নিশির ডাক -- অর্ঘ্য শুর রায়

 

গল্প

নিশির ডাক

অর্ঘ্য শুর রায়

 

অজানা ফোনটা কেটেই দিচ্ছিল। কাজের সময় যত্তসব অকাজের ফোন। কোনো অজানা ফোন সিন্টু ধরে না। বাড়ির ফোন তো আসেনা, তাই ফোন ধরার তাড়াও নেই। দুই বছর হলো মা গত হয়েছে। বাবা সিন্টু যখন খুব ছোট, তখনই চলে গেছে। ভাঙ্গা টালির বাড়িতে একমাত্র সিন্টুই বংশের বাতি হয়ে জ্বলছে। দুই তিনবার ফোনটা রিং হবার পর ধরল। ধরেই ভীষণ অবাক হল। বহুদিন পর পলাশ ফোন করেছে। ওর গ্রামের বন্ধু। সিন্টু গ্রাম ছেড়েছে প্রায় বারো বছর হতে চলল। এরপর কোনও যোগাযোগ নেই। কীভাবে নম্বর পেল কে জানে?

“কী রে চুপ করে আছিস! খুব অবাক হয়েছিস?" পলাশ খিলখিল করে ফোনের ওই প্রান্তে হেসে উঠল।

“সে আর বলতে। তুই যে ফোন করবি এতদিন পর কোনোদিন ভাবিনি। আমার ফোন নম্বর কী করে পেলি বল।”

“আরে ভাই, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। ফেসবুকে তোর আসল নাম দিয়ে সার্চ করতেই পেয়ে গেলাম!” বলতে বলতে আবার হাসি পলাশের। “এখন কোথায় আছিস এই আমতলা বাজারে?"

“তুই তো দেখছি আমার নাড়ি নক্ষত্র জেনে নিয়েছিস! এই আমতলা বাজার তুই চিনিস? তুইও কি এই দিকেই থাকিস?" সিন্টু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।

"আরে, সেই জন্যে তো ফোন করলাম। তোর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেখলাম তুই আমতলা বাজারের কাছে থাকিস লিখেছিস, আর আমি তোর বাড়ির সামনের রাস্তা ধরে এগিয়ে আরো ছয় কিলোমিটার দূরে থাকি। আজ চলে আয় আমার বাড়ি। রিকশা করে ঠিক আধঘন্টা লাগবে। রাস্তা একটু খারাপ। কবিরাজ পাড়ার চার মাথায় নেমে ফোন করিস, আমি ডিরেকশন দিয়ে দেবো। আসবি কিন্তু, আমি অপেক্ষা করবো।" কথা গুলো ঝড়ের মত বলেই ফোন রেখে দিল পলাশ।

যদিও বিশ্বাস হচ্ছে না, তবু পলাশ এতবার করে যখন বলছে, কাজের পর ক্লান্ত শরীরে বাড়িতে গিয়ে রান্না করার চেয়ে বন্ধুর বাড়ি আড্ডা আর খাওয়া হলে ক্ষতি কী?

কারখানার কাজ মিটতে মিটতে বিকাল পাঁচটা হয়ে গেল। একটু ফ্রেশ হয়ে কিছু স্নাক্স কিনে বেরোতে বেরোতে ছয়টা। শীতের বেলা। বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। তার উপর পথঘাট একটু ফাঁকা আর রাস্তায় আলোও যেন কম কম লাগছে। সিন্টু কারখানার থেকে বেরিয়ে সোজা রিকশা স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখে একটা রিক্সাও নেই। কী সব্বনাশ! এখন যাবে কী রে?

"দাদা রিকশা নেই কেন?" সিন্টু পাশে চায়ের দোকানদারকে জিজ্ঞাস করল।

"ওদের কে একজন মারা গেছে, তাই ইউনিয়ন থেকে আজ বন্ধ।" দোকানদার জানাল।

কী করবে ভাবতে ভাবতেই হাঁটতে লাগল সিন্টু। ভারী মুশকিল হলো। এখন তো আর পলাশকে না করা যায় না। এই যাঃ! ঝুপ করে কারেন্ট চলে গেল। পূজার কয়দিন ভালই সাপ্লাই দিয়েছিল। আবার পুরনো লোডশেডিং রোগ ফিরে এসেছে। পুরো রাস্তাটা অন্ধকারে ডুবে গেল।

শীত ভালই পড়েছে। লোকজন কম। তার ওপর দোকানপাট কম খোলা। কালীপূজার পর বেচাকেনা কম। জনমানবশূন্য নিঝুম রাস্তার দুপাশে বড়ো বড়ো শাল, সেগুন, শিমুল, শিশু গাছ যেন প্রহরীর মত ঝাঁকড়া চুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। টিমটিম করে কয়েকটা দোকানের আলো জ্বলছে। অনেকটা হেঁটে এসেছে সিন্টু। এখানে কোনো বাজার নেই। ক্রমশ লোকালয় পাতলা হয়ে যাচ্ছে। গুটিকয় বাড়ির জানালা দিয়ে ঠিকরে আসা হারিকেনের আলোতে রাস্তা দেখা যাচ্ছে কোনরকমে। কোথায় এলো কে জানে? অচেনা জায়গা। চুরি ছিনতাইয়ের ভয়ও আছে। কাউকে জিজ্ঞাস করতে হবে।

"বাবু যাবেন কোথায়?" ভাঙ্গা ভাঙা শব্দের কথাগুলো শুনে সিন্টু চমকে উঠল।

পিছনে তাকিয়ে দেখে এক বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা। দেখেই সিন্টু লাফ দিয়ে চড়ে বসল। যাক! বাঁচা গেল। আর নামা নেই। যেখানে নিয়ে যাবে সেখানেই যাবে। এই জায়গায় পলাশ থাকে কী করে কে জানে? জিজ্ঞাসা করা হয়নি, পলাশ করে কী, গ্রাম থেকে এখানে এল কী করে? মনে মনে সিন্টু বিড়বিড় করছে।

"বাবু, কোথায় যাবেন বললেন না।"

বুড়োর কথায় সম্বিত ফিরে এলো সিন্টুর। "চলো! ওই কবিরাজ মোড় আছে ঐখানে।"

ঠান্ডায় সিন্টুর হাত বরফ হয়ে যাচ্ছে। আর বুড়ো এই ঠান্ডায় দিব্যি একটা জামা পরে রিকশা টানছে। ধীরে ধীরে একের পর এক মোড় ছাড়িয়ে ফাঁকা রাস্তায় ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করে রিকশা চলছে। চলছে তো চলছেই। কিন্তু এই গতিতে চললে তো সারারাত লেগে যাবে।

"জ্যেঠু। বলছি আর কত দূর?" সিন্টু জিজ্ঞাসা করেই ফেলল।

"এইতো আর দশ মিনিট। কিন্তু বাবু মোড়ে তো কেউ থাকেনা। আপনি কার বাড়ি যাবেন?" 

"বাড়ি ঠিক জানিনা। ফোন করে জেনে নেবো।" সিন্টু কাঁপতে কাঁপতে উত্তর দিল।

শুনেই বুড়ো বিশ্রী ভাবে হেসে উঠল। সিন্টু রেগে গেল। এমনিতেই পেটে খিদে, তার উপর অন্ধকার ঠান্ডা অজানা জায়গা। কী কুক্ষণে যে রাজি হয়েছিল আসতে? শালা! এখন ফেরারও পথ নেই।

"এতে হাসার কি কোনো কারণ পেলেন?" একটু চিৎকার করেই যেন সিন্টু বলে ফেলল। চারপাশে ফাঁকা চাষের জমি। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। দূরে কিছু বাড়ির আলো। আর জমির মাঝে মাঝে শ্যালো মেশিনের ঘর।

"বাবু এখানে ফোনে লাইন থাকে না। জিজ্ঞেস করবেন কী করে?" বুড়ো বলল।

সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে সিন্টু ফোন বের করে দেখল বুড়ো ঠিক বলেছে। ফোনের একটাও টাওয়ার নেই। "আমরা কোথায় এখন?

"এই তো কবিরাজ মোড়। এবার কোনদিকে যাবেন? ডাঁয়ে না বাঁয়ে? এইখানেই নেমে যাবেন?" বুড়ো হাঁফাতে লাগল।

আঁতকে উঠল সিন্টু। এই জনমানব শূন্য জায়গায় নেমে যাবে কোথায় এখন? ফোন করা যাচ্ছে না। ফেরার পথ বন্ধ। সারা রাত কি এখানেই কাটাতে হবে? কিছুই মাথায় আসছে না। "আচ্ছা, আপনার বাড়ি কি এখানে? আপনি পলাশ বলে কাউকে চেনেন?" দুম করে সিন্টু জিজ্ঞাসা করেই ফেলল।

"ওহ্, পলাশ বিশ্বাস? আপনার মতই বয়স? এই তো কিছুদিন আগেও…” কথা শেষ হলো না বুড়োর।

"হ্যাঁ হ্যাঁ। পলাশ পলাশ। আপনি চেনেন? উঃ। বাঁচালেন। ওর বাড়িতেই আজ আমার যেতে হবে। আমার বন্ধু।" বুড়োর মুখে পলাশের কথা শুনে যেন সিন্টুর বুকে জোর এল।

"আমি সেই ছোটোবেলা থেকে দেখছি। ওকে চিনব না তাই কি হয়? ও তো আপনার বয়সী। এই অঞ্চলে এই বয়সী আর কেউ নেই। আপনাকে দেখেই বুঝেছিলাম, আপনি ওর সাথেই দেখা করতে যাচ্ছেন।" এই বলেই আবার বুড়োর রিকশা এবার ডান দিকের কাঁচা রাস্তা ধরল।

যাক বাবা! সিন্টু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। রিকশাওয়ালা নিশ্চয়ই এই গ্রামের অথবা পলাশের আত্মীয়। সে যাইহোক সিন্টু পৌঁছাতে পারলেই হল।

"ওই যে বাড়ি। রিক্সা আর যাবে না। এখানেই নামতে হবে।" বুড়ো দূর থেকে একটা পুরানো একতলা বাড়ি দেখিয়ে বলল।

"খুব উপকার করলে জেঠু। তুমি না থাকলে ভয়েই মরে যেতাম।" বলে টাকা মিটিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

একটা টোকা দিতেই পলাশ দরজা খুলে দিল। শরীর খুব ক্লান্ত সিন্টুর। কাজের পর খাওয়া হয়নি, খুব খিদেও পেয়েছে। ধপাস করে চেয়ারে বসে সিন্টু বলল, "আগে জল দে। তারপর কথা হবে।"

পুরনো বাড়ি। প্লাস্টার করা নেই। মেঝেও মাটির। একটা খাট। দুটো চেয়ার। একটা টেবিল। টেবিলে হ্যারিকেন টিমটিম করে জ্বলছে, যেন এই বুঝি নিভে গেল।

"আসতে জানি একটু কষ্ট হয়েছে। অনেকক্ষণ লোডশেডিং। তোকে ফোন করতেও পারিনি। আসলে এখানে টাওয়ারের খুব সমস্যা।" পলাশ বলল।

জলে চুমুক দিতে দিতে কথাগুলো শুনে ভীষণ রাগ হলো সিন্টুর। মনে মনে ভাবল পলাশকে বলেই ফেলে, ফোনে নেটওয়ার্ক থাকে না তো ফোন করতে বলেছিলি কেনো? আর এই যোগাযোগ ব্যাবস্থার কথা আগে বললেই হত। একটু কষ্ট নয়, প্রাণ বেরিয়ে যাবার জোগাড় হয়েছিল। কথাগুলো চেপে সিন্টু অন্য প্রসঙ্গ তুলল।

হ্যারিকেনের আলোয় চা বিস্কুট খেতে খেতে সিন্টু আর পলাশের পুরানো সব কথা, গ্রামের কথা হচ্ছিল। পলাশও একা থাকে। কথায় কথায় জানাল ওর বাবা এই কয়েক মাস হল মারা গেছে। এক বছর হল গ্রাম থেকে এই তল্লাটে এসেছে। এক বেসরকারি অফিসের ঠিকা কর্মী পলাশ। কথাটা শুনে ভারী অদ্ভূত লাগল সিন্টুর। বলেই ফেলল ওই বৃদ্ধ রিকশাওয়ালার কথা। উনি তো বলেছিলেন ছোটবেলা থেকেই পলাশকে চেনেন।

বৃদ্ধ লোকটার কথাগুলো সিন্টুর মুখে শোনার পরই পলাশ উত্তেজিত হয়ে খিঁচিয়ে উঠল। "কী বললি? আর একবার বল। বুড়ো রিকশাওয়ালা?"

"হ্যাঁ। তাই তো বলল লোকটা।" তুই বলছিস তোরা এক বছর হলো এখানে এসেছিস। আর উনি বললেন তোকে বাচ্চা বয়স থেকে চেনে।"

মুহূর্তে পলাশের মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। হ্যারিকেনের আবছা আলোয় বেশ ভয়ার্ত দেখাচ্ছে। সিন্টুর দিকে কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ আর্তনাদ করে উঠল, "বাবা বাবা। তুমি ফিরে এসো। তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেও না।" চিৎকার করতে করতে ঘরের বাইরে ভাঙ্গা সিড়ি দিয়ে ঘরের ছাদে উঠে গিয়ে কি যেন খুঁজতে লাগল।

সিন্টু কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেছে। কী করবে ভেবে পাচ্ছেনা। পিছন পিছন হ্যারিকেনটা নিয়ে ছাদে গিয়ে দেখল, কোথায় পলাশ? এদিক ওদিক কিছু খুঁজে না পেয়ে সিন্টু তাড়াতাড়ি সিড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হটাৎ একটা বিকট শব্দ শুনল। আবার দৌড়ে ছাদের কিনারায় গিয়ে আবছা আলোয় দেখে পলাশের নিথর দেহটা বাড়ির দক্ষিণ কোনায় নীচে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। রক্ত গড়িয়ে চলছে পাস দিয়ে।

এক দৌড়ে বাড়ির বাইরে চলে এল সিন্টু। হাতের হ্যারিকেনটা দপ দপ করে নিভে গেল। ভয়ে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সিন্টু দৌড়ে চলল। হঠাৎ পিছন থেকে একটা শক্ত কিছুর আঘাতে নিমেষে সিন্টু লুটিয়ে পড়ল। অন্ধকার খানিক কেটেছে। একদল লোক এই দিকেই হেঁটে আসছে। সিন্টু মাথা তুলতে পারছেনা। একটা বট গাছের তলায় পড়ে আছে। মাথার পিছনে খুব যন্ত্রণা। রাতে এই গাছেই বোধহয় আঘাত পেয়েছিল।

"ও মশাই কোথায় এসেছেন?" লোকগুলোর মধ্যে কেউ একজন সিন্টুকে জিজ্ঞাস করলো।

"পলাশের বাড়ি।"

"বুঝেছি আর বলতে হবেনা।" বলতে বলতেই সবাই হেসে উঠল। একজন বলল, "তো মশাই আপনিও কি দিক হারিয়ে এই শ্মশানে এসে পড়লেন? আপনাকে নিয়ে এইরকম হল চার জনের। বিধুন বুড়ো রিকশা চালিয়ে বহু কষ্টে ছেলেটাকে মানুষ করছিল। পলাশ বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে অপঘাতে মরল। পরের বছরেই বিধুনেরও অ্যাকসিডেন্ট হল ওই চারমাথা মোড়ের মাইল খানেক আগে। তারপর থেকেই বিধুন বুড়ো সবাইকে এই বাড়িতে নিয়ে আসে।"

"কিন্তু! পলাশ আমার খুব ভালো বন্ধু। ওই তো আমাকে ফোন করে আসতে বলেছিল। কাল রাতেও ওর সাথে বসে কথা বলেছি, খেয়েছি, গল্প করেছি!" বিস্ময়, ভয় আর ক্লান্তি মেশানো গলায় বলল। কাল সন্ধ্যে থেকে একের পর এক যা ঝড় বয়ে যাচ্ছে, কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে গেছে। যেন স্বপ্ন দেখছে। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝে চিন্তাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে।

"দাদা। ওইসব নিশির ডাক। আমরা গ্রামের লোকরাই ওদের দাহ করিয়েছি। পারেন যদি এবার বন্ধুর শ্রাদ্ধ শান্তির ব্যবস্থা করুন।"

লোকগুলো সিন্টুকে তুলে এনে মোড়ের একটা চায়ের দোকানের মাচায় শুয়ে দিয়ে গেল। পূব আকাশটা ততক্ষণে লাল হয়ে উঠছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post