হ্যাপি টিচার্স ডে
নীহার জয়ধর
“স্যার ওরা একটা সেলফি তুলতে চায়”-- দোহারা চেহারার ছেলেটি এগিয়ে এলো। একটু
দূরে দাঁড়িয়ে কয়েকটি ইলেভেনে নতুন ভর্তি হওয়া মেয়ে।
এই স্কুলটিতে উচ্চমাধ্যমিক থেকে কো-এড। তাই অন্য স্কুল থেকে এসে একাদশে
নতুন ভর্তি হওয়া মেয়েগুলি এখনও একটু সম্ভ্রমিত দূরত্ব রাখছে। তাই প্রিয় স্যারকে
সেলফির জন্য নিজে এসে ডাকতে দ্বিধা, তাই তৃতীয় পক্ষ ধার।
স্কুলে পরপর দু'দিন
অনুষ্ঠান হয়। পাঁচ তারিখে টিচার্স ডে। ছয় তারিখে নবীনবরণ। ক্লাস ফাইভ থেকে পড়া
ছেলেরা জানে প্রতি বছরই এমন অনুষ্ঠান হয়। তাই বাস্তু
ঘুঘুদের থেকে থেকে প্রজাপতিরাই বেশি উৎসুক, কী হয় ?
কেমন হয় ? স্কুলে দু’রাতের ফাংসান মুক্তির মতো!ষ মনে হয়।
মেয়েরা বেশির ভাগই শাড়িতে, এবং যথা সম্ভব ফুল-পাখি-প্রজাপতি। সব উৎসব
মেয়েদের। ক্লাস টেনে পড়ার সময় ওদের চেনা যায়না। বালিকা ভাব মনে ও শরীরে।
ইলেভেনে এসে ওরা হঠাৎ মনে যুবতী হলেও প্রকাশ পায় না। প্রকাশ হয় উৎসবে অনুষ্ঠানে।
শাড়ি, সাজ, চলন সব কিছুতে তারা নারী হয়ে ওঠে। ওদের সহপাঠী ছেলেরা তখন নেহায়েৎই
নাবালক। দুরন্ত সাহসী, ভয়ঙ্কর এবং শিক্ষিকাদের ভাষায় ‘বদ’ ছেলেরাই তখন ওদের কাছে
পাত-যোগ্য থাকে। তারা একা একা এবং দলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, উড়ে বেড়াচ্ছে, পেখমে,
পাপড়িতে, সেলফিতে । হয়ত চির পুরাতন এবং আজও নতুন। তাদের হাঁটায় পথ বেঁকে যায়।
যুবক স্যারের বা ভালোলাগা মানুষের পাশ হয়ে যাওয়ার সময়, আশ্চর্য ঘ্রাণ আর রঙ ছড়িয়ে
পাশ ঘেসে চলে যায় ।
ঘোষিকা মাইকে বার
বার নানা অনুষ্ঠানের ঘোষণা করছেন। অনবরত চিৎকার করতে থাকা ছেলেমেয়েদের চুপ করে
শান্ত হয়ে থাকতে বলছেন। যাঁরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের দায়িত্বে আছেন তারা ছুঁটে
বেড়াচ্ছেন। স্কুলের তরফ থেকে কফির ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্কুলের ছাত্ররা কমপক্ষে
এক কাপ করে পাবে এবং শিক্ষক শিক্ষিকারা দুই কাপ করে পাবেন। সেখানে ঘন ভিড়।
হিমেল নামের ছেলেটি
আজ খুব কাজ করছে। প্রায় সব রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সে সূত্রাধার। নবীন বরণের
গোলাপ এনে দেওয়া, মিষ্টির প্যাকেটের নৌকা দোতলায় তুলে দেওয়া, সব কিছুতেই সে
আছে। সে একটু ব্যস্ত থাকতে চায়। একটু অন্তর্ভূক্ত থাকতে চায়। যেন কারো কাছে কাছে
থাকতে চায়।
একটি ঘরে নাটকের শেষ রিহার্সাল চলছে। সে প্রম্পটার হয়ে থাকবে। অনেকেরই
পার্ট মুখস্ত হয়নি। তাকে লাগবেই। মেকআপ ঘরে লাইন শিল্পীদের । অনেকেরই মেকআপ হয়ে
গেছে। আশ্চর্য সুন্দর লাগছে মীরার চরিত্রে অভিনয় করা মধুজা দত্তকে। পাশের
গার্লসস্কুল থেকে এসে ভর্তি হয়ে প্রথম দুই একদিন হিমেলের সঙ্গে বেশ কথা বলেছিল।
‘পাড়ারমেয়ে’ দাবিতে সব স্যার ম্যাডামকে চিনিয়ে দিয়েছিল। কে কী পড়ান, কোন
স্যারের কোন মূদ্রা দোষ, কোন কথায় কোন ম্যাম খুব রেগে যান সব জানিয়েছে। এই
স্কুলের রীতি নীতি নিয়ম কেমন তাও
জানিয়েছিল। অবশ্য দুদিন পরেই আর শুনতে চায়নি মধুজা। কথা বলত কম । কথা শুনতে
শুনতে অন্য দিকে চেয়ে থাকত, অন্য কথায় কান পাততো। তখন একটু অহংকারী মনে হয়েছিল। এখন তো আর কথাই বলতে চায় না। হঠাৎ সামনে পড়লে,
হেসে এড়িয়ে যায়। এখন আর অহংকারী মনে হয় না, বরং আগ্রহ-হীন মনে হয়। হিমেল
বুঝেছে, আগ্রহ তৈরি করতে পারেনি সে। ...অনেকদিন আগে একবার একটা প্রজাপতি ধরেছিল
সে, তখন হাতে রঙের ছাপ লেগেছিল … এখনও মাঝে মনে হয় সে রঙ মোছেনি। হঠাৎ হঠাৎ মনের ভুলে হাতের তালু দেখে নেয়।
বাংলার শিক্ষক
তুহিনবাবুর একটা ভালো লাগার দিন আজ। এই দিনটাতে তিনি খুশি থাকেন। স্যার হাসি মুখে
এগিয়ে গেলেন। স্যার আজকে সাদা রঙের হাল্কা পাঞ্জাবি পরেছেন, নিচে ডেনিম জিন্স।
একটা দারুন চশমা। এই চশমাটা স্যার রোজ পরেন না।“ তখনি পাশ হয়ে ভূগোল ম্যাম চলে
গেলেন। শাড়ির খসখসে শব্দটা ম্যামের স্পেশাল।” স্যারের জন্য ক্রেজ দেখে তার দৃষ্টি
বাঁকাচাঁদ হলো।
ছেলেটি স্কুলের পোশাকেই আছে। স্কুলের নানা কাজের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের হয়ে
নানা রকম কাজ করে দিচ্ছে । তার ডাকে স্যার হাসিমুখে এগিয়ে গেলেন। সেলফি তোলা হবে।
মেয়েরা প্রথমে সাহসী লজ্জায় দুজন, তারপর তিনজন, এবং শেষে চলতো…বলে একদল মিলে ঘিরে
ধরল। একটি মেয়ে হিমেলকে ও ডাকল। কিন্ত সে আসবেনা। “তোরা তোল আমি আলাদা করে
স্যারের সঙ্গে তুলে নেব।”
তুহিনের তখন কুড়ি।
হাজরা অঞ্চলের একটি কলেজে অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। বিভাগীয় অনুষ্ঠানে সব মেয়েরা দারুন সেজে এসেছিল। দক্ষিণ কলকাতার ফিল্মি রঙের সঙ্গে উত্তর
কলকাতার বনেদি বাড়ির ঢং দুটোই দারুণ চলছে। সেদিনটা তুহিনের মনে লেপ্টে আছে
ফুসফুসের শ্লেষ্মার মতো। নাটকের মানুষ অগ্নিমিত্র স্যার মার্লন ব্র্যান্ডোর মতো
হাঁটছেন। তরুণ কবি সমিতাভ স্যার একটু লাজুক। তিনি গুটিয়ে থাকলেও চকলেট হিরোর মতো দেখতে স্যারকে ছাড়ছে না কেউই। কোডাকের KB10 হাতে মেয়েরা ছবি তুলে যাচ্ছে। তখন একটা ফিল্মে ৩৪/৩৫ টা ছবি হত। অন্য সময় মায়া করলেও সল্টলেকের মেয়ে পামেলা আজ আর কিছু
মানছে না। কে একজন একটু অশ্লীল আওয়াজ দিল,--গিলে খাস না। উত্তর কলকাতার এক কাপড়
ব্যাবসায়ীর মেয়ে গরিমা দূর থেকে দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। একটু পরেই সে ময়দানে
নামল। সবচেয়ে জনপ্রিয় স্যার (ভালো পড়ান বলে) যিনি এখনও বিয়ে করেন নি এবং করবেনও
না। তাকে প্রাচীন কালের গুরুর কায়দায় ফুলের তোড়া, উত্তরীয়, এবং সবে প্রকাশ পাওয়া
প্রশান্তকুমার পালের রবিজীবনী পুরো সেট উপহার দেয়। রবীন্দ্র ভক্ত স্যারের পছন্দ আগে থেকেই কায়দা করে জেনে নিয়ে ছিল
গরিমা। বিভাগের পুরো গল্প ঘুরে গেল। এবং হ্যাঁ, পাঁচজন স্থায়ী স্যার ম্যামের
সবাইকেই উপহার দিয়েছিল। একমাত্র ছাত্রছাত্রীরাই ব্যাপারটা জেনেছিল। নিজের
বনেদিয়ানা maintain করে কোন উষ্মা ছাড়াই রাজহাঁসের মতো মোনালিসাকে টেক্কা দিয়েছিল সাদা আরবি ঘোড়ার মতো গরিমা। ছেলে বন্ধুরা দামি
পাঞ্জাবিতে সেজেছিল অনেকেই। কলেজের জি.এস. গণপ্রিয় বেদজ্ঞ এসেছিল মালকোচা-পেড়ে
ধুতি আর রবীন্দ্রনাথের গান লেখা পাঞ্জাবিতে। তার হাতে ছিল দেবদত্তার হাত। দেবদত্তা
নাচ ও আবৃত্তি দুটোতেই তুখোড়।
অনেক সময় শ্রুতিনাটকও করে। পৃথ্বীশ এসেছিল
বেহালা থেকে বাবার অফিসের গাড়ি নিয়ে, এসেই কয়েকজনকে গাড়িতে নিয়ে ধর্মতলা ঘুরে
এলো। তাদের মধ্যে তুহিনের পছন্দ হওয়া মেয়েটিও ছিল। বজবজ থেকে আসে নিমাইচাঁদ
হালদার। সে অবশ্য দলবল গুছিয়ে করে বসে সিগারেট টানছে। সিগারেট শেষ হয়ে যাবে একটু
পরেই, তখন নুঙ্গির কালোসুতার বিড়ি জ্বলবে। তার জিগরি দোস্ত
এখন কয়েকটি অ-বাঙালি ছেলে। পরম যত্নে খৈনি কোমল করতে করতে তারা সময়ের সমস্যা পার
করিয়ে নেয়। তুহিনের কাছে সেদিনের ঐ ঘটনা ছিল দূর পৃথিবীর লড়াই। সে কোনো দলে
ঢুকতে পারেনি। কিছুর ভাগ সে দাবি করেনি, বরং পেটে একটা চিনচিনে ব্যাথা অনুভব
করেছে। ব্যথাটা প্রায়ই করে। খিদে পাচ্ছিল।
বাড়ি ফিরতে এখনও আড়াই ঘন্টা!
ছেলেটি হিমেল বাড়ৈ। খুব মন দিয়ে কাজ করছে। তার কাজ দেখে, তাকে শ্রান্ত দেখে
অনেক বান্ধবী ই এসে আহা, ওহো কত সংবেদন জানিয়ে গেছে! ওদের এটা স্কুলের শেষ বছর। স্কুলেই অনেকে বিশেষ বান্ধবী পেয়েছে। যারা
পেয়েছে তারা বেশির ভাগই দর্শকাসনে বসে আছে জোড়ে । ‘হ্যাপি টিচার্স ডে’ বলে হেসে
সরে যাচ্ছে।
হঠাৎ একজন ম্যাম
প্রায় দৌড়ে ঢুকলেন। গায়ে রোদ মেখে। পিঠে ঘাম বিন্দু বিন্দু । স্যার ম্যাডামদের বসার জন্য আলাদা করা জায়গায় বসে হাঁসফাঁস করতে লাগলেন। ছেলেটি দৌড়ে ম্যামের
দিকে একটু এগিয়ে গেল । ম্যামের গায়ে একটু হালকা
লাগল। ম্যাম বেশ বিরক্ত হলেন, ও! তোরা যে কী
করিস না! পিছনে একটা স্ট্যান্ড ফ্যান। ম্যাম যেখানে বসেছেন, ফ্যান একটু সরিয়ে এনে
ম্যাডামের দিকে ঘুরিয়ে দিল। গায়ে তীব্র হাওয়া লাগতেই ম্যাম ঘুরে তাকালেন। হাসলেন।
ছেলেটার প্রতি খুশি হলেন। ম্যামের খুশি দেখে স্যারেরা এবং ছাত্ররা স্বস্তি পেল।
মনে পড়ছে নন্দিনী ম্যাডামের কথা। সেবার চার জন ম্যাম একসঙ্গে কলেজে
ঢুকেছেন। বাংলা, ইতিহাস, জীববিজ্ঞান, এবং সংস্কৃত বিষয়ের। কাচা হলুদের মতো তীব্র
রং নন্দিনী ম্যাডামের। আজ একটু দেরি হয়ে গেল। দৌঁড়ে ঢোকেন। সেদিন সবুজ একটা শাড়ি পড়ে এসেছেন। বসলে দেখা গেল তার পিঠে
স্বচ্ছ টলটলে ঘামের বিন্দু। চন্দ্রমল্লিম্যাম বৈষ্ণব পদাবলিতে পড়িয়েছেন দুদিন
আগেই, “স্বেদ মকরন্দ বিন্দু বিন্দু চূয়ত”।
চমক ভাঙল তুহিন স্যারের। সে কী দেখছে! সাহিত্যের ইতিহাসের সিলেবাসে বৈষ্ণব
পদাবলি থাকলেও এই চরণটি হিমেল পড়েনি নিশ্চিত। ম্যাডামের দিকে এখনও তাকিয়ে আছে
ছেলেটি। ম্যাম খুশি হয়েছেন দেখে তারও বেশ ভালো লাগছে।
হিমেল তুহিন স্যার সব সময় কী ভাবেন! পড়াতে পড়াতে এক গল্প থেকে আরেক গল্পে
চলে যান। এখনও অন্য মনস্ক লাগছে স্যারকে। সে কী দেখছে স্যার তা লক্ষ্য করেছেন?
হিমেল ভাবতে ভাবতে, ভাবতে থাকে।
মেয়েগুলি আবার শুরু
করেছে। এমনিতে স্কুলে ফোন আনা নিষেধ। সব আইন সত্য প্রমাণিত হবে, যেহেতু ভাঙণ অবাধ
আজ। দিশা আজ সাজানো ধনুক । স্যারের এতো কাছে বেঁকেছে যে চুল উড়ে পড়ছে স্যারের মুখে। নীপা চেহারায় সীমিত হরিণ, স্যারের দিকে এতটা আনত
হয়েছে যে, স্যারের ট্রিম করা দাড়ি ওর চুলে
চিরুনি ভুমিকায়। এই সময় কম্পিউটার ম্যাম এসে ঢোকেন। খুব কড়া ম্যাম। লম্বা সোনালি আখের গড়ন । একটু মহেঞ্জোদারো মুভির হিরোইন রকমের। কৃত্রিম সুগন্ধি
দূরত্বে বেদনা আনে। বখাটে ছেলেরা এবং
বকা খাওয়া ছেলেগুলিও ম্যামের কাছ ছাড়া হতে রাজি নয়। অন্য দিনগুলিতে মেয়েরা
ম্যামের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখলেও আজ তারা
পাতাবাহারের বেড়ার পাশ হয়ে হাঁটছে (যদিও মনের মধ্যে পাহাড়া দিচ্ছে মালি)।
ম্যামের ডাল, পাতা, ফুলের, প্রশংসা করছে, অনাকাঙ্ক্ষিত ভ্রমর এড়াচ্ছে আর লবণ অম্ল
মধুর ত্রি-স্বাদ শব্দে কান ধনী করে নিচ্ছে।
দু-একটি অতি সাহসী ছেলে একটু কথা বলতে চেয়ে এগিয়ে গেলে, প্রথমেই তাড়িয়ে দিলেন। না না, -- আজ আমার কাছে তোদের
কোনও কাজ নেই। দূরে, দূরে থাকবি। মেয়েরা ম্যামকে তখনও ঘিরেই আছে। ম্যাম তাদের
প্রশংসা কৃত্রিম রাগের সঙ্গে
চোখে-মুখে-নাকে এবং গ্রীবায় মেখে নিচ্ছেন।
ইংরেজি ম্যাম দেখা দিলেন তখন । মধ্য কলকাতার কনভেন্ট স্কুলের ছাত্রী ছিলেন।
আচরণ কিছুটা ললিত। চলনে শৌখিন কেয়ারি। বাচনে সচেতন প্রয়োগ, উচ্চারণ য-ফলা বলযুক্ত।
সাজ পোশাক অতি শোভন। ছাত্রদের কথায় "ম্যাম
আজ ফাটিয়ে দিয়েছেন"। যখন ঢুকলেন, ছেলেরা, মেয়েরা, স্যারেরা এবং ম্যামেরাও
ঘুরে তাকালেন। টুয়েলভে পড়া মেয়েগুলি জানে ম্যাম কিসে খুশী হন। ম্যাম, শাড়িটা
অসাধারণ, ম্যাম, লিপস্টিকটা কি বিদেশি? একটি মহা বদমাশ ছেলে নিজেদের আড্ডায়, ঘোষণা
করে দিল—আজকে মার খেয়ে হলেও ম্যামকে বার খাওয়াব-ই। হিমেল ছাত্র মধ্যবিত্ত। তার অত
সাহস নেই। সে দুরেই আছে। বরং আরও একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। স্রোতে হাবুডুবু খেলে
স্রোতের আচরণ দেখা যায়না। সে দর্শকের যোগ্যতা অর্জন করতে চায়।
কলেজে একজন ম্যাডাম
ছিলেন, বাসবী সরকার। অসাধারণ। শোনা যায় তিনি কোনও একটি ইউনিভার্সিটিতে
ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হয়েছিলেন। আমূল মাখনের মতো গায়ের রং। অতি উচ্চবিত্ত ঘরে বিয়ে
হয়েছে। কলেজ টিচার্সদের অনেক পার্টিই তিনি স্পন্সর করেন। বিদেশি সাহিত্যের ইতিহাস
ও সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস অংশটুকু পড়াতেন। উচ্চারণ করতেন গ্রিক লাতিন স্বরে।
সেদিন বিকালে স্পেশাল ক্লাসে ম্যাম বেশ খোশ মেজাজে ছিলেন। ওরা সবাই জানে, শীতের এই বিকালে কৃষ্ণচূড়ার গায়ে রোদ
হামলে পড়েছে। নিচেই রাধাচূড়া। প্রিয়জনের গায়ে শাল টেনে দেওয়ার মতো কৃষ্ণ রাধার
দিকে রোদ ঠেলে দিচ্ছে। ক্লাসে ছাত্রদের উপস্থিতিও ছিল খুব কম। সংস্কৃত কাব্যের
কোনও এক নায়িকার বর্ণনা দিতে গিয়ে বেশ তখন বেশ গদগদ হয়েছেন ম্যাম। তুহিন মুখ ফস্কে
বলে ফেল্ল, ম্যাম, আপনার শাড়ি, আপনাকেও কিন্ত আজ উর্বশীর মতো মনে হচ্ছে ।
ম্যাম তাৎক্ষণিক
ভাবে বেশ গম্ভীর নারাজ হস্তিনী হলেন -- থামো। মনে রাখবে, তোমার কুড়ি, আমার পঞ্চাশ।
ম্যামের সে ভঙ্গীতে কোনও প্রশ্রয় দেখেনি সেদিন তুহিন। ভরসা করা কাচের মতোই শব্দ
গোপন করে ভেঙ্গে পড়েছিল তুহিনের ফ্লার্ট
করার চেষ্টা। ক্লাসের মেয়েরা অবশ্য লুণ্ঠিত বেত বন নিয়ে বেশ রসিকতা করেছিল কয়েকদিন। সঞ্চিতা সোনারপুর থেকে আসে, সেই শুধু খুব
সিরিয়াস মুখে বলেছিল, চেষ্টা চালিয়ে যা… হা হা হা…
ছেলেদের প্রশংসায় ম্যামেরা যে খুশি
হননা, তা নয়। টালিগঞ্জ থেকে আসত নীলাদ্রি স্যান্যাল।পাঁচ ফুট এগার ইঞ্চি লম্বা।
সিনেমার নায়কের মতো চেহারা। সপ্তাহে দুদিনের বেশি কলেজে আসে না। সুন্দরী ম্যামদের
সঙ্গে দেখা হলেই অতি উচ্চমানের রম-মন্তব্য করে। ম্যামরাও হেসে তার কথার উত্তর দেন।
প্রশ্রয়ের সঙ্গে শাসন করেন। তবে এমন দৃশ্য লাখে একটা দেখা যায় ।
আবার যত বয়স্ক স্যারই হন না কেন, গাম্ভীর্য ভেঙ্গেই যায় বিশেষত মেয়েদের
কাছে। সেই যে, যে স্যার কল্যাণী ইউনিভার্সটিতে চলে গেলেন, মনে আছে তুহিন একটা
ছন্দের বই চাইলে বলেছিলেন— এখন তো কাছে নেই। বইটা স্যার তুহিনকে দেননি।
পরে স্যার যখন চলে যাবেন তখন একদিন তুহিনকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেন মহুয়া নামের
একটি মেয়ের কথা।
কেন স্যার ?
একটা বই নিয়েছে, কীভাবে ফেরত পাওয়া যায়, বলতো …
কলেজে তখন স্টাডি লিভ চলছে।
কী বই ?
নূতন ছন্দ পরিক্রমা । প্রবোধ চন্দ্র সেন।
কলেজ জীবনে কোনও
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত থাকতে পারেনি তুহিন। হাজরা থেকে শিয়ালদা, সেখান থেকে
হাবড়া। আগেই বেরোতে হয়। নবীণ বরণ, টিচার্স ডে, এগুলিতে ওদের আর অধিকারই বা কোথায়
ছিল? ইউনিয়ন করা ছেলেদেরই সব দাপট ছিল। এখন তুহিন স্যার প্রতিদিন ছুটি হয়ে গেলেও
একটু দেরি করে বেরোন। ছুটি হলে ছেলেমেয়েদের ভিড় থাকে রাস্তায়। আশে- পাশের চারটে
স্কুলের ভিড় ও জমা হয় রেল ক্রসিংএ। দশ মিনিট দেরি করলেই বেশ ফাঁকা ফাঁকা রাস্তায়
আরামে যাওয়া যায়।
টিচার্স রুম থেকে
বেড়িয়ে বাইরে দাঁড়ালেন। মঞ্চের সামনে সারি সারি ফাঁকা চেয়ার। যেন দীর্ঘ শ্বাস
যাতায়ত করছে। হ্যাঁ, সেই হিমেল এখনও আছে। সঙ্গে আরও কয়েকটি ছেলে। স্কুল মাঠের শেষ
প্রান্তে বেশ কয়েকটি জোড় তখনও গল্প করছে। ওরা
কখনওই বাড়ি যেতে চায়না। একটা গিটারে ওরা গোল হয়ে বসেছে। স্যার কান পাতার চেষ্টা
করছেন, একটা নতুন মুভির জনপ্রিয় গান গাইছে মনে হল। আর অন্য দিকে হিমেল ফাঁকা মঞ্চে
দাঁড়িয়ে কী করছে । তখনও রঙিন আলোগুলি যুবক। ছেলেটির সদ্য যুবক ত্বক ঝলমল করছে। চোখের কালো কুচকুচে পাতাগুলির চকচক যেন অন্তরের প্রতিফলক।
তুহিন বাবুর কিছু মনে পড়ছে যেন…। পুরনো দিনের কোনও দৃশ্য। এই দৃশ্য কোথাও তিনি
চোখে দেখেননি, কিন্ত মনের মধ্যে যেন অভিনীত হয়েছিল। সেই অভিনয় ফিরে ফিরে আসছে।
স্বপ্ন হয়ে আসে, অমন একটি সদ্য যুবক। আশ্চর্য একটা তৃপ্ত বেদনা ঘিরে ধরেছে তাঁকে।
২০০৫ সালে স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষার পরে ভালো ফল করে বেশি ছাত্রওয়ালা এই
স্কুলটি বেছে নিয়েছিলেন। তিনি আজ তৃপ্ত। নিম্নবিত্ত থেকে নিম্ন-মধবিত্ত শ্রেণির
হয়ে উঠতে পেরেছেন। শিক্ষক হয়ে সমাজে সম্মান পেয়েছেন। সেটা তিনি মনে রাখেন।
ছেলেমেয়েদের ভালোবেসে মন দিয়ে পড়ান। একটা প্রশ্রয়বোধ থেকে এগিয়ে গেলেন মঞ্চের দিকে,
কী হল হিমেল বাবু, একা একা মঞ্চে?
সামান্য সংকোচে উত্তর দিল, --স্যার মঞ্চে দাঁড়ালে কেমন লাগে দেখার চেষ্টা
করছি।
হিমেলকে কেন যেন একবার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছে তুহিনবাবুর। মনে মনে বললেন
--যদি আশীর্বাদ করার কোনও আমার যোগ্যতা তৈরি হয়, তাহলে হিমেল যেন কোনও একদিন
শিক্ষক হতে পারে… যেন মঞ্চে ওঠার মতো প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
