ডীপার স্টেট => শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

 ডীপার স্টেট 

শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

<============== Deeper State ===============>

SIR-এ নাম বাদ, নির্বাচন পরবর্তী হিংসা ইত্যাদি নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনের প্রথম সুযোগেই পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভারত সরকারকে বাংলাদেশের এক জুলাই বিপ্লবীর হত্যার ষড়যন্ত্রী বানিয়ে দিলেন। কিন্তু দেশদ্রোহের অভিযোগে FIR হলেও তাঁকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি। 

বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যে একটি ছদ্মবিপ্লব যার লক্ষ্য ছিল মৌলবাদীদের সরাসরি রা⁹জনৈতিক উত্থান, তা আজ জানতে কারোর বাকি নেই। বাংলাদেশ যতই ভারতের ভিক্ষান্নে ও দয়ায় জীবন ধারণ করুক, বাণিজ্যিক সুবিধা পাক, এই ইসলামিক মৌলবাদীরা ভারতকে বাংলাদেশের কাল্পনিক শত্রু রটিয়ে এবং বাংলাদেশের হিন্দুদের ভারতপ্রেমী বলে দেশদ্রোহী দাগিয়ে নির্বিচারে হত্যা ধর্ষণ নির্যাতন করে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়, সেটাও আমরা কেন সারা বিশ্ব ভালো মতন জানে। ওসমান হাদি এই ভাবধারারই ছাত্র নেতা ছিল যার প্রধান যোগ্যতা ছিল ভারতবিরোধিতা। এরা শুধু হিন্দুদের নয়, নির্বিচারে খুন করেছে বাংলাদেশের আওয়ামীলীগের মুসলিম সদস্য নেতাকর্মীদেরকেও। 

এই খুনোখুনির মধ্যে হাদি নিজেও অজানা আততায়ীর গুলিতে খুন হয়। হাদির হত্যার পর বলা বাহুল্য, বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। তার খুনিরা পালিয়ে ভারতে মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ঢুকে সন্ত্রাসীদের সেফ হেভেন পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়। মমতার সঙ্গে জামাতের সখ্য। তার পুলিশের STF-এর খুনীদের গ্রেফতার করতে সমস্যা হয়নি। পরে তাদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তবে সন্ত্রাসী হাদির হত্যাকারীরা ভারতে ধরা পড়েছে প্রকাশ পেলে ইউনূস ও জামাত শিবির শাসিত বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক পাছে আরও খারাপ হয়, তাই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক থেকে তখনকার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করে ধৃতদের পরিচয় গোপন রাখতে অনুরোধ করা হয়েছিল। সেই ঘটনাকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াই চ্যানেলে ধরনায় বসে এমনভাবে উপস্থাপন করলেন, যেন হাদি হত্যায় ভারত সরকারের হাত ছিল। 

এই মন্তব্যে বাস্তবিকই বাংলাদেশ উত্তাল। কারণ ইতিমধ্যে unknown gunman-এর নামে একটা মিথ ছড়িয়েছে ভারতের অত্যুৎসাহী রাষ্ট্রবাদীরাই। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে ভারতবিরোধী সন্ত্রাসীরা গুলিবিদ্ধ হয়ে মরলেই এইসব মাথামোটা ছেলেরা আননোন গানম্যানের ওপর কৃতিত্ব আরোপ করে ধেই ধেই নেচেছে। ব্যাপারটা এমন, ঝড়ে কাক মরে, আর ফকিরের কেরামতি বাড়ে। ফলে বাংলাদেশে মমতার প্রলাপ নিয়ে ভারতবিরোধী প্রচার নতুন মাত্রা পেয়েছে। হিন্দুদের ওপর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া আছড়ে পড়েছে। সত্যিই যদি ভারত কাজটা করাত, তাহলে কি বাংলাদেশের হাতে খুনীদের তুলে দিত?

 

তাতে অবশ্য দিল্লীর শাসকদল বিজেপির কাঁচকলা। হিন্দুনিগ্রহ তো ওদেশের জন্মের আগে থেকেই ছিল লেবার পেইনের মতো, তারপর হল নিয়মিত যন্ত্রণা। ২০১৪-য় কেন্দ্রে গেরুয়াদল ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ওরা ভারতে মুসলিমরা নিগৃহীত রটিয়ে অত্যাচারের নতুন অজুহাত পেয়ে যায়, যেটা ক্রমশ বেড়েছে বিজেপি সরকারেরই সস্নেহ প্রশ্রয়ে। বাড়তে বাড়তে এমন হয়েছে, যে ২০২৪-এর "জুলাই বিপ্লব" ইস্তক বাংলাদেশের মৌলবাদী থেকে বুদ্ধিজীবী-- সব শিবিরেই উচ্চাশা জন্মায়, বাংলায় মমতা ২০২৬-এ পুনরায় ক্ষমতায় এলে চীন বা আমেরিকার সাহায্যে পশ্চিমবঙ্গ সহ গোটা উত্তরপূর্ব ভারত তারা কব্জা করে নিতে পারবে। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় সে গুড়ে দৃশ্যত বালি পড়ল। মমতারও ইসলামিক দুনিয়ার কাছ থেকে পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা আপাতত তলিয়ে গেল।  


এইবার পরপর কতগুলো বিন্দু মেলানোর চেষ্টা করছি। 

১) ২২শে মে ২০২৬ নির্বাচনী ফলপ্রকাশের পরে মমতার ভরাডুবি দেখেও Missionaries of Charities সংস্থার সিস্টাররা মমতাকে শুভেচ্ছা জানাতে কালীঘাটে গিয়েছিল। তা sister তো দিদির বাড়ি যেতেই পারে। কিন্তু ব্যাপারটা কি অতটাই সহজ ছিল? =>

২) এরপর নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পরেও মমতা হার স্বীকার না করে দোষারোপ করে বাংলাদেশ ও পশ্চিমী দুনিয়ায় মিথ্যা ন্যারেটিভ ছড়াতে চাইলেন। মাসখানেক একঘেয়ে বুলি শুনে সবাই মাথার গোলমাল নিয়ে হাসাহাসি করল। চেয়ার আঁকড়ানো বাচ্চা মেয়ের একটা মিষ্টি কার্টুন পর্যন্ত তৈরি হয়ে গেল, যেটা দেখে মনে হল, আহা রে! =>

৩) বিজেপি-র বাংলা জয়ের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগবাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে অভিনন্দন জানালেন। ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কীসের এত উৎসাহ। তাহলে কি এটা কোনও হতাশার বহিঃপ্রকাশ নাকি আগামী দিনে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত?

৪) তারপর দেখা গেল মার্কিন রাষ্ট্রসচিব মার্কো রুবিও ভারতে এসে দিল্লীর বদলে সোজা কলকাতায় এসে মাদার টেরেজ়ার Missionaries of Charities-এ দেখা করেন। এখানে মনে পড়ল, সংগঠনটির বিরুদ্ধে ধর্মান্তরণের তো বটেই এমনকি পশ্চিমা বিশ্বে অবৈধ দত্তক প্রদানের (কার্যত শিশুপাচারের) অভিযোগও আছে। =>

৫) মার্কো রুবিও ঘুরে যাওয়ার পরেই মমতা ওসমান হাদির ঘাতক রূপে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে সরাসরি আঙুল তুললেন। বোঝা যাচ্ছে, নিজের দিন ফুরিয়েছে বুঝে মমতা ব্যানার্জী এখন সরাসরি মানববোমার মতো ফেটে দেশকে যতখানি সম্ভব চৌচির করতে উদ্যত হয়েছেন। এই বক্তব্যের জেরে বাংলাদেশ যে উত্তাল হবে, তা নিজের বক্তব্য রাখার সময়ই বলেছিলেন। স্পষ্টত বাংলাদেশকে উত্তাল করে ভারত ও হিন্দু বিদ্বেষের জোয়ার আনাই ছিল তাঁর আলটপকা মন্তব্যের উদ্দেশ্য। =>

৬) এই দেশদ্রোহীতার জন্যই দাবি উঠেছে, অবিলম্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে UAPA দিয়ে গ্রেফতার করা হোক। নতুবা এই মহিলা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় ভারতকে আরও অস্বস্তিতে ফেলবেন। 

৭) কিন্তু তিনি ও তাঁর চোর তোলাবাজ ও সাম্প্রতিক গুঞ্জন অনুযায়ী দুশ্চরিত্র ভাইপো এখনও খোলা আকাশের নীচে স্বমহিমায় বিরাজমান। এর আগেও পিসি ভাইপো ক্রমাগত হিন্দুদের বিরুদ্ধে দাঙ্গায় সরাসরি ইন্ধন দিয়েছেন। তখনও কিছু করা হয়নি, এখনও হচ্ছে না।


এখন সাধারণ মানুষ থেকে বিশেষজ্ঞরা সবাই বলেন, মমতা ভোটে জেতার জন্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করছেন। কিন্তু আমি গত এক দশক ধরে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, তাঁর রাজনীতি করার উদ্দেশ্যই সাম্প্রদায়িক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে, একটা তীব্র হিন্দুবিদ্বেষী ও ভারতবিরোধী ষড়যন্ত্র কার্যকর করতে। 


কেন বলছি? বুঝতে পারবেন একটু পিছিয়ে গেলে। দেখতে পাবেন, আরও কয়েকটি অতীত বিন্দু এই লেখচিত্রের সঙ্গে খাপ খেয়ে যাচ্ছে। 

উত্তরপূর্ব ভারতে অশান্তির পেছনে চীনের একটা উস্কানি আছে, এটা বছর সাতাশ-আঠাশ আগেই শুনেছি। অনুরূপ হুলিয়ার কারণে চীনাদের উত্তরপূর্বের জনগণের মধ্যে আত্মগোপন করে থাকতেও সুবিধা হয়। আমার "বকেয়া হিসেব" উপন্যাসের অন্যতম ভিত্তিই এই বাস্তবতা। অথচ একমাত্র অরুণাচল প্রদেশের ওপর চীনের বারংবার দখলদারির চেষ্টার দৃষ্টান্ত ছাড়া গোটা উত্তরপূর্ব ভারতে খ্রীষ্টধর্মের ব্যাপক রমরমা, যেখানে চীনের কোনও ধর্মীয় এজেন্ডা নেই; অন্তত খ্রীষ্টধর্ম প্রচারে চীনের কোনও স্বার্থ নেই। কিন্তু নাগাল্যান্ড শত শতাংশ খ্রীষ্টান। মিজ়োরামের মিজ়োরাও তাই। ত্রিপুরার আদিবাসীরাও খ্রীষ্টান চার্চ থেকে হিন্দু অর্থাৎ বাঙালী হিন্দুদের ওপর হামলা করার অনুপ্রেরণা পায়। আবার মণিপুরের আদি বাসিন্দা মৈতৈ বৈষ্ণবরা হিন্দু ও সংখ্যাগুরু হলেও রাজ্যের সিংহভাগ ভূমি অর্থাৎ পার্বত্য মণিপুর খ্রীষ্টান উপজাতি কুকিদের দখলে, যাদের সঙ্গে মিলে খ্রীষ্টান নাগারাও মৈতৈদের অতিষ্ঠ করে দিচ্ছে। মেঘালয়েও গারো ও খাসিরা অনেকেই নিজেদের চিরাচরিত বিশ্বাস ধরে রাখলেও খ্রীষ্টান মতবাদ থাবা বসাচ্ছে সেখানেও। এরা সকলেই হিন্দুবিরোধী হতে গিয়ে টার্গেট করেছে মূলত হিন্দু বাঙালীদের, যাতে ভারতের অবাঙালী শাসকরা মোটেই বিচলিত নন। 

আসামের গল্প আরও আগ্রহোদ্দীপক। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংকের আমল পর্যন্ত অসমীয়া ভাষা বাংলাভাষারই রূপভেদ বা উপভাষা রূপে বিবেচিত হত; বস্তুত আসাম রাজ্যটা তৈরিই হয়েছিল বাংলা প্রদেশের খানিকটা অংশ কেটে তার সঙ্গে সংযুক্ত পাহাড়ী অঞ্চলগুলোকে জুড়ে। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে দুই ব্যাপটিস্ট মিশনারী যারা সম্পর্কে দম্পতি সেখানকার অসমীয়াভাষীদের বোঝায় অসমীয়া হল বাংলা থেকে পৃথক ভাষা। শুরু হল বাঙালীর প্রতি মন বিষোনোর খেলা। রচিত হতে লাগল বাংলাভাষা থেকে অসমীয়া ভাষার স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় অসমীয়া ভাষার ব্যাকরণ। আসামে খ্রীষ্টান জনসংখ্যা তেমন বেশি না হলেও মিশনারিরা ভাষা সংঘাত লাগিয়ে বাঙালীদের বিরুদ্ধে চীন থেকে আগত অহোম সমেত পাহাড়ী জনজাতিগুলোকে খেপিয়ে তুলতে সক্ষম হয়। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে এমন এক অণুজাতিসত্তা সৃষ্টি করে আমেরিকান ব্যাপটিস্ট মিশনারিরা, যে তারা শুধু বাংলাভাষা বিরোধী নয়, বাঙালী জাতিরও রক্তলিপ্সু হয়ে ওঠে।  

এই ইতিহাসকে গত এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে ভারতের উত্তরপূর্বে সক্রিয় জেসুয়া প্রজেক্ট বা খ্রীষ্টানীকরণ প্রকল্পের পূর্ব প্রস্তুতি রূপে দেখাই যায়। এই জেসুইট প্রকল্পেরই অন্যতম পরিণাম মণিপুরে লাগাতার রক্তক্ষয়, যেখানে খ্রীষ্টান উপজাতিগুলো মৈতৈদের উপজাতি পরিচয় লাভের ঘোর বিরোধিতায় এবং পার্বত্য অঞ্চলে নিজেদের একাধিপত্য সংরক্ষিত রেখে সমতলে মৈতৈদের জমিতে এসে কব্জা করতে সচেষ্ট।


মজার ব্যাপার, হিন্দুধর্মের জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধেই তো বাবাসাহেব ভীমরাও ভারতের সংবিধানে জাতিগত সংরক্ষণ ব্যবস্থা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু জাতপাতের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে যেসব হিন্দুরা ইসলাম বা খ্রিশ্চিয়ানিটি গ্রহণ করেছে, তারা কী করে হিন্দু বর্ণভেদ অনুযায়ী জাতপাতের সংরক্ষণ পেতে পারে, সেটা ব্যাখ্যা করে যাননি। কারণ তিনি নিজে হিন্দু সমাজের প্রতি চরম বীতস্পৃহ, বিদ্বেষপ্রবণ ও দূরত্বকামী বৌদ্ধ ছিলেন। জানি না, সংবিধানের অন্যান্য রচয়িতারা সেই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন কিনা। কিন্তু কোনও অর্থনৈতিক মানদণ্ড স্থির না করে শুধুমাত্র জাতের ভিত্তিতে সংরক্ষণ চালু করায় এবং স্বাধীনতার ৮০ বছর পরেও তা বহাল থাকায় আদিবাসী বা জনজাতি বা ট্রাইব বলে পরিচিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশাল সম্পত্তির মালিক গোষ্ঠীপতি বা রাজাদের পরিবারগুলোও তফশিলী জনজাতি হিসাবে বংশপরম্পরায় সংরক্ষণের ক্ষীর খেয়ে যাচ্ছে নিজেদেরই স্বজাতির প্রকৃত অনগ্রসরদের বঞ্চিত করে। ফলত ধর্মান্তরণ ও ভারতীয় সংবিধানের ভ্রান্ত নীতির শাঁড়াশি আক্রমণে বর্ণহিন্দুরা মাতৃগর্ভে আসা মাত্র পৃথিবীর আলো দেখার আগেই অপরাধী সাব্যস্ত হয়ে যায়, এবং সব জনগোষ্ঠীর কাছেই অন্ধ বিদ্বেষের লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়ায়। যাইহোক আপাতত এই ব্যাপারে বিস্তারে যাচ্ছি না। মূল প্রসঙ্গে ফিরি।


এখানে যেটা দ্রষ্টব্য, উত্তরপূর্ব ভারতকে খ্রীষ্টান প্রধান করে তোলা ছিল একশো বছর ধরে আমেরিকান মিশনারী থেকে ডীপ স্টেটের অন্যতম লক্ষ্য, যাতে তারা প্রায় শত শতাংশ সফল। কিন্তু শুধু ধর্মান্তরণই তো মোক্ষলাভ হতে পারে না যদি না সেখানে উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে ফায়দা লোটা যায়। তাই দরকার ভারতের ঐ অংশটা বিচ্ছিন্ন করে নিজেদের তাঁবে রাখা। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর, খনিজ তেল ও খনিজ গ্যাসে সমৃদ্ধ ঐ অংশটা ভারতের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারলে পশ্চিমা বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদের অভীপ্সা, দাদাগিরির শখ, ব্যবসায়িক স্বার্থ, উপনিবেশ হারানোর ক্ষতিপূরণ এবং যে বাঙালী জাতির জন্য ব্রিটিশদের ভারত ছাড়তে হয়েছে, তাদের ওপর বদলা --- এই এতগুলো পাখিকে এক তীরে বধ করা যাবে।

এর জন্য খ্রীষ্টান প্রধান উত্তরপূর্ব ভারতের কিছুটা, তার পশ্চিমে লাগোয়া বাংলাদেশের কিয়দংশ এবং পূর্বদিকে মায়ানমারের খানিকটা, যে স্থানগুলোতে পাহাড়ী ভূপ্রকৃতির কারণে সীমান্তরেখায় বেড়া দেওয়া যায়নি, এই পুরো অঞ্চলটা নিয়েই আমেরিকার বশংবদ একটা খ্রীষ্টান রাষ্ট্র তৈরির চেষ্টা চলেছে। সেই চেষ্টারই এক চরম বহিঃপ্রকাশ হল মণিপুরে রক্তক্ষয়ী জাতি সংঘর্ষ।  


হাসিনা ক্ষমতাসীন থাকতেই ভারতকে এই ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে সাবধান করেছিলেন বলে জানা গেছে। হাসিনার কাছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ চেয়ে আমেরিকা পায়নি। তাই ছাত্র আন্দোলনের ছলে হাসিনাকে উৎখাত করে দালাল ইউনূসকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে আনে। ইউনূস শাসনে জামাত বা আনসারুল্লা তো বটেই, বাংলাদেশের মাটিতে তালিবান, লশকরে তৈবা, আইসিস-- এতগুলো জঙ্গী সংগঠন একসাথে সক্রিয় হয়ে ঊঠল। আর বাংলাদেশের মতো নেংটি ইঁদুর ভারতের চিকেন নেক কেটে একদিকে পশ্চিমবঙ্গ আরেক দিকে সমগ্র উত্তরপূর্ব দখলের হুমকি দিতে লাগল। সঙ্গে অধিকতর তীব্রতায় বাঙালী (হিন্দু) নিগ্রহ ও নিধনে রত হল। তাদের এই স্পর্ধায় ইন্ধন দিয়েছে ভারতের রাষ্ট্রীয় নেতৃবৃন্দের নীরবতা। 

লক্ষণীয়, ভারত তার সীমান্ত বরাবর কাঁটাতার বসালে বাংলাদেশের মুসলমান ও মায়ানমানের খ্রীষ্টান কুকি-নাগা -- দুই পক্ষেরই আপত্তি। 

হাসিনা হিন্দুদের প্রতি কতটা সুবিচার করেছেন, সবাই জানে। বরং তিনি যে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করেছেন হিন্দু নির্মূলীকরণে, সেটাও জানা কথা'। তবু ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার একবারও তাঁকে সতর্ক করেনি। বরং বিজেপি সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্কের জেরে তিনি ভারতে রানীর হালে আশ্রিতা, যেখানে তাঁর ভারতপন্থী রাজনীতির প্রতি বিদ্বেষ আছড়ে পড়ছে বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর; তারা আরও বেশি মাত্রায় আক্রান্ত। এখনও যে অবলুপ্ত নয়, সেটাই আশ্চর্য। আরও আশ্চর্য, হাসিনাকে অগণতান্ত্রিক ভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা মৌলবাদী তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেও ভারত নির্যাতন বন্ধ করার কথা না বলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে জড়াতে চেয়েছিল। অবশেষে বাংলাদেশে নির্বাচন করিয়ে বিএনপি-র তারেক রহমানকে ক্ষমতায় বসিয়ে বাঙালী হিন্দুনিগ্রহকে ভারত সরকার, বলতে গেলে, গণতান্ত্রিক বৈধতা দিয়ে দিল। অতএব বলা যায়, বাংলাদেশে হিন্দুনিগ্রহ চলছে কার্যত ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকারেরই সম্মতিক্রমে। 

ওদিকে তিন বিঘা করিডোরের কাছে কাগজে কলমে বাংলাদেশের ভারত লাগোয়া ৮টি হিন্দুপ্রধান গ্রামের অধিবাসীরা ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কাছে ভারতে যোগ দেওয়ার আবেদন করে করে ক্লান্ত। তাদের কাছে বাংলাদেশের কোনও নথিই নেই। আবার মুসলমানরা সহজেই ভারতের ভোটার আধার ইত্যাদি করিয়ে ফেলতে পারলেও, মনেপ্রাণে ভারতীয় এই হিন্দুদের কপালে সেসব সোজাপথ বা ঘুরপথ কোনোভাবেই জোটে না।

 

জানি না, এর পরেও সরকার পক্ষের হিন্দুত্ববাদী নেতা ও সমর্থকেরা বাংলাদেশের হিন্দু নির্যাতনের নিত্যনতুন রোমহর্ষক খবর জানিয়ে ঠিক কী বোঝাতে চান। সম্ভবত আমরা ইসলামিক হিংস্রতার সংবাদ শুনে শুধু শিউরে উঠব, শেয়ার করব, তদনুসারে ভোট দেব, এটাই প্রত্যাশিত গেরুয়া রাজশক্তির কাছে। কিন্তু ইসলামিক সন্ত্রাস নিরসনে আমাদের সরকারের সদর্থক উদ্যোগ প্রত্যাশা প্রকাশ করলেই উল্টে ইসলামিস্ট দেশদ্রোহী চিহ্নিত হতে হবে। বাস্তবে না হোক, ভার্চুয়াল লিঞ্চিং-এর আয়োজন হবে। আমাদের শুধু সিলেকটেড মিডিয়া ও ইউটিউবারদের কণ্ঠে বিশ্বগুরুর বিশ্বজয়ের বীরগাথা এবং ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সাফল্যের প্রশস্তি শুনে মুগ্ধ হতে হবে।


আমরা যেখানে ঘটনা ঘটার পর চুঁইয়ে পড়া সংবাদ থেকে একটু একটু করে বুঝতে পারছি, সেখানে যাদের হাতে শক্তিধর ভারত সরকারের ইন্টেলিজেন্স থেকে সেনা -- সব ক্ষমতা, সেই মহারথীরা ঘটনাবলীর আভাষ পাননি, হতে পারে? বাংলাদেশে হিন্দুদের সীমাহীন দুর্দশা থেকে মৌলবাদী অভ্যুত্থান -- সবকিছুরই আগাম খবর ছিল। এমনকি উত্তরপূর্ব ভারতে আমেরিকা কী খেলা খেলছে, সেই সংবাদও ছিল। তবু দুই বছর ধরে ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারের পর ২০২৪-এ যখন খোলাখুলি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং সাত বোন দখল করার হুমকি শোনা গেল ভারতের দয়ায় প্রতিপালিত বাংলাদেশের কর্তাব্যক্তিদের মুখে, তখনও ভারতের গেরুয়া সরকার বিরল সংযমে কুত্তার কামড় হজম করে গেল। 

অথচ এই সমস্ত কিছুর সবচেয়ে যুক্তিগ্রাহ্য ও সহজ সমাধান ছিল বাংলাদেশের খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও বরিশাল এই বিভাগগুলো দখল করে ঢাকাকে একা করে দেওয়া। অতটা না হলেও নিদেনপক্ষে রংপুর, চট্টগ্রাম ও খুলনার দখল নিলেও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশের অন্যায় আবদার মেটানো, অনুপ্রবেশ আর চিকেন নেক নিয়ে হুমকি, দীর্ঘ সীমান্ত বরাবর কাঁটাতার দেওয়ার খরচ-- সবকটি সমস্যারই সহজতর সমাধান বেরিয়ে আসত। ইউনূস আমলে তার যথেষ্ট যুক্তিগ্রাহ্য কারণ ও সুবর্ণ সুযোগ ছিল। আমার স্থূল সমাধানসন্ধানী বুদ্ধি তো তাই বলে। মনকে চোখ ঠেরে না রাখলে আরও অনেকেরই তাই মনে হবে।

কিন্তু আমাদের দেশের সরকারে আসীন নেতা মন্ত্রীদের সূক্ষ্ম বুদ্ধি সমস্যা সমাধানের বদলে জিইয়ে রেখে নিজেদের স্বার্থে রাজনীতি করার পক্ষে। তার মধ্যে একটা জাতিবিধ্বংসের (বাঙালী জাতির) অভিপ্রায়ও যেন সুপ্ত। তাই মুখে বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দু বৌদ্ধ জৈনদের আশ্রয় দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে অমুসলিম বাঙালী শরণার্থীদের আসার পথটাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আসলে বাংলাদেশের হিন্দুদের আশ্রয় দিলে বা সংশ্লিষ্ট উপদ্রুত ভূমি অধিকার করে নিলে ভারতে হিন্দু বাঙালীর সংখ্যাধিক্য ও গুরুত্ব বাড়বে, যেটা ওদের মোটেই কাম্য নয়। বরং বাংলার সঙ্গে বাংলাদেশের লড়াই বাধিয়ে রাখলেই হিন্দীপ্রধান পশ্চিম ভারতীয় নেতাদের গ্লাডিয়েটরদের লড়াই দেখার মতো হিংস্র সুখ লাভ হয়। তাই শীর্ষনেতৃত্ব বাংলাদেশে নিপীড়িত বাঙালী হিন্দুরা সংগঠিত হতে চাইলে তাদের বালোচদের মতো নৈতিক সমর্থন, অর্থসাহায্য বা অস্ত্র যোগান কোনোটাই দেয়নি; বরং মুসলমান হাসিনাকে আতিথ্য দিয়েছে, তৎসহ বাংলাদেশী মুসলমানদের দিয়ে রেখেছে বাঙালী হিন্দুর রক্তে স্নান করার পরিপূর্ণ ছাড়।


বোঝা যাচ্ছে কেন, পশ্চিমবঙ্গের মমতা সরকারের অনুপ্রবেশে প্রত্যক্ষ মদত এবং জামাতপন্থী ভারতবিরোধী অবস্থানের কথা জানা সত্ত্বেও কেন্দ্রের বিজেপি সরকার কেন মমতার প্রতি পরম সহিষ্ণু ছিল বা তার পরাজয়ের পরেও আছে। এমনকি মমতা যে ডীপ স্টেটের অন্যতম স্তম্ভ, তা আজ প্রকাশ্যে আসার পরেও দেখা যাচ্ছে "রাজনৈতিক সৌজন্য" নামক নাটকের অবসান হচ্ছে না; ঠিক যেমন আরজিকর কাণ্ডে সিবিআই তদন্ত নামক প্রহসন রাজ্য পুলিশের বলির পাঁঠা ধরা সিদ্ধান্তেই শীলমোহর দিয়েছে। হয়তো কঠোর পদক্ষেপ নিলে ধরা পড়বে মমতা ও অভিষেকের হাত আসলে নাগপুর ও গুজরাত হয়ে দিল্লী পর্যন্ত বিস্তৃত; সেইসঙ্গে তাদের দুর্নীতির শৃঙ্খলও।

আরজিকর-এর মৃতা ডাক্তারের মা রাজনীতিটা ভালোই বোঝেন এবং আবেগ দমন করে করতেও পারেন। তাই সিবিআইয়ের প্রতি তোলা প্রশ্নগুলো এখন ভুলে গেছেন। সুতরাং পাল্টা হাওয়ায় আমাদের মতো উলুখাগড়াদেরও ওসব ভুলে যাওয়া উচিত। মিডিয়া টিআরপি বর্ধক যা চর্বিতচর্বণ করবে বা আপডেট দেওয়ার ছলে পরিবেশন করবে, সেসব গিলেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। নাহলে বিপদ আছে। কারণ ডীপ স্টেটের একপ্রকার প্রমাণিত এজেন্টদের প্রতি এত প্রশ্রয় এত ছাড় থেকে অনুমান করা যায়, এই দেশে আমেরিকা তুর্কি ইত্যাদি বিদেশী শক্তিগুলোর হয়ে কাজ করছে না এমন নেতা, এমন দল বা এমন সংঘের সন্ধান পাওয়া খড়ের গাদায় ছুঁচ খুঁজে বার করার মতো ব্যাপার। তৃণমূল ডীপ স্টেটের একটা স্তম্ভ হয়ে থাকলে তার প্রতি প্রশ্রয়ী যারা তারা তো ডীপার স্টেট। 


পশ্চিমবঙ্গে পালাবদল জরুরি ছিল ডীপ স্টেটের পরিকল্পনা সাময়িকভাবে ভেস্তে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ডীপ স্টেটের গভীরেও যে কিছু খেলা আছে, যাদের লক্ষ্য সনাতন ভারতের যুগপৎ ইসলামীকরণ ও তারপর খ্রীষ্টানীকরণ, অথবা প্রথমটার মাধ্যমে দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছানো, সেই ডীপার স্টেট যে বহাল তবিয়তেই রয়ে গেছে, সেটা কেউ উপলব্ধি করছে না। আরব দুনিয়ায় বিশ্বগুরুর জনপ্রিয়তা আর আমেরিকার সঙ্গে love-hate রোম্যান্স সম্ভবত তারই নির্দেশক। কিন্তু অচৈতন্য অবস্থার মধ্যে এখনই আমাদের পাহাড় বনভূমি খনিজ ভূমিজ মনুষ্যত্ব সংস্কৃতি -- সব বিক্রি হয়ে গেছে; এরপর আর জেগেও লাভ নেই।


#SaveBangladeshiHindhu 

#highlightsシ゚ 

#DeepState 


✍️শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

Post a Comment

Previous Post Next Post