আঁচল => সুপ্রিয়া মণ্ডল

 

আঁচল

 সুপ্রিয়া মণ্ডল

 

চাঁদপুর গ্রামটা আকারে খুব ছোটও নয়, আবার বড়ও নয়, ওই মাঝামাঝি। গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে চাষের জমি আছে বেশ কয়েক ঘরের, ধান চাষ, পাট চাষ ঋতু অনুযায়ী যখন যেমন তখন তেমন হয়। চাঁদপুরের আশেপাশেই ছোট, বড়, মাঝারি মিলিয়ে আরো দু’চারটে গ্রাম। এ গাঁয়ের ছেলেরা ট্যুয়েলভ্ পাস অবধি অপেক্ষা করে না, পড়তে পড়তেই পড়া থামিয়ে গাঁয়ের আরো জোয়ান লোকদের সাথে শহরে পাড়ি জমায় দু’পয়সা বেশি কামাতে, আর মেয়েদের তো স্কুলের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই বাপের বাড়ির চৌকাঠের গণ্ডি ডিঙাতে হয়। যারা বাইরে যেতে পারে না, বা যেতে চায় না তারা ওই মুদির দোকানে জিনিস বওয়া, এনে দেওয়া, পঞ্চায়েত প্রধানের ফাইফরমাশ খাটা, এ’সব ক’রেই জীবন চালায়।

গাঁয়ে ঢোকার মুখেই রোদে, জলে, ঝড়ে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া টালির ছাউনি দেওয়া মাটির দু’কামরার ঘরে বাস কুন্তী বুড়ির। ঘরের সামনের একটুখানি জায়গায় পলিথিন আর খড় দিয়ে বানানো রান্না ঘর, সে ঘরে দুপুরে একবেলা রেশনের চালের ভাত ফোটে। কুন্তী বুড়ির বয়স চল্লিশের কোঠায়, তামাটে রঙের কোঁচকানো চামড়া, মাথায় কাঁচা, পাকা চুল। গাঁয়ের ছেলে, বুড়ো সবাই ওকে বুড়িই ডাকে, অচেনা কাউকে গ্রামের দিক নির্দেশ করতে হ’লে, কুন্তী বুড়ির বাড়ি বললেই যে কেউ দেখিয়ে দেবে। কুন্তী নামটা ওর বাপের দেওয়া, পাঁচ ভাই আর এক বোন ছিল ওরা, বাপে একমাত্র মেয়ের সোহাগ ক’রে নাম রেখেছিল ‘কুন্তী’। বাপ মারা যাওয়ার সময়ে বলেছিল, “কুন্তী রে, তুর ভাই, দাদাদের তো মানুষ কইরতি পারলাম না, তু যেনে তুর ছেলিটারে মানুষ করিস, মা।” এরপর বাপটা চোখ বুজেছিল। কিন্তু কুন্তীর পোড়া কপাল। বাচ্চা হওয়ার এক মাস আগে বরটা বিষাক্ত মদ খেয়ে মারা গেল। ভেবেছিল পাঁচটা না হোক, এই একটা ছেলেকেই পঞ্চ পাণ্ডবের সমস্ত গুণাবলী মিশিয়ে বড় করবে, লোকের চোখ টাঁটিয়ে যাবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক! ছেলেটা গুণ পেল বটে, তবে কৌরবদের। কুন্তী শহরে যেত লোকের বাড়ি ঝিয়ের কাজ করতে, নইলে সংসার চলবে কী করে।

গ্রামের প্রাইমারি স্কুল শেষ করে দু'টো গ্রাম পরে হাই স্কুলে ভর্তি করল ছেলেটাকে, বাবুদের বাড়ি থেকে বেতনের আগাম কিছুটা নিয়ে একটা নতুন সাইকেলও কিনে দিল যাতায়াতের সুবিধার জন্য। কিন্তু সেই ছেলে কোনোরকমে টেনেটুনে মাধ্যমিকটা দিয়েই পড়াশোনায় ইতি টানল। বদ ছেলেদের চক্করে প’ড়ে খারাপ নেশায় চার চারটে বছর ডুবে থাকল। বিড়ি, মদ, গাঁজা কিছুই বাকি রাখল না। শেষে নেশার টাকা না পেয়ে কুন্তীর গায়ে হাত তুলতেও ছাড়ত না। একদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে পাশের ঘরের দরজা খোলা দেখে ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখে ছেলে নেই, পালিয়েছে। প্রতিবেশী মহিলারা এসে কুন্তীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, “যা হয়িছে ভালই হয়িছে রে, কুন্তী। তুর ছেলিটা জুয়ার পাল্লায় পইড়ি এক্কেরে বখাটি হয়ি উঠছিলু, কইলকিতায় গেইলি একখান কাজের খোঁজ তো পাবে। ভগবান যা করেন ভালর জন্যিই করেন রে, তু মুন খারাপ করিসনি, উ ভাল ছেলি হয়ি ফিরবে।”

কুন্তী প’ড়ে প’ড়ে খুব কেঁদেছিল সেদিন, কাজেও যায়নি, এমনকী রেশনের দোকানে চাল নিতে যাওয়ার লাইনেও দাঁড়ায়নি।

কুন্তী ভক্তি থেকেই হোক, আর শখ ক’রেই হোক, নিজের নামের প্রথম অক্ষরের সাথে মিলিয়ে বাপ-মরা ছেলেটার নাম রেখেছিল ‘কৃষ্ণ’। মায়ের পথ চেয়ে থাকার প্রায় এক বছর পরে কৃষ্ণ ঠাকুর তার গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন। এসেই মায়ের পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। কুন্তী তো এমন আকস্মিক ও অভাবনীয় ঘটনায় হতবাক। যে ছেলে মায়ের গায়ে হাত ওঠাতে একবারের বেশি ভাবত না, সে কিনা প্রণাম করছে! মাঠে, ঘাটে ঘুরে বেড়ানো রোদে পোড়া গ্রাম্য দোহারা চেহারার কৃষ্ণ কলকাতার জল, হাওয়া পেয়ে এখন চালাক চতুর হয়েছে, কাজের সূত্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়।

 

দুপুর বেলায় ভাল-মন্দ রেঁধে খাওয়ানোর পরে চোখের জল শাড়ির আঁচলে মুছে কুন্তী বলল, “অ কিষ্ট, আর কইলকিতা গেয়ি কাজ লাই বাপ, ইখানেই থাক, শহোরে যা, কিছু একখান ঠিক হয়ি যাবে খন। তুকে ছাড়া আমি থাকতি লারি।” কৃষ্ণ তখন গলাটা একটু গম্ভীর ক’রে নব্য শেখা শহুরে বাচন ভঙ্গিতে বলল, “মা, আর তোমাকে শহরে পরের বাড়ি বাসন মাজা, ঘর মোছার কাজ করতে যেতে হবে না। ভাল কাজ আছে, আমার সাথে করো, টাকার পাহাড়ে সারাদিন শুয়ে থাকবে।” কুন্তী আবারো সেই বিষাদগ্রস্ত গলায় বলল, “ইখানেই থাক না বাপ, শাক, পাতা, গরম ভাত দু’বেলা তোরে ফুটি দিব, চোখের দেখা তো দেখতি পাব। তু ছাড়া আমার আর কে আছে, বল।”

“তুমি বুঝতে পারছ না, মা। আচ্ছা, তুমি কি চাও না যে, তোমার ছেলে একটু নামডাক করুক, একটু পয়সা হোক, গাঁয়ের লোকে চোখ তুলে আমাদের দিকে তাকাক। চাও কি চাও না?”

“চাই তো বাপ, খুব চাই, কিন্তু…”

“আর কোনো কিন্তু টিন্তু নয়, যা বলছি মন দিয়ে শোনো।”

“বেশ, বাপ বল”

“দেখো, আমি চাই শুধু তুমি নও, এই গ্রামের বা আশেপাশে গ্রামের মেয়েরাও যাতে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে, স্বনির্ভর হয়। তোমাকে শুধু একটা ছোট কাজ করতে হবে এর জন্য। পারবে তো?”

একজন রত্নগর্ভা মায়ের মত গৌরবান্বিত চোখে কুন্তী বলে উঠল, “পারবু, বাবা, খুব পারবু। গাঁয়ের মেয়িদের লগে উদের কথা ভেবি এত্ত ভালা একখান কাজ করতি তুর মুন চেয়িছে, আর আমি তুর মা হয়ি তুকে সাহায্য করবু না, ই কখুনু হতি পারে? ই গাঁ কেনে, সব গাঁয়ের লুক ইবার দেখবি কুন্তী কেমুন ছেলি মানুষ করিছে। সে মাঝখানি উ বয়োসের দোষে একটু ইদিক-উদিক হয়ি গিছিল, কিন্তু বাপ আমার মানুষের মত মানুষ হয়িছে বটে, আজ আমার বাপটা বেঁচি থাকলে কত্ত খুশি যে হ’ত।” বলেই আবার আঁচলের খুঁটে চোখ মুছল কুন্তী।

“আচ্ছা, বেশ বেশ, শোনো, তোমাকে গ্রামের মেয়েদের মানে যে সমস্ত মেয়েরা কাজ খুঁজছে তাদের বোঝাতে হবে শহরে কাজের কথা। ওদের চিন্তা করার কোনো কারণ নেই, আমিই সব ব্যবস্থা করে দেব। নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা, আর থাকা, খাওয়া একেবারে ফ্রি। তোমার শুধু এটাই কাজ, বুঝিয়ে আমার কাছে আনা। এর জন্য মালিক ভাল টাকা দেবে বলেছে। এইটুকু জিনিস তোমার কাছে চাইছি মা, কাজটা করে দিও।”

“তা আমাকে কবে নিয়ি যাবি শহরে?”

“আরে যাব, যাব, সবাইকেই নিয়ে যাব, তুমি আগে ওই কাজটা তো করো, তারপর সব হবে।”

“ঠিক আছে বাপ, আমি দেখছি, তু একটু আরাম কর দেখিনি।”

“না, মা, আরাম করলে হবে না, হাতে বেশি সময় নেই, তিনদিন, তিনদিনের মধ্যে আমাদের কাজ শেষ করতে হবে।”

“হবে বাপ, তু অত চিন্তা করিস ক্যান। তুর মা আছে লা, সব হয়ি যাবে।”

মা, ছেলে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা শেষ ক’রে যে যার ঘরে গেল।

সেদিন বিকেলেই কুন্তী পাড়া বেড়াতে বের হ’ল। নিজের ছেলের এত বড় কীর্তির কথা নিজের মুখে না বললে হয়!

“কিষ্টর মা, সবই তো বুঝলাম, কিন্তু কাজখান কী? আমার চম্পাটারও একটা কাজের দরকার আছে, জানই তো সব, ইয়ার বাপটা কুথায় কুথায় যে পড়ি থাকে, কুনু ঠিক ঠিকানা থাকে না, সাত দিনে আট দিনেগা বাড়ি আসে। এসিই মারধর, মেয়িটার একটা গতি হোক।”

“সেই জন্যিই তো বলছিলাম, চম্পাকে কিষ্টর সাথে পাঠি দে, উ উয়ার একটা না একটা ব্যবস্থা ঠিক করি দিবে। অন্য কাউরে না হোক আমার উপর তো তুর বিশ্বাস আছে, আমি খারাপ কাজ কুনুদিন করিনি।”

“না, গো, বিশ্বাস আছে বলিই না জিজ্ঞাস করলাম, ওই বিশ্বাসটুকুই তো সব।”

“শুন, বেশি কথা বাড়িয়ি আর লাভ নাই, তু কালকি চম্পাকে একটা ব্যাগে কয়েকটা পরনের জামা, কাপড় দি পাঠাবি, উখানে গি থাকতি হবে।”

কুন্তী এরপর আরো কিছু বাড়ি ঘুরল যেসব বাড়িতে মেয়েরা কাজের খোঁজে কয়েক পয়সা রোজগারের আশায় রয়েছে যাতে বাড়ির হালটা মেয়ে হয়েও ধরতে পারে, ঘরে সুদিন আনতে পারে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ রাজি হ’ল, কেউ আবার সন্দেহের চোখেও দেখল; এই যেমন মিলির মা। সে তো বলেই বসল, “অ্যাতদিন পর তুর ছেলি ফিরল, কী করে না করে তার কিচ্ছু জানিনি আমরা, তার উপর তুর ছেলি নিশা করত, কুন ভরসায় ছাড়ি বল্ দেখিনি?”

“আমি মানছি উ আগে নিশা করত, কিন্তু বিশ্বাস কর্, এখুন এক্কেরে বদলি গিছে, মেয়িদের লগে ভাল কাজ করতি চায়, ইতে উয়ার পাশে আমাদের দাঁড়ানু উচিত।”

“তুর ছেলি, তু দাঁড়া। আমাদের টানিস ক্যানে, আর বিরক্ত করিসনি, যা।”

দু'টো বাড়ির মেয়েকে কৃষ্ণর সাথে যাওয়ার জন্য রাজি করাতে পেরে খানিকটা বিজয়ের হাসি হেসে সন্ধ্যে গড়ালে পরে ঘরে ফিরল কুন্তী।

পরদিন চম্পা আর কিছুটা দূরের বাড়ির রীতাকে সাথে নিয়ে ট্রেন ধরার জন্য বেরিয়ে পড়ল কৃষ্ণ। মা-কে শহরে ভাল কাজের জন্য আরো কিছু মেয়েদের বোঝানোর কথা বলে গেল।

“দুগ্গা, দুগ্গা” বলে দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে কুন্তী ঘরে এসে বসল। শরীরটা আজকাল আর ভাল যায় না ওর। ছেলেটার একটা হিল্লে হয়েছে ভেবে আনন্দে আর গর্বে চোখের কোণে জল এসে কখন যে গাল ভিজিয়ে দিয়ে চলে যায় বুঝতেই পারে না।

প্রায় দু’মাস অতিক্রান্ত। চম্পা আর রীতার মা মাঝেমাঝে কুন্তীর কাছে এসে মেয়েদের খবর নিতে চায়, কিন্তু কুন্তীও নিরুপায়, ওর কাছেও তো কোনো খবর নেই ওদের। মোবাইল সহজলভ্য হলেও গ্রামের সহজ মানুষগুলোর কাছে এখনও এ এক জটিল বিষয়, আর তার ওপরে সেই যন্ত্রের মাসিক যত্নআত্তির খরচ তো রয়েইছে। এর মধ্যেই একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ ক’রে কৃষ্ণ আসে। কুন্তী তো বেজায় খুশি। তবে কৃষ্ণর সাথে আরো দু'জন অচেনা লোক আসে, বাড়িতে কিছুক্ষণ থেকে কৃষ্ণ ওদের নিয়ে বেরিয়ে যায় দূরে শহরের হোটেলে থাকার বন্দোবস্ত করতে। রাত্রে অবশ্য কৃষ্ণ ফিরে আসে, কিন্তু সঙ্গে একটা অচেনা অল্প বয়সী মেয়ে। কুন্তী কিছুই বুঝতে পারে না কী হচ্ছে। কৃষ্ণ বলে, “মা একে দু’দিন তোমার কাছে রাখো, আমি এসে নিয়ে যাব।” কুন্তী “এ কে, বাবা?” জিজ্ঞাসা করতে যেতেই ছেলের কাছ থেকে কড়া ধমক খায়। কৃষ্ণ উত্তেজিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়।

মেয়েটার গড়ন রোগাটে শ্যামলা, তবে মুখের শ্রী আছে, বয়স ওই আঠারো, উনিশ হবে। কুন্তী কাছে যেতেই মেয়েটা হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল। “আমাকে বাঁচান, আমি বাঁচতে চাই, আমি ও পথে যেতে চাই না।” মেয়েটার বলার ধরনটা বেশ শহরের লোকদের মত। কুন্তী কী বলবে ভেবে পেল না। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়িছে, মা, এমুন করি কাঁদছ কেনে? কুনু ভয় লাই, আমার ছেলি যখুন এনিছে তুমায় তখন তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। গাঁয়ের মেয়িদের, যাদের টাকা, পয়সা নাই তাদের কাজের জুগাড় করি দেয় আমার ছেলি। দূরে যেতি হচ্ছি বলি চিন্তা কোরু না, মা।”

“আপনার ছেলেকেই তো ভয়, মাসিমা। ওর হাতে পড়া মানে জীবন শেষ হয়ে যাওয়া। দালালি ক’রে মেয়েদের কলকাতায় বিক্রি করা, পাচার করা এ'সবই ওর কাজ। আমি অন্য গ্রামের মেয়ে, আমায় চিনবেন না আপনি। শহরে টিউশনি পড়তে যেতাম, একজনের মাধ্যমে আপনার ছেলের সাথে পরিচয় হয় কাজের জন্য। ওদের সাথে না গেলে আমার অসুস্থ বাবাকে ওরা মেরে ফেলবে। আমি ওই পথে যেতে চাই না, কোনোদিন না, কিন্তু উপায় নেই আমার” কথাগুলো বলেই মেয়েটা এবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।

মেয়েটার কথাগুলো কুন্তীর মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছিল, “ও কী বলছি, আমার কিষ্ট… এ হতি পারে লা।”

গভীর রাত্রে একটা গাড়ি এসে থামল কুন্তী বুড়ির বাড়ির সামনে। গাড়ি থেকে ওর ছেলে কৃষ্ণ, সাথে সেই লোক দু'টো এবং আরো একজন নেমে ওদের বাড়ির দিকে গেল। গ্রামাঞ্চলের ঘর, গেট বলতে বাঁশের দরজা ঠেকা দেওয়া, সেটা ঠেলেই ওরা উঠোনে এসে দাঁড়াল। কৃষ্ণ ওর মায়ের ঘরের দরজায় আস্তে করে আওয়াজ করতে লাগল “মা, তাড়াতাড়ি দরজা খোলো” ব’লে। ঘুম জড়ানো গলায় কুন্তী বুড়ি “কে, কে এসিছে” ব’লে মেঝেতে পাতা বিছানায় উঠে বসে। তারপর যখন বুঝতে পারে ওর ছেলে এসেছে তখন কৃষ্ণকে মুখের ওপর জানিয়ে দেয় সে দরজা খুলতে পারবে না। কৃষ্ণ আরো রেগে যায়। “মা, ভাল বলছি, দরজা খোলো, নইলে দরজা ভেঙে ঢুকব” বলেই দরজায় প্রচণ্ড জোরে লাথি মারতে থাকে। এরপর যখন সাথের লোকগুলোও দরজায় ধাক্কা মারতে থাকে তখন কুন্তী বুড়ি আর স্থির থাকতে পারে না, দরজা খুলে বেরিয়ে আসে।

এসেই শান্ত গলায় “অ্যাতো রাইতে কী হয়িছে” বলতে বলতেই কৃষ্ণ ঘরের মধ্যে থাকা মেয়েটাকে জবরদস্তি টেনে বের ক’রে নিয়ে আসে। মেয়েটা তখন ভয়ে কাঁপছে। ওরা গাড়িতে তোলার জন্য মেয়েটাকে যেই ধ’রতে যাবে তক্ষুনি কুন্তী মেয়েটার সামনে এসে দাঁড়ায়। “কী হ’ল, আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে, সরো” কৃষ্ণ জোরে ব’লে ওঠে।

“না, আমি, সোরবো লাই। ই খারাপ কাজটা তুই করতি পারবি না, আমি তুকে করতি দিব না। তুই কী করি ইকে নিয়ি যেতি পারিস দেখি, মুনে রাখিস কিষ্ট, আমি তুর মা” চিৎকার ক’রে গর্জে ওঠে কুন্তী। কুন্তীর এমন রূপ আগে কখনো কেউ দেখেনি, কৃষ্ণও থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। ওদের বাড়ি থেকে আশেপাশের বাড়িঘর কিছুটা দূরে হলেও এত রাত্রের শোরগোলে কেউ কেউ কাঁচা ঘুম ভেঙে উঠে পড়েছিল কোথায় কী হচ্ছে দেখতে।

“আমি জানতি পেরিছি তুরা কী কামটা করিস।”

“কী জানতে পেরেছ, বুড়ি, দেখবে কী করি?” কৃষ্ণর সাথে থাকা একজন ফ্রেঞ্চকাট দাড়িওয়ালা লোক বাঁকা চোখে কথাটা ব’লেই মেয়েটার গায়ে থাকা ওড়না খুলে মাটিতে ফেলে দেয়, ওর সালোয়ার কামিজ পুরুষালি শক্ত হাত দিয়ে নখ দিয়ে ছিঁড়তে লাগে; ওদের হিংস্র চোখগুলো দিয়ে ঝরে পড়তে থাকে কামার্ত লোলুপ দৃষ্টি। এরপর কৃষ্ণ মেয়েটিকে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলতে যেতেই কুন্তী এগিয়ে এসে জোরে একটা থাপ্পড় মারে কৃষ্ণর গালে। “ইটা আমার আগেই করা উচিত ছিল, একখান ছেলি নিয়ি আমি অন্ধ ছিলাম। মানুষ করতি পারলাম না। আমারই দোষ।” আপন মনে কথাগুলো ধীর গলায় ব’লে নিজের শাড়ি থেকে আঁচল খুলে মেয়েটির গায়ে জড়িয়ে দেয় কুন্তী। মেয়েটিও কাঁদতে কাঁদতে কুন্তীকে জড়িয়ে ধরে। “আর কেউ যদি ইকে আমার থেকি নিয়ি যেতি চায়, আমি গাঁয়ের লোক ডাইকবু, পুলিশে খবর দিবু।”

বলার মাঝেই গ্রামের কিছু লোক এসে জড়ো হয়ে যায় ওদের উঠোনে। অবস্থা বেগতিক দেখে কৃষ্ণর সাথে লোকগুলো গাড়ির দিকে পালাতে থাকে, কিন্তু ধরা পড়ে গ্রামের লোকদের হাতে।

 

রাত্রির তমসা কেটে গিয়ে ভোরের আলো ততক্ষণে ফুটতে শুরু করেছে। গাছের কোটরে রাত কাটানো পাখিরাও তাদের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে খাবারের সন্ধানে কিচিরমিচির শব্দে বেরিয়ে পড়েছে।

মহাভারতের কুন্তীর মত রত্নগর্ভা মা না হতে পারলেও চাঁদপুর গ্রামের অখ্যাত কুন্তী ভগবান শ্রীকৃষ্ণর জন্য অপেক্ষা না ক’রে একটি অজানা সম্পর্কহীন মেয়ের আব্রু রক্ষার্থে নিজের আঁচল খুলে দিয়ে স্ত্রী জাতির সম্ভ্রম বাঁচাল। যে আঁচল দিয়ে সন্তানকে বড় করতে পারে একজন মা, প্রয়োজন হলে সেই আঁচল আপন রক্তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও করতে জানে। নতুন মহাভারত রচিত হ’লে আমাদের চারপাশের এমনই সব কুন্তীরা জীবন্ত চরিত্র হ’য়ে অক্ষরে অক্ষরে উঠে আসবে, আর কলিযুগের কৃষ্ণ নামধারী শয়তানদের কীভাবে শায়েস্তা করতে হয় তার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্তও হয়ে থাকবে সমাজের কাছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post