অতলান্তে বাঙালী সাম্প্রদায়িকতা ও জাতিবিদ্বেষের ঘূর্ণাবর্তে
কেন্দ্রীয় নেতাদের মনোভাবেরই প্রতিফলন
অমিত মালব্যর 'ভাষাজ্ঞান'। তবে এতে আরেকটা কাজও হল। বাংলাভাষা রক্ষার ধ্বজা এখন মাননীয়ার
হাতে, যাঁর দলের মাননীয় মহানাগরিক কিছুদিন আগেই আশা প্রকাশ করেছিলেন তাঁর মজ়হব কায়েম
হলে বাংলার মানুষ উর্দুতে কথা বলবে। ২০২৬-এ গেরুয়াদের ক্ষমতায় আসা এমনিতেই সুদূর
পরাহত ছিল। আর এই মন্তব্যের ফলে তো বঙ্গ নেতারা যেটুকু চেষ্টা করছিলেন শক্তি সুনীল
বিষ্ণু দে আউড়ে, তাতেও ভালোমতো জল ঢালা সম্পন্ন হল।
উদ্দেশ্য? সেটা বলতে হবে? বাংলাদেশকে
প্রশ্রয় দেওয়া থেকে অভয়াকাণ্ডে পর্দা দেওয়ার মাধ্যমে সবুজ সন্ত্রাস ও গেরুয়া মৌলবাদের
গাঁটছড়া যে অটুট, তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় নিরন্তর অসংখ্য
অনুরূপ সাম্প্রদায়িক ও লিঙ্গহিংসাত্মক ঘটনার ঘনঘটা দুই বাংলার আকাশে দিন-দিন গাঢ় থেকে
গাঢ়তর হচ্ছে।
এমতাবস্থায় মানুষের
মনে এমনিতেই সেটিং-এর অস্তিত্ব নিয়ে কোনও সংশয় থাকার কথা নয়। তবু চরম দুর্ভোগ থেকে
বাঁচার জন্য মন্দের ভালো বিকল্প হিসাবে তারপরেও মানুষ গেরুয়াদের একমাত্র বিকল্পরূপে
দেখছিল, কারণ বাকি দুটি পক্ষ কার্যত অস্তিত্বহীন অথবা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রশ্নে
ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বহাল সরকারেরই ছায়ামাত্র। তাই এই অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে চাইলে
সেই দলটিই যোগ্যতম বিকল্প হিসাবে বেছে নিতে হয়, যারা জাতীয় নাগরিক পঞ্জী ও নাগরিকত্ব
সংশোধনী আইনের মতো পদক্ষেপ ঘোষণা করে অন্তত মৌখিক সদিচ্ছার পরিচয় রেখেছে। এই দু'টির
যারা বিরোধিতা করেছে, তারা নিজগুণেই সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসীর কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।
কিন্তু লাগাতার অ্যাডভান্টেজ পেয়েও গেরুয়ারা বারবার ম্যাচ পয়েন্টে এসে ধ্যাড়াচ্ছে
কেন? কারণ তারা ম্যাচ জিততেই চায় না।
এখন ইচ্ছাকৃত হারের নেপথ্য কারণ কী? ম্যাচ
গড়াপেটায় টাকা-পয়সার গল্প থাকে। এখানে কী আছে তা বলতে পারব না, কারণ তদন্ত যারা
করবে সেই ইডি সিবিআই-এর গতিবিধি ও সাফল্য রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। যা প্রমাণ করতে
পারব না, তা অনুমান করলেও বলার দুঃসাহস দেখানো নিরাপদ নয়। তবে ক্রমাগত বাংলা ও বাঙালীর
ধ্বংসে নীরব দর্শক থাকা, বাংলাভাষী বা বাঙালী মানেই বাংলাদেশী অর্থাৎ অনুপ্রবেশকারী
বলে দাগানো এবং সর্বোপরি বাঙালীর বিপন্নতার সুযোগ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দী চাপিয়ে
দেওয়ার চেষ্টা-- এগুলো স্পষ্ট জাতিবিদ্বেষের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
লোকে বলে ভোটের জন্য
সাম্প্রদায়িক রাজনীতি হচ্ছে। আমি তো বলব, রাজনীতিটা করাই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক তথা জাতিগত
উদ্দেশ্যে। হিন্দুদের মধ্যে ঐতিহ্যের দিক দিয়ে সবচেয়ে সমৃদ্ধ, বুদ্ধিমান, আবেগী ও
প্রগতিশীল এই বাঙালী জাতিটিকে বরাবর ঈর্ষা করে এসেছে অবাঙালী হিন্দুরা। ঔপনিবেশিক আমলেও
ইংরেজদের সঙ্গে টক্কর দিয়ে বারবার বাংলার বিভাজন ডেকে এনেছি আমরা। দেশের স্বাধীনতা
এসেছে বাঙালীর বুকচেরা রক্তের বিনিময়ে, বাঙালীর ভিটে জ্বালিয়ে। কিন্তু তা সত্ত্বেও
ভারতের বিজ্ঞানচর্চা থেকে মার্গ সঙ্গীত কি মুম্বাই ফিলম ইন্ডাস্ট্রি -- কোনোকিছুতেই
বাঙালীর অনায়াস গতায়ত আটকানো যাচ্ছিল না। শুধু একটাই দুর্বল স্থান শনাক্ত করা গিয়েছিল---
৩৪ বছর ধরে আঁতলামির ছলে অজস্র শিল্পবিরোধী খানাখন্দের সঙ্গে একটা আত্মবিস্মৃতির অন্ধকূপও
বাংলার বুকে খনন করা হয়েই ছিল। শুধু দরকার তার মধ্যে ধাক্কা মেরে মানুষগুলোকে ফেলে
দেওয়া। বিগত দেড় দশকে আসলে সেই কাজটাই সুচারুরূপে করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, কূপে
পতিত মণ্ডুকদের চরিত্রকে মেলা-খেলা পাগলু-ছাগলু করে একেবারে পচিয়ে হাজিয়ে সংস্কারের
অযোগ্য করে তোলা হয়েছে অতি সুপরিকল্পিতভাবে, যাতে তাদের দোসর রাষ্ট্রীয় দলটি নিজেদের
হিন্দী-হিন্দু-হিন্দুস্তান এজেন্ডাকে বাংলার বুকেও সার্থক করে তুলতে পারে। তাই তো এখন
মাননীয়ার পতাকাতলে আমরা ভুলভাল উর্দুতে বাংলাভাষা আন্দোলনে শামিল হতে পারছি বিনা বিকারে।
হিন্দীর সঙ্গে উর্দুর পার্থক্য কতটুকু? রাওয়ালপিণ্ডি এক্সপ্রেসের মুখের ভাষা কি মাস্টার
ব্লাস্টারের চেয়ে বিশেষ কিছু আলাদা?
আর বাঙালী যে একেবারেই
পচে হেজে গেছে তার আরেকটা জোরালো প্রমাণ ঐ আবোলতাবোল বকওয়াসের বঙ্গ বিজেপি তো সাফাই
গাইছেই, এমনকি বিরোধী একটা পাঁঠারও মাথায় এলো না যে এটা বলে, ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম
তফশিলভুক্ত ভাষার মধ্যে একটি হল বাংলা। মিঃ অমুক আপনি সংবিধান বিরোধী মন্তব্য করেছেন।
আপনার বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না?
আপনারা ভাববেন, এভাবে
একটি দলের ভিলেন ও আরেকটি দলের ম্যাচ ফিক্সিং-এ সন্দেহভাজন বা অভিযুক্ত হয়ে লাভ কী?
আরে মশাই, সিনেমা নাটক দেখেন না? কেউ
হিরো হয়, কেউ ভিলেন, কেউ কমেডিয়ান। কিন্তু যে যার মতো পারিশ্রমিক তিনজনেই পায়, যে
টাকাটা আসে আর আমরা দর্শকরা খরচা করে সেই নাটক বা ছায়াছবি দেখি বলে।
ক্ষমতায় থাকলে কোটি কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাস
তথা অভিশাপ কিছুই বোধহয় স্পর্শ করে না। তাই বিশ্বজুড়ে এত দুর্ঘটনা ঘটলেও আগুন লাগিয়ে
বেহালা বাজিয়ে গান ধরা শয়তানগুলোর না গাড়ি গড়িয়ে খালে পড়ে না, বিমান আকাশে ভস্মীভূত
হয়।
