ভূমিকম্পের ভূতাত্ত্বিক অভিঘাত কি ভূরাজনীতিও প্রভাব ফেলতে পারে? -> শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

ভূমিকম্পের ভূতাত্ত্বিক অভিঘাত কি ভূরাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে?

শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়
 

ভূমিকম্পের মাত্রা, তীব্রতা ও নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে ঘটার সংখ্যা তথা সম্ভাবনা নিয়ে তৈরি করা হয় ভূপৃষ্ঠে একেকটি অঞ্চলের ভূমিকম্প মানচিত্র। রাষ্ট্র হিসাবে ভারতবর্ষেরও একটি ভূমিকম্প মানচিত্র আছে। এর নাম 'সিসমিক জোনেশন ম্যাপ', যা ভূমিকম্পের ঝুঁকি অনুসারে দেশের ভূখণ্ডকে চিহ্নিত করেছে। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই মানচিত্র সময় সময় আপডেট বা নবায়ন করতে হয়। ভারতের নবিকৃত ভূমিকম্প মানচিত্রে যা প্রতিফলিত, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। 

এতদিন ভারতীয় মানদণ্ড ব্যুরো (BIS)-এর Sysmic Zonation Map বা ভূমিকম্প মানচিত্রে ৪টি জ়োন বা অঞ্চল নির্দেশিত ছিল-

Zone II -> কম ঝুঁকিপূর্ণ

Zone III -> মাঝারি বিপদ

Zone IV -> উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ

Zone V -> সর্বোচ্চ ঝুঁকি

আগে Zone I বলেও একটি বিস্তীর্ণাঞ্চল ছিল। সম্ভবত তাৎপর্যপূর্ণ ঝুঁকি বা ঝুঁকির ফারাক না থাকায় সেটার আর পৃথক অস্তিত্ব নেই; বরং কম ঝুঁকিপূর্ণ জ়োন II-র সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে।

কিন্তু দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে সাম্প্রতিকতম ভূমিকম্প মানচিত্রটি যেখানে বিদ্যমান চারটি বিস্তীর্ণাঞ্চলের সঙ্গে আরেকটি নতুন বিস্তীর্ণাঞ্চল যুক্ত করা হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে জ়োন VI বা অতি-উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বিস্তীর্ণাঞ্চল।

ছবির মানচিত্র আনন্দবাজার অনলাইন থেকে সংগৃহীত। ভালো করে লক্ষ করুন, ভারতীয় মানদণ্ড ব্যুরো (BIS) দ্বারা প্রকাশিত নয়া Earthquake Design Code অনুযায়ী পুরো হিমালয়কেই এবার এই প্রথম রাখা হচ্ছে সর্বোচ্চ ঝুঁকির Zone VI-এ, যেখানে যে কোনও সময় একটি বড়সড় ভূমিকম্প হতে পারে। এই মানচিত্র থেকে আরও দেখা যাচ্ছে, দেশের ৬১ শতাংশ এলাকাই এখন মাঝারি থেকে সর্বোচ্চ ঝুঁকির আওতায়। 

পুরোনো মানচিত্রটি ২০০২ সালে তৈরি হয়েছিল যেটাকে ২০১৬ সালে কিছুটা আপডেট করা হয়েছে। তারপর সেই নতুন মানচিত্রটিকেও আরও নির্ভুল করা হয়েছে সম্প্রতি। এর উদ্দেশ্য হল আরও নির্ভুল চিত্র দিয়ে দেশের জনপদগুলিকে ভূমিকম্প থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়। এর ফলে ভূমিকম্পে যাতে নির্মাণ প্রকল্পগুলি ধসে না পড়ে এবং জীবন ও সম্পদের ক্ষতি কম হয়, তার জন্যও যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। 

BIS নির্দেশিকা অনুযায়ী সব ইঞ্জিনিয়ারকে নির্মাণ খাড়া করার জন্য এই নতুন মানচিত্র ব্যবহার করে হবে, যেখানে আগের মতোই চারটি জ়োন বজায় রাখার পাশাপাশি সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ আরও কঠোর ও সূক্ষ্মভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। জ়োন V-এর মধ্যেও সর্বাপেক্ষা ঝুঁকিপূর্ণ অংশটিকে অতি-উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বা জ়োন VI হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, জ়োন VI চিহ্নিত অংশগুলি সবচেয়ে বিপজ্জনক। 

এবার আসা যাক এর নেপথ্যের কারণে।

প্রবল ভূমিকম্পের কারণ =)>

 হিমালয়ের নীচে আছে তিনটি বড় ফল্ট — 

Main Frontal Thrust বা সম্মুখবর্তী ঘাত

Main Boundary Thrust বা প্রধান সীমান্তবর্তী ঘাত

Main Central Thrust বা প্রধান কেন্দ্রীয় ঘাত

ভূবিজ্ঞানে 'ফল্ট'কে বাংলায় ঠিক কী বলে, তার পরিভাষা পাইনি। তবে 'দুর্বল স্থান' বলা বা ভাবা যেতে পারে। 

আমরা জানি পৃথিবীর অন্দরমহলে প্রচণ্ড উত্তাপে সব পদার্থ গলে ম্যাগমা অবস্থায় আছে। আর সেই গলন্ত-ফুটন্ত তরল ম্যাগমায় ভাসছে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড চাঙড় যাদের plate বা বাংলায় পাত বলে। এই পাতগুলির ওপরেই রয়েছে ভূপৃষ্ঠের জলভাগ ও স্থলভাগ।

ভূবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, হিমালয়ের নীচে থাকা ভারতীয় পাতকে সমানে ধাক্কা দিয়ে চলেছে ইউরেশীয় পাত, যার জেরে প্রতি বছর ভারতীয় পাতটির সরণ (displacement) হচ্ছে ৫ সেন্টিমিটার করে। নতুন সিসমিক মানচিত্রে ফল্ট লাইন, মাত্রা এবং মাটির ধরণ বিবেচনা করে হিমালয়ের চারপাশের সমভূমি, যেমন দেরাদুন ও হরিদ্বারকে আরও সতর্ক করা হচ্ছে। এই মানচিত্রে প্রতিফলিত কীভাবে ক্রমশ দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে বেড়ে চলেছে হিমালয়, আর তার পাদদেশে দেখা দিচ্ছে একাধিক ফাটল। হিমালয়ের প্রসারণজনিত চাপের অভিঘাতে মাটির উপরিতল কখনও কখনও কুঁকড়ে যাচ্ছে, কখনও চাপমুক্তির জন্য নিজেকে প্রসারিত করছে। এই কুঞ্চন ও প্রসারণ প্রক্রিয়াতেই মাটিতে অনুভূত হয় কম্পন।

হিমালয়ের ফ্রন্টাল থ্রাস্ট ধরে সম্ভাব্য ভূকম্পনের বিস্তার দক্ষিণে নেমে পৌঁছতে পারে দিল্লীর মতো এলাকা পর্যন্ত। তাই দেরাদুন-সহ আউটার হিমালয়ের বড় অংশও পড়ে গেছে আরও উচ্চ ঝুঁকিতে। শুধু তাই নয়, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল, উত্তরপ্রদেশের কিছু জেলা-- এইসব অঞ্চলে বড় ভূমিকম্প এলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা হতে পারে অকল্পনীয়। 

প্রসঙ্গত Pacific Ring of Fire বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় বলয়ে অকস্মাৎ প্রায় সবকটি আগ্নেয়গিরি জেগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কিছুদিন আগে দিল্লী পর্যন্ত পৌঁছেছিল লাভা উদগিরণের ভস্ম। তার সঙ্গে ভারতের এই ভূমিকম্প বিস্তীর্ণাঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কিনা জানি না, তবে অগ্ন্যুৎপাতের সঙ্গে পাতে পাতে সংঘর্ষ একই সময়ে সমাপতিত হলে মহাপ্রলয়ের কাছাকাছি কিছু ঘটাও অসম্ভব নয়। 

আবহাওয়ার মতো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস পাওয়া যায় না। যেমন যতক্ষণ না একটি বিল্ডিং ব্লকের তলার দিক থেকে একটা ব্লক সরে যাচ্ছে, ততক্ষণ কাঠামোটা হুড়মুড়িয়ে পড়ে যাবে না, তেমনি ভূগর্ভে কি পর্বতের নীচে কোনও কিছু সরে না যাওয়া অবধি ভারসাম্য নষ্ট হবে না। তাই আগে থেকে কবে কখন অঘটন ঘটতে চলেছে, জানা সম্ভব নয়। শুধু মাটি পরখ না করে পাহাড়ে বেপরোয়া নির্মাণ যে বিপদ ঘটাতে পারে, এইটুকুই অনুমান করা যায়; ঠিক কখন ভারসাম্য হারাবে সেটা গণনার উপায় হয়তো এখনও অনাবিষ্কৃত। তবে টেকটনিক প্লেটগুলির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আসন্ন বিপদের আঁচ পেতে পারেন ভূবিজ্ঞানীরা। কিন্তু ঠিক কবে কোন সময় একটি প্লেট গিয়ে আরেকটিকে ধাক্কা মারবে, আর তার অভিঘাতে পৃথিবী ওপর সবকিছু কতটা তছনছ খানচুর হবে কিনা বা কতটা হবে, সেটা বোধহয় এখনও পূর্বানুমান করা যায়নি।

ভূতাত্ত্বিক প্রভাব কি ভূরাজনীতিও পড়তে পারে?

ভূমিকম্পের বিধ্বংসী রূপের সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে। এইরকম টেকটনিক প্লেটের ঘষাঘষিতেই ২০০৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বর ঘটেছিল "সুনামি" যা জাপান সহ কিছু দ্বীপরাষ্ট্রকে প্রায় মুছে ফেলেছিল। মাঝেমাঝেই কম ঝুঁকিপূর্ণ বিস্তীর্ণাঞ্চল এক বা দুইতেই অনুভূত হয় ভূমিকম্প। সাম্প্রতিক অতীতে আফগানিস্তানে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আমরা দেখেছি। অপধর্মের প্রভাবে উদ্ধারকার্যে লিঙ্গবৈষম্যের প্রসঙ্গে এখানে যাচ্ছি না। কিন্তু ভারতের সিসমিক জোনেশন ম্যাপ শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, ভূটান ও বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে নয়। কারণ মা বসুধা রাজনীতি কূটনীতির পরোয়া করেন না। ঐতিহাসিকভাবেও পুরোটাই হিসাবমতো ভারতীয় উপমহাদেশের অন্তর্ভুক্ত। মানচিত্রে গোটা উত্তরপূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলও অতি ঝুঁকিপূর্ণ Zone VI অন্তর্গত। প্রবল মেদিনীকম্পনে সেখানকার ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন ভূরাজনীতিতেও ওলটপালট করে দেবে না তো?


চিত্রঋণ ছবিতেই স্বীকার করা হয়েছে। নিবন্ধটিতে আনন্দবাজার অনলাইন থেকে আংশিক তথ্যঋণ নেওয় হয়েছে। 


Post a Comment

Previous Post Next Post