনীতির ঘনিষ্ঠ লোক সেটা মিথিলার কাছে প্রকাশ হয়ে গেল। ভদ্রতা বজায় রাখতে
মিথিলা দু চার কথা বলেই ভিতর ঘরের দিকে পা বাড়ালো। বিহারীলালবাবু বহুদিনের
রাজনীতির পোড় খাওয়া লোক।তবু মিথিলার এই আচরণ কিছু বুঝলেন কিছু বুঝলেন না। তিনি রাজনীতির লোক। যুবতী মনের সুলুক সন্ধান যে রাজনীতির
থেকেও অনেক বেশি ঘোরালো সেটা ওনার জানা নেই।তবে মিথিলার কোন দোষ দেখলেন না।
মিথিলার সাথে আলাপ করে বুঝেছিলেন এই চা আমন্ত্রণের পিছনে ওর বাবার কোন বিশেষ
উদ্দেশ্যর কথা মিথিলার জানা ছিল না। বিহারীলালবাবুর মনে হল দীপেশবাবু মেয়েকে
তুরুপের তাস বানিয়ে রাজনীতির উচ্চাকাঙ্ক্ষা মেটাবার চেষ্টায় আছেন। ওনার ছেলে
অশোকানন্দর সঙ্গে মিথিলার বিয়ে দিয়ে একটা বৈবাহিক সংযোগ রচনা করে অঞ্চল সভাপতি
থেকে ব্লক সভাপতির হবার ধান্দায় রয়েছেন। তবুও তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন যে
মিথিলাকেই ওনার পুত্রবধূ হিসেবে দেখবেন। ছেলেকেও নিজের মনোবাসনা ব্যক্ত করবেন।
মেয়ে মানুষের নেশা আর ক্ষমতার নেশা একবার মানুষের
মনকে গ্রাস করলে মানুষ রক্ত-পিপাসু শ্বাপদের মতো হয়ে ওঠে। ঈপ্সিত আকাঙ্ক্ষা
চরিতার্থ করতে সব নিয়ম-নীতি অগ্রাহ্য করে উচিত অনুচিত বোধ ভুলে যায়। দীপেশবাবুর
মনে এখন এই ক্ষমতার নেশা জেগে উঠেছে। তিনি যে কোন মূল্যে তার রাজনীতি জীবনের
পরবর্তী ধাপে উন্নীত হওয়াকে পাখির চোখ করে তুলেছেন। সেই জন্য নিজের মেয়ের
অজান্তে মেয়েকে তুরুপের তাস করে নিজের মনোবাসনা হাসিল করার জঘন্য রাস্তায় পা
বাড়িয়েছেন। এর ফলে তার সাংসারিক পরিমণ্ডলে যে সুনামি উঠবে তার ধাক্কা সামলাতে
পারবেন কিনা সেটা একবারও ভেবে দেখেননি।
এখন বিহারীলালবাবু বেরিয়ে যেতেই বাবার বিরুদ্ধে
ধূমায়িত ক্ষোভ চাপা রেখে হিম শীতল কন্ঠে বাবাকে মিথিলা বলল "তুমি তো জানো
আমি রাজনীতি পছন্দ করি না। রাজনৈতিক সম্বন্ধীয় ব্যাপার ও পরিবেশ থেকে শত হাত দূরে
থাকি। এ বাড়িতে রাজনীতির লোক আসুক এটা আমি পছন্দ করি না।
আমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে।যথেষ্ট বিদ্যা অর্জন করেছি। কিসে আমার ভাল হবে এ বোধ আমার
যথেষ্ট হয়েছে। আর তুমি কিনা চুপি চুপি এক রাজনৈতিক নেতাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আবার
আমাকে তার আপ্যায়নের ভার চাপিয়ে দিয়ে যে নিকৃষ্ট কাজটা করালে তার কোন ক্ষমা
নেই। এর ফল ভালো হবে না।"
এত কথা
শুনেও দীপেশবাবু নিস্পৃহভাবে বললেন "উনি মান্যিগণ্যি লোক" বাবার মুখের
কথা কেড়ে নিয়ে মিথিলা শ্লেষের স্বরে বলল "কিসের মান্যিগন্যি লোক? আজ
যদি রাজনৈতিক তকমা সরে যায় তো কাল রাস্তার লোক তুই তোকারি করতে শুরু করবে। টাকা
পয়সা দেখে আজকাল কেউ মান্যিগন্যি করে না। আজকাল ওইসব নেতাদের কিছুটা ভয়ে আর
কিছুটা সরকারি ডোল পাওয়ার জন্য ভক্তিভাব দেখায়। আসলে এইসব নেতাদের জন্য সাধারণ
লোকদের মনে তীব্র জ্বালা সবসময় বয়। একদিন না একদিন ভিসুভিয়াসের জ্বালামুখ দিয়ে
গলিত লাভা বেরিয়ে এসে এইসব নেতাদের ছাই করে দেবে।"
দীপেশবাবু অনেকদিনের পোড় খাওয়া নেতা। এসব জ্বালাময়ী কথা বহু শুনতে হয়েছে। বহু
মানুষের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের সামনে কি করে নিজেকে শীতল রাখতে হয় তা তিনি আস্তে
আস্তে শিখেছেন। তিনি ধীর স্থির স্থিতধী এখন।অন্তরে কোন সত্যিকারের আবেগ থাকলে
রাজনৈতিক নেতা হওয়া যাবে না সেটা তৃণমূল স্তরেই হোক বা উঁচু মহলেই হোক। কথার
মারপ্যাঁচে মানুষকে ভোলাতে হবে। জনতার সামনে একটা ইলিউশন তৈরি করতে হবে। তবেই
রাজনীতির কন্টকাস্তীর্ন পথ চলতে সহজসাধ্য হবে। আজ একটা স্থানে পৌঁছেছেন, এবার
সেখান থেকে আরেক ধাপের উত্তরণে প্রয়াসী হয়েছেন। এর জন্য মেয়েকে তুরুপের তাস করে
তুলতে পিছপা নন।
মেয়ে
মিথিলার এত কটু বাক্য শুনেও ক্যাবলার মত হেসে বললেন " ওনার ছেলে তো রাজনীতি
করে না । বি টেক পাস করে বিদেশি কোম্পানিতে ভালো মাইনের চাকরি করে। চেহারায়
আভিজাত্য বোধ আছে। এমন ছেলেকে পাত্র হিসাবে ভাবতে দোষ কোথায়?"
এবার মিথিলা গলা আরো চড়িয়ে বলল"আমি তো
বিহারীলালবাবু বা তার ছেলেকে কিছু বলছি না, আমি তোমার কপট চিন্তাধারার কথা বলছি।
নিজের রাজনৈতিক উচ্চাশা চরিতার্থ করতে নিজের মেয়েকে তুরুপের তাস করে তুলেছ।"
এই বলে মিথিলা নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
এতক্ষন
পাশের ঘরে মিথিলার মা অনুভাদেবী সব শুনছিলেন। এবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মেয়ের
দরজায় করাঘাত করে বললেন" মিথিলা তুই কি পাগল হলি মা? তুই তো বড়ো হয়েছিস
যথেষ্ট বিদ্যা বুদ্ধি হয়েছে। তোর অমতে বাবা তোর বিয়ে দিতে পারে? দেশে থানা পুলিশ
আইন আদালত কি নেই?"
অনুভাদেবী
উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়লেন। যুবতী বয়সের মন। কে বলতে পারে একটা অঘটন না বসিয়ে বসে
রাগের মাথায়।
অনুভাদেবী এবার স্বামীর উদ্দেশ্যে বললেন"
রাজনীতি করে করে সহজ ভাবনা বুদ্ধি সব গোল্লায় দিয়েছো। সব সময় একটা প্যাঁচালো
কান্ড কর। তোমার যদি সেই পাত্রটিকে পছন্দ হয় তবে একদিন তাকেই বাড়িতে চায়ের
আমন্ত্রণ জানাতে পারতে। তা না করে তার বাবাকে ডেকে নিয়ে আনলে? মেয়ের রাজনীতির
অ্যালার্জি আছে। আবার মেয়ের অজ্ঞাতসারে মেয়েকেই আমন্ত্রণের ভার দিলে।এখন সে
ভদ্রলোক যদি মিথিলাকেই পুত্রবধূ করে নিতে চায় মিথিলার মতের বিরুদ্ধে, তাহলে
ব্যাপারটা কোথায় দাঁড়াবে? একটা সহজ ব্যাপার জটিল থেকে জটিলতার করে তুললে।"
দীপেশবাবু
গিন্নির কথাগুলোর প্রত্যুত্তরে একটি কথাও বললেন না। এতক্ষণে তিনি ঘটনার গুরুত্ব
উপলব্ধি করলেন। ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তার খোলা হাওয়ায় ধাতস্থ হবার চেষ্টা করলেন।
দীপেশবাবুএক অজানা আশঙ্কায় কণ্টকিত হয়ে উঠলেন। তিনি ওই বিহারীলাল বাবুকে ভালো
করে চেনেন। এইরকম লোকেরা তাদের সিদ্ধান্তকে যেনতেন প্রকারেণ বাস্তব রূপ দিতে যে
কোনো ঘটনা ঘটাতে পারে। এদের হিংস্রতা পাশবিকতার পরিচয় রাজনৈতিক কার্যকলাপ এর
মধ্যে দীপেশবাবু বহু বার প্রত্যক্ষ করেছেন।মিথিলা যদি তার ছেলের সঙ্গে একান্তই
বিয়েতে রাজি না হয় তবে মিথিলার যেকোনো ক্ষতি করতে কলকাঠি নাড়বেন। দয়া মায়া
মমতা নৈতিকতার ধার ধারবেন না। মিথিলার পিছনে ওনার কোন সাগরেদ লাগিয়ে মিথিলাকে একা
রাস্তায় পেয়ে ভয় দেখাবে। এমনকি কোন দৈহিক বা মানসিক ক্ষতিও করতে পারে। স্থানীয়
থানা বা প্রশাসন চুপ করে থাকবে। মিথিলার যে ক্ষতি হবে তা তো সে আর ফিরে পাবে না।
এই ঘটনার দুদিন পরে এক বিকেলে এক দীর্ঘদেহী সুঠাম
যুবক দীপেশবাবুর বাড়ির দরজায় কলিংবেল বাজালো। দীপেশবাবু বাড়িতেই ছিলেন। তিনি
দরজা খুলে যুবককে দেখেই চিনতে পেরে শশব্যস্ত হয়ে ভিতরে এসে বসতে বললে যুবকটি
বলল" না কাকাবাবু, আমি আজ ভিতরে যাব না। বাবা আমাকে একটা চিঠি দিয়েছেন আপনার
মেয়েকে দেওয়ার জন্য। কেন যে আমাকে পাঠালেন আমি জানিনা। তবে গুরুত্ব আছে বলে আমি
মনে করি। এই চিঠিটা আপনার মেয়েকে দেবেন, এখন আমি চলি।"
দীপেশবাবুকে আর কোন কথার সুযোগ না
দিয়ে যেমন এসেছিল তেমন চলে গেল। আর চিঠির খামটা নিয়ে যুবকটির গমনপথের দিকে
কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে খামটা উল্টেপাল্টে দেখে বুঝলেন চিঠিটা মেয়ে মিথিলার নামে
পাঠিয়েছেন বিহারীলালবাবু ।
মিথিলা
খাম খুলে চিঠিটা বার করে পড়ল। দীর্ঘ চিঠি নয়। এক নিঃশ্বাসে পড়ে জানলা দিয়ে
বাইরের দিকে উদাসী চাউনি মেলে বসে রইল। কানে প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো চিঠির
কথাগুলো:: মা মিথিলা, রাজনীতিবিদদের প্রতি তোমার বীতস্পৃহ হওয়ার কারণ যথেষ্ট- এটা
আমি মানি। কিছু কিছু রাজনীতিবিদদের কার্যকলাপে সাধারণ জনসাধারণ আজ বীতশ্রদ্ধ ও
ক্ষুব্ধ। তাই বলে সবাইকে এক বন্ধনীতে ফেলে দূরে সরে থাকা তোমার মত শিক্ষিতা
বুদ্ধিমতী ও স্বাধীনচেতা সদ্য ইংরেজিতে এমএ পাস ছাত্রীর শোভা পায় কিনা একবার ভেবে
দেখার অনুরোধ রাখছি। আমার রাজনৈতিক তকমা সরিয়ে রেখে ব্যক্তি বিহারীলালের
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করার আবেদন করছি। সেখানে যদি কোন শৈথিল্য ও বিচ্যুতি
তোমার চোখে পড়ে তা আমাকে নির্দেশ করলে আমি তৎক্ষণাৎ শুধরে নেব।
তাই আর একবার অনুরোধ করি সবকিছু খোলা মনে বিচার করে
শুধু আমি রাজনীতিবিদ বলে দূরে সরিয়ে রেখোনা। হাজার হলেও তুমি আমার কন্যাসমা।
তোমার সাথে সংক্ষিপ্ত আলাপে তোমাকে যথেষ্ট বুদ্ধিমতী ও স্বাধীনচেতা বলে মনে
হয়েছে। আর আমাদের এখন এইরকমই স্বাধীনচেতা স্থিতধী নারী জাতির বিশেষ দরকার।।
